1. Hi Guest
    Pls Attention! Kazirhut Accepts Only Bengali (বাংলা) & English Language On this board. If u write something with other language, you will be direct banned!

    আপনার জন্য kazirhut.com এর পক্ষ থেকে বিশেষ উপহার :

    যে কোন সফটওয়্যারের ফুল ভার্সন প্রয়োজন হলে Software Request Center এ রিকোয়েস্ট করুন।

    Discover Your Ebook From Our Online Library E-Books | বাংলা ইবুক (Bengali Ebook)

Collected মোঘল হেরেমের দুনিয়া কাঁপানো প্রেম

Discussion in 'Collected' started by Zahir, Jul 3, 2013. Replies: 204 | Views: 26598

  1. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,257
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    সেই অভিজ্ঞতার চোখ এবং অনন্তর প্রেমিক মন নিয়ে আফসানাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। যৌবনের প্রথম দিকে ভালোবাসার চেয়ে শারীরিক সম্পর্কটাকেই প্রাধান্য দিতেন শাহজাদা। কোনো নারীর সানি্নধ্যে আসার অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি শরীরবৃত্তীয় কাজটি প্রথমে করে নিতেন নির্দ্বিধায়। তারপর কথাবার্তা। এর অবশ্য কারণও ছিল- উত্তেজিত হলে মানুষের মন-মস্তিষ্ক তার স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলে। শরীরের প্রতিও নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এ অবস্থায় পৃথিবীর কোনো বীর পুরুষই মাথা উঁচু করে নারীর সামনে কথা বলতে পারে না বরং এক ধরনের বিষণ্নতা ও হীনমন্যতা তাকে পেয়ে বসে এবং এই বেদনা সে বহন করতে থাকে বহুক্ষণ_ কখনো সখনো বহুদিন পর্যন্ত।
    শাহজাদার জীবনে নতুন ও আনকোরা সুন্দরী অপ্সরাদের আগমন ঘাটেছে অগণিত হারে। এমন দিনও গেছে যখন তিনি হররোজ কম করে হলেও ৩/৪ জন নারীর সানি্নধ্য উপভোগ করেছেন। পর্যাপ্ত উপহার দিয়ে মেয়েটিকে বিদায় করতেন। এমনকি এসব সঙ্গিনীর সঙ্গে তেমন কোনো কথাবার্তা বলতেন না। এমনকি নাম-পরিচয় পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করতেন না। জিজ্ঞাসা করার অবশ্য কারণও ছিল না। কারণ তিনি জানতেন মেয়েটির সঙ্গে দ্বিতীয়বার আর দেখা হবে না। তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা সারা দুনিয়ার বিভিন্ন ভাষাভাষী এতসব সুন্দরী মেয়েকে সংগ্রহ করে রেখেছে যে, এদের সবার সঙ্গে মিলিত হওয়া এক জীবনে অসম্ভব। মাঝে মধ্যে ওইসব মেয়েদের কথা ভেবে তার খুব খারাপও লাগত। একজন মাত্র পুরুষের ভোগের জন্য এতসব আয়োজন! অথচ সংক্ষিপ্ত জীবনের জরা-ব্যাধি, সুখ-দুঃখ, যুদ্ধ-বিগ্রহ কিংবা প্রাত্যহিক কাজ-কর্ম সারতেই বেশির ভাগ সময় চলে যায়। রঙ্গ-রসের এত সময়ইবা কোথায়। শাহজাদার জন্য সংগৃহীত মেয়েদের তিনি স্পর্শ না করা পর্যন্ত সে মেয়েটির যেমন সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত হয় না, তেমনি তার ভাগ্যও ঝুলে থাকে। দীর্ঘদিনের এ প্রথার সঙ্গে তিনিও কেমন জানি খাপ খাইয়ে নিয়েছেন। ফলে এ নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। বরং ভোগের জন্য মানসিক অস্থিরতা দিনকে দিন কেন বৃদ্ধি পাচ্ছে তা নিয়ে ইদানীং তিনি গবেষণা করছেন।

    নারী সানি্নধ্যে আসার সময় তিনি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মাতাল অবস্থায় থাকতেন। মাতাল থাকার সুবিধা অনেক। প্রথমত, কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। মাতাল অবস্থায় কৃত কর্মের জন্য অনুশোচনাও হয় না। এভাবেই চলে আসছিল বহুদিন থেকে। মাঝপথে আনারকলির সঙ্গে প্রণয় তৎপরবর্তী ঝামেলা এবং সবশেষ সম্রাটের বিরুদ্ধে নিষ্ফল বিদ্রোহে তার সব কিছু তছনছ হয়ে গেছে।

    আফসানার সামনে দাঁড়িয়ে এক ঝলকে অতীতের কিছু স্মৃতি স্মরণ করার পর শাহজাদা বাস্তবে ফিরে এলেন। রুপাইয়া বেগমের প্রসাদে আসার পর আজ অবধি তিনি কোনো সুরা পান করেননি। কোনো নারী সঙ্গও লাভ করেননি। অধিকন্তু অসুস্থ থাকাকালীন অবস্থায় হেকিমের পরামর্শে নিয়মিত আহার, ঘুম ও বিশ্রাম লাভের কারণে শরীর বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠেছে। আফসানার শরীরের স্পর্শে শাহজাদা তার নিজের শরীরে কিসের যেন নাচন অনুভব করলেন। তিনি সময়টাকে কাজে লাগানোর আগে গভীর মনোযোগ নিয়ে আফসানাকে দেখতে লাগলেন। অপরূপ সুন্দরী, যেন বিধাতা আপন হাতে গড়েছেন। মেয়েটি লম্বায় প্রায় শাহজাদার সমান। উজ্জ্বল গৌরবর্ণের সঙ্গে সর্বাঙ্গে এক অপরূপ গোলাপি আভা চিক চিক করছে। মুখটি গোলাকার নয়, আবার লম্বাটেও নয়। বরং লম্বাও গোলাকৃতির মাঝামাঝি। মুখমণ্ডলের সঙ্গে অসাধারণ দুটি ঠোঁট, বাঁশির মাতা সুচাল নাক, ডাগর দুটি অাঁখি, পরিপাটি চিকন ভ্রূ, উন্নত ললাট এবং মাথাভর্তি মেঘবরণ ঘন-কালো লম্বা কেশের বাহার শাহজাদাকে পাগল করে তুলল।
     
  2. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,257
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    তিনি আফসানার দুটো হাত নিজের হাতে নিয়ে ওলট-পালট করে দেখতে লাগলেন। নিখুঁত গাত্রবর্ণ। কোথাও একটি তিল পর্যন্ত নেই। গোলাপি রংয়ের ত্বকের মসৃণতা এতটাই নিপাট যে, তা ভেদ করে শরীরের ভেতরকার নীল রংয়ের রগগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হাত ধরার পর বুঝলেন এই হাত কখনো কোনো পুরুষ স্পর্শ করেনি। এত নরম, এত মসৃণ আর সুগন্ধিযুক্ত নারীদেহ তিনি জীবনে দেখেননি। তিনি আফসানার শরীরের অন্য অঙ্গগুলোর দিকে তাকালেন। অসম্ভব সুন্দর দুটি পা মেহেদি বা অন্য কোনো রং দিয়ে চমৎকারভাবে আলপনা অাঁকা রয়েছে সেখানে। পায়ের সঙ্গে মানানসই আঙ্গুলগুলোর মসৃণতা এবং আঙ্গুলের মাথার নখগুলো নারীর সৌন্দর্যতাকে আরও মাধুর্যময় করে তুলেছে। শরীরের সঙ্গে মানানসই মেদহীন কোমর এবং নিটোল পশ্চাৎদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মেদহীন পেট এবং তলপেট দেখে শাহজাদা রীতিমতো আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। এবার তিনি তার নজর আফসানার গণ্ডদেশের দিকে নিক্ষেপ করেন। একটি দুর্লভ মুক্তার কণ্ঠহার সেখানে জড়ানো রয়েছে এবং বুকের মাঝ বরাবর ঝোলনো রয়েছে। সেদিকে তাকানো মাত্র তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। বুকে চেপে ধরলেন মর্তে নেমে আসা হুর সদৃশ মানবীকে।

    পরবর্তী ঘটনায় আরও চমক অপেক্ষা করছিল শাহজাদার জন্য। আফসানার নরম দেহখানাকে বুকের মধ্যে নিয়ে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেন শাহজাদা। গভীর এবং দীর্ঘতর শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করতে করতে তিনি আলিঙ্গনের অকৃত্রিম স্বাদ অনুধাবন করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু নিজের বুকে অন্য দুটি মাংসপিণ্ডের খোঁচা অনুভব করলেন অভাবিতভাবে। এত সুদৃঢ় এবং সুগঠিত কাঙ্ক্ষিত বস্তুর খোঁচা তিনি জীবনে এই প্রথমবার আস্বাদন করলেন। আফসানা সম্পর্শে তার একটি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়ে গেল।

    আফসানার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হওয়ার আগে শাহজাদা ইচ্ছে করেই কিছুটা বেশি সময় নিয়ে ধৈর্যসহকারে তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হতে চাইলেন। এসব মেয়ে একদিকে যেমন মানসিকভাবে দুর্বল তেমনি অনভিজ্ঞতার কারণে কখনো সখনো লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়ে বসে, চিৎকার-চেঁচামেচির মাধ্যমে। শাহজাদাকে জীবনে এমন কিছু যদিও ঘটেনি, কিন্তু তিনি বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে বহু কল্প-কাহিনী শুনেছেন। আফসানা বা আফসানার মতো মেয়েরা যাদের রাজপুরুষদের ভোগের জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলা হয় তারা অবশ্য খুঁটিনাটি অনেক জানে। তারপরও শাহজাদা আফসানার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের আগে একটি মানসিক বন্ধন গড়ে তুলতে চাইলেন।
     
  3. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,257
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    শাহজাদা সেলিম তার বাহুবন্ধন থেকে আফসানাকে মুক্তি করে হাত ধরে টেনে খাটের ওপর বসালেন। এরপর নিজে তার পাশে বসে পরম যত্নে মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন। এরপর আবার আপনার হাতটি নিজের হাতে রেখে মমতা জড়ানো কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন_ তোমার কি খুব খারাপ লাগছে। এ ধরনের প্রশ্ন বা শাহজাদার কাছে এমন ব্যবহারের জন্য আফসানা মোটেই প্রস্তুত ছিল না। তার শিক্ষক তাকে এমন ধারণাই দিয়েছিলেন যে, রাজপুরুষরা শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনটাকেই প্রাধান্য দেয় বেশি। প্রেম-ভালোবাসা বা সহানুভূতি তাদের কাছে থেকে আশা করা বাতুলতা মাত্র। সেই মানসিক প্রস্তুতির বিপরীতে শাহজাদার দরদভরা স্নেহময় বক্তব্য শুনে আফসানা অশ্রুসজল নেত্রে তার দিকে তাকালেন। শাহজাদা সেলিম পুনরায় বললেন, আমাকে তোমার সম্পর্কে বিস্তারিত বল_ কোথা থেকে এসেছ, কিভাবে এসেছ, কিভাবে বড় হয়েছ ইত্যাদি।

    শাহজাদার আশ্বাস পেয়ে আফসানা শুরু করল তার জীবনের উপাখ্যান। বলল, হে আমার সাহেবে আলম- আজ আট বছর হলো আমি এ প্রাসাদে আছি। বাইরের দুনিয়ার কোনো খোঁজ-খবরই আমার কাছে নেই। এমনকি আমি ভুলে গেছি আমার আত্দীয়স্বজন, ভাইবোন ও পিতামাতার কথা। এই প্রাসাদের আবহাওয়া, চার দেয়ালের কান্না এবং ভেতরের জাঁকজমক যে কাউকে বাধ্য করে, তার সব কিছুকে ভুলে থাকতে। অথচ এখানে আসার আগে আমার সব কিছুই ছিল। ছিল স্বাধীন একটি জীবন, স্বাধীন চিন্তাশক্তি এবং সর্বোপরি স্বাধীন একটি মন। কিন্তু হঠাৎ কিসে যে কি হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না।

    হিমালয় পর্বতমালা এবং পীর পাঞ্জাল পর্বতমালার মধ্যবর্তী উপত্যকার সবচেয়ে ভয়াবহ যে পর্বতটি তার নাম নাঙ্গা পর্বত। এই পর্বতের পাদদেশে বালতিস্তান নামক গ্রামে আমাদের বসতবাটি। ওই গ্রামসহ পাশর্্ববর্তী প্রায় ১০০টি গ্রাম নিয়ে বিশাল পরগনার জমিদারি আমাদের পরিবার ভোগদখল করে আসছিল সুলতানি আমল থেকে। মোগল আমলে বিশেষত মহামতি আকবরের শাসনামলে আমাদের পরিবারের শান-শওকত বাড়তে থাকে অতি দ্রুততার সঙ্গে। মোগল সেনাপতি খানে খানান আবদুর রহিমের বদান্যতায় আমার পিতা ফতেপুর সিক্রিতে আগমন করে মহান সম্রাটের সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ লাভ করেন। সম্রাট আমার পিতাকে এক হাজারী মসনবদারীতে উন্নীত করে জায়গির প্রদান করেন।
     
  4. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,257
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    সম্রাট কর্তৃক আমার পিতাকে নতুন পদ, মর্যাদা এবং ক্ষমতা প্রদানের ফলে পুরো উপত্যকায় আমাদের ইজ্জত ও সম্মান বেড়ে যায় বহুগুণে। আমাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের জমিদারির পরিধি বেড়ে যায় বহুগুণে। এসব যখন ঘটছিল তখন আমার বয়স সবে পাঁচ বছর। আমার দাদি এবং আম্মা হুজুরের কাছে মোগল দরবারের শান-শওকত, রাজপুরুষদের যুদ্ধজয়ের নানা কাহিনী আর রাজ কুমারীদের প্রেমের কথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম। আমাদের হাভেলীতে নতুন প্রাসাদ নির্মিত হলো এবং প্রাসাদের বাইরে এক হাজার সৈন্য থাকার মতো গ্যারিসন নির্মিত হলো। হিন্দুস্তান, কাবুল, তুর্কিমেনিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সৈনিকরা মোগল সরকারের বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসেবে সেই গ্যারিসনে আসত। একজন মোগল সুবেদার গ্যারিসনটির দায়িত্বে থাকলেও তাকে আমার পিতার হুকুম মেনে চলতে হতো। কারণ গ্যারিসনের সৈন্যদের বেতন-ভাতাসহ নানান ব্যয় আমাদের জমিদারি থেকেই পরিশোধিত হতো।

    আমি এবং আমার বোনেরা সুযোগ পেলেই গ্যারিসন এলাকায় যেতাম বিভিন্ন রকম তেজি আরবি ঘোড়া আর তুর্কি টাট্টু ঘোড়া দেখার জন্য। সকাল-বিকাল ঘোড়াগুলোকে বিশেষভাবে পরিচর্যা করা হতো। ঘোড়াগুলো যখন খোশ মেজাজে থাকত তখন মাথা ঝাকিয়ে চি হি হি শব্দে প্রবলভাবে ডেকে উঠত। হৃষ্টপুষ্ট ঘোড়াগুলোর সেই ডাকাডাকি আমাদের বালিকা বেলায় যে কি অসাধারণ আনন্দ দিতো তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। ঘোড়ার ডাকাডাকির পাশাপাশি আমাদের আরও একটি জিনিস ভীষণ ভালো লাগত আর তা হলো সৈনিকদের কুচকাওয়াজ।

    বাদ্যের তালে তালে খুব সকালে সৈনিকরা যখন কুচকাওয়াজ করত তখন প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও আমাদের শরীর গরম হয়ে যেত এক ধরনের উত্তেজনায়।

    গ্যারিসনের দায়িত্বে নিয়োজিত মোগল সুবেদারের নাম ছিল মির্জা খলিল। তিনি যে কোনোভাবে দূরসম্পর্কীয় হলেও মোগল খান্দানের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন। তার স্ত্রী বেশ কয়েকবার ফতেপুর সিক্রির শাহী হেরেমে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিলেন এবং একবার সম্রাজ্ঞী রুকাইয়া সুলতানার সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ পেয়েছিলেন। সুবেদার সাহেব এবং তার স্ত্রী আমাকে ভীষণ ভালোবাসতেন এবং আমরা যখনই গ্যারিসনে যেতাম তখন তারা আমাদের দলবলকে তাদের প্রাসাদে ডেকে নিয়ে মিঠাই-মণ্ডা খাওয়াতেন। জেবুনি্নসা নামের তাদের একটি অপরূপা কন্যাসন্তান ছিল আমার বয়সী। কয়েকদিন পর জেবুনি্নসার সঙ্গে আমার খাতির হয়ে গেল এবং আমাদের দুই পরিবার বিরাট অনুষ্ঠান করে আমাদের মধ্যে 'সহেলীগিরি' পাতিয়ে দিল। তারপর থেকে আমাদের দুজনের শিক্ষা-দীক্ষা একসঙ্গে চলতে থাকল। আমাদের মধ্যে এমনই মহব্বত পয়দা হলো যে, আমরা একে অপরকে না দেখে একদণ্ডও থাকতে পারতাম না।
     
  5. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,257
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে কেবল ধর্ম এবং মোগল দরবারের প্রতি আনুগত্য ব্যতিরেকে তেমন কোনো মিল ছিল না। আমরা স্থানীয় পাখতুন ভাষায় কথা বলতাম আর জেবুনি্নসারা বলত পরিশুদ্ধ ফারসি ভাষায়। আমাদের খাবার-দাবার, পোশাক-আশাক এমনকি চেহারা-সুরতও ছিল ভিন্ন। কিন্তু মনের মিল ছিল অসাধারণ। ফলে অল্প কিছুদিন দুটি পরিবার একত্রে চলার পর আমরা একে অপরের ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি করায়ত্ত করে ফেলি। জেবুনি্নসার বাবা-মায়ের কাছে থেকে আমার আব্বা-আম্মা মোগল শাহী খান্দানের গল্প শুনতেন। মোগল রাজ রক্তের ইতিহাস বিশেষ করে তৈমুরীয় খান্দান আর চেঙ্গিস খানের খান্দানের কাহিনী শুনে আমার আব্বা মোগলদের প্রতি অত্যধিক মাত্রায় আকর্ষিত হতে থাকলেন।

    মোগল দরবারের অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয় এবং মোগল হেরেমের ইতিহাস আমার আব্বা-আম্মার মনকে ভীষণভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলল। তারা স্বপ্ন দেখতে লাগলেন, কোনো মোগল রাজকুমার সদলবলে ঘোড়া হাঁকিয়ে তাদের হাভেলীর মেহমান হিসেবে তসরিফ এনেছেন এবং তাদের কন্যারা ফতেপুর সিক্রি, আগ্রা, দিলি্ল বা লাহোর হেরেমে ঢোকার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। আর কোনোমতে এ সুযোগ একবার পেলে আর কোনো চিন্তা নেই। সমগ্র মোগল সালতানাতের সর্বত্র সব জায়গির, সব দরবার, সব অফিস, সব গ্যারিসন এমনকি দেওয়ানি-ফৌজদারি আদালতসমূহে পাওয়া যাবে বিশেষ মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা আর অধিকার। শুধু কি তাই- রাজ্যের সব সরকারি সম্পত্তি প্রয়োজনে ব্যবহার করার অধিকারও পেয়ে যাবেন তারা।

    মূলত জায়গির লাভের পরই আমার আব্বা-আম্মা এসব খবর আর লোভ-লালসা এবং স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কথাবার্তা শুনতে পেলেন। মাঝে-মধ্যে উচ্চপদস্থ মোগল কর্তারা আমাদের হাভেলীতে আসতেন। সাম্রাজ্যের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সৈন্য-সামন্ত নিয়ে যুদ্ধ কিংবা অন্য কোনো কারণে পাড়ি দেওয়ার সময় আমাদের হাভেলী মাঝপথে পড়লে কেউ কেউ যাত্রাবিরতি করতেন। দুই হাজারি, তিন হাজারি বা চার হাজারি কোনো সেনাপতিকে দেখলে আমার আব্বা এবং জেবুনি্নসার আব্বার হুশ থাকত না। সর্বোচ্চ সতকর্তা, আন্তরিকতা এবং আতিথেয়তা দ্বারা ওই সেনাপতিকে আপ্যায়ন করা হতো। এতে করে সমগ্র কাশ্মীর উপত্যকায় আমাদের মান-মর্যাদা বুদ্ধি পেত। এভাবে চলতে চলতে আমার বয়স ১০ বছর পূর্ণ হলো। আমার আব্বার জায়গির লাভের পর গত পাঁচ বছর আমিসহ আমাদের পরিবারের সবাই নানা রকম রাজকীয় নিয়ম-কানুন শিখেছি এবং একই সঙ্গে বড় কিছু করার বা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করেছি। এরই মধ্যে সৌভাগ্যক্রমে মোগল সরকারের অন্যতম ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী সাত হাজারি সেনাপতি এবং বিখ্যাত বৈরাম খানের পুত্র খানে খানান আবদুর রহিম আমাদের হাভেলীতে মেহমান হিসেবে এলেন।
     
  6. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,257
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    মোগল হেরেমের দুনিয়া কাঁপানো প্রেম (১৮ তম পর্ব)

    [​IMG]

    খানে খানান আবদুর রহিমের কথা শোনামাত্র শাহজাদা সেলিমের মুখমণ্ডল গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি সন্দেহভরা দৃষ্টি নিয়ে আফসানার দিকে তাকালেন।

    নিজের অজান্তে তার শরীরের সবগুলো পেশি রাগ আর ক্রোধে শক্ত হয়ে উঠল। একবার মনে হলো তলোয়ার দিয়ে এ মুহূর্তে আফসানার মস্তক তার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। আফসানার অনুপম স্বর্গীয় সৌন্দর্য কামদীপ্ত মিহি কণ্ঠস্বর এবং সর্বোপরি মেধাদীপ্ত অভিব্যক্তি কোনো কিছুই যুবরাজের মেজাজ ঠাণ্ডা করতে পারছিল না। শাহজাদা অনেকক্ষণ এই অষ্টাদশী সুন্দরীর সঙ্গে রমণপূর্ব রঙ্গ-রসিকতা করছিলেন। তার পলাতক জীবনের নির্জন ও দুর্বিষহ স্মৃতিগুলো আফসানার সানি্নধ্যের ছোঁয়ায় মুছে ফেলার চেষ্টা করছিলেন। আর এ কারণেই অনেকক্ষণ ধরে তার কথা শুনছিলেন কেবল মানসিকভাবে তাকে কাছে পাওয়ার জন্য। আফসানার বর্ণিল বর্ণনা এবং নিজের জীবন-কাহিনী চমৎকারভাবে গল্পাকারে উপস্থাপন করার কারণে শাহজাদা তন্ময় হয়ে শুনছিলেন এতক্ষণ ধরে। কিন্তু তার ইদানীংকালের জাতশত্রু খানে খাহান আবদুর রহিমের নাম শোনামাত্র তিনি হঠাৎ করেই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন।
    শাহজাদা আফসানার হাত ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

    তার পর এগিয়ে গেলেন সুরার পাত্রের দিকে। স্বর্ণপাত্রে রক্ষিত পারস্যদেশ থেকে আমদানিকৃত এবং শাহজাদার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত সুরা থেকে ঢক ঢক করে পান করলেন অনেকটা। শাহজাদার এই হাবভাব দেখে আফসানা ভয়ে শুকনো পাতারমতো থর থর করে কাঁপতে লাগল। সে বুঝে উঠতে পারল না হঠাৎ করে শাহজাদা এতটা উত্তেজিত হয়ে পড়লেন কেন! অনেকটা কিংকতর্ব্যবিমূঢ় আফসানা তার সব মেধা, যোগ্যতা আর প্রশিক্ষিত চিন্তাশক্তি দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিলো। মুহূর্তের মধ্যে সে হৃদয়ের সব ভয়। দ্বিধা আর সংকোচ ঝেড়ে ফেলল। হিমালয়ের পাদদেশের যে অঞ্চলে তার জন্ম সেখানকার নারী-পুরুষের ধমনিতে মনে হয় অন্যরকম রক্ত প্রবাহিত হয়। প্রচণ্ড বিরূপ আবহাওয়া, দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশ আর শত শত ছোট ছোট পার্বত্য গোত্রের মধ্যকার নিত্যনৈমত্তিক যুদ্ধবিগ্রহ এবং দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদের কারণে এমনিতেই সেখানকার লোক অসাধারণ সাহসী। কষ্টসহিষ্ণু এবং তড়িৎ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী আফসানাও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
    বসা থেকে উঠে দাঁড়াল আফসানা। তারপর শাহজাদার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দৃঢ় অভিব্যক্তি নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কি হয়েছে সাহেবে আলম! শাহজাদা সারা জীবন নারীকে দুর্বল অবস্থায় দেখতেই অভ্যস্ত ছিলেন। মেয়েরা পুতু পুতু করে কথা বলবে, কিছু হলেই নাকিয়ে নাকিয়ে কাঁদবে। নাকের পানি আর চোখের পানি একাকার হয়ে যাবে এবং সবশেষে তার কাছে শর্তহীন ক্ষমা প্রার্থনা করে পায়ে লুটিয়ে পড়বে। এই চিরায়ত দৃশ্যের বাইরে গিয়ে আফসানা যখন প্রবল ব্যক্তিত্ব নিয়ে শাহজাদাকে প্রশ্ন করল, তখন ঘটনার আকস্মিকতায় তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। খানে খানান আবদুর রহিমের নাম শোনামাত্র তিনি যে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন এবং আফসানাকে শত্রুপক্ষের গুপ্তচর ভেবে সন্দেহ করেছেন তা তিনি কিভাবে প্রকাশ করবেন_ এমনটি যখন ভাবছিলেন তখন তাকে ততোধিক আশ্চর্য করে দিয়ে অষ্টাদশী সুন্দরী তার সুকোমল হাত দিয়ে প্রথমে শাহজাদার হাত দুইখানা চেপে ধরলেন। তারপর সাজারে তাকে আলিঙ্গন বন্ধ করে শাহজাদার লোমশ বুকে মাথা রেখে পাগলের মতো মুখ ঘষতে রাগল এবং একের পর এক চুম্বনে সিক্ত করতে করতে তাকে পুনরায় বিছানার ওপর নিয়ে বসাল।
     
  7. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,257
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    একান্ত বাধ্যগত বালকের মতো শাহজাদা আফসানার ইচ্ছার কাছে নিজেকে সমর্পণ করলেন। আফসানা এবার শাহজাদাকে শুইয়ে দিলেন। তারপর পা দুটো আপন কোলে উঠিয়ে নিলেন। যথাসম্ভব শক্তি প্রয়োগ করে পা দুটো টিপতে কখনো পায়ের পাতার কাছে হাত রেখে চমৎকার পেশা দারিত্ব নিয়ে এমনভাবে ম্যাসাজ করতে লাগল যে, শাহজাদা মুহূর্তের মধ্যেই তার বিষণ্নতা কাটিয়ে উঠে চাঙ্গা অনুভব করতে লাগলেন। তার রাগ পানি হয়ে গেল এবং নেশাও ছুটে পালাল। তিনি উঠে বসতে চাইলেন।

    আফসানা এবার মৃদু আপত্তি জানিয়ে শাহজাদাকে আরও কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার অনুরোধ জানাল। কোনো কথা না বলে শাহজাদা আফসানাকে বুকে টেনে নিলেন। এই সুযোগে আফসানা শাহজাদার বুকে মাথা রেখে তার কোমল হাত দিয়ে আরাধ্য পুরুষের মুখমণ্ডল, ঠোঁট, ঘাড়, চিবুক প্রভৃতি স্থানে হাত বোলাতে বোলাতে বলল_ মান্যবর সাহেবের আলম! আমার বয়স ও অভিজ্ঞতা নিতান্ত কম হলেও শাহী হেরেমের শিক্ষা ব্যবস্থাপনার কারণে আমি রাজনৈতিকভাবে বেশ পরিপক্বতা অর্জন করেছি। হঠাৎ করে আপনার উত্তেজিত হওয়ার কারণও আমি অনুধাবন করতে পেরেছি। আপনি হয়তো সন্দেহ করেছেন আমি বা আমার পরিবার খানে খানান আবদুর রহিমের শুভাকাঙ্ক্ষী এবং হয়তো এই প্রসঙ্গে আমি গুপ্তচর হিসেবে কাজ করছি!

    আফসানার কথা শুনে শাহজাদা নড়েচড়ে বসলেন এবং বিব্রতভঙ্গিতে যুবতীর দিকে তাকালেন। আমতা আমতা করে বললেন, ঠিক তা নয়। তবে হ্যাঁ কিন্তু জানত, কেবল তার এবং তার পুত্রদের জন্য আমি পরাজিত হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আমি ইতোমধ্যে তার দুই পুত্রকে আমার বিশ্বস্ত লোকের মাধ্যমে অপহরণ করে দিলি্লর কুখ্যাত 'খুনি দরজায়' ফেলে হত্যা করেছি। আমার আব্বা হুজুরের বিখ্যাত নবরত্ন অর্থাৎ নয়জন প্রভাবশালী মন্ত্রীর অন্যতম হলেন খানে খানান আবদুর রহিম। তিনি কেবল প্রভাবশালী মন্ত্রীই নন, বিভিন্নভাবে মোগল খান্দানের সঙ্গে আত্দীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। নিজের অনুগত সৈন্য-সামন্ত ছাড়া মূল শাহী ফৌজের ওপর রয়েছে তার বিরাট প্রভাব। তার যে দুই পুত্রকে আমি হত্যা করেছি তারাও ছিল নামকরা সেনাপতি এবং আব্বা হুজুরের অতিশয় স্নেহধন্য। পুত্র হারিয়ে খানে খানান পাগলপ্রায় হয়ে পড়েছেন এবং আমাকে হত্যার জন্য হন্যে হয়ে ফিরছেন। এ অবস্থায় তোমার মুখে তার কথা শুনে আমি বিচলিত হবো এটাই স্বাভাবিক। যা হোক তুমি যা বলছিলে তা আবার শুরু কর এবং আমাকে সব কিছু বল, যা তুমি জান; বিশেষ করে খানে খানান সম্পর্কে-
     
  8. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,257
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    আফসানা তার শৈশবের কাহিনী পুনরায় শুরু করল, যেখান থেকে সে এর আগে শেষ করেছিল। আমার মালিক আমার সর্দার! আজকের এ সময়টাতে আমার বয়স যখন ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে এবং আপনি আপনার মহামতি পিতার সঙ্গে যদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে ১৫৯৯ সালটাকে ইতিহাসে স্থান করে দিলেন যার নিয়তিতে আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ হলো- এই ক্ষণটির জন্য আমার কিন্তু যাত্রা শুরু হয়েছিল ঠিক আট বছর আগে। ১৫৯১ সালে আমার বয়স যখন ১০ বছর তখনই খানে খানান আবদুর রহিম আমাদের হাভেলিতে এলেন। তিনি আসার একমাস আগ থেকেই শুরু হলো ব্যাপক প্রস্তুতি। তার ফৌজের অগ্রবর্তী একটি দল আমাদের হাভেলি এসে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা তল্লাশি চালিয়ে গেল। লাহোর কোর্ট থেকেও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এলেন। সব বিষয়ে যখন ইতিবাচক প্রতিবেদন খানে খানানের দফতরে পেশ করা হলো তখন তার সচিব সরকারিভাবে ফরমান জারি করে সেনাপতির আগমন বার্তা পাঠিয়ে দিলেন আমাদের হাভেলিতে।

    আমার বয়স তখন ১০ বছর হলেও অন্যসব সাধারণ বালিকার মতো জীবন সম্পর্কে উদাসীন ছিলাম না। পারিবারিক শিক্ষাও পরিবেশের কারণে অনেক কিছুই জানতাম এবং অনেক কিছু বোঝার চেষ্টা করতাম। খানে খানানের আগমন সংবাদে আমাদের জমিদারিসহ আশপাশের পরগনার লাখ লাখ হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইতে শুরু করে। হিন্দুরা বিশ্বাস করত, তাদের ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাক্ষাৎ রক্তের ধারক হলেন খানে খানান। হিন্দুরাই আমাদের জানাল যে, খানে খানান আবদুর রহিম জন্ম নিয়েছিলেন ১৫৫৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর। মায়ের দিক থেকে তিনি কিভাবে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে আত্দীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন সে কাহিনী বলতে গিয়ে তারা পুরো মোগল খান্দানের এক বিরাট ইতিহাস আমাদের শুনিয়ে ফেলল। সম্রাট বাবরের মৃত্যুর পর শাহজাদা হুমায়ুন যখন দিলি্লর সিংহাসনে আসীন হলেন তখন রাজ্যের সব বালা-মুসিবত তাকে ঘিরে ধরল। পাঠান বীর শেরশাহ সুরী কর্তৃক পরাজিত হয়ে তিনি বহু বছর পথেঘাটে ঘুরে বেড়ালেন। তারপর লাহোর, কাবুল হয়ে পারস্যে গেলেন। আবার দিলি্ল জয় করলেন। তার দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনে বট বৃক্ষের মতো আশ্রয়দাতা, সহযোগী কিংবা সহযোদ্ধা হিসেবে ছিলেন সেনাপতি বৈরাম খান। দিলি্ল জয়ের পরও হুমায়ুন শেরশাহের কতিপয় আত্দীয়স্বজনের সঙ্গে পেরে উঠছিলেন না। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ভারতীয় রাজ্য সেওয়াতের শাসন কর্তা হাসান খান। হরিয়ানা এবং রাজস্থানের বিরাট অংশ নিয়ে গঠিত প্রাচীন এ রাজ্যটি খ্রিস্ট জন্মের ৫০০ বছর আগে থেকেই নানা কারণে প্রসিদ্ধ অর্জন করেছিল।

    হাসান খান ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে খানুয়ার যুদ্ধে বাবরের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন। দিলি্ল-গুরগাঁও, আলওয়ার-জয়পুর মহাসড়কটি মেওয়াত রাজ্যের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়ার কারণে কৌশলগতভাবে রাজ্যটি অসাধারণ গুরুত্ববহন করত। হাসান খানের পর তার ভাই জামাল খান এ গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের কর্ণধার হলেন। হুমায়ুন নিজে জামান খানের বড় মেয়েকে বিয়ে করলেন এবং ছোট মেয়ের সঙ্গে বেরাম খানের বিয়ে দিলেন। হাসান খান এবং জামাল খানেরা মুসলমান হওয়ার আগে হিন্দু ছিলেন এবং বংশানুক্রমে রাজপুত রক্তের ধারক ছিলেন। রাজপুত খানের রাজার পুত্র এ নামের সঙ্গ মিল রেখে তারা মুসলমান হওয়ার পর নতুন উপাধি ধারণ করলেন খানজাদা অর্থাৎ খানের পুত্র। রাজপুতরা ঐতিহাসিকভাবে শ্রী কৃষ্ণের বংশধর বলে স্বীকৃত হওয়ার কারণে সেই বংশের একটি অংশ মুসলমান হয়ে খানজাদা উপাধি ধারণ করলেও ভারতবর্ষের হিন্দুরা তাদের যারপরনাই ভক্তি-শ্রদ্ধা করত।
     
  9. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,257
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    জামাল খানের কনিষ্ঠ কন্যার পুত্র হিসেবে খানে খানান আবদুর রহিম লাহোরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা বৈরাম খান আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছিলেন গুজরাটের পাথান নামক স্থানে। তখন বালক আবদুর রহিম ও তার মাকে প্রথমে নেওয়া হয় আহমেদাবাদে এবং পরে আনা হয় দিলি্লতে। সম্রাট আকবর তাকে মির্জা খান উপাধি দেন এবং পরবর্তী সময়ে মোগল সালতানাতের বিখ্যাত আমিরের ততোধিক বিখ্যাত বোন সাহবানুর সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করেন। অন্যদিকে আবদুর রহিমের সৎমা সালিমা সুলতান বেগমকে স্বয়ং সম্রাট বিয়ে করার পর রাজ দরবারে তার প্রতিপত্ত আরও বেড়ে যায়।

    খানে খানান আবদুর রহিম একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও মনে-প্রাণে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি এক ধরনের দরদ অনুভব করতেন। তার কাব্যপ্রতিভা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর অসাধারণ পাণ্ডিত্য কেবল ভারতবর্ষই নয়, সমসাময়িক দুনিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। তার রচিত পুস্তক 'খেত কাওতুকাম' এবং 'দাওয়াউইসথ ইউগাভানি' জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দুটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের প্রশংসা কুড়াবে। ভারতবর্ষের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি তুলসী দাস ছিলেন তার ব্যক্তিগত পরম ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বারানসির গঙ্গাতীরে বসে দুই বন্ধু একসঙ্গে শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে বহু বিখ্যাত কবিতা রচনা করেছেন। যা ভারতবর্ষের হিন্দুদের মুখে মুখে ধর্মীয় শ্লোক হিসেবে হররোজ উচ্চারিত হতে থাকে।

    আমাদের হাভেলিতে এসে হিন্দু পণ্ডিতরা খানে খানান সম্পর্কে উপরোক্ত বক্তব্য প্রদান করল। এর বাইরে তার রাজসিক প্রভাব প্রতিপত্তি তো ছিলই। এমন একজন বিরাট মাপের মানুষ আমাদের ক্ষুদ্র হাভেলিতে প্রায় এক সপ্তাহ থাকবেন, তা আমার আব্বাজান কল্পনাই করতে পারছিলেন না। অতিরিক্ত উত্তেজনা আনন্দ আর খুশির ধাক্কায় আব্বাজানের খাওয়া-দাওয়া, ঘুম ও বিশ্রাম হারাম হয়ে গেল। তিনি একদিন হঠাৎ সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেন। কবিরাজ অনেক চেষ্টা-তদবির করার পর আব্বাজান সুস্থ হলেন বটে, কিন্তু অজানা কারণে কয়েকদিন বাকরূদ্ধ হয়ে রইলেন। আমাদের জেনানা মহলে কান্নার রোল উঠল। এই সময়ে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন স্থানীয় মোগল সুবেদার মির্জা খলিল। তিনি আব্বাজানকে এই মর্মে নিশ্চিত করলেন যে, খানে খানানকে অতিরিক্ত সম্মান কিংবা আদর-যত্ন করার দরকার হবে না। কারণ তিনি খুবই বাস্তববাদী এবং মরমী সাধক প্রকৃতির মানুষ। বেশি বাড়াবাড়ি করলে তিনি হয়তো বিরক্ত হতে পারেন। সুবেদার চাচা আব্বাকে বিশ্রাম নিতে অনুরোধ জানিয়ে পুরো আয়োজনের দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিলেন।

    খানে খানানকে ফুল দিয়ে বরণ করার দায়িত্ব অর্পিত হলো আমার প্রতি এবং আমাকে সাহায্য করবে আমার সহেলী জেবুনি্নসা যার কথা ইতোপূর্বে আপনাকে বলেছি। আমার সহেলী জেবুনি্নসার বাস্তব বুদ্ধি আমার চেয়ে বেশি ছিল। তার পিতার চাকরি উপলক্ষে গত ১০ বছরে তারা হিন্দুস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করেছে। অনেক লোক দেশ এবং মানুষের আচার-আচরণ সম্পর্কে সে আমাকে অদ্ভুত অদ্ভুত সব কথা বলত যেগুলো ছিল বেশ আকর্ষণীয় এবং কৌতূহলী। সে আমাকে যৌন জীবন সম্পর্কে নানা রসাত্দক কথাবার্তা বলত যার বেশির ভাগই আমি বুঝতাম না। সে বলত আমার নাকি আর কিছুদিন পরই বুকের মাংস পিণ্ডগুলো উঁচু হয়ে উঠবে এবং তার দিকে সব পুরুষ তাকিয়ে থাকবে। পুরুষরা নাকি ভারি বজ্জাত প্রবৃত্তির- তারা সুযোগ পেলে কিশোরী মেয়েদের আদর স্নেহ করার উসিলায় কাছে ডেকে নেয়। প্রথমে মাথায় হাত বুলায়, তারপর সুযোগ পেলে বুকে হাত দেয় এবং শরীরের অন্যান্য স্থানে খোঁচা দেয়। আমাদের হাভেলী বা পার্বত্য অঞ্চলে মেয়েরা অবাধে ঘুরে বেড়ায় দিন রাতের সব সময়। কিন্তু জেবুনি্নসার বর্ণনা মতে কোনো কথা আমি জীবনে শুনিনি।
     
  10. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,257
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    আমার সহেলীর বয়স আমার সমান হলেও তার আভিজাত্য শিক্ষাদীক্ষা এবং সততা আমাকে মুগ্ধ করত। আমি প্রতি মুহূর্তে তাকে কাছে পেতে চাইতাম। কিন্তু তার পিতা অর্থাৎ আমাদের সুবেদার চাচার কঠোর অনুশাসনের জন্য তা সব সময় সম্ভব হতো না। খানে খানানের আগমন উপলক্ষে আমাদের দুটো পরিবার ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশার সুযোগ পেল। আর তখনই জানলাম জেবুনি্নসা আগামী ২/১ মাসের মধ্যে মোগল হেরেমে চলে যাচ্ছে রাজকীয় কয়েদা কানুন শেখার জন্য। আমার আম্মাজান এবং আম্মাহুজুর এই কথা শোনার পর পাগল হয়ে গেলেন আমাকেও জেবুনি্নসার সঙ্গে মোগল হেরেমে পাঠানোর জন্য। প্রতিটি জায়গীয়দার স্থানীয় অভিজাত সামন্তগণ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্থাব্যক্তিরা ছাড়াও পাশর্্ববর্তী দেশের রাজকন্যাদের অভিভাবকরা তাদের সবচেয়ে সুন্দরী এবং মেধাবী কন্যাটিকে মোঘল হেরেমের রয়্যাল একাডেমিতে পাঠানোর স্বপ্ন দেখতেন।

    আমার আব্বাজান যখন তার মনের গোপন স্বপ্নটির কথা সুবেদার চাচার কাছে বললেন, তখন চাচা তাকে আমার বাণী শুনালেন এই কথা বলে যে, হয়তো আল্লাহর ইচ্ছাতেই আমাদের পরিবার বিরল সেই সম্মান পেতে পারে খানে খানানের অনুকম্পায়। কারণ কেউ চাইলেই তার কন্যাকে শাহী হেমেরের রয়্যাল একাডেমিতে পাঠাতে পারত না। প্রথমত মোগল দরবারের কোনো প্রথম সারীর সাত হাজারী আমিরের সুপারিশ সহকারে দরখাস্তটি একাডেমির অধ্যক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত হতে হতো। অধ্যক্ষ মেয়েটিকে দেখতেন এবং তার মেধা, পারিবারিক গঠন, বংশ মর্যাদা এবং মোগল খান্দানের সঙ্গে মেয়েটির পরিবারের সম্পর্কের ইতিবাচক দিকগুলোর চুলচেরা বিচার করে তার মতামত দিতেন। মতামত যদি ইতিবাচক হতো সে ক্ষেত্রে দরখাস্তটিতে হেরেমের কোনো মালেকাই আলেয়া বা রাজ মহীয়সীর অনুমোদন লাগত। এ পর্বটি হলো সবচেয়ে কঠিন। কারণ কোনো সম্রাজ্ঞীই এই দায়িত্ব নিতে চাইতেন না নিতান্ত বাধ্য না হলে। কারণ মেয়েটির খাওয়া-দাওয়া, নিরাপত্তা, শিক্ষাদীক্ষা, তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং সবশেষে মেয়েটিকে কর্মজীবনে প্রবেশ করানোর সব দায়িত্ব সম্রাজ্ঞীকেই নিতে হতো। এ ক্ষেত্রে মেয়েটি যদি সবদিক থেকে ভালো করত তবে সম্রাজ্ঞীর মানসম্মান বাড়ত আর তা না হলে বেইজ্জতীর সীমা থাকত না।

    কেবল প্রধান রাজমহীয়সী সম্রাটের সঙ্গে কেন্দ্রীয় রাজপ্রাসাদে থাকতেন। অন্যান্য রাজমহীয়সী আলাদা আলাদা প্রাসাদে থাকলেও সব প্রাসাদই একক হেরেম হিসেবে অনুমোদিত হয়ে একই ধরনের আইনের দ্বারা পরিচালিত হতো। কিছু কর্মকর্তা সম্রাজ্ঞীর ইচ্ছায় নিয়োগ হলেও বেশির ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীই ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের সচিবালয় কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত। তাদের নিয়ন্ত্রণ, বেতনভাতা, পদোন্নতি সবই ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন। এই অবস্থায় রাজমহীয়সীর অনুমোদন পাওয়ার জন্য দরবার এবং হেরেমের উঁচু-নীচু বহু কর্তা-কর্তার আনকুল্য এবং সহযোগিতার দরকার হতো। কখনো কখনো এ কাজে বড় রকমের ঘুষের লেনদেনও হতো।

    সুবেদার চাচার কাছে এত্তো সব ফিরিস্তি শোনার পর আমার আব্বা এবং আম্মাহুজুর হতাশ হয়ে পড়লেন। কিন্তু চাচাজান যখন আশ্বাস দিলেন যে, ফতেপুর সিক্রির দরবার এবং হেরেমের যাবতীয় ঝক্কি-ঝামেলার দায়িত্ব তিনি নেবেন যদি খানে খানানের সুপারিশ জোগার করা সম্ভবপর হয়। এই কথা শোনার পর আমার আব্বাজানের শুরু হলো নতুন এক উদ্বেগ। তিনি যে কোনো মূল্যে খানে খানানকে খুশি করতে চাইলেন।
     

Pls Share This Page:

Users Viewing Thread (Users: 0, Guests: 0)