1. Hi Guest
    Pls Attention! Kazirhut Accepts Only Bengali (বাংলা) & English Language On this board. If u write something with other language, you will be direct banned!

    আপনার জন্য kazirhut.com এর পক্ষ থেকে বিশেষ উপহার :

    যে কোন সফটওয়্যারের ফুল ভার্সন প্রয়োজন হলে Software Request Center এ রিকোয়েস্ট করুন।

    Discover Your Ebook From Our Online Library E-Books | বাংলা ইবুক (Bengali Ebook)

Collected মোঘল হেরেমের দুনিয়া কাঁপানো প্রেম

Discussion in 'Collected' started by Zahir, Jul 3, 2013. Replies: 204 | Views: 26796

  1. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,283
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    মোগল হেরেমের দুনিয়া কাঁপানো প্রেম (১৯তম পর্ব)

    [​IMG]

    তিনি খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করলেন খানেখানানের পছন্দের বিষয়গুলো। যারা নারী, অর্থ কিংবা মদে আসক্ত তাদের বশীভূত করা অতি সহজ।

    কিন্তু খানেখানান আবদুর রহিমের নাকি এই তিনটি অভ্যাসের একটিও ছিল না। ফলে আব্বাজান পেরেশানিতে পড়ে গেলেন। কেউ কেউ বুদ্ধি দিলেন কবিতাপাঠ, সংগীতসন্ধ্যা কিংবা জাঁকজমক সহকারে শ্রীকৃষ্ণ ও হনুমানজীর কীর্তনের ব্যবস্থা করা। আমাদের অঞ্চলটিতে হিন্দু মুসলমানরা বহু বছর ধরে সম্প্রীতি নিয়ে বসবাস করে আসছিল। ফলে মুসলমান জায়গিরদারের হাভেলীতে হিন্দুদের কীর্তন অনুষ্ঠানের পথে কোনো বাধাই ছিল না। আব্বাজান হিন্দু নেতাদের সঙ্গে কথা বললেন। সবাই খুব খুশি হলো। মনেশ্বর নামক এক হিন্দু জমিদার পরামর্শ দিলেন মহাকবি তুলসী দাসকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। খানেখানান যদি এই স্থানে এসে তুলসী দাসকে দেখেন তবে তার আনন্দের সীমা-পরিসীমা থাকবে না। মনেশ্বর বাবুর পরামর্শটি আব্বাজানের খুবই পছন্দ হলো। স্থানীয় অভিজাত হিন্দুদের এক প্রতিনিধি দল পাঠানো হলো কবি তুলসী দাসের কাছে।

    রামভক্ত কবি হিসেবে তুলসী দাসের খ্যাতি তখন ছড়িয়ে পড়ছিল দুনিয়াব্যাপী। সংস্কৃত ভাষায় রচিত মহাকবি বাল্মিকীর রামায়ণ তিনিই প্রথম হিন্দি ভাষায় অনুবাদ করে সর্বত্র হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে দেবতা রামের আরেক সহযোগী হনুমানকে নিয়ে তিনি রচনা করেছেন হনুমান চরিত্র। বারানসীর গঙ্গাতীরে হনুমানজীর নামে একটি মন্দির স্থাপন করে তুলসী দাস সেখানেই বসবাস করছিলেন। বিশ্বসাহিত্যের বিস্ময় তুলসী দাস তার রামলীলা নামক কাব্যের জন্য ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের হৃদয়ে ইতোমধ্যেই দেবতা হিসেবে আসন লাভ করেছেন।
     
  2. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,283
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    আমি যে সময়ের কথা বলছি অর্থাৎ ১৫৯১ সালে তুলসী দাসের বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। হিন্দুরা যেহেতু পুনর্জন্মে বিশ্বাস করে তাই তারা তুলসী দাসকে কলিযুগের বাল্মিকী বলত। এর অবশ্য কারণও ছিল। হিন্দু পুরাণ মতে, দেবতা শিব তার স্ত্রী পার্বতীকে বলেন হনুমানের আশীর্বাদ পাওয়ার পরে বাল্মিকী একবার সংস্কৃত ভাষায় রামের কীর্তি বর্ণনা করবে। আবার এর বহুকাল পর কলিযুগে সে অন্য ভাষায় রাম কীর্তন বর্ণনা করবে। (ভবিষ্যতের পুরাণ, পতিস্বর্গ পর্ব ৪.২০)। এর বাইরে তুলসী দাসকে নিয়ে রয়েছে আরও নানা রকম কিংবদন্তি। ১৫৩২ সালে তিনি যখন রাজাপুরে জন্মগ্রহণ করলেন (বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশের চিত্রাকুট জেলায় অবস্থিত) তখন সময়টা ছিল শ্রাবণের সপ্তমীর শুক্লপক্ষ (শ্রাবণ মাসের ৭ তারিখের অমাবস্যার রাত)। জন্মের পর দেখা গেল তার মুখে ৩২টি দাঁত রয়েছে এবং আকার-আকৃতিতে তাকে ৫-৬ বছরের শিশু বলে মনে হচ্ছিল। জন্মের সময় তার মা কোনো প্রসববেদনা অনুভব করলেন না এবং নবজাতক হিসেবে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তুলসী দাস কোনো কান্না না করে কেবল রাম রাম ধ্বনি উচ্চারণ করতে থাকলেন। এ জন্য শৈশবকাল থেকেই তাকে 'রাম বোলা' বলা হতো।

    হিন্দু অভিজাতরা কবি তুলসী দাসকে রাজি করিয়ে ফেললেন আমাদের হাভেলিতে তসরিক আনার ব্যাপারে। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত আমাদের গ্রামটি আসলেই ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি। অন্যদিকে খানেখানানের নাম এবং স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের আধিক্য ও উৎসাহ-উদ্দীপনার কথা শুনে তিনি কালবিলম্ব না করে রওনা দিলেন। বয়স ৯৪ বছর হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন একজন বলবান যুবকের মতো হৃষ্টপুষ্ট এবং শক্তিশালী মানুষ। তার আগমন উপলক্ষে আমাদের হাভেলিতে রীতিমতো মেলা বসল। প্রতিদিন হাজার হাজার লোক এসে পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের পাদদেশে তাঁবু ফেলে বসবাস শুরু করল। সুবেদার চাচা তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেন। অন্যদিকে গ্যারিসনের পশ্চিম দিকে বসল বিরাট এক মেলা। খানেখানান আবদুর রহিম যখন এলেন তখন কমপক্ষে এক লাখ লোক তাকে স্বগত জানাল যারা গত কয়েক দিন ধরে ওই অঞ্চলে তীর্থ যাত্রীর ন্যায় বসবাস করছিল কেবল তুলসী দাসের জন্য। লাখো লোকের কাছে উষ্ণ অভ্যর্থনা পাওয়ার পর খানেখানান যখন হাভেলির মধ্যে প্রবেশ করে মহাকবি তুলসী দাসের সাক্ষাৎ পেলেন তখন তার আর বিস্ময়ের সীমা রইল না। তিনি আমার আব্বাজানকে জড়িয়ে ধরে অনেকগুলো কৃতজ্ঞতা চুম্বন দিলেন। এত বড় একজন মানুষের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার পর আব্বাজান আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। তিনি শুরু করলেন কান্না। এ দৃশ্য দেখে আমি এবং আমার সহেলী জেবুন্নিসার প্রথমে খুব হাসি পেল। আমরা ফিক করে হেসে দিলাম। কিন্তু একটু পর আবার কেন জানি কান্না পেল। আমরা দুজনে শুরু করলাম কান্না। আমাদের সেই কান্না দেখে খানেখানান এগিয়ে এলেন এবং দুজনের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। রাজপুরুষের সান্ত্বনা পেয়ে আমাদের কান্নার গতি আরও বেড়ে গেল।
     
  3. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,283
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    মহাকবি তুলসী দাস এবং খানেখানানের পারস্পরিক সম্পর্ক দেখে আমরা বড়ই আশ্চর্য হলাম। দুজন একই কামরায় থাকতেন। প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও তুলসী দাস খালি পায়ে থাকতেন। তিনি রোজ মাথা কামাতেন এবং সারা শরীরে এক ধরনের ঔষধি তেল মাখতেন। খাওয়া-দাওয়া করতেন খুবই কম এবং কথা বলতেন আরও কম। অন্যদিকে খানেখানানের ছিল মাথাভর্তি বাবরি চুল এবং মুখভর্তি অসম্ভব সুন্দর দাড়ি। কেবল বিশ্রামের সময় ব্যতিরেকে তিনি সব সময় তার রাজকীয় পাগড়ি পরে থাকতেন। দুজন মহাপুরুষই আমাকে এবং জেবুনি্নসাকে অত্যধিক স্নেহ করতেন। আমাদের নানা রকম হাসির গল্প শোনাতেন এবং মাঝেমধ্যে খানেখানানের মাথার পাকা চুল গণনার দায়িত্ব দিতেন। আমি এবং আমার সহেলী খুবই আনন্দ ও নিষ্ঠার সঙ্গে তার মাথার পাকা চুল গণনার ব্যর্থ চেষ্টা করতাম প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে। পরপর খানজাদা আমাদের দুজনকে একটি করে আশরাফি দিতেন। আমাদের এ দৃশ্য দেখে কবি তুলসী দাস মুচকি মুচকি হাসতেন। খানজাদার নির্দেশে আমরা কখনো-সখনো কবির হাত-পা এবং পিঠ টিপে দিতাম। আরামে তিনি ঘুমিয়ে পড়তেন এবং গড় গড় শব্দে নাক ডাকতেন। আমাদের তখন ভারি ইচ্ছে হতো তার টাক মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিতে। কিন্তু খানজাদার ভয়ে আমরা ওই কাজটি করতে পারতাম না।

    দুজন মহান অতিথির আগমনে আমাদের হাভেলিতে খুশির বন্যা বইছিল। আমি আর জেবুনি্নসা ছিলাম অতিমাত্রায় খুশি। কারণ আমাদের তখন ওস্তাদজীর কাছে পড়তে যেতে হতো না। আমরা স্বাধীনভাবে পুরো হাভেলি, গ্যারিসন, মেলা এবং আগত দর্শনার্থীদের তাঁবুর কাছে দল বেঁধে ঘোরাফেরা করতাম। খানজাদার দেওয়া স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে ইচ্ছা মতো মিঠাই মণ্ডা আর হরেক রকম খেলনা কিনতাম। হররোজ এ রকম সুযোগ পাওয়ার কারণে আমার বয়সী প্রায় ৫০-৬০ জন গ্রাম্য পাহাড়ি মেয়েদের সঙ্গে আমাদের পরম বন্ধুত্ব হয়ে গেল। ওইসব মেয়ের বেশির ভাগই ছিল দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তারা আসত মেলার পণ্যসামগ্রী এবং সাপ খেলাসহ নানা রকম তামাশা দেখার জন্য। আমাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর আমরা যা কিছু কিনতাম তার সব কিছুই ওদের দিয়ে দিতাম। আমাদের কাছে প্রতিদিন খরচ করার জন্য দুটো স্বর্ণমুদ্রা থাকত, যা দিয়ে কয়েক মণ মিঠাই মণ্ডা কিনলেও কিছু অর্থ থেকে যেত। আমাদের ক্রয়কৃত মিঠাই মণ্ডা কিংবা শত শত খেলনা যখন ওদের দিতাম তখন খুশিতে তাদের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত।
     
  4. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,283
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    কবি তুলসী দাস এবং খানেখানানের বিদায়ের দিন যতই ঘনাতে লাগল ততই আমরা বিষাদগ্রস্ত হতে থাকলাম। এরই মধ্যে আমার আব্বাজান সুযোগ বুঝে তার মনের কথাটি খানজাদার কাছে উপস্থাপন করলেন। আমার কথা শুনে খানজাদা একবাক্যে কেবল সুপারিশ করতেই রাজি হলেন না বরং শাহেনশাহ এবং মালেকা-ই আলিয়া রুকাইয়া সুলতান বেগমকে রাজি করানোর দায়িত্বও নিলেন। আব্বাজান আম্মাহুজুরসহ আমাদের খান্দানের নেতারা যখন এ সুসংবাদ শুনলেন তখন আনন্দের আতিশয্যে গরিব প্রজাদের জন্য বিশেষ ভোজের আয়োজন করলেন। সবার আনন্দে আমিও আনন্দিত হলাম।

    খানেখানান বিদায় নেওয়ার তিন মাসের মাথায় আমাদের হাভেলিতে সম্রাজ্ঞী রুকাইয়া সুলতান বেগমের প্রাসাদের অধ্যক্ষের কাছ থেকে পত্র এলো যে- মোগল হেরেমের সম্মানিতা বাসিন্দা হিসেবে সেখানে অবস্থান করে আঠারো বছর বয়স অবধি রাজসিক শিক্ষাগ্রহণ করার জন্য আমাকে সদাশয় সম্রাট অনুমতি প্রদান করেছেন। আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে সম্মতিপত্র পেলে রাজকীয় বাহিনীর একটি চৌকস দল আমাকে যথাযথ নিরাপত্তা দিয়ে আমাদের হাভেলি থেকে রাজধানী ফতেপুর সিক্রিতে পৌঁছে দেবে। চিঠি পাওয়ার পর আমাদের হাভেলিতে আনন্দের বন্যা বইতে শুরু করল। আব্বাজান খুশিতে অতিমাত্রায় উদার হয়ে উঠলেন। দুই হাতে অকাতরে দান-খয়রাত করতে লাগলেন। আমার সহেলিও দারুণ খুশি হলো। জেবুনি্নসা অনেক আগেই মনোনয়ন পেয়েছে। কিন্তু তার ডাক এখনো আসেনি। তার আব্বা-আম্মাও এ নিয়ে বেশ চিন্তিত। তাছাড়া তারা এখনো জানতে পারেনি কোন সম্রাজ্ঞীর প্রাসাদে জেবুনি্নসার ঠাঁই হবে। অন্যদিকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে আমারটা হয়ে যাওয়া এবং সম্রাটের সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রীর প্রাসাদে ঠাঁই পাওয়ার খবরে তারা ওপরে ওপরে খুশি হলেও মনে মনে ঈর্ষা অনুভব করতে থাকল আর নিজেদের তকদিরের দোষ দিতে থাকল।

    আমার দশ বছরের কিশোরী মনের অভিব্যক্তি বোঝানোর ভাষা আজ অবধি আমি রপ্ত করতে পারিনি। আমার বয়সী কয়েকটি মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তারা আমাকে অনেক কিছু বলতে চাইত। কিন্তু আমার আম্মাহুজুর অতি সতর্কতার সঙ্গে আমাকে ওইসব মেয়ে থেকে আলাদা করে রাখত।
     
  5. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,283
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ফলে অতি অল্প বয়সে অনেক মেয়ে যেমন অনাগত দিনের যৌবনদীপ্ত কাণ্ড-কারখানা নিয়ে পাকনামোমূলক সব জ্ঞান অর্জন করে- আমি ছিলাম তাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আম্মাজান, চাচাজান, মামাজান, কিংবা ভাইজানদের বাইরে অন্য পুরুষ বা কোনো পুরুষ মানুষের সঙ্গে প্রেমময় সম্পর্কের কথা এখনো পর্যন্ত আমার মাথায় আসেনি। মোগল হেরেমে ঢোকার দুর্লভ এবং অতি সম্মানজনক আমন্ত্রণ পাওয়ার পর আমার মানসপটে কেবল ভেসে উঠত বড় বড় প্রাসাদ, হাজার হাজার সৈন্যের কুচকাওয়াজ, রাজকুমারীদের কলকাকলী এবং একজন অজানা রাজকুমারের ঘোড়ার খুরের শব্দ। পরিবারের লোকজনের উৎসাহ এবং নানা উদ্দীপনামূলক বক্তব্যের কারণে আমি নিজেকে পরম সৌভাগ্যবতী ভাবতে আরম্ভ করলাম। এরই মধ্যে আমাদের পরিবারের সম্মতিপত্র পাওয়ার পর আগ্রার ফতেপুর সিক্রির রাজদরবারের একদল সৈন্য এলো আমাকে সম্মানের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য। হাতি, ঘোড়া এবং পালকির ব্যবস্থা ছিল আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। যাত্রাপথে আমি যেভাবে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করব সেভাবেই রক্ষী দল সব কিছুর ব্যবস্থা করবে বলে আমাকে আশ্বস্ত করা হলো।

    একদিন সকালবেলা আমি রওনা করলাম আগ্রার উদ্দেশে। আমার সমবয়সী শত শত পাহাড়ি বালিকারা আমাকে বিদায় জানাতে এলো। জেবুনি্নসা এবং তার বাবা-মা এলেন। সবাই অশ্রুসজল নেত্রে আমাকে বিদায় দিল। এ অনুষ্ঠানে আমার জন্য সবাই কাঁদলেও কেন জানি আমার কারও জন্য কান্না পাচ্ছিল না। ইতিপূর্বে অনেক তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে কারণে-অকারণে আমি কেঁদেকেটে একাকার করেছি। তাছাড়া কান্না করতে আমার ভালোই লাগত। অনেকক্ষণ কাঁদলে মনটা হালকা হয়ে যায় আর সঙ্গে উপরি হিসেবে অনেকের সহানুভূতিও পাওয়া যায়। এ জন্য কান্নার সুযোগ পেলেই আমি কাঁদতাম। আর মাঝেমধ্যে উপযাচক হয়ে কান্নার উসিলা খুঁজে ফিরতাম। আশপাশের কোনো বাড়িতে কেউ মারা গেলে বা অসুস্থ হলে আমি সেখানে যেতাম এবং সেই পরিবারের লোকজনের সঙ্গে গলা মিলিয়ে সুর করে কাঁদতাম। আমাদের হাভেলির আশপাশের কয়েকটি বস্তিতে কয়েকজন দরিদ্র পরিবার বাস করে। তারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে এসব বস্তিতে বসবাস করত। তাদের ভাষাও ছিল আলাদা। আবার তারা কান্নাও করত হরেক রকম সুরে। এসব সুরের মধ্যে রাজস্থানি এবং পারস্য দেশীয় কান্নার সুর আমার ভালো লাগত। এ জন্য আমি সময় পেলেই কখনো রাজস্থানি ঢঙে আবার কখনো পারস্য দেশীয় ঢঙে কাঁদতাম। আমার আম্মাহুজুর এসব কান্নার সুর শুনলেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতেন। তিনি ওই দুটি সুরের একটিও শুনতে পারতেন না- কখনো-সখনো বিরক্তিতে লাফালাফি শুরু করতেন। আমি সুরের ছন্দ বাড়িয়ে দিতাম। আম্মাহুজুর ওই মহাবিরক্তিকর অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য তাড়াতাড়ি আমার দাবি মেনে নিতেন।
     
  6. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,283
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    একটি কাঁদুনে মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও আমার কেন যে সেদিন কান্না এলো না তা আমি আজও ভেবে পাই না। তবে আমি কেঁদেছিলাম এবং কাঁদতে কাঁদতে মূর্ছা গিয়েছিলাম। কিন্তু সেটা ছিল ভিন্ন কারণে। আমার তিন জোড়া সাদা রঙের কবুতর এবং এক জোড়া টিয়া পাখি ছিল। পাখিগুলো আমি প্রায়ই খোলা আকাশে ছেড়ে দিতাম এবং আবার ডাক দিলেই তারা উড়ে এসে আমার মাথার ওপর বসত। কেউ কেউ বসত কাঁধে বা হাতের ওপর। আমার বিদায়ের সময় হঠাৎ তাদের কথা মনে পড়ল। আমি পাখিগুলোর খাঁচার কাছে গিয়ে সেগুলোকে চিরদিনের জন্য মুক্ত করার উদ্দেশে দরজা খুলে দিলাম। অন্যান্য দিন খাঁচার দরজা খোলামাত্র তারা ফুড়ুত করে উড়ে যেত এবং নিকটস্থ গাছের ডালে গিয়ে বসত। এরপর ডাকলে কাছে আসত। কিন্তু ঘটনার দিন তারা হেলেদুলে বের হলো। কোনো শব্দ করল না এবং উড়ে গাছের ডালে না গিয়ে সরাসরি আমার কাঁধের ওপর বসল। কয়েকটি কবুতর পায়ের কাছে বসে পড়ল। করুণ সুরে তারা ডাকতে লাগল। এক সময় আমার মুখমণ্ডল ও পায়ে তাদের মাথা ঘষতে লাগল। আমার বুঝতে কোনোই অসুবিধা হলো না যে, পাখিগুলো তাদের মালিকের বিদায়ের ঘটনা জানতে পেরেছে। পাখিদের কান্না শুনে আমারও ভীষণ কান্না পেল। কাঁদতে কাঁদতে আমার বুক ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো। এবার আমার মনে হলো- স্বজনদের ছেড়ে দূরে যাওয়ার বেদনায় আমি ভারাক্রান্ত হয়ে গুমরে মরছিলাম অনেকক্ষণ ধরেই। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে কাঁদতে পারিনি। পাখিদের স্পর্শে সেই জমাটবাঁধা পুঞ্জীভূত কান্নায় জোয়ার এসেছে। কাঁদতে কাঁদতে আমি সংজ্ঞা হারালাম। ফলে সেদিন আর যাত্রা হলো না। পরের দিন খুব ভোরে যাত্রা শুরু করলাম নতুন গন্তব্যে। যাত্রাপথে আমাদের কাফেলা বহু জায়গিরদার, সুবেদার এবং নগর কোতোয়ালের হাভেলি অতিক্রম করল, আমরা যেখানেই যাত্রাবিরতি করলাম সেখানকার সরকারি মহল থেকে যারপরনাই যত্ন-আত্মি এবং সম্মান পেলাম। অনেকে আবার আমাকে আকর্ষণীয় উপঢৌকন প্রদান করল।
     
  7. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,283
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    মোগল হেরেমের দুনিয়া কাঁপানো প্রেম (২০ তম পর্ব)

    [​IMG]

    অবশেষে আমরা আগ্রা নগরীতে পৌঁছলাম। নগরের শাসনকর্তা ইমতিয়াজ খানের প্রাসাদে আমাকে রাখা হলো।

    আগ্রা দুর্গের ঠিক পশ্চিম দিকে যমুনার তীরঘেঁষে সুরম্য প্রাসাদটিকে দেখে আমার মনে হলো যেন সাক্ষাৎ বেহেশত। এ কয় দিনের অনবরত যাত্রায় যদিও আমি ছিলাম অতিমাত্রায় ক্লান্ত তথাপি অসংখ্য জনপদ পাড়ি দেওয়ার দৃশ্য। রাস্তার দুই পাশের বন-বনানী, শস্যক্ষেত্র আর হাটবাজারের ছবিগুলো মনের পর্দায় ভেসে উঠছিল একের পর এক। প্রতিটি দৃশ্য আমার কৌতূহলী মনের মধ্যে অসাধারণ এক প্রশান্তির ছাপ রেখেছিল। ইমতিয়াজ খানের প্রাসাদ প্রকোষ্ঠে বিশ্রামের জন্য খাটিয়ার ওপর দেহ রাখার পরও চোখের পাতা বন্ধ করতে পারছিলাম। আমার কামরাটি ছিল দক্ষিণমুখী। জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছিল হরেক রকম ফুলের বাহারি বাগান। নানা রকম প্রজাপতি সেসব ফুলের ওপর বেড়াচ্ছিল। পাশেই একটি অর্জুন গাছে বসে গোটাকয়েক পাখি কিচিরমিচির শব্দে চারদিক মুখরিত করে তুলছিল। আর যমুনা নদী পার হয়ে আসা স্নিগ্ধ শীতল বাতাস আমার কামরায় প্রবেশের পূর্বে নিকটস্থ ফুলের বাগান থেকে মনোহরি সুভাস নিয়ে সুরোভিত হয়ে যখন জানালার ফাঁক দিয়ে ঝিরঝির শব্দে ছন্দ তুলছিল, তখন আমার ক্লান্তি যে কোথায় উবে গেল টেরই পেলাম না।
    মহামতি সম্রাট তার রাজধানী আগ্রা থেকে ফতেপুর সিক্রিতে স্থানান্তর করলেও লোকজন তখনো আগ্রাকেই রাজধানী মনে করত। আমি জানতে পারলাম ফতেপুর সিক্রিতে আমার কর্মক্ষেত্র সম্রাজ্ঞী রুকাইয়া সুলতানা বেগমের প্রাসাদে যাওয়ার আগে ইমতিয়াজ খানের প্রসাদে সাত দিন থাকতে হবে। এই প্রাসাদের কর্ত্রী এবং তার কন্যারা অত্যন্ত সম্মানসহকারে আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন। মোগল হেরেমের বাসিন্দা হিসেবে আমাকে বিশেষ মর্যাদাসহকারে সবাই সম্বোধন করতেন এবং আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম, আমি একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। বিকেলবেলা এক বয়স্ক অভিজাত মহিলা আমার কামরায় আসলেন এবং জানালেন যে, আমার আপত্তি না থাকলে আমাকে নিয়ে শহর দেখতে বেরুবেন এবং আগ্রার ইতিহাস বর্ণনা করবেন। তিনি এই শহরের সবচেয়ে নামকরা শিক্ষিকা যিনি কিনা হেরেমের বাসিন্দাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে শিক্ষা দান করেন। তিনি নিজেকে পারসিক মুসলমান বলে পরিচয় দিয়ে নিজের নাম খানজালা বলে জানালেন।
     
  8. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,283
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    আমি আমার শিক্ষিকা খানজালার সঙ্গে শহর দেখতে বের হলাম। আমাদের বহন করার জন্য দুই ঘোড়ার চমৎকার একটি জুড়ি গাড়ি অপেক্ষা করছিল। গাড়ির সামনে দু'জন বর্শাধারী সেন্য তাদের নিজ নিজ ঘোড়ার পিঠে চড়ে প্রস্তুত হয়েছিল আমাদের যাত্রাপথের নিরাপত্তা প্রদান করার জন্য। আমরা গাড়িতে উঠামাত্র সৈন্যরা কুর্নিশ করে আমার শিক্ষিকার কাছে থেকে গন্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিল। আমরা চলছিলাম আর শহর দেখছিলাম। এত বড় শহর, বড় বড় প্রশস্ত রাজপথ আর অলিগলি জীবনে দেখা তো দূরের কথা কল্পনাও করিনি। রাস্তার দু'পাশের সারিবদ্ধ অট্টালিকা, ছোট-বড় বাগানওয়ালা অভিজাত প্রাসাদসমূহ। বিপণি বিতান এবং হাজার হাজার ব্যস্ত মানুষের কোলাহল- ছোটাছুটি দেখে আমার দুচোখ জুড়িয়ে গেল। আমি উৎসুক দৃষ্টিতে আমার শিক্ষিকার দিকে তাকালাম।

    শিক্ষিকা আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারলেন। তিনি বললেন, শোন আফসানা! তুমি এখন এমন এক শহরে আছ যার গোড়া পত্তন হয়েছিল মহাভারতের যুগে। আজ থেকে ২৭০০ বছর আগে অর্থাৎ খ্রিস্ট জন্মের এক হাজার বছর আগে এর নাম ছিল মহর্ষি আঙ্গিরা। পরবর্তী সময়ে সুলতানি আমলে ১৫০৪ খ্রিস্টাব্দে সুলতান সিকান্দর লোদী এই শহরের নামকরণ করেন আগ্রা। তার পুত্র ইব্রাহিম লোদীর আমলেও আগ্রার প্রাধান্য অক্ষুণ্ন থাকে। তবে মোগল আমলেই এর শান-শওকত বাড়তে থাকে অভাবিতভাবে। যদিও ফতেপুর সিক্রিতে হাল আমলে রাজধানী করা হয়েছে, তথাপি দিলি্ল ও আগ্রার গুরুত্ব একটুও কমেনি। বরং অযাচিত ঝক্কি-ঝামেলা কমে যাওয়ায় শহর শান্তিপূর্ণ হয়েছে। এই শহরের সবচেয়ে মূল্যবান আকর্ষণ হচ্ছে প্রবহমান যমুনা নদী। উত্তরখানের যমুনা তীর সুউচ্চ পর্বতমালা থেকে প্রবাহিত যমুনা নদী ৮৫৫ মাইল পথ অতিক্রম করেছে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। উত্তরখান, হরিয়ানা, আগ্রা, হিমাচল প্রদেশ এবং দিলি্ল হয়ে এলাহাবাদের ত্রিবেনী সঙ্গমে গিয়ে শেষ হয়েছে।

    মুসলমানরা নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত কিংবা আসমান-জমিনের যে কোনো সৃষ্টি নিয়ে আলাদাভাবে মাতামাতি করে না। তারা সব কিছুকেই এক আল্লাহর সৃষ্টি বলে মানে। কিন্তু হিন্দু ধর্মটির মূল ভিত্তি হলো হাজার নয়- কোটি কোটি গল্প বা উপকথা। এই ধর্মের দেবদেবী রয়েছে প্রায় ৩৩ কোটি। এই ৩৩ কোটি দেবদেবীকে ঘিরে আবার কয়েকশ কোটি কাহিনী প্রচলিত আছে। এসব দেবদেবী এবং কাহিনীকে তাবৎ দুনিয়ার হিন্দুরা বিশ্বাস করে। তাদের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে পরম শ্রদ্ধা আর ভক্তিসহ করা এসব উপকথা নিবিড়ভাবে মিশে আছে। এসব বিষয় ভালোভাবে না জানলে হিন্দু সম্প্রদায়কে কোনো মতেই শাসন করা যাবে না। কাজেই মোগল সালতানাতের সব সরকারি কর্মকর্তার প্রতি কঠোর নির্দেশনা রয়েছে, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে হিন্দু ধর্মের সব দেবদেবী এবং উপকথার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। হিন্দুরা যমুনা নদীকে অত্যন্ত পুত ও পবিত্র মনে করে বছরের বিভিন্ন সময় দলবেঁধে গোসল করে পাপমুক্তির উদ্দেশ্যে। তারা বিশ্বাস করে, মৃত্যুর দেবতা ইয়ামার বোন হলো ইয়ামি। তাদের পিতা হলেন সূর্য, দেবতা সুরাইয়া এবং মায়ের নাম সারানু। দেবী ইয়ামিকে হিন্দুরা যমুনা নামে ডাকে। আর তাই এর উৎসস্থলে তারা দেবীর নামে তৈরি করেছে বিশাল এক মন্দির। হিন্দুদের অন্যতম দেবতা শ্রীকৃষ্ণের জন্ম ও বেড়ে ওঠার অনেক স্মৃতি রয়েছে যমুনাকে কেন্দ্র করে। শ্রীকৃষ্ণের নিষ্ঠুর মামার নাম ছিল কংস। তিনি জ্যোতিষীদের মাধ্যমে জানতে পারলেন, তার বোন দেবকী এবং ভগি্নপতি বাসুদেবের ঘরে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হবে এবং পরবর্তীতে এই শিশুর হাতেই তার জীবন ও রাজ্যের বিনাশ হবে। বহু বাধা আর অলৌকিক ঘটনার মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হলে তার পিতা বাসুদেব একটি ঝুড়িতে করে শিশু কৃষ্ণকে যমুনা নদীতে ভাসিয়ে দেন ঠিক যেন ইসলামের নবী হজরত মুসা (আ.)-এর মতো।
     
  9. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,283
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    শিশু শ্রীকৃষ্ণকে ধারণ করে যমুনার স্রোতে তাকে নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে দেয়। আর সেই দিন থেকে কৃষ্ণের সম্মানে যমুনার পানি স্বচ্ছ নীল রং ধারণ করে কৃষ্ণের গায়ের রঙের সঙ্গে মিল রেখে। অনাদিকাল থেকে আজ অবধি যমুনাতে কখনো ঘোলা বা কাদাযুক্ত পানি প্রবাহিত হয়নি। যমুনা নদী এবং এর তীর অনাদিকাল থেকে মানব-মানবীর প্রেমের লীলাক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। অন্য কোনো নদীকে ঘিরে এতো প্রেম কাহিনীর সৃষ্টি হয়নি। এই প্রেম কাহিনীর শুরুটা করেছিলেন হিন্দুদের ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজে। তার কৃষ্ণলীলা নামে পরিচিত বর্ণাঢ্য প্রেমের উপাখ্যানগুলো এই যমুনা তীরেই অভিনীত হয়েছে। হাজার হাজার মেয়ের সঙ্গে তার প্রেমের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধি অর্জন করেছে আপন মামী রাধার সঙ্গে পরকীয়ার উপাখ্যানটি। যমুনা দেবীর সঙ্গেও তার প্রেম ছিল। কৃষ্ণের প্রেমে পাগল হয়ে দেবী যমুনা ভিন্ন নাম ধারণ করে মর্তে এসেছিলেন। তিনি কৃষ্ণের জন্য কালিন্দা পাহাড় থেকে নেমে এসে কালিন্দার কন্যা পরিচয় দিয়ে যখন আরাধ্য দেবতার কাছে প্রেম নিবেদন করলেন, তখন দেবতা জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কি নাম গো কন্যা। দেবী উত্তর করলেন কালিন্দী- আর তখন থেকেই দেবতা শুরু করলেন নতুন এক কৃষ্ণলীলা। যমুনা শুধু প্রেমের জন্যই অমর হয়ে আছে তা কিন্তু নয়! ভারতবর্ষে মানবজাতির সভ্যতার বিকাশে এই নদীর রয়েছে এক অনন্য ভূমিকা। গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতী এ তিনটি নামের মধ্যে ভারতবর্ষের তাবৎ মানুষের জন্য রয়েছে জীবন-জীবিকার নানা উপকরণ। পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর ভূমি দোয়াব অঞ্চল এই নদীর মোহনায় অবস্থিত। অন্যদিকে গঙ্গা-যমুনা সরস্বতীর মধ্যে রাগারাগী হওয়ার কারণে এদের শাখা নদী ঘঘর এক সময় শুকিয়ে যায়। ফলে ওই অঞ্চলের সুপ্রাচীন হারাপান সভ্যতা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় আর সৃষ্টি হয় সুবিখ্যাত থর মরুভূমির। তাই তো ভারতবাসী হিন্দুরা গঙ্গা-যমুনাকে তাদের দেবদেবী বানিয়ে পূজা অর্চনা করে আসছে সেই প্রাচীনকাল থেকে।

    পৃথিবীর অনেক প্রাচীন ভৌগোলিক মানচিত্রে যমুনা নদীর বর্ণনা রয়েছে। আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলুকাস যমুনা নদী জরিপ করার জন্য সার্ভেয়ার পাঠিয়েছিলেন ৩০৫ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে। গ্রিক পর্যটক ও ভূগোলবিদ মেগাসথিনিস ২৮৮ ক্রিস্ট পূর্বাব্দে অর্থাৎ যে বছর সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মারা গেলেন সে বছর যমুনা নদীর অববাহিকায় ব্যাপক জরিপ চালান। তার রচিত ইনডিকা বইতে সে কথা তিনি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।

    যমুনার বড় গৌরব এর রাজসিকতায়। এই নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা জনপদের শাসকরাই ভারতবর্ষ শাসন করে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। এই ধারাবাহিক সাম্রাজ্যের শুরুটা হয়েছিল চানক্য বংশের মাধ্যমে। এরপর খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দে এলো মগধ সাম্রাজ্য। ইমরা সাম্রাজ্য রাজত্ব করল ৩২১ থেকে ১৮৫ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ অবধি। সুঙ্গা সাম্রাজ্য, কুসান সাম্রাজ্য, গুপ্ত সাম্রাজ্য ও চাওলা সাম্রাজ্য ধারাবাহিকভাবে এই অঞ্চলকে রাজার নগরী বানিয়ে শেষমেশ মোগলদের হাতে সমর্পণ করেছে ঐতিহাসিক দায় মেটানোর জন্য। এ পর্যন্ত বলে আফসানা হঠাৎ শাহজাদার দিকে নজর দিল আর লক্ষ্য করল এক অন্য পরিবেশ- খাটের ওপর মখমলের তুলতুলে নরম বিছানায় শুয়ে শাহজাদা অত্যন্ত একাগ্রতার সঙ্গে আফসানার কথা শুনছিলেন আর মনে মনে হেরেমের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছিলেন। আফসানার মতো একটি সহজ-সরল গ্রাম্য বালিকা শিক্ষা পেলে যে কতটা অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে তা তিনি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলেন দুই ঘণ্টা ধরে। নারীর অমিত সুন্দর অভিব্যক্তি এবং তার আকর্ষণীয় শারীরিক গঠনের সঙ্গে যদি জ্ঞান ও মেধা যুক্ত হয় তবে সে আর নারী থাকে না- হয়ে যায় দেবী। আফসানাকে তার দেবী বলেই মনে হলো। শ্রীকৃষ্ণ দেবতা হয়ে যাদের সঙ্গে প্রেমলীলা চালিয়েছিল- তাদের বেশির ভাগই ইতিহাসে দেবীর সম্মানে অধিষ্ঠিত হয়েছে। তাহলে শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে নিশ্চয়ই অলৌকিক কিছু ছিল। আজ অবধি কত পুরুষ কত রাজ্য দখল করল- কত নারীর দেহমনে প্রবিষ্ট হলো কিংবা যুমনা তীরে কতই না রঙ্গলীলা করল- কিন্তু কেউ তো কৃষ্ণ হতে পারল না! আফসানার কথা শুনতে শুনতে শাহজাদা আনমনে এসব প্রসঙ্গ ভাবছিলেন আর মাঝে মধ্যে দুষ্ট চোখে নারীর সুন্দর অঙ্গগুলোর দিকে তাকিয়ে উসখুস করছিলেন।
     
  10. Zahir
    Offline

    Zahir Administrator Admin

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    19,283
    Likes Received:
    5,823
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka, Bangladesh
    Reputation:
    1,142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    আফসানা কথা থামিয়ে শাহজাদার মুখের কাছে মুখ নিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে মুখপানে তাকিয়ে রইলেন। তার মুখমণ্ডল ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গে স্পষ্ট কমনীয়তার ছাপ দেখে শাহজাদার শারীরিক উত্তেজনা বেড়ে গেল। শোয়া থেকে ওঠার চেষ্টা করে তিনি আফসানাকে জড়িয়ে ধরতে চাইলেন। খ্যাপাটে পুরুষের মতো উত্তেজনায় তার ঠোঁট ও জিহ্বা শুকিয়ে গেল। আফসানা শাহজাদাকে কোনো সুযোগ না দিয়ে উল্টো তার বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে উত্তেজিত ঠোঁট, মুখমণ্ডল তার দুষ্ট দুষ্ট চাহনীর চোখ দুটোতে বারবার ভালোবাসার চিহ্ন বসাতে থাকলেন। শাহজাদা হতোদ্যম হয়ে সুবোধ বালকের মতো নিষ্ক্রিয় থেকে আফসানাকে তার কর্ম স্বাধীনভাবে করতে দিলেন। সারা জীবন নিজে অগ্রণী হয়ে নারীর মধ্যে বিলীন হয়ে আনন্দ লাভের চেষ্টা করেছেন। আর আজ নারীই- এই প্রথম তাকে কুপোকাৎ করার চেষ্টা করছে! তিনি চোখ বুঝে সেই কুপোকাতের আক্রমণ অনুভব করার চেষ্টা করলেন। বেশ ভালোই তো লাগছে।

    কিন্তু হঠাৎ কি মনে করে যেন ভয় পেয়ে গেলেন। নিজের পৌরুষ এবং পুরুষত্ব সম্পর্কে তার একটু সন্দেহ দেখা দিল। তিনি যদি আফসানার কাছে বেইজ্জত হয়ে যান! সর্বনাশ! এই ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে তার সারা দেহমনে এক ধরনের অবসন্নতা অনুভব করলেন। তিনি বড় বড় হাই তুললেন কেবল এ কথা বোঝানোর জন্য যে, তার বড্ড বেশি ঘুম পেয়েছে।

    শাহজাদার হঠাৎ পরিবর্তন দেখে মনোরম মিহিসুরে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল আফসানা। সেকি হাসি! হাসি আর থামেই না। বিব্রত শাহজাদা ঘুমের ভান করে আবার হাই তুললেন এবং পাশ ফিরে শুতে শুতে বললেন- হাসছ কেন? কি হয়েছে তোমার! কিছু হয়নি গো আমার মালিক! কিছু হয়নি- কেবল কলিজার মধ্যে উথাল-পাতাল করছে বলেই আরেক দফা হাসতে আরম্ভ করল। শাহজাদা ভারি মসিবতে পড়লেন। এমন অবস্থায় তিনি জীবনে কোনো দিন পড়েননি। এমন মেয়েও দেখেননি। যেমনি সাহসী, তেমনি মেধাবী, আকর্ষণীয়। তবে অতি মাত্রায় মুখরা। মুখে কোনো কিছু আটকায় না। যা জিজ্ঞাসা করা হয় সবই ফটাফট বলে দেয়। গত দুই ঘণ্টা সময় তার মতো অস্থির চিত্তের একজন মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো বশ করে রেখেছে কেবল কথা দিয়ে। শব্দ চয়ন, বাচনভঙ্গি, তথ্য সংযোগে তার জীবনের ইতিহাস এমনভাবে বর্ণনা করছে, তাতে মনে হচ্ছে- সব কিছু ছেড়ে কেবল গল্পই শুনি। নিজের জীবনের কাহিনীর সঙ্গে আগ্রা নগরী এবং যমুনা নদীর ইতিবৃত্ত মিলিয়ে এমন কাহিনী শুনিয়েছে যে, সেই কাহিনীর পরবর্তী অংশ না শুনলে মনে হয় জীবনটা ব্যর্থই হয়ে যাবে। তার মনে পড়ল আনারকলির কথা। অসম্ভব সুন্দরী আর প্রেমময়ী শান্তশিষ্ট একটি ভাব জাগানিয়া মেয়ে ছিল সে। কিন্তু আফসানা যেন আগুনের গোলকের মধ্যে প্রস্ফুটিত একটি সুরভিত বসরার গোলাপ। কারও সঙ্গেই তাকে তুলনা করা যাবে না। যেন এক অনন্য পরিপূর্ণ নারী- এ কথা ভাবতে ভাবতে শাহজাদা চোখ মেলে আফসানার দিকে তাকাতে চেষ্টা করলেন আর তখনই বাইরে থেকে ভেসে এলো বহু সৈন্যের কোলাহল আর ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ।
     

Pls Share This Page:

Users Viewing Thread (Users: 0, Guests: 0)