1. Hi Guest
    Pls Attention! Kazirhut Accepts Only Bengali (বাংলা) & English Language On this board. If u write something with other language, you will be direct banned!

    আপনার জন্য kazirhut.com এর পক্ষ থেকে বিশেষ উপহার :

    যে কোন সফটওয়্যারের ফুল ভার্সন প্রয়োজন হলে Software Request Center এ রিকোয়েস্ট করুন।

    Discover Your Ebook From Our Online Library E-Books | বাংলা ইবুক (Bengali Ebook)

Collected নিঃসঙ্গতার একশ বছর | গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস

Discussion in 'Collected' started by abdullah, May 1, 2016. Replies: 44 | Views: 4176

  1. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,002
    Likes Received:
    1,583
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ---------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ৭
    ---------------------------------

    জন্মানোর দু সপ্তাহ পরে পিলার তেরনেরার ছেলেকে নিয়ে যাওয়া হোল ওদের দাদা-দাদীর বাড়িতে। ওকে অনিচ্ছার সঙ্গে বরণ করে উরসুলা। স্বামীর গোয়ার্তুমির কাছে আবার হার মানে সে, কারন তার স্বামী সহ্য করতে পারছিল না যে তার রক্তের একটা কুঁড়ি বিপথে প্রবাহিত হবে। তবে শর্ত দেয়া হল ছেলেটার কাছে তার প্রকৃত পরিচয় গোপন করা হবে। যদিও ওর নাম রাখা হল হোসে আর্কাদিও কিন্তু বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য তাকে শেষ পর্যন্ত আর্কাদিও নামেই ডাকা হলো। সেই সময় গ্রামে এত কর্মতৎপরতা আর বাড়িতে এত ক্লান্তিকর কাজ ছিল যে বাচ্চাদের দেখা শুনাটা পরিণত হয় গৌণ কর্মে। অনিদ্রা নামক মহামারীর হাত থেকে বাঁচার জন্য গুয়াহিরা উপজাতিদের দল থেকে কয়েক বছর আগে পালিয়ে আসা বিসিতাসিওন নামের এক আদিবাসী মহিলা আর তার ভাই-এর হাতে ওদের ভার অর্পন করা হল। উভয়ই এত অনুগত আর শান্ত প্রকৃতির ছিল যে উরসুলা ওদেরকে ঘরের যাবতীয় কাজের ভার দিয়ে দেয়। এভাবেই আর্কাদিও আর আমারান্তা কাস্তেইয়ানোর আগে গুয়াহিরা ভাষায় কথা বলে। উরসুলার অজান্তেই গিরগিটির স্যুপ আর মাকড়ের ডিম খেতে শিখে তারা, কারণ উরসুলা মিষ্টি দিয়ে তৈরী জীব জন্তদের এক সম্ভাবনাময় ব্যবসার কাজে ভীষনভাবে ব্যস্ত। মাকন্দো বদলে যাচ্ছিল। উরসুলার সঙ্গে যে লোকেরা এসেছিল ওরা মাকন্দোর মাটির উর্বরতা আর জলাভূমির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অবস্থানের কথা প্রচার করে দিয়েছিল, ফলে আগের সেই সাদামাটা গ্রামটাই দ্রুত হয়ে উঠল কর্মচঞ্চল, দোকান পাট আর হস্তশিল্পে ভরপুর। আর স্থায়ী এক নিত্যবাণিজ্যের পথ দিয়ে ঢোলা পাজামা, কানে মাকরি পড়ে প্রথম আরবিয়রা আসে গলার হারের সঙ্গে গুয়াকামাইয়া-র (বড় জাতীয় টিয়া পাখী) বদলের জন্য। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া এক মুহূর্তও বিশ্রাম পাচ্ছিল না। আকর্ষণীয় বাস্তবতা তার কাছে কল্পনাপ্রসূত বিশাল বিশ্বের চেয়ে অনেক বেশী আকৃষ্টকর বলে মনে হলো। আলকেমীর পরীক্ষাগারের প্রতি সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, মাসের পর মাস রূপ বদলানোর পর প্রায় শেষ হয়ে আসা পদার্থটাকে বিশ্রাম দিল সে। আবার হয়ে উঠল প্রথমদিককার মত সেই একই উদ্যোক্তা যার উদ্যমে রাস্তাগুলো আর নতুন বাড়িগুলোর অবস্থান এমনভাবে বিন্যাস করা হয়েছিল যাতে করে কেউ কারো চেয়ে বেশী সুবিধে ভোগ করতে না পারে। সে তখন এমন ক্ষমতা অর্জন করে যে নতুন আসা লোকগুলো ওর মতামত না নিয়ে বাড়ির ভিত্তি স্থাপন বা দেয়াল পর্যন্ত বানাতো না। এমনকি ঠিক করা হলো যে জমি বিলির ব্যাপারটাও সে-ই পরিচালনা করবে। যখন ছোট্ট, ঘুড়ে-বেড়ানো এক দলকে জুয়ো আর অন্যান্য খেলাধুলার দলকে বিশাল এক মেলায় পরিণত করে দড়াবাজ জিপসী দলটা ফিরে আসে তখন তাদেরকে আনন্দের সঙ্গে বরণ করে নেয়া হয় কারণ সকলে মনে করেছিল ওদের সঙ্গে হোসে আর্কদিও ফিরে এসেছে। কিন্তু হোসে আর্কাদি্ও ফিরে আসে নি, এমনকি ওরা আনেনি স্বর্পমানবকেও- উরসুলা ভেবেছিল একমাত্র সর্পমানবই তার ছেলের সন্ধান দিতে পারবে। যার ফলে জিপসীদের গ্রামে তাবু ফেলতে দেয়া হলো না এমনকি ভবিষ্যতেও গ্রামে পা ফেলতে নিষেধ করা হলো, কারণ মনে করা হলো ওরা হচ্ছে যৌনলিস্পা আর বিকৃতির প্রচারক। কিন্তু হোসে আর্কদিও বুয়েন্দিয়া খুব ভালভাবে বলে দিল যে, সেই মেলকিয়াদেসের আদি জিপসীর দল যাারা এই গ্রামের উন্নতিতে বিরাট অবদান রেখেছে তাদের প্রাচীন জ্ঞান আর অপূর্ব ঘটনাবলী দিয়ে, ওদের জন্য গ্রামের দরজা সবময় থাকবে খোলা। কিন্তু ভূ-পর্যটকরা জানাল, মেলকিয়াদেসের উপজাতির প্রজ্ঞা মানুষের জানার সীমানা লংঘন করে যাওয়ায় উধাও হয়ে গেছে পৃথিবী থেকে।

    দিবা স্বপ্ন থেকে সেই সময়ের জন্য হলেও মুক্তি পেয়ে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া অল্প সময়ের মধ্যেই শৃংখলা আর কাজে প্রত্যাবর্তন করে, যার ভিতর শুধু মাত্র অনুমতি দেয়: গ্রাম পত্তনের সময় থেকে যে পাখীগুলো ওদের বাঁশীর সুরে আনন্দমুখর করে রাখত তাদের মুক্তি দিয়ে তার বদলে প্রতিটা বাড়িতে মিউজিকাল (সুরেলা) ঘড়ি বসানোর। ওগুলো ছিল খোদাই করা কাঠের খুব সুন্দর সব ঘড়ি, যেগুলোকে আরবরা গুয়াকামাইয়ার সঙ্গে বদল করত। যেগুলোকে হোসে আর্কাদিও এমন সুন্দরভাবে মিলিয়ে নিল যে প্রতি আধঘন্টা পর পর সমস্ত গ্রাম আনন্দিত হয়ে ওঠে ক্রমানুসারী একই সঙ্গীতের অংশগুলো বেজে ওঠায়, আর ঠিক মধ্য দিনে সেটা পরিণত হয় এক সম্পূর্ণ ওয়ালটস-এ। ঐ বছরগুলোতে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াই ছিল সেই লোক যে স্থির করে সোনাঝুড়ি গাছের বদলে আলমন্ড গাছ লাগানোর। কারণ যদিও কাউকে সে বলেনি কিন্তু আবিস্কার করেছিল গাছগুলোকে অমর করার প্রক্রিয়া। অনেক বছর পর যখন মাকন্দো পরিণত হয়েছিল কাঠের বাড়ি আর বস্তার চালের শিবিরে, তখনও সবচেয়ে পুরোনো রাস্তাগুলোতে দেখা যেত ভাঙা আর ধুলোময় আলমন্ড গাছগুলো দাড়িয়ে আছে, যদিও কেউ জানত না ওগুলোকে কে লাগিয়েছে। যখন বাবা ব্যস্ত গ্রামে শৃংখলা স্থাপন করতে তখন মা শক্ত করে তুলছে পারিবারিক উত্তরাধিকার। দিনে দুবার বালসা কাঠে গাথা অবস্থায় বের হওয়া চিনি মাখানো ছোট মোরগ আর মাছের অভাবনীয় শিল্পের মাধ্যমে। আর তখন আওরেলিয়ানো কাটাচ্ছে ঘন্টার পর ঘন্টা পরিত্যক্ত পরীক্ষাগারে নিজে নিজেই অনুসন্ধান করে রৌপ্যকর্ম শিখে। অল্প সময়ে সে এত বেশী লম্বা হয়েছিল যে ছোট হয়ে যায় ভাইয়ের রেখে যাওয়া জামা কাপড়, আর পড়তে আরম্ভ করে বাবারগুলো। তবে ভিসিতাসিয়নকে জামার কুঁচি আর প্যান্টের কোমর সেলাই করতে হয়েছে কারণ আওরেলিয়ানোর অন্য সকলের মত পেশীবহুল শরীর হয় নি। বয়সন্ধি কেড়ে নিয়েছিল তার গলার কোমলতা, আর হয়ে গিয়েছিল শান্ত আর নিঃসঙ্গ; কিন্তু তার বদলে ছিল জন্মের সময় থেকে পাওয়া প্রখর চাহনি। রৌপ্যকর্মের পরীক্ষাতে এতই আত্মনিয়োগ করেছিল যে শুধুমাত্র খাবার প্রয়োজনেই পরীক্ষাগার ত্যাগ করত। তার এই অন্তর্মুখিতার কারণে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া মনে করে তার মেয়ে মানুষের দরকার–এই ভেবে ওকে বাড়ির চাবি আর কিছু টাকা দেয়। কিন্তু আউরেলিয়ানো টাকাগুলো খরচ করে আকোয়া রেজিয়া বানানোর জন্য, আর মুরিয়াটিক এসিড কিনে, তা দিয়ে চাবিগুলোকে সোনার গিলটি করে তাদের সৌন্দর্য বাড়ায়। ওর বাড়াবাড়িগুলো কোনরকমে তুলনা করা যায় আর্কাদিও আর আমারান্তার বাড়াবাড়ির সঙ্গে। ওদের দাঁত নড়তে শুরু করেছে কিন্তু তখনও সবসময় আদিবাসীদের আঁচল ধরে থাকে। তারা ছিল এত জেদী যে কাস্তেইয়ানো-তে কথা না বলে গুয়াহিরা ভাষায় কথাবলার ব্যাপারে ছিল অনড়। “এমন কিছুই হয় নি যে তুমি অনুযোগ করতে পার” উরসুলা স্বামীকে বলে, “ছেলেমেয়েরা বাপমায়ের পাগলামী উত্তরাধিকার সুত্রেই পায়”। যখন তাদের ছেলেমেয়েদের উদ্ভট কাজকর্মকে শুয়োরের লেজের মতই একটা ব্যাপার হিসেবে ধরে নিয়ে উরসুলা অনুতাপ করছে তখন আউরেলিয়ানো ওর দিকে এমন এক দৃষ্টি দিয়ে তাকায় যে তাতে ঘরজুড়ে অনিশ্চয়তাময় এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

    “কেউ একজন আসবে”- উরসুলাকে বলল সে। সব সময়ই যেমন করে থাকে তেমনি উরসুলা এবারও নিরুৎসাহিত করে ওর ভবিষ্যদ্বানীকে। কেউ যে আসবে এটাতো একটা সাধারণ ব্যাপার। আগে থেকে ঘোষণা না করে কারো মনে কোন উদ্বেগ তৈরী না করে প্রতিদিন প্রচুর অজ্ঞাত লোক মাকন্দো দিয়ে যাতায়াত করে। কিন্তু সমস্ত যুক্তির পরও আউরেলিয়ানো ওর ভবিষ্যদ্বানীতে নিশ্চিত থাকে। “জানি না কে” জোর দিয়ে বলে, “যে আসবে সে রাস্তায় আছে।”

    রোববার, সত্যিই রেবেকা আসল। ওর বয়স এগারোর বেশী ছিল না। এক কষ্টকর যাত্রা শেষে মানাউর থেকে কতগুলো চামড়ার ব্যবসায়ী দায়িত্ব নেয় একটি চিঠিসহ রেবেকাকে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার হাতে পৌঁছে দেবার। ছোট্ট একটা কাপড়চোপর ভরা তোরঙ্গ, হাতে রং বেরঙের ফুল আঁকা এক দোল-কেদারা, বাপ মায়ের হাড়গোর ভরা এক থলে যা সারাক্ষণ শব্দ করত ক্লক, ক্লক, ক্লক, আর শুধুমাত্র এসবই ছিল তার মালপত্র। স্নেহপূর্ণ ভাষায় লিখা চিঠিটা ছিল হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে উদ্দেশ্য করে, লিখেছে এমন একজন যে প্রচুর দূরত্ব এবং অনেক সময় পার হওয়ার পরও হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে স্নেহ করে। সে মানবতার খাতিরে বাধ্য হয়ে উরসুলা এবং হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার দূর সম্পর্কের এতিম, সহায়হীন জ্ঞাতি বোনকে পাঠিয়ে দিচ্ছে। যদিও দুরত্বটা খুব দূরের তবুও কখনও ভোলা সম্ভব নয় এমন বন্ধু মৃত নিকানোর (ইশ্বর তাদেরকে পবিত্র রাজ্যে স্থান দিন) উইয়্যোহা এবং তার সম্মানীয় স্ত্রী রেবেকা। মন্টিয়েলে‘র বাপমায়ের দেহের দেহাবশিষ্ট মেয়ের সঙ্গে পাঠিয়ে দিচ্ছে যাতে করে খ্রিষ্টান ধর্মীয় মতে তাদের শেষকৃত্য করা হয়। যদিও চিঠিতে উল্লেখিত নামগুলো এবং স্বাক্ষর সঠিকভাবে পরা যাচ্ছিল তবুও হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া বা উরসুলা মনে করতে পারছিল না এই নামের কোন আত্মীয়র অস্তিত্ব। অথবা চেনে না চিঠির লেখককে, মানাউর নামের সেই দূরবর্তী গ্রামের কথা তো বলাই বাহুল্য। অসম্ভব হয় মেয়েটার কাছ থেকেও অন্য কোন তথ্য বের করা। আসামাত্রই তাকে জিজ্ঞেস করা প্রশ্নগুলো যে বুঝতে পারছে এমন কোন অভিব্যক্তি প্রকাশ করে না সে। আসার পর থেকেই দোল-কেদারায় বসে আঙ্গুল চুষতে চুষতে বড় বড় চোখগুুলোতে ভয় নিয়ে চারিদিক দেখছে। কালো রংয়ের বহুল ব্যবহারে মলিন, আড়াআড়ি এক পোষাক ছিল তার পরনে আর পায়ে ছিল চলটা উঠে যাওয়া চামড়ার জুতো। কালো লেসের ফুল বানিয়ে কানের পেছনে চুলগুলো ছিল তার বাধা। গলায় পরা ঘামে প্রায় মুছে যাওয়া প্রতিমূর্তিসহ এক হার। আর ডান কব্জিতে পরা ছিল চোখ-লাগা প্রতিরোধের জন্য তামার উপর বসানো এক মাংশাশী জন্তর শদন্ত বালা। তার নীলাভ গায়ের রঙ, গোলাকার আর ঢোলের মত টানটান পেট, খারাপ স্বাস্থ্য আর বহু দিনের ক্ষুধারই ইঙ্গিত বহন করে। কিন্তু ওকে যখন খাবার দেয়া হলৈা স্বাদ গ্রহণ না করেই পায়ের উপর থালা রেখে বসে রইল। যতক্ষণ পর্যন্ত না আদিবাসীরা ওদের নিজস্ব ভাষায় ওকে জিজ্ঞেস করল সামান্য কিছু পানি চায় কিনা আর সে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল, ততক্ষণ পর্যন্ত ওকে ভাবা হোল বোবা আর কালা। অন্য কোন উপায় না থাকায় সে ওদের সঙ্গেই রয়ে গেল। আউরেলিয়ানো ধৈর্য ধরে ওর সামনে সমস্ত সানতরাল (সন্তদের নাম লিখা বই) পড়ে যাওয়ার পরও সে কোন নামেই সাড়া না দেয়ায় চিঠি অনুযায়ী ওর মায়ের নামে নাম হয় রেবেকা। যেহেতু মাকন্দোতে তখন পর্যন্ত কেউ মারা যায়নি, ফলে মাকন্দোতে কোন কবরস্থান না থাকায় দেহাবশিষ্টের হাড়েভর্তি থলেটা সঠিক মতে শেষকৃত্যের অপেক্ষায় রাখা হয়েছিল অনেক সময় পর্যন্ত। আর যেখানে থাকার কথা নয় সেখানে উপস্থিত হয়ে থলেটা ডিমে তা দেয়া মুরগীর মত ক্লক ক্লক শব্দ করে সকলের বিরক্তির উদ্রেক করত। অনেক সময় লাগলো রেবেকার পারিবারিক জীবনের সঙ্গে একাত্ব হতে। ছোট্ট দোল-কেদারাটিতে বসত আঙ্গুল চোষার জন্য বাড়ির সবচেয়ে দুরের কোনায়। শুধুমাত্র ঘড়িগুলোর বাজনা ছাড়া কিছুই তার মনযোগ আকর্ষণ করত না। ভয়াতুর চোখে প্রতি আধঘন্টা অন্তর ঘড়িগুলোকে খুঁজে বেড়াতো যেন ওগুলোকে খুঁজে পাওয়া যাবে শূন্যের ভিতর। অনেক দিন পর্যন্ত ওকে কিছুই খাওয়ানো গেল না। আদিবাসীরা বিরামহীন নিঃশব্দ চরণে বাড়িময় ঘুড়ে বেড়ানোর কারণে সবকিছু সম্বন্ধেই অবগত ছিল আর এভাবেই তারা আবিস্কার করে কেন সে না খেয়ে এতদিন মারা যায়নি। ওরা বের করে, রেবেকা শুধু উঠানের নরম মাটি আর নখ দিয়ে খুলে ফেলা বাড়ির দেয়ালের চুনের পরত খেতে পছন্দ করে। বোঝাই যায় ওর বাবা মা বা যারাই ওকে লালন করছে তারা এই অভ্যেসটার দরুণ ওকে তীব্র ভৎর্সনা করত, কারণ কাজটা করত সে লুকিয়ে একটা অপরাধবোধ নিয়ে, আর পরের বরাদ্দটা লুকিয়ে রাখত যাতে কারো চোখ না পরে। সুতরাং, সেই সময় থেকে ওকে পাহারা দেওয়া হতো নিশ্ছিদ্রতায়। তার এই অভ্যেসটাকে দমন করতে বাড়ির উঠান লেপা হত গরুর পিত্ত দিয়ে, দেয়ালে মাখা হতো ঝাল মড়িচ কিন্তু সে মাটি জোগাড়ের জন্য এমন চতুরতা আর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয় যে উরসুলা আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। কড়াইতে কমলার রসের সঙ্গে রেউচিনি মিশিয়ে সারারাত ফেলে রাখা হত শিশিরে আর শিরাপটা খালি পেটে খাওয়ানো হত ওকে।

    যদিও কেউই উরসুলাকে বলে দেয়নি যে ওটাই ছিল মাটি খাওয়ার অভ্যাসের মোক্ষম দাওয়াই তবুও সে ভেবেছিল খালি পেটে যে কোন তিক্ত জিনিসই যকৃতকে সাড়া দিতে বাধ্য করবে। রেবেকা অবাধ্য আর দুর্বলতা সত্ত্বেও এতই শক্তিশালী ছিল যে ওষুধ খাওয়ানোর জন্য তাকে বাছুরের মত বাঁধতে হত আর ওরা কোনরকমে সহ্য করে নিত ওর লাথি, কামড়, ছেটানো থুথু আর দুর্বোধ্য সব কুৎসাপূর্ন শব্দ যেগুলো ছিল আদিবাসিদের কথানুযায়ী ওদের ভাষার জঘন্যতম গালি। উরসুলা যখন জানল তখন ওর সঙ্গে যোগ হল কোমড়-বন্ধনী দিয়ে চাবকানি। কেউ কখনই স্থির করতে পারল না রেউচিনি না চাবকানি অথবা দুটোরই সম্মিলিত গুনের ফলে রেবেকা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আরোগ্যের চিহ্ন দেখাতে শুরু করে। আর্কাদিও আর আমারান্তার সঙ্গে খেলায় অংশগ্রহন করে সে, যারা ওকে বড় বোন হিসেবে দেখত। আর আরম্ভ করে ছুরি কাটাচামচ ব্যবহার করে পেট ভরে খেতে। শিঘ্রই জানা গেল সাবলীলভাবে কাস্তেইয়ানো বলতে পারে যেমনটি পারে আদিবাসীদের ভাষাও। তাছাড়া হাতের কাজে আছে তার উল্লেখযোগ্য দক্ষতা। আর সে যখন ঘড়িগুলোর সঙ্গে ওয়ালটস গাইত তখন গাইত সে নিজের বানানো কিছু শব্দ দিয়ে যা ছিল কৌতুকপূর্ণ। ওকে পরিবারের আর একজন সদস্য হিসাবে গণ্য করতে বেশী দেরী হল না। উরসুলা হয়েছিল ওর সবচেয়ে বেশী অনুরক্ত যা সে নিজের কোনও ছেলেমেয়ের কাছ থেকেও পায়নি। আর আর্কাদিও আমারান্তাকে ডাকত ভাই বোন বলে। আ্রউলিয়ানোকে কাকা আর হোর্সে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে ডাকত দাদা বলে। যাতে করে আর সবার মতই সে যোগ্যতা পেল রেবেকা বুয়োন্দিয়া নামের। এই নামটিই ছিল সব সময় তার একমাত্র নাম আর আমৃত্যু নামটিকে সে বহন করে গৌরবের সঙ্গে।

    রেবেকা যখন মাটি খাওয়ার রোগ থেকে সুস্থ হয় তখন ওকে নিয়ে যাওয়া হয়, অন্য শিশুদের সঙ্গে ঘুমানোর জন্য। আদিবাসী মহিলাও ওদের সঙ্গে ঘুমাতো এবং এক রাতে ঘটনাচক্রে সে জেগে যায় ঘরের কোণ থেকে আসা আশ্চর্যজনক এক অবিরাম শব্দ শুনে। প্রথম সে সতর্ক হয় ঘরে কোন জন্তু ঢুকে পড়েছে ভেবে। এমন সময় দেখতে পায় রেবেকাকে অন্ধকারে বিড়ালের মত জ্বলন্ত চোখ নিয়ে দোল-কেদারায় বসে আঙ্গুল চুষতে। ভয়ার্ত, ভাগ্যের ফেরে নিপীড়িত ভিসিতাসিওন চোখগুলোর ভিতর দিয়ে চিনতে পারে সেই রোগের উপসর্গ যার হুমকি ওকে আর ওর ভাইকে বাধ্য করেছিল এক সুপ্রাচীন দেশ ত্যাগ করতে, যেখানে ওরাই ছিল রাজকুমার আর রাজকুমারী। রোগটা হচ্ছে অনিদ্রা।
    কাতাউরে নামের আদিবাসী ছেলেটা বাড়ি ত্যাগ করে। ওর বোন রয়ে গেল কারণ ওর অদৃষ্টবাদী মন ওকে জানিয়ে দেয় যে সে যাই করুক না কেন এই প্রাণঘাতী কষ্টটা ওকে অনুসরন করবে পৃথিবীর শেষ কোনা পর্যন্ত। ভিসিতাসিওনের এই আতঙ্ক বাড়ির কেউ বুঝতে পারে না। “যদি না আবার ঘুমোয় এটাই তো ভাল” -খুশী মনে বলে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া, “এভাবে আমাদের জীবনটা আরও দীর্ঘ হত কাজে লাগানোর জন্য”। কিন্তু ভিসিতাসিওন বুঝিয়ে বলে যে না ঘুমানো অসুখের সবচেয়ে ভীতিকর দিকটা হচ্ছে ঘুমাতে না পারাটা নয়, কারণ শরীর কোন ক্লান্তিই বোধ করে না। ভীতিকর দিকটা হচ্ছে এর স্মৃতিবিলোপের অবশ্যম্ভাবী ক্রমবিকাশ। যা বলতে চাচ্ছে সেটা হচ্ছে অসুস্থ মানুষটা যখন রাত্রি জাগরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে তখন তার শৈশবের স্মৃতিগুলো মুছে যেতে আরম্ভ করে। তারপর ভুলে যায় নিজের নাম, বস্তু সম্পর্কে ধারণা, শেষ পর্যায়ে মানুষের পরিচয়, এমনকি ভুলে যায় তার নিজস্ব সত্তা যতক্ষণ পর্যন্ত না পরিণত হয় অতীতবিহীন এক মুর্খ প্রজাতিতে। হোর্সে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া, হাসতে হাসতে মরে এই ভেবে যে অনেকগুলোর মত এটাও একটা আদিবাসীদের আবিস্কৃত কুসংস্কারগ্রস্থ ব্যাধি। যদি বা সত্য হয় এই ভেবে উরসুলা রেবেকাকে অন্যান্য শিশুদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

    কয়েক সপ্তাহ পর, যখন মনে হচ্ছিল ভিসিতাসিওনের আতংক নিভে এসেছে, হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া এক রাতে ঘুম আসতে না পেরে নিজেকে আবিস্কার করে শয্যায় গড়াগড়ি দিতে। উরসুলা নিজেও জেগেছিল বলে সে প্রশ্ন করে তার কী হয়েছে। আর সে উত্তর দেয় “আবার আমি প্রুদেনসিও আগিলারের কথা ভাবছি” যদিও দুজনে এক দন্ড ঘুমোয়নি তবুও পরের দিন ওরা একই কাজ করে বিশ্রী গত রাতটার কথা ভুলে যায়। দুপুরের খাবার সময় আউরেলিয়ানো আশ্চর্যের সঙ্গে মন্তব্য করে যে সে সারারাত জেগে উরসুলার জন্মদিনে উপহার দেবার জন্য পরীক্ষাগারে এক ব্লোচ বানিয়ে কোন ক্লান্তি বোধ করছে না। তৃতীয় দিন পর্যন্ত ওরা সর্তক হল না যতক্ষণ না দেখল শোবার সময় হলেও ঘুম আসছে না আর তখন খেয়াল করে যে তারা নির্ঘুমে কাটিয়েছে পঞ্চাশ ঘন্টারও বেশি সময়। “শিশুরাও জেগে আছে”– অদৃষ্টবাদী দৃঢ়তা নিয়ে বলল আদিবাসী মেয়েটা- “বাড়ির কেউই রেহাই পায় না একবার কোন বাড়িতে রোগটা ঢুকলে।”

    সত্যিই অনিদ্রারোগে ধরছে ওদের–বুঝতে পারে তারা। উরসুলা তার মায়ের কাছে শিখেছিল ঔষধী গাছের উপকারিতা। আর সে একোনইট (এক জাতীয় অষুধি গুল্ম) গাছ দিয়ে পানীয় বানিয়ে এক মাত্রা করে খাইয়ে দেয় সবাইকে। কিন্তু এতে করে ওরা না ঘুমিয়ে সারাদিন স্বপ্ন দেখে জাগ্রত অবস্থায়। এই মতিভ্রম, সুস্থতার স্বচ্ছ অবস্থায় ওরা শুধু যে নিজেরা নিজেদের স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি দেখছিল তাই-ই নয়, এতে দেখছিল অন্যের দেখা স্বপ্নের প্রতিছবিও। এটা এমন ছিল যেন সারা বাড়ি অতিথিতে ভরে গেছে। রান্না ঘরের কোনায় দোল-চেয়ারে বসে রেবেকা স্বপ্ন দেখল যে প্রায় ওর মতই দেখতে এক লোক, পরনে গলাবন্ধ, সোনার বোতামওয়ালা সাদা লিনেনের শার্ট, ওর জন্য নিয়ে এসেছে এক তোড়া গোলাপ। লোকটাকে সঙ্গ দিচ্ছে এক মার্জিত হাতের মহিলা যে তোড়া থেকে একটি গোলাপ আলাদা করে গুজে দেয় রেবেকার চুলে। উরসুলা বুঝতে পারল ভদ্রলোক আর মহিলা ছিল রেবেকার বাবা ও মা কিন্তু অনেক চেষ্টা স্বত্তেও রেবেকা ওদের চিনতে পারল না, এমনকি দৃঢ়তার সাথে নিশ্চিত করলো ওদের সে কখনোই দেখিনি। সেই সময়ে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার অসতর্কতার ফলে বাড়িতে বানানো মিষ্টির জীবজন্তুগুলো গ্রাম জুড়ে বিক্রি হতে লাগল, যার দরুণ সে নিজেকে কখনই ক্ষমা করতে পারবে না। শিশুরা আর বড়রা আনন্দের সঙ্গে চুষতে লাগল সবুজ মজাদার অনিদ্রার ছোট ছোট মুরগী, মজাদার গোলাপী অনিদ্রা মাছ আর সুন্দর হলুদ রঙের অনিন্দ্রার ছোট ছোট ঘোড়া। ফলে সোমবারের উষা চমকে দেয় জেগে থাকা সারা গ্রামকে। প্রথম দিকে কেউই গুরুত্ব দেয় না। উল্টো না ঘুমিয়ে সবাই খুশীই হল, কারণ তখন সারা গ্রামে এত কাজ ছিল যে কোনভাবেই সময়ে কুলাতো না সব কাজ শেষ করার জন্য। ওরা এতই কাজ করল যে শিঘ্রই করার মত আর কিছুই থাকল না। আর ভোর তিনটের সময় নিজেদের আবিস্কার করল কিছুই না করে ঘড়িগুলোর মাত্রা গুনতে। ক্লান্তির জন্য নয় বরঞ্চ ঘুমের অতীত আর্তিতে কাতর হয়ে যারা ঘুমুতে চাইল তাদের করা সমস্ত চেষ্টা বিফল হয়। ওরা একত্রিত হত বিরতিহীন আলাপ করতে, ঘন্টার পর ঘন্টা একই কৌতুক বলতে আর খাশী করা মোরগের কাহিনীটাকে জটিল বিরক্তিকর চরম সীমায় নিয়ে যাবার জন্য। সেটা ছিল এক অন্তহীন খেলা যেখানে গল্পকার প্রশ্ন করে খাশি করা মোরগের গল্প বলবে কিনা, যখন ওরা জবাব দেয় হ্যাঁ তখন গল্পকার বলে হ্যাঁ বলতে বলেনি সে। প্রশ্ন করেছে তাদেরকে সে খাশি করা মোরগের গল্প বলতে বলেছে কিনা। যদি বলে না তখন গল্পকার বলে না বলতে বলেনি সে। প্রশ্ন করেছে তাদেরকে যে খাশি করা মোরগের গল্প বলেছে কিনা আর যদি চুপ করে থাকে তখন গল্পকার বলে চুপ করে থাকতে বলেনি সে। সে প্রশ্ন করেছে তাদেরকে যে খাশি করা মোরগের গল্প বলতে বলেছে কি না। কেউ উঠে চলে যেতে পারত না কারণ যদি কেউ চলে যেতে চাইত তখন গল্পকার বলত সে ওদেরকে চলে যেতে বলেনি প্রশ্ন করেছে, তাদেরকে খাশি করা মোরগের গল্প বলতে বলেছে কিনা আর এভাবেই বারবার চলতে থাকত খেলাটা যেখানে আরম্ভ সেখানেই ফিরে আসা অব্যাহত বৃত্তের মত।
     
  2. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,002
    Likes Received:
    1,583
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ---------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ৮
    ---------------------------------

    জন্মানোর দু সপ্তাহ পরে পিলার তেরনেরার ছেলেকে নিয়ে যাওয়া হোল ওদের দাদা-দাদীর বাড়িতে। ওকে অনিচ্ছার সঙ্গে বরণ করে উরসুলা। স্বামীর গোয়ার্তুমির কাছে আবার হার মানে সে, কারন তার স্বামী সহ্য করতে পারছিল না যে তার রক্তের একটা কুঁড়ি বিপথে প্রবাহিত হবে। তবে শর্ত দেয়া হল ছেলেটার কাছে তার প্রকৃত পরিচয় গোপন করা হবে। যদিও ওর নাম রাখা হল হোসে আর্কাদিও কিন্তু বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য তাকে শেষ পর্যন্ত আর্কাদিও নামেই ডাকা হলো। সেই সময় গ্রামে এত কর্মতৎপরতা আর বাড়িতে এত ক্লান্তিকর কাজ ছিল যে বাচ্চাদের দেখা শুনাটা পরিণত হয় গৌণ কর্মে। অনিদ্রা নামক মহামারীর হাত থেকে বাঁচার জন্য গুয়াহিরা উপজাতিদের দল থেকে কয়েক বছর আগে পালিয়ে আসা বিসিতাসিওন নামের এক আদিবাসী মহিলা আর তার ভাই-এর হাতে ওদের ভার অর্পন করা হল। উভয়ই এত অনুগত আর শান্ত প্রকৃতির ছিল যে উরসুলা ওদেরকে ঘরের যাবতীয় কাজের ভার দিয়ে দেয়। এভাবেই আর্কাদিও আর আমারান্তা কাস্তেইয়ানোর আগে গুয়াহিরা ভাষায় কথা বলে। উরসুলার অজান্তেই গিরগিটির স্যুপ আর মাকড়ের ডিম খেতে শিখে তারা, কারণ উরসুলা মিষ্টি দিয়ে তৈরী জীব জন্তদের এক সম্ভাবনাময় ব্যবসার কাজে ভীষনভাবে ব্যস্ত। মাকন্দো বদলে যাচ্ছিল। উরসুলার সঙ্গে যে লোকেরা এসেছিল ওরা মাকন্দোর মাটির উর্বরতা আর জলাভূমির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অবস্থানের কথা প্রচার করে দিয়েছিল, ফলে আগের সেই সাদামাটা গ্রামটাই দ্রুত হয়ে উঠল কর্মচঞ্চল, দোকান পাট আর হস্তশিল্পে ভরপুর। আর স্থায়ী এক নিত্যবাণিজ্যের পথ দিয়ে ঢোলা পাজামা, কানে মাকরি পড়ে প্রথম আরবিয়রা আসে গলার হারের সঙ্গে গুয়াকামাইয়া-র (বড় জাতীয় টিয়া পাখী) বদলের জন্য। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া এক মুহূর্তও বিশ্রাম পাচ্ছিল না। আকর্ষণীয় বাস্তবতা তার কাছে কল্পনাপ্রসূত বিশাল বিশ্বের চেয়ে অনেক বেশী আকৃষ্টকর বলে মনে হলো। আলকেমীর পরীক্ষাগারের প্রতি সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, মাসের পর মাস রূপ বদলানোর পর প্রায় শেষ হয়ে আসা পদার্থটাকে বিশ্রাম দিল সে। আবার হয়ে উঠল প্রথমদিককার মত সেই একই উদ্যোক্তা যার উদ্যমে রাস্তাগুলো আর নতুন বাড়িগুলোর অবস্থান এমনভাবে বিন্যাস করা হয়েছিল যাতে করে কেউ কারো চেয়ে বেশী সুবিধে ভোগ করতে না পারে। সে তখন এমন ক্ষমতা অর্জন করে যে নতুন আসা লোকগুলো ওর মতামত না নিয়ে বাড়ির ভিত্তি স্থাপন বা দেয়াল পর্যন্ত বানাতো না। এমনকি ঠিক করা হলো যে জমি বিলির ব্যাপারটাও সে-ই পরিচালনা করবে। যখন ছোট্ট, ঘুড়ে-বেড়ানো এক দলকে জুয়ো আর অন্যান্য খেলাধুলার দলকে বিশাল এক মেলায় পরিণত করে দড়াবাজ জিপসী দলটা ফিরে আসে তখন তাদেরকে আনন্দের সঙ্গে বরণ করে নেয়া হয় কারণ সকলে মনে করেছিল ওদের সঙ্গে হোসে আর্কদিও ফিরে এসেছে। কিন্তু হোসে আর্কাদি্ও ফিরে আসে নি, এমনকি ওরা আনেনি স্বর্পমানবকেও- উরসুলা ভেবেছিল একমাত্র সর্পমানবই তার ছেলের সন্ধান দিতে পারবে। যার ফলে জিপসীদের গ্রামে তাবু ফেলতে দেয়া হলো না এমনকি ভবিষ্যতেও গ্রামে পা ফেলতে নিষেধ করা হলো, কারণ মনে করা হলো ওরা হচ্ছে যৌনলিস্পা আর বিকৃতির প্রচারক। কিন্তু হোসে আর্কদিও বুয়েন্দিয়া খুব ভালভাবে বলে দিল যে, সেই মেলকিয়াদেসের আদি জিপসীর দল যাারা এই গ্রামের উন্নতিতে বিরাট অবদান রেখেছে তাদের প্রাচীন জ্ঞান আর অপূর্ব ঘটনাবলী দিয়ে, ওদের জন্য গ্রামের দরজা সবময় থাকবে খোলা। কিন্তু ভূ-পর্যটকরা জানাল, মেলকিয়াদেসের উপজাতির প্রজ্ঞা মানুষের জানার সীমানা লংঘন করে যাওয়ায় উধাও হয়ে গেছে পৃথিবী থেকে।

    দিবা স্বপ্ন থেকে সেই সময়ের জন্য হলেও মুক্তি পেয়ে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া অল্প সময়ের মধ্যেই শৃংখলা আর কাজে প্রত্যাবর্তন করে, যার ভিতর শুধু মাত্র অনুমতি দেয়: গ্রাম পত্তনের সময় থেকে যে পাখীগুলো ওদের বাঁশীর সুরে আনন্দমুখর করে রাখত তাদের মুক্তি দিয়ে তার বদলে প্রতিটা বাড়িতে মিউজিকাল (সুরেলা) ঘড়ি বসানোর। ওগুলো ছিল খোদাই করা কাঠের খুব সুন্দর সব ঘড়ি, যেগুলোকে আরবরা গুয়াকামাইয়ার সঙ্গে বদল করত। যেগুলোকে হোসে আর্কাদিও এমন সুন্দরভাবে মিলিয়ে নিল যে প্রতি আধঘন্টা পর পর সমস্ত গ্রাম আনন্দিত হয়ে ওঠে ক্রমানুসারী একই সঙ্গীতের অংশগুলো বেজে ওঠায়, আর ঠিক মধ্য দিনে সেটা পরিণত হয় এক সম্পূর্ণ ওয়ালটস-এ। ঐ বছরগুলোতে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াই ছিল সেই লোক যে স্থির করে সোনাঝুড়ি গাছের বদলে আলমন্ড গাছ লাগানোর। কারণ যদিও কাউকে সে বলেনি কিন্তু আবিস্কার করেছিল গাছগুলোকে অমর করার প্রক্রিয়া। অনেক বছর পর যখন মাকন্দো পরিণত হয়েছিল কাঠের বাড়ি আর বস্তার চালের শিবিরে, তখনও সবচেয়ে পুরোনো রাস্তাগুলোতে দেখা যেত ভাঙা আর ধুলোময় আলমন্ড গাছগুলো দাড়িয়ে আছে, যদিও কেউ জানত না ওগুলোকে কে লাগিয়েছে। যখন বাবা ব্যস্ত গ্রামে শৃংখলা স্থাপন করতে তখন মা শক্ত করে তুলছে পারিবারিক উত্তরাধিকার। দিনে দুবার বালসা কাঠে গাথা অবস্থায় বের হওয়া চিনি মাখানো ছোট মোরগ আর মাছের অভাবনীয় শিল্পের মাধ্যমে। আর তখন আওরেলিয়ানো কাটাচ্ছে ঘন্টার পর ঘন্টা পরিত্যক্ত পরীক্ষাগারে নিজে নিজেই অনুসন্ধান করে রৌপ্যকর্ম শিখে। অল্প সময়ে সে এত বেশী লম্বা হয়েছিল যে ছোট হয়ে যায় ভাইয়ের রেখে যাওয়া জামা কাপড়, আর পড়তে আরম্ভ করে বাবারগুলো। তবে ভিসিতাসিয়নকে জামার কুঁচি আর প্যান্টের কোমর সেলাই করতে হয়েছে কারণ আওরেলিয়ানোর অন্য সকলের মত পেশীবহুল শরীর হয় নি। বয়সন্ধি কেড়ে নিয়েছিল তার গলার কোমলতা, আর হয়ে গিয়েছিল শান্ত আর নিঃসঙ্গ; কিন্তু তার বদলে ছিল জন্মের সময় থেকে পাওয়া প্রখর চাহনি। রৌপ্যকর্মের পরীক্ষাতে এতই আত্মনিয়োগ করেছিল যে শুধুমাত্র খাবার প্রয়োজনেই পরীক্ষাগার ত্যাগ করত। তার এই অন্তর্মুখিতার কারণে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া মনে করে তার মেয়ে মানুষের দরকার–এই ভেবে ওকে বাড়ির চাবি আর কিছু টাকা দেয়। কিন্তু আউরেলিয়ানো টাকাগুলো খরচ করে আকোয়া রেজিয়া বানানোর জন্য, আর মুরিয়াটিক এসিড কিনে, তা দিয়ে চাবিগুলোকে সোনার গিলটি করে তাদের সৌন্দর্য বাড়ায়। ওর বাড়াবাড়িগুলো কোনরকমে তুলনা করা যায় আর্কাদিও আর আমারান্তার বাড়াবাড়ির সঙ্গে। ওদের দাঁত নড়তে শুরু করেছে কিন্তু তখনও সবসময় আদিবাসীদের আঁচল ধরে থাকে। তারা ছিল এত জেদী যে কাস্তেইয়ানো-তে কথা না বলে গুয়াহিরা ভাষায় কথাবলার ব্যাপারে ছিল অনড়। “এমন কিছুই হয় নি যে তুমি অনুযোগ করতে পার” উরসুলা স্বামীকে বলে, “ছেলেমেয়েরা বাপমায়ের পাগলামী উত্তরাধিকার সুত্রেই পায়”। যখন তাদের ছেলেমেয়েদের উদ্ভট কাজকর্মকে শুয়োরের লেজের মতই একটা ব্যাপার হিসেবে ধরে নিয়ে উরসুলা অনুতাপ করছে তখন আউরেলিয়ানো ওর দিকে এমন এক দৃষ্টি দিয়ে তাকায় যে তাতে ঘরজুড়ে অনিশ্চয়তাময় এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

    “কেউ একজন আসবে”- উরসুলাকে বলল সে। সব সময়ই যেমন করে থাকে তেমনি উরসুলা এবারও নিরুৎসাহিত করে ওর ভবিষ্যদ্বানীকে। কেউ যে আসবে এটাতো একটা সাধারণ ব্যাপার। আগে থেকে ঘোষণা না করে কারো মনে কোন উদ্বেগ তৈরী না করে প্রতিদিন প্রচুর অজ্ঞাত লোক মাকন্দো দিয়ে যাতায়াত করে। কিন্তু সমস্ত যুক্তির পরও আউরেলিয়ানো ওর ভবিষ্যদ্বানীতে নিশ্চিত থাকে। “জানি না কে” জোর দিয়ে বলে, “যে আসবে সে রাস্তায় আছে।”

    রোববার, সত্যিই রেবেকা আসল। ওর বয়স এগারোর বেশী ছিল না। এক কষ্টকর যাত্রা শেষে মানাউর থেকে কতগুলো চামড়ার ব্যবসায়ী দায়িত্ব নেয় একটি চিঠিসহ রেবেকাকে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার হাতে পৌঁছে দেবার। ছোট্ট একটা কাপড়চোপর ভরা তোরঙ্গ, হাতে রং বেরঙের ফুল আঁকা এক দোল-কেদারা, বাপ মায়ের হাড়গোর ভরা এক থলে যা সারাক্ষণ শব্দ করত ক্লক, ক্লক, ক্লক, আর শুধুমাত্র এসবই ছিল তার মালপত্র। স্নেহপূর্ণ ভাষায় লিখা চিঠিটা ছিল হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে উদ্দেশ্য করে, লিখেছে এমন একজন যে প্রচুর দূরত্ব এবং অনেক সময় পার হওয়ার পরও হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে স্নেহ করে। সে মানবতার খাতিরে বাধ্য হয়ে উরসুলা এবং হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার দূর সম্পর্কের এতিম, সহায়হীন জ্ঞাতি বোনকে পাঠিয়ে দিচ্ছে। যদিও দুরত্বটা খুব দূরের তবুও কখনও ভোলা সম্ভব নয় এমন বন্ধু মৃত নিকানোর (ইশ্বর তাদেরকে পবিত্র রাজ্যে স্থান দিন) উইয়্যোহা এবং তার সম্মানীয় স্ত্রী রেবেকা। মন্টিয়েলে‘র বাপমায়ের দেহের দেহাবশিষ্ট মেয়ের সঙ্গে পাঠিয়ে দিচ্ছে যাতে করে খ্রিষ্টান ধর্মীয় মতে তাদের শেষকৃত্য করা হয়। যদিও চিঠিতে উল্লেখিত নামগুলো এবং স্বাক্ষর সঠিকভাবে পরা যাচ্ছিল তবুও হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া বা উরসুলা মনে করতে পারছিল না এই নামের কোন আত্মীয়র অস্তিত্ব। অথবা চেনে না চিঠির লেখককে, মানাউর নামের সেই দূরবর্তী গ্রামের কথা তো বলাই বাহুল্য। অসম্ভব হয় মেয়েটার কাছ থেকেও অন্য কোন তথ্য বের করা। আসামাত্রই তাকে জিজ্ঞেস করা প্রশ্নগুলো যে বুঝতে পারছে এমন কোন অভিব্যক্তি প্রকাশ করে না সে। আসার পর থেকেই দোল-কেদারায় বসে আঙ্গুল চুষতে চুষতে বড় বড় চোখগুুলোতে ভয় নিয়ে চারিদিক দেখছে। কালো রংয়ের বহুল ব্যবহারে মলিন, আড়াআড়ি এক পোষাক ছিল তার পরনে আর পায়ে ছিল চলটা উঠে যাওয়া চামড়ার জুতো। কালো লেসের ফুল বানিয়ে কানের পেছনে চুলগুলো ছিল তার বাধা। গলায় পরা ঘামে প্রায় মুছে যাওয়া প্রতিমূর্তিসহ এক হার। আর ডান কব্জিতে পরা ছিল চোখ-লাগা প্রতিরোধের জন্য তামার উপর বসানো এক মাংশাশী জন্তর শদন্ত বালা। তার নীলাভ গায়ের রঙ, গোলাকার আর ঢোলের মত টানটান পেট, খারাপ স্বাস্থ্য আর বহু দিনের ক্ষুধারই ইঙ্গিত বহন করে। কিন্তু ওকে যখন খাবার দেয়া হলৈা স্বাদ গ্রহণ না করেই পায়ের উপর থালা রেখে বসে রইল। যতক্ষণ পর্যন্ত না আদিবাসীরা ওদের নিজস্ব ভাষায় ওকে জিজ্ঞেস করল সামান্য কিছু পানি চায় কিনা আর সে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল, ততক্ষণ পর্যন্ত ওকে ভাবা হোল বোবা আর কালা। অন্য কোন উপায় না থাকায় সে ওদের সঙ্গেই রয়ে গেল। আউরেলিয়ানো ধৈর্য ধরে ওর সামনে সমস্ত সানতরাল (সন্তদের নাম লিখা বই) পড়ে যাওয়ার পরও সে কোন নামেই সাড়া না দেয়ায় চিঠি অনুযায়ী ওর মায়ের নামে নাম হয় রেবেকা। যেহেতু মাকন্দোতে তখন পর্যন্ত কেউ মারা যায়নি, ফলে মাকন্দোতে কোন কবরস্থান না থাকায় দেহাবশিষ্টের হাড়েভর্তি থলেটা সঠিক মতে শেষকৃত্যের অপেক্ষায় রাখা হয়েছিল অনেক সময় পর্যন্ত। আর যেখানে থাকার কথা নয় সেখানে উপস্থিত হয়ে থলেটা ডিমে তা দেয়া মুরগীর মত ক্লক ক্লক শব্দ করে সকলের বিরক্তির উদ্রেক করত। অনেক সময় লাগলো রেবেকার পারিবারিক জীবনের সঙ্গে একাত্ব হতে। ছোট্ট দোল-কেদারাটিতে বসত আঙ্গুল চোষার জন্য বাড়ির সবচেয়ে দুরের কোনায়। শুধুমাত্র ঘড়িগুলোর বাজনা ছাড়া কিছুই তার মনযোগ আকর্ষণ করত না। ভয়াতুর চোখে প্রতি আধঘন্টা অন্তর ঘড়িগুলোকে খুঁজে বেড়াতো যেন ওগুলোকে খুঁজে পাওয়া যাবে শূন্যের ভিতর। অনেক দিন পর্যন্ত ওকে কিছুই খাওয়ানো গেল না। আদিবাসীরা বিরামহীন নিঃশব্দ চরণে বাড়িময় ঘুড়ে বেড়ানোর কারণে সবকিছু সম্বন্ধেই অবগত ছিল আর এভাবেই তারা আবিস্কার করে কেন সে না খেয়ে এতদিন মারা যায়নি। ওরা বের করে, রেবেকা শুধু উঠানের নরম মাটি আর নখ দিয়ে খুলে ফেলা বাড়ির দেয়ালের চুনের পরত খেতে পছন্দ করে। বোঝাই যায় ওর বাবা মা বা যারাই ওকে লালন করছে তারা এই অভ্যেসটার দরুণ ওকে তীব্র ভৎর্সনা করত, কারণ কাজটা করত সে লুকিয়ে একটা অপরাধবোধ নিয়ে, আর পরের বরাদ্দটা লুকিয়ে রাখত যাতে কারো চোখ না পরে। সুতরাং, সেই সময় থেকে ওকে পাহারা দেওয়া হতো নিশ্ছিদ্রতায়। তার এই অভ্যেসটাকে দমন করতে বাড়ির উঠান লেপা হত গরুর পিত্ত দিয়ে, দেয়ালে মাখা হতো ঝাল মড়িচ কিন্তু সে মাটি জোগাড়ের জন্য এমন চতুরতা আর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয় যে উরসুলা আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। কড়াইতে কমলার রসের সঙ্গে রেউচিনি মিশিয়ে সারারাত ফেলে রাখা হত শিশিরে আর শিরাপটা খালি পেটে খাওয়ানো হত ওকে।

    যদিও কেউই উরসুলাকে বলে দেয়নি যে ওটাই ছিল মাটি খাওয়ার অভ্যাসের মোক্ষম দাওয়াই তবুও সে ভেবেছিল খালি পেটে যে কোন তিক্ত জিনিসই যকৃতকে সাড়া দিতে বাধ্য করবে। রেবেকা অবাধ্য আর দুর্বলতা সত্ত্বেও এতই শক্তিশালী ছিল যে ওষুধ খাওয়ানোর জন্য তাকে বাছুরের মত বাঁধতে হত আর ওরা কোনরকমে সহ্য করে নিত ওর লাথি, কামড়, ছেটানো থুথু আর দুর্বোধ্য সব কুৎসাপূর্ন শব্দ যেগুলো ছিল আদিবাসিদের কথানুযায়ী ওদের ভাষার জঘন্যতম গালি। উরসুলা যখন জানল তখন ওর সঙ্গে যোগ হল কোমড়-বন্ধনী দিয়ে চাবকানি। কেউ কখনই স্থির করতে পারল না রেউচিনি না চাবকানি অথবা দুটোরই সম্মিলিত গুনের ফলে রেবেকা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আরোগ্যের চিহ্ন দেখাতে শুরু করে। আর্কাদিও আর আমারান্তার সঙ্গে খেলায় অংশগ্রহন করে সে, যারা ওকে বড় বোন হিসেবে দেখত। আর আরম্ভ করে ছুরি কাটাচামচ ব্যবহার করে পেট ভরে খেতে। শিঘ্রই জানা গেল সাবলীলভাবে কাস্তেইয়ানো বলতে পারে যেমনটি পারে আদিবাসীদের ভাষাও। তাছাড়া হাতের কাজে আছে তার উল্লেখযোগ্য দক্ষতা। আর সে যখন ঘড়িগুলোর সঙ্গে ওয়ালটস গাইত তখন গাইত সে নিজের বানানো কিছু শব্দ দিয়ে যা ছিল কৌতুকপূর্ণ। ওকে পরিবারের আর একজন সদস্য হিসাবে গণ্য করতে বেশী দেরী হল না। উরসুলা হয়েছিল ওর সবচেয়ে বেশী অনুরক্ত যা সে নিজের কোনও ছেলেমেয়ের কাছ থেকেও পায়নি। আর আর্কাদিও আমারান্তাকে ডাকত ভাই বোন বলে। আ্রউলিয়ানোকে কাকা আর হোর্সে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে ডাকত দাদা বলে। যাতে করে আর সবার মতই সে যোগ্যতা পেল রেবেকা বুয়োন্দিয়া নামের। এই নামটিই ছিল সব সময় তার একমাত্র নাম আর আমৃত্যু নামটিকে সে বহন করে গৌরবের সঙ্গে।

    রেবেকা যখন মাটি খাওয়ার রোগ থেকে সুস্থ হয় তখন ওকে নিয়ে যাওয়া হয়, অন্য শিশুদের সঙ্গে ঘুমানোর জন্য। আদিবাসী মহিলাও ওদের সঙ্গে ঘুমাতো এবং এক রাতে ঘটনাচক্রে সে জেগে যায় ঘরের কোণ থেকে আসা আশ্চর্যজনক এক অবিরাম শব্দ শুনে। প্রথম সে সতর্ক হয় ঘরে কোন জন্তু ঢুকে পড়েছে ভেবে। এমন সময় দেখতে পায় রেবেকাকে অন্ধকারে বিড়ালের মত জ্বলন্ত চোখ নিয়ে দোল-কেদারায় বসে আঙ্গুল চুষতে। ভয়ার্ত, ভাগ্যের ফেরে নিপীড়িত ভিসিতাসিওন চোখগুলোর ভিতর দিয়ে চিনতে পারে সেই রোগের উপসর্গ যার হুমকি ওকে আর ওর ভাইকে বাধ্য করেছিল এক সুপ্রাচীন দেশ ত্যাগ করতে, যেখানে ওরাই ছিল রাজকুমার আর রাজকুমারী। রোগটা হচ্ছে অনিদ্রা।
    কাতাউরে নামের আদিবাসী ছেলেটা বাড়ি ত্যাগ করে। ওর বোন রয়ে গেল কারণ ওর অদৃষ্টবাদী মন ওকে জানিয়ে দেয় যে সে যাই করুক না কেন এই প্রাণঘাতী কষ্টটা ওকে অনুসরন করবে পৃথিবীর শেষ কোনা পর্যন্ত। ভিসিতাসিওনের এই আতঙ্ক বাড়ির কেউ বুঝতে পারে না। “যদি না আবার ঘুমোয় এটাই তো ভাল” -খুশী মনে বলে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া, “এভাবে আমাদের জীবনটা আরও দীর্ঘ হত কাজে লাগানোর জন্য”। কিন্তু ভিসিতাসিওন বুঝিয়ে বলে যে না ঘুমানো অসুখের সবচেয়ে ভীতিকর দিকটা হচ্ছে ঘুমাতে না পারাটা নয়, কারণ শরীর কোন ক্লান্তিই বোধ করে না। ভীতিকর দিকটা হচ্ছে এর স্মৃতিবিলোপের অবশ্যম্ভাবী ক্রমবিকাশ। যা বলতে চাচ্ছে সেটা হচ্ছে অসুস্থ মানুষটা যখন রাত্রি জাগরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে তখন তার শৈশবের স্মৃতিগুলো মুছে যেতে আরম্ভ করে। তারপর ভুলে যায় নিজের নাম, বস্তু সম্পর্কে ধারণা, শেষ পর্যায়ে মানুষের পরিচয়, এমনকি ভুলে যায় তার নিজস্ব সত্তা যতক্ষণ পর্যন্ত না পরিণত হয় অতীতবিহীন এক মুর্খ প্রজাতিতে। হোর্সে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া, হাসতে হাসতে মরে এই ভেবে যে অনেকগুলোর মত এটাও একটা আদিবাসীদের আবিস্কৃত কুসংস্কারগ্রস্থ ব্যাধি। যদি বা সত্য হয় এই ভেবে উরসুলা রেবেকাকে অন্যান্য শিশুদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

    কয়েক সপ্তাহ পর, যখন মনে হচ্ছিল ভিসিতাসিওনের আতংক নিভে এসেছে, হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া এক রাতে ঘুম আসতে না পেরে নিজেকে আবিস্কার করে শয্যায় গড়াগড়ি দিতে। উরসুলা নিজেও জেগেছিল বলে সে প্রশ্ন করে তার কী হয়েছে। আর সে উত্তর দেয় “আবার আমি প্রুদেনসিও আগিলারের কথা ভাবছি” যদিও দুজনে এক দন্ড ঘুমোয়নি তবুও পরের দিন ওরা একই কাজ করে বিশ্রী গত রাতটার কথা ভুলে যায়। দুপুরের খাবার সময় আউরেলিয়ানো আশ্চর্যের সঙ্গে মন্তব্য করে যে সে সারারাত জেগে উরসুলার জন্মদিনে উপহার দেবার জন্য পরীক্ষাগারে এক ব্লোচ বানিয়ে কোন ক্লান্তি বোধ করছে না। তৃতীয় দিন পর্যন্ত ওরা সর্তক হল না যতক্ষণ না দেখল শোবার সময় হলেও ঘুম আসছে না আর তখন খেয়াল করে যে তারা নির্ঘুমে কাটিয়েছে পঞ্চাশ ঘন্টারও বেশি সময়। “শিশুরাও জেগে আছে”– অদৃষ্টবাদী দৃঢ়তা নিয়ে বলল আদিবাসী মেয়েটা- “বাড়ির কেউই রেহাই পায় না একবার কোন বাড়িতে রোগটা ঢুকলে।”

    সত্যিই অনিদ্রারোগে ধরছে ওদের–বুঝতে পারে তারা। উরসুলা তার মায়ের কাছে শিখেছিল ঔষধী গাছের উপকারিতা। আর সে একোনইট (এক জাতীয় অষুধি গুল্ম) গাছ দিয়ে পানীয় বানিয়ে এক মাত্রা করে খাইয়ে দেয় সবাইকে। কিন্তু এতে করে ওরা না ঘুমিয়ে সারাদিন স্বপ্ন দেখে জাগ্রত অবস্থায়। এই মতিভ্রম, সুস্থতার স্বচ্ছ অবস্থায় ওরা শুধু যে নিজেরা নিজেদের স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি দেখছিল তাই-ই নয়, এতে দেখছিল অন্যের দেখা স্বপ্নের প্রতিছবিও। এটা এমন ছিল যেন সারা বাড়ি অতিথিতে ভরে গেছে। রান্না ঘরের কোনায় দোল-চেয়ারে বসে রেবেকা স্বপ্ন দেখল যে প্রায় ওর মতই দেখতে এক লোক, পরনে গলাবন্ধ, সোনার বোতামওয়ালা সাদা লিনেনের শার্ট, ওর জন্য নিয়ে এসেছে এক তোড়া গোলাপ। লোকটাকে সঙ্গ দিচ্ছে এক মার্জিত হাতের মহিলা যে তোড়া থেকে একটি গোলাপ আলাদা করে গুজে দেয় রেবেকার চুলে। উরসুলা বুঝতে পারল ভদ্রলোক আর মহিলা ছিল রেবেকার বাবা ও মা কিন্তু অনেক চেষ্টা স্বত্তেও রেবেকা ওদের চিনতে পারল না, এমনকি দৃঢ়তার সাথে নিশ্চিত করলো ওদের সে কখনোই দেখিনি। সেই সময়ে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার অসতর্কতার ফলে বাড়িতে বানানো মিষ্টির জীবজন্তুগুলো গ্রাম জুড়ে বিক্রি হতে লাগল, যার দরুণ সে নিজেকে কখনই ক্ষমা করতে পারবে না। শিশুরা আর বড়রা আনন্দের সঙ্গে চুষতে লাগল সবুজ মজাদার অনিদ্রার ছোট ছোট মুরগী, মজাদার গোলাপী অনিদ্রা মাছ আর সুন্দর হলুদ রঙের অনিন্দ্রার ছোট ছোট ঘোড়া। ফলে সোমবারের উষা চমকে দেয় জেগে থাকা সারা গ্রামকে। প্রথম দিকে কেউই গুরুত্ব দেয় না। উল্টো না ঘুমিয়ে সবাই খুশীই হল, কারণ তখন সারা গ্রামে এত কাজ ছিল যে কোনভাবেই সময়ে কুলাতো না সব কাজ শেষ করার জন্য। ওরা এতই কাজ করল যে শিঘ্রই করার মত আর কিছুই থাকল না। আর ভোর তিনটের সময় নিজেদের আবিস্কার করল কিছুই না করে ঘড়িগুলোর মাত্রা গুনতে। ক্লান্তির জন্য নয় বরঞ্চ ঘুমের অতীত আর্তিতে কাতর হয়ে যারা ঘুমুতে চাইল তাদের করা সমস্ত চেষ্টা বিফল হয়। ওরা একত্রিত হত বিরতিহীন আলাপ করতে, ঘন্টার পর ঘন্টা একই কৌতুক বলতে আর খাশী করা মোরগের কাহিনীটাকে জটিল বিরক্তিকর চরম সীমায় নিয়ে যাবার জন্য। সেটা ছিল এক অন্তহীন খেলা যেখানে গল্পকার প্রশ্ন করে খাশি করা মোরগের গল্প বলবে কিনা, যখন ওরা জবাব দেয় হ্যাঁ তখন গল্পকার বলে হ্যাঁ বলতে বলেনি সে। প্রশ্ন করেছে তাদেরকে সে খাশি করা মোরগের গল্প বলতে বলেছে কিনা। যদি বলে না তখন গল্পকার বলে না বলতে বলেনি সে। প্রশ্ন করেছে তাদেরকে যে খাশি করা মোরগের গল্প বলেছে কিনা আর যদি চুপ করে থাকে তখন গল্পকার বলে চুপ করে থাকতে বলেনি সে। সে প্রশ্ন করেছে তাদেরকে যে খাশি করা মোরগের গল্প বলতে বলেছে কি না। কেউ উঠে চলে যেতে পারত না কারণ যদি কেউ চলে যেতে চাইত তখন গল্পকার বলত সে ওদেরকে চলে যেতে বলেনি প্রশ্ন করেছে, তাদেরকে খাশি করা মোরগের গল্প বলতে বলেছে কিনা আর এভাবেই বারবার চলতে থাকত খেলাটা যেখানে আরম্ভ সেখানেই ফিরে আসা অব্যাহত বৃত্তের মত।
     
  3. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,002
    Likes Received:
    1,583
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ---------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ৯
    ---------------------------------

    যখন হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া বুঝতে পারে যে প্লেগটা সারাগ্রাম দখল করে নিয়েছে। তখন পরিবারের সব প্রধানকে ডেকে অনিদ্রা রোগ সম্মন্ধে তার যা জানা ছিল তা জানায়। আর জলাভূমির অন্যান্য জনবসতিকে এই রোগের রোষানল থেকে রক্ষার জন্য সকলে মিলে কার্যক্রম ঠিক করে। এভাবেই কাকাতুয়ার সঙ্গে বদল করা ঘণ্টিগুলো ছাগলের গলা থেকে খুলে গ্রামের প্রবেশপথে ঝুলিয়ে দেয় তাদের উদ্দেশ্যে, যারা উপদেশ গ্রাহ্য না করে বা পাহারাদারদের অনুরোধ রক্ষা না করে গ্রাম ভ্রমণের জেদ করে। তখনকার সমস্ত আগুন্তুকদের, যারা মাকন্দোর পথ অতিক্রম করত, তাদের অবস্থানের সময় খাবার বা পান করা নিষিদ্ধ ছিল। কারণ, এ ব্যাপারে কারও সন্দেহ ছিল না যে রোগটা ছড়ায় মুখ দিয়ে, আর সমস্ত খাবার এবং পানীয় কলুষিত ছিল অনিদ্রা দিয়ে। এভাবেই প্লেগটা ছিল গ্রামের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কোয়ারানটিনটা এতই ফলপ্রসূ হয় যে এমন একদিন আসে যখন জরুরি সময়টাই স্বাভাবিক বলে গণ্য হয় আর জীবন ও কাজের ছন্দ এমনভাবে সুসংবদ্ধ হয়ে আসে যে কেউই আর নিদ্রা নামের অপ্রয়োজনীয় অভ্যাসটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করে না।

    আউরেলিয়ানো ছিল সেই ব্যক্তি, যে কয়েক মাসের মধ্যেই স্মৃতিবিলোপ প্রতিরোধের সূত্র আবিষ্কার করে। ঘটনাবশত ব্যাপারটা আবিষ্কার করে সে। আক্রান্ত হওয়া প্রথম কয়েকজনের একজন হওয়ায় অনিদ্রায় অভিজ্ঞ আউরেলিয়ানো শিখে ফেলে রৌপ্যকর্ম নিখুঁতভাবে। একদিন ধাতু পিটিয়ে পাতে পরিণত করার জন্য ব্যবহৃত ছোট্ট নেহাই খুঁজছিল সে। আর তার নাম মনে করতে পারছিল না। ওর বাবা বলে নেহাই। আউরেলিয়ানো এক টুকরো কাগজে নামটা লিখে নেহাইর হাতলে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দেয়। এভাবেই সে ভবিষ্যতে নামটা ভুলে না যাবার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়। জিনিসটার নামটা কঠিন বিধায় ওর তখনও মনে হয়নি যে, সেটা হচ্ছে স্মৃতিবিলোপের প্রথম ঘটনা।
    কিন্তু অল্পকয়েকদিনের মধ্যেই বুঝতে পারে যে পরীক্ষাগারের প্রায় প্রতিটি জিনিসেরই নাম মনে রাখা কঠিন হয়ে পরেছে। সুতরাং যথাযথভাবে নামাঙ্কিত করে প্রতিটি জিনিসকে, যাতে করে শুধুমাত্র বর্ণনা পড়ার ফলেই জিনিসটাকে সনাক্ত করতে পারে। যখন তার কাছে ওর বাবা ছোটবেলায় সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী ঘটনাগুলোও ভুলে যাওয়ার উদ্বেগ প্রকাশ করে তখন আউরেলিয়ানো তার পদ্ধতি বর্ণনা করে, আর হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ওটাকে বাস্তবে কাজে লাগায় সারাবাড়ি আর পরে আরোপ করে গ্রামে। কালিমাখানো এক বুরুষ দিয়ে প্রতিটি জিনিসকে নামাঙ্কিত করে: টেবিল, চেয়ার, ঘড়ি, দরজা, দেয়াল, বিছানা, কড়াই। খোয়াড়ে গিয়ে একইভাবে নামাঙ্কিত করে জীবজন্তুর আর গাছপালার: গরু, ছাগল, শুকর, মুরগি, ইউকা (মিষ্টিআলু জাতীয় এক ধরনের গাছের শেকড়, যা খাদ্যে হিসেবে ব্যবহৃত), মালাংগা (গাছের শিকড়, যা দিয়ে ময়দাজাতীয় খাদ্য বানানো হয়), কলা। আস্তে আস্তে ভুলে যাবার অনন্ত সম্ভাবনার কথা বিশ্লেষণ করে ওরা বুঝতে পারে যে, একদিন এমন হবে যে, পরে জিনিসগুলোকে চিনতে পারবে।
    কিন্তু মনে থাকবে না তাদের ব্যবহার। সুতরাং বর্ণনা লিখে আরও বিশদভাবে। স্মৃতিবিলুপ্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত মাকন্দোবাসী গরুর গলায় যে লেখাটা ঝুলিয়েছিল, সেটা ছিল এক আদর্শ নমুনা: ‘এটা হচ্ছে গরু, প্রতি সকালে এটাকে দোয়াতে হয় যাতে করে দুধের উৎপাদন হয়, আর দুধকে ফোটাতে হয় কফিতে মিশিয়ে, দুধসহ কফি বানানোর জন্য।’
    আর এভাবেই ওরা বাস করতে লাগল পালিয়ে-যেতে-থাকা এক বাস্তবতায়, কিছুক্ষণের জন্য শব্দের দ্বারা বন্দি হয়ে। কিন্তু লেখা শব্দগুলোর মূল্য বিস্মৃত হলে সেই বাস্তবতা হারিয়ে ফেলার আর কোনো বিকল্প ছিল না।
    জলাশয়ে যাওয়ার রাস্তায় ঢোকার মুখে টাঙানো ছিল এক ঘোষণা, যেটাতে লেখা ছিল মাকন্দো, আর প্রধান রাস্তায় আরেকটি ছিল আরও বড় করে লেখা: ‘ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে।’
    সবগুলো বাড়িতেই লেখা ছিল জিনিসপত্রের আর অনুভূতি মনে রাখার সংকেত। কিন্তু প্রক্রিয়াটায় এত বেশি সতর্কতা আর নৈতিক দায়িত্বের প্রয়োজন ছিল যে অনেকেই এক কাল্পনিক বাস্তবের জাদুর দ্বারা বশীভূত হয়ে পড়ে, যা ছিল তাদের নিজেদের দ্বারাই উদ্ভাবিত; তা যতটা না বাস্তবানুগ তারচেয়ে বরঞ্চ আরামপ্রদ। এই রহস্যময়তাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলার ব্যাপারে বেশী অবদান রাখে পিলার তেরনেরা, তাস দেখে অতীত বানী করে যেমনটা আগে করত ভবিষ্যৎ বাণী। এভাবেই অনিদ্রা রোগীরা বাস করতে শুরু করে তাস দিয়ে গড়া এক অনিশ্চয়তার বিকল্প জগতে, যেখানে আবছাভাবে বাপকে মনে রাখা হয় এপ্রিলের শুরুতে আসা এক গাঢ় রংয়ের পুরুষ হিসেবে। আর মাকে অষ্পষ্টভাবে মনে রাখা হয় এক বাদামি রংয়ের মহিলা হিসেবে, যে বাম হাতের আঙুলে সোনার আংটি পরত। যেখানে জন্মদিন হত সেদিন তেজপাতা গাছে গান গেয়েছিল আলন্দ্রা পাখি। ঐ সমস্ত স্বান্তনাময় চর্চার কাছে হার মেনে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া সিদ্ধান্ত নেয় স্মৃতি-উদ্ধার যন্ত্রটা তৈরী করার, যেটাকে একবার বানাতে চেয়েছিল জিপসীদের সব আশ্চর্যজনক আবিস্কার গুলোকে মনে রাখবার জন্য। যন্ত্রটার ভিত্তি ছিল প্রতিদিন সকালে মানুষের জীবনে যত অভিজ্ঞতা আছে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ঝালিয়ে নেওয়ার উপর, সেটাকে কল্পনা করে একটা ঘুরন্ত অভিধান হিসেবে যেটা এক অক্ষের উপর বসানো এবং যে কেউ ওটাকে হাতলের মাধ্যমে চালিয়ে অল্প কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় ব্যাপারগুলোকে ঝালিয়ে নেবে। যখন জলাশয়ের রাস্তা ধরে ঘুমের মানুষদের করুন ঘন্টা বাজিয়ে, দড়ি দিয়ে বাঁধা পেটমোটা বাক্স আর কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা গাড়ি নিয়ে উদয় হয় এক অদ্ভুতদর্শন বৃদ্ধ ততক্ষণে প্রায় চৌদ্দ হাজার তালিকা লিপিবদ্ধ হয় গেছে। সে সোজা এসে ঢোকে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার বাড়ি।

    দরজা খোলার সময় ভিসিতাসিয়ন চিনতে পারে না, আর অনিরাময়যোগ্য বিস্তৃতির চোরাবালিতে ডুবে যাওয়া এই গ্রামে যে কিছু বিক্রি হয় না, তা অবজ্ঞা করে ভাবে, হয়ত সে কিছু বিক্রি করতে এসেছে। লোকটা ছিল ভগ্নদশাগ্রস্ত। যদিও তার গলার স্বর অনিশ্চয়তার ফলে ভাঙা ছিল; আর হাত জিনিসপত্রের অস্তিত্বে ছিল সন্দিহান, তবুও নিশ্চিত যে, সে এসেছে সেই পৃথিবী থেকে, যেখানে মানুষ এখন ঘুমাতে পারে আর মনে রাখতে পারে।
    হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ওকে পেল বৈঠক ঘরে বসা অবস্থায়, তালি দেওয়া এক কালো টুপি দিয়ে বাতাস নিচ্ছে আর মনোযোগ সহকারে অনুকম্পার দৃষ্টি দিয়ে দেয়ালে লাগানো লেখাগুলো পড়ছে। লোকটাকে পরম আন্তরিকতার সঙ্গে সম্ভাষণ জানায় এই ভয়ে যে, হয়ত অন্যসময়ে তাকে চিনত আর এখন তা মনে পড়ছে না। কিন্তু অতিথি তার এই মিথ্যা অভিনয় বুঝতে পারে। বিস্মৃতিতে হারিয়ে যাওয়া মানুষ হিসেবে নিজেকে মনে হয় তার। নিরাময়যোগ্য হৃদয় থেকে বিস্মৃতি নয়; বরঞ্চ তার থেকেও নিষ্ঠুর, অনিবার্য বিস্মৃতি, যাকে সে ভালো করেই চেনে। কারণ, সেটা হচ্ছে মরণের বিস্মৃতি। সুতরাং তা সে মেনে নিল। অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব নয় এমন জিনিসে ভরা বাক্সটা খুলে তা থেকে অনেকগুলো বোতল ভরা ছোট্ট একটা বাক্স বের করে সে। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে পান করতে দেয় এক পান্ডুর কয়ের পদার্থ আর আলোক রশ্মি ফুটে উঠেতার স্মৃতিতে। নামাঙ্কিত জিনিসপত্রে ভরা উদ্ভট বসার ঘরে নিজেকে দেখতে পাওয়ার আগে এবং দেয়ালে লেখা অর্থহীন শব্দগুলোর জন্য লজ্জা পাওয়ার আগেই, সর্বোপরি হতবুদ্ধিকর আনন্দের উজ্জ্বলতায় পাওয়া এই সদ্য আগত লোকটাকে চিনে ওঠার আগেই তার চোখ জলে ভিজে উঠে। সদ্যাগত লোকটা ছিল মেলকিয়াদেস।


    মাকন্দো যখন পুনরায় স্মৃতিজয়ের উৎসব যাপন করছে তখন হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া আর মেলকিয়াদেস পুরনো বন্ধুত্ব পুনরুজ্জীবিত করে নেয়। জিপসি লোকটা গ্রামেই থেকে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিল। সত্যিই মৃত অবস্থায় ছিল সে কিন্তু একাকিত্ব সহ্য না করতে পেরে ফিরে এসেছে। নিজের লোকদের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে জীবনের প্রতি বিশ্বস্ততার শাস্তি হিসেবে অপ্রাকৃতিক সমস্ত ক্ষমতা বর্জিত মেলকিয়াদেস স্থির করে পৃথিবীর এমন এক কোনায় আশ্রয় নিতে এখনও মৃত্যু যার সন্ধান পায়নি; আর নিজেকে উৎসর্গ করে এক দাগেরোটাইপ পরীক্ষাগারে। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া কখনও এই আবিষ্কারের কথা শোনেনি। কিন্তু যখন সে তাকে আর তার সমস্ত পরিবারকে এক উজ্জ্বল ধাতবপাতের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকতে দেখে তখন সে বিস্ময়ে নির্বাক, নিশ্চল হয়ে পড়ে। তখনকার দিনে মরচে-পরা ধাতবপাতে যে দাগেরোটাইপ চিত্র ধারণ করা হত। তাতে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার চুলগুলো ছিল ছাইরংয়ের এবং খাড়া খাড়া। শক্ত কাগজের কলারের শার্টটা আটকানো ছিল এক তামার বোতাম দিয়ে। আর মুখের ভাবে প্রকাশ পাচ্ছিল এক বিশাল গাম্ভীর্য যাকে উরসুলা– ‘এক ভীত সেনাপতি’ বলে ব্যাঙ্গ করে হাসতে হাসতে মরে।

    সেই স্বচ্ছ পরিস্কার ডিসেম্বরের সকালে যখন দাগেরোটাইপটি ধারন করা হয়েছিল তখন সত্যি ভয় পেয়েছিল হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া কারন সে ভেবেছিল তারা প্রতিবারই একটু একটু করে ক্ষয় হয় ধাতব পাতে গিয়ে ঠাঁই নিয়ে। আশ্চর্যজনকভাবে উরসুলা তার চরিত্রের সম্পূর্ণ উল্টোটা করে এ ক্ষেত্রে। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার মাথা থেকে বের করে দেয় ছবি সমন্ধে তার ভুল ধারণাকে, আর একইভাবে অতীতের তিক্ততা ভুলে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় যে, মেলকিয়াদেস বাড়িতেই থেকে যাবে। যদিও কখনও আর দাগেরোটাইপ করতে দেয়নি। কারণ (তার নিজের ভাষায়) সে কখনও নাতিনাতনিদের হাসির পাত্র হয়ে থাকতে চায় না ছবিতে। সেই সকালে বাচ্চাদের পরাল সবচেয়ে ভালো জামাকাপড়, মুখে দিল পাউডার, খাইয়ে দিল এক চামচ মজার সিরাপ– যাতে করে প্রায় দুই মিনিট মেলকিয়াদেসের ক্যামেরার সামনে সম্পূর্ণ অনড় হয়ে থাকতে পারে। আউরেলিয়ানোকে কালো মখমলের পোশাকপরা অবস্থায় দেখা যায় শুধুমাত্র পারিবারিক দাগেরোটাইপেই; আর সেখানে সে দাঁড়িয়ে ছিল আমারান্তা আর রেবেকার মাঝখানে। ছিল সেই একই উদ্যমহীনতা, একই ভবিষ্যৎদ্রষ্টার দৃষ্টি, যেমনটি হবে অনেক বছর পর ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে।

    কিন্তু তখনও সে তার ভাগ্যলিপি সমন্ধে কোনো পূর্বাভাস পায়নি। ওর কাজের সূক্ষ্মতার দরুণ সমস্ত জলাভূমির চারপাশে সে পরিগণিত হত এক দক্ষ রৌপ্যকার হিসেবে। মেলকিয়াদেসের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া উন্মত্ত পরীক্ষাগারে সে এতই নিমগ্ন থাকত যে তার নিঃশ্বাসেরও শব্দ পাওয়া যেত। যখন ওর বাবা আর জিপসির মধ্যে নস্ত্রাদামুসের ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে উচ্চস্বরে তর্ক চলে, চলছে ফ্লাস্ক আর বালতির কর্কশ আওয়াজ হয়, কনুইয়ের ধাক্কায় পড়ে যাওয়া সিলভার ব্রোমাইড আর এসিডের মধ্যে পিছলে পড়ে গিয়ে সৃষ্টি হয় চরম বিশৃঙ্খলার, তখন সে যেন আশ্রয় নিয়েছে এক অন্য জগতে। কাজের প্রতি এই আত্মনিয়োগ আর যে সুনিপুনভাবে নিজের স্বার্থকে সে পরিচালনা করত, তাতে অল্পসময়ের মধ্যেই বানিয়ে ফেলে উরসুলার মজাদার মিশ্রির জীবজন্তু বিক্রির ব্যবসার চাইতেও বেশি টাকা। তার মত একজন সৎ এবং দস্তুরমত পুরুষের যে কোন মেয়ের সঙ্গে ভাব হবে না তা ছিল এক রকম অসম্ভব। সত্যিই তার কারও সঙ্গে ভাব ছিল না।

    কয়েকমাস পর ফিরে আসে বিশ্বভ্রমণকারী ব্যক্তি হুয়ান ফ্রান্সিস্কো। ফ্রান্সিস্কো এল অমব্রে, যার বয়স ছিল প্রায় ২০০ বছর; আর সে নিজের রচিত গান পরিবেশন করে যেত প্রায়ই মাকন্দোতে এসে। গানগুলোতে ফ্রানসিস্কো এল অমব্রে মানাউর থেকে জলাভূমি পর্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করত ঘটে যাওয়া সমস্ত গ্রামের ঘটনাবলি। আর কেউ যদি কাউকে কোনো বার্তা পাঠাতে চাইত অথবা কোনো ঘোষণা করার ইচ্ছে থাকত, তাহলে তাকে দুই পয়সা দিত, যাতে সে ঘটনাবলিকে তার খবরের সঙ্গে সংযুক্ত করে নেয়। এভাবেই ঘটনাচক্রে, হোসে আর্কাদিও সমন্ধে কিছু জানা যায় কি না, এই আশায় যখন উরসুলা গান শুনছিল– জানতে পারে তার মায়ের মৃত্যুসংবাদ। ওর নাম ছিল ফ্রান্সিসকো এল অমব্রে। কারণ সে তাৎক্ষনিকভাবে রচিত সংগীতের এক দ্বৈরথে শয়তানকে হারিয়ে দেয়; আর ওর সত্যিকারের নাম কেউ কখনও জানেনি। অনিদ্রা রোগের প্লেগের সময় সে গ্রাম থেকে উধাও হয়ে যায় আর কোনো আগাম সংবাদ না দিয়ে হঠাৎ করেই আবার একরাতে হাজির হয় কাতারিনোর দোকানে। কী ঘটছে পৃথিবীতে জানার জন্য গ্রামশুদ্ধ সবাই হাজির হয় সেখানে। এইবার ওর সঙ্গে আসে এক মোটা মহিলা। এতই মোটা যে চারজন আদিবাসীর দরকার হত ওকে দোলচেয়ারে বসিয়ে বহন করতে। আর এক অবহেলিত মুলাতো(সাদা ও কালোর বর্ণ শংকর) কিশোরী, যে ওকে রৌদ্র থেকে রক্ষা করত একটা ছাতা ধরে। ঐ রাতে আউনেলিয়ানো যায় কাতারিনোর দোকানে।
     
  4. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,002
    Likes Received:
    1,583
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    -----------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ১০
    -----------------------------------

    সে ফ্রান্সিসকো এল অমব্রেকে পেল গোল হয়ে থাকা একদল উৎসুক শ্রোতাদের মাঝখানে কামালেওনের (এক জাতীয় গিরগিটি) মত বসা অবস্থায়, পুরোনো বেসুরো গলায় খবর গেয়ে যাচ্ছিল গায়ানার স্যার ওয়াল্টার রালে-র কাছ থেকে পাওয়া সেই একই অ্যাকোর্ডিয়ান বাজিয়ে। হাঁটতে পটু সোরার (saltpeter) কারনে ফেটে যাওয়া বড় বড় পা দিয়ে তাল রেখে যাচ্ছিল। পিছনের দিকে একটা দরজা দিয়ে কিছু লোক ঢুকছিল আর বেরিয়ে যাচ্ছিল, আর তার সামনে নীরবে দোলচেয়ারে হাওয়া খাচ্ছিল সেই সম্ভ্রান্ত চেহারার মহিলা, কানে ফেল্টের (কাপড়) তৈরি একটা গোলাপ গুঁজে কাতারিনা দর্শকদের কাছে বিক্রি করছিল গাজানো আখের রসে ভর্তি কাপ আর এই সুযোগে লোকদের কাছে গিয়ে হাত দিচ্ছিল এমন সব জায়গায় যেখানে হাত দেয়া উচিৎ নয়। মধ্যরাতের দিকে গরম ছিল অসহ্য। আউরেলিয়ানো খবরের শেষ পর্যন্ত শুনেও ওর পরিবারের জন্য আগ্রহজনক কিছুই পেল না। যখন সে বাড়ি ফিরে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল তখন মহিলা তাকে হাত দিয়ে ইশারা করে। -“তুইও ঢুকে যা” বলল “দাম হচ্ছে কেবল মাত্র কুড়ি সেন্ট”।

    আউরেলিয়ানো কিছুই না বুঝে ওর কোলের উপর রাখা টাকার বাক্সে একটি মুদ্রা ফেলে ঢুকে গেল। কুকুরীর মত ছোট ছোট স্তন নিয়ে মুলাতো (সাদা আর কালোর বর্ণ সঙ্কর)কিশোরী নগ্ন অবস্থায় শোওয়া ছিল বিছানায়। আউরোলিয়ানোর আগেই তেষট্টি জন পুরুষের আগমন ঘটেছিল সেই ঘরে। এতবার ব্যবহারের ফলে কাঁদা হয়ে যেতে আরম্ভ করেছিল ঘাম আর দীর্ঘশ্বাসে মাখামাখি ঘড়ের বাতাস। কিশোরী মেয়েটা ভেজা চাদরটা সরিয়ে নিয়ে এক কোনা ধরতে বলে আউরেলিয়ানোকে। ওটা ছিল ক্যানভাসের মত ভারী। দুই পাশ ধরে নিংড়িয়ে চলল দুজনে যতক্ষণ পর্যন্ত না ওটা ফিরে পায় তার স্বাভাবিক ওজন। মাদুরটাকে উল্টে দেয় ওরা আর এতে করে ঘাম ঝড়ছিল মাদুরের অপর পাশ থেকে। আউরোলিয়ানো উদগ্র মনে চাচ্ছিল যে এই কাজটা যেন কখনই শেষ না হয়। প্রণয়ের তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াগুলো তার জানা ছিল, কিন্তু হাটু দুটোর সাহসহীনতার কারণে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না সে। যদিও কামনায় তার চামড়া জ্বলছিল আর লোমগুলো খাড়া হয়ে গিয়েছিল, তবুও পেটের ভার মুক্ত করার আশু প্রয়োজনীয়তাটা কিছুতেই রোধ করতে পারছিল না। যখন মেয়েটা বিছানা পাতা শেষ করে, ওকে আদেশ দেয় নগ্ন হতে আর সে চিন্তাভাবনা ছাড়াই একটা ব্যখ্যা দেয়। “আমাকে জোড় করে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। আমাকে বলল বিশ সেন্ট টাকার বাক্সে ফেলতে আর বলল দেরী না করতে”। মেয়েটা তার অজ্ঞতার কথা বুঝতে পারে। “যদি বেরুনোর সময় আরও বিশ সেন্ট ফেলে দিস তবে আরও কিছুক্ষণ দেরী করতে পারিস” নরম স্বরে বলে। ওর নগ্নতা ওর ভাইয়ের নগ্নতার কাছে টিকবে না–এই ধারণার লজ্জায় পীড়িত আউরোলিয়ানো নগ্ন হয়। মেয়েটার উপুর্যুপরি চেষ্টা সত্ত্বেও ও বোধ করে প্রতিবারই অনাসক্তি, প্রতিক্ষণই বোধ করে ভয়ংকর একাকীত্ব। “আরও বিশ সেন্ট রাখব,” বলে হিমশীতল স্বরে। মেয়েটা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিরবতার সাথে। পিঠের মাংশ বেরিয়ে গিয়েছিল ওর। বুকের হাড়ের সঙ্গে চামড়া ছিল এক হয়ে আর ভীষণ ক্লান্তির ফলে শ্বাসপ্রশ্বাস ছিল অনিয়মিত আর গভীর। এখান থেকে অনেক দূরে, দু‘বছর আগে মোমবাতি না নিবিয়ে ঘুমিয়ে পরে ও। আর জেগে ওঠে চারিদিকে জ্বলন্ত আগুন নিয়ে। ছাইভষ্মে পরিণত হয় দাদীর বাড়িটা যেখানে ওর দাদী ওকে লালন করেছিল। সেই সময় থেকেই ওর দাদী বিশ সেন্টের বিনিময়ে মেয়েটিকে পুরুষদের সঙ্গে শোয়ানোর জন্য নিয়ে যেত এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রামে, যাতে করে পুড়ে যাওয়া বাড়িটার দাম শোধ করতে পারে মেয়েটা। মেয়েটার হিসেব অনুযায়ী তখনও বাকি আছে প্রতি রাতে সত্তর জন পুরুষ ধরে হিসাব করে আরও দশ বছর। কারণ শুধুমাত্র বাড়ির টাকাই নয়, তাকে বহন করতে হতো দুজনের যাতায়াত ভাড়া, খাবার দাবার, আর যে আদিবাসীরা দোলচেয়ার বহন করত তাদের বেতন। যখন মহিলা দ্বিতীয়বারের জন্য দরজায় টোকা দেয় তখন আউরেলিয়ানো কান্নার ঘোড় নিয়ে বের হয়ে যায় কিছুই না করে। ঐ রাতে কামনা আর করুণার মিশ্র অনুভূতি নিয়ে আউরেলিয়ানো ঘুমাতে পারে না। অনুভব করে ওকে রক্ষার আর ভালবাসার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা। ভোরে অনিদ্রার প্রচন্ড অবসাদ আর জ্বর নিয়ে স্থির সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ে করে মেয়েটাকে অত্যাচারী দাদীর হাত থেকে মুক্ত করার আর প্রতি রাতে সত্তর জন লোককে যে তৃপ্তি মেয়েটা দিত তা একা একা উপভোগ করার। কিন্তু সকাল দশটার সময় যখন সে কাতারিনার দোকানে উপস্থিত হয়েছে ততক্ষণে মেয়েটা গ্রাম থেকে চলে গিয়েছে।

    সময়ই তার এই অপরিণামদর্শী ইচ্ছেটাকে প্রশমিত করে কিন্তু বেড়ে যায় তার হতাশা। এতে করে সে আশ্রয় নেয় কাজের মধ্যে। নিজের অনুপযোগিতার লজ্জা লুকাতে সিদ্ধান্ত নেয় সাড়া জীবন মেয়েদের সংস্পর্শহীন পুরুষ হয়ে থাকার। অন্যদিকে, মেলকিয়াদেস মাকন্দোর ধারনযোগ্য সব চিএই তার দাগেরোটিপোতে ধারন করার কাজ শেষে দাগেরটিপোর পরীক্ষাগার পরিত্যাগ করে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার উন্মতত্ততার কাছে, যে নাকি ঈশ্বরের অস্তিত্বের বৈজ্ঞানিক প্রমাণে ওটাকে কাজে লাগাতে চায়। সে নিশ্চিত হয় যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব যদি থাকেই তবে সুপারইম্পোজড্ এক্সপোজারের এক জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাড়ির নানান জায়গায় তোলা দাগেরটিপোতে ঈশ্বর ফুটে উঠবেন নতুবা চিরদিনের জন্য ঈশ্বরের অস্তিত্বের ধারণাকে সে ক্ষান্ত দেবে। নস্ত্রাদামুসের ভবিষ্যদ্বাণীগুলো আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে মেলকিয়াদেস। রংচটা মখমলের জামার শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় চড়ুই পাখির পায়ের মত সরু হাত দিয়ে হিবিজিবি এঁকে চলে কাগজের উপর অনেক রাত পর্যন্ত, যে হাতের আংটিগুলো হারিয়ে ফেলেছে আগেকার সেই উজ্জলতা। এক রাতে তার মনে এই বিশ্বাস জেগে ওঠে যে সে জেনে ফেলেছে মাকন্দোর ভবিষ্যৎ। মাকন্দো হবে কাঁচের বাড়িঘরওয়ালা এক ঝলমলে শহর যেখানে বুয়েন্দিয়া বংশের কোন চিহ্নই থাকবে না। “এটা একটা ভূল ধারণা” গর্জন করে উঠে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া, “বাড়িগুলো কাঁচের হবে না, হবে বরফের, আমি যেমনটি স্বপ্নে দেখেছি; আর সবসময়ই বুয়েন্দিয়ারা থাকবে, শতাব্দীর পর শতাব্দী”। ঐ উদ্ভট বাড়িতে সাধারণ মানুষের বুদ্ধিতে যা আসে তা দিয়ে উরসুলা প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলে মিসরীর জীবজন্তুর ব্যবসাটাকে প্রসারিত করতে । একটি চুল্লীতে সারারাত ধরে ঝুড়ির পর ঝুড়ি পাউরুটি, বিভিন্ন ধরনের পুডিং, মেরেংগে (এক ধরনের পিঠা) বিসকোচুয়েলস (স্পঞ্জ কেক) তৈরী হত আর সেগুলো উধাও হয়ে যেত জলাভুমির বন্ধুর রাস্তা ধরে। এমন বয়সে সে পৌঁছেছে যে তার অধিকার ছিল অবসর নেবার কিন্তু প্রতিদিনই সে আরও বেশী কাজ করত । সে এতই ব্যাস্ত ছিল তার সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যাবসা নিয়ে যে যখন এক আদিবাসী মেয়ে তাকে ময়দার তালে মিষ্টি মেশাতে সাহায্য করছে তখন, গোধুলির আলোয় সে অন্যমনস্কতার সাথে দেখে অপরিচিত দুই সুন্দরী মেয়ে উঠানে এমব্রয়াডারি করছে। ওরা ছিল রেবেকা আর আমারান্তা, যারা তিন বছরব্যাপী অনমনীয় দৃঢ়তায় ধরে রাখা নানীর মৃত্যুতে শোকের পোশাক কেবলমাত্র ত্যাগ করছে। আর রঙিন পোশাক যেন এই পৃথিবীতে ওদেরকে তৈরি করে দিয়েছে এক নতুন জায়গা। রেবেকা সম্মন্ধে যা ভাবা হচ্ছিল তা উল্টে দিয়ে সে ছিল অপেক্ষাকৃত সুন্দরী। ওর গায়ের রং ছিল স্বচ্ছ, চোখগুলো ছিল শান্ত আর বড় বড়। অদৃশ্য সুতো দিয়ে যাদুকরী হাতগুলো যেন বুনে চলেছে ফ্রেমের উপর এমব্রয়েডারী কাজ। বয়সে ছোট আমারান্তা ছিল সামান্য মাধুর্যহীন কিন্তু সে ছিল স্বভাবসুলভভাবে স্বতন্ত্র আর মনটা ছিল মৃত নানীর মত বিশাল। ওদের সঙ্গে আর্কাদিওর মধ্যে যদিও বাপের শারীরিক গঠন প্রকাশ পাচ্ছে তবুও তখনও তাকে দেখে মনে হত শিশু। আর্কাদিও নিজেকে নিবেদন করেছিল আউরেলিয়ানোর কাছে রৌপ্য কর্ম শেখায়। এছাড়াও আউরেলিয়ানো তাকে শেখায় লিখতে আর পড়তে। হঠাৎ করেই উরসুলা খেয়াল করে তাদের বাড়ি লোকজনে ভরে গিয়েছে, ছেলেমেয়েরা কিছুদিনের মধ্যেই বিয়ে করবে, তাদের বাচ্চা হবে আর জায়গার অভাবে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পরতে বাধ্য হবে। সুতরাং বের করে আনে অনেকদিনের কষ্টার্জিত জমানো টাকা, ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয় আর আরম্ভ করে বাড়ি বাড়ানোর কাজ। স্থির করে তৈরি করার: অতিথিদের জন্য একটা আনুষ্ঠানিক বসার ঘড়, প্রতিনিয়ত ব্যবহারের জন্য আর একটা বসার ঘড় যেটা আরও বেশী শীতল ও আরামপ্রদ, বাড়ির সকলে এবং অতিথিসহ একসঙ্গে বারোজন লোকের বসার ব্যবস্থা থাকা খাবার টেবিল সমেত খাবার ঘড়, উঠানের দিকে জানালা সমেত নয়টা শোবার ঘড়ের মধ্যদিনের রৌদ্রের তীক্ষ্ণতা থেকে আড়াল করতে গোলাপের বাগান দিয়ে ঘেড়া টানা বারান্দা আর ফার্ন ও বেগনিয়ার টব রাখার জন্য চওড়া রেলিংয়ের। স্থির করে রান্না ঘড়টাকে আরও বড় করার যাতে করে দুটো চুল্লী এটে যায় ভিতরে; যে খামারে পিলার তেরনেরা হোসে আর্কাদিওর হাত দেখেছিল সেটাকে ধ্বংস করে দ্বিগুণ বড় করতে যাতে করে কখনই বাড়ির খাবারের কোন অভাব হবে না। উঠানে চেশনাট গাছের তলায় বানানো আরম্ভ হলো একটা মেয়েদের গোসলখানা, অপরটি পুরুষদের; একেবারে পিছনদিকে সুপরিসর আস্তাবল, তার দিয়ে ঘেরা মুরগীর খোয়ার; দুধ দোয়ানোর গোয়াল আর চতুর্দিকে খোলা পাখির আবাসস্থল যাতে করে নির্দিষ্ট জায়গায় সবসময় না থেকে নিজেদের খুশিমত যেখানে সেখানে থাকতে পারে পাখিগুলো। সে ডজনখানেক রাজমিস্ত্রি আর কাঠমিস্ত্রিদের আলো আর উত্তাপের অবস্থান নির্দিষ্ট করে দিয়ে সব কিছুর জায়গা ভাগ করে দেয় সীমাহীনভাবে, যেন স্বামীর চিত্তবিভ্রম তার উপর ভর করেছে। পত্তনকারীদের প্রকৌশলের প্রাথমিক পর্যায়ে নির্মিত ভবনটা ভরে ওঠে যন্ত্রপাতি আর মালপত্রে, ঘেমে নেয়েওঠা আর মানুষের হাড়ের নিঃশব্দ ঝংকারে সবজায়গায় ধাবিত হওয়া মজুরে, যারা নিজেরাই সকলকে বিরক্ত করছে সেটা চিন্তা না করে সবাইকে বলছে তাদের বিরক্ত না করতে। সেই অস্বস্তিকর অবস্থায়, কেউ ভাল করে বুঝতে পারে না কিভাবে চুন আর আলকাতরা নিঃশ্বাস নিতে নিতে মাটি থেকে আশ্চর্যজনকভাবে গড়ে উঠেছে শুধুমাত্র গ্রামের সবচেয়ে বড় বাড়িই নয় বরঞ্চ সমস্ত জলাভূমির মধ্যে সবচেয়ে বড়, অতিথিপরায়ণ আর ঠান্ডা বাড়ি যেরকমটি আর কখনই বানানো হবে না। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া বুঝতে পারে সবচেয়ে কম, কারন সে তখন বিশাল ওলট পালটের মাধ্যমে স্বর্গীয় দূরদর্শিতাকে চমকে দিতে ব্যস্ত। বাড়িটা যখন প্রায় শেষের দিকে তখন উরসুলা একদিন হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে তার অবাস্তব পৃথিবী থেকে বের করে এনে জানাল যে ওরা বাড়িটার সামনেটা সাদা রং করতে স্থির করেছিল, কিন্তু সেটা না করে নীল রং করার আদেশ এসেছে। ওকে দেখায় সরকারী এক কাগজে লেখা আদেশনামাটা। বউ কি বলছে না বুঝতে পেরে সাক্ষরটা পড়ে সে।
    -“কে এই লোকটা”- জিজ্ঞেস করে।
    -“ম্যাজিষ্ট্রেট”- ক্রোধান্বিত উরসুলা জবাব দেয় “সকলে বলে যে সে হচ্ছে কর্তৃপক্ষ যাকে সরকার পাঠিয়েছে”। ম্যাজিষ্ট্রেট, দন আপলিনার মাসকতে মাকন্দোতে আসে বিশেষ কোন ঘোষণা না করে। এসে প্রথম রাত কাটায় বিভিন্ন হাবিজাবি জিনিষের বিনিময়ে ম্যাকাও পাখি নেয়া আরবদের একজনের বানানো হোটেল দে জ্যাকবে। আর পরের দিন ভাড়া নেয় বুয়েন্দিয়ার বাড়ি থেকে দুই ব্লক দূরে রাস্তার দিকে দরজাওয়ালা ছোট এক কামরা। জ্যাকব থেকে কেনা একটা টেবিল আর চেয়ার বসায় সেখানে, দেয়ালে তারকাটা গেথে লাগায় ওর সঙ্গে আনা প্রজাতন্ত্রের ফলকটা আর কালি দিয়ে দরজায় লিখে ‘ম্যজিষ্ট্রেট’। তার প্রথম আদেশ ছিল জাতীয় স্বাধীনতাবার্ষিকী উপলক্ষে সমস্ত বাড়ি নীল রং করার। আদেশনামাটা হাতে নিয়ে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ওকে পেল তার ছোট অফিসের মধ্যে ঝুলন্ত এক হ্যামকে দিবানিদ্রায় মগ্ন অবস্থায়। “তুমি লিখেছ এটা” জিজ্ঞেস করে। অভিজ্ঞ, লাজুক কিন্তু রাগে লাল হয়ে যাওয়া চেহারার দন আপলিনার মাসকতে জবাব দেয় “হ্যাঁ”; “কোন অধিকারে?” আবার জিজ্ঞেস করে হোসে আর্কেদিও বুয়েন্দিয়া। দেরাজ থেকে একটা কাগজ খুঁজে বের করে দেখিয়ে বলে “আমাকে নিয়োগ করা হয়েছে এই গ্রামের ম্যাজিষ্ট্রেট হিসেবে”। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া এমনকি দেখেও না কাগজটা-“এই গ্রামে আমরা কেউ কাগজ দিয়ে আদেশ দিই না”- শান্তভাবে নিয়ন্ত্রণ না হারিয়ে বলে, “প্রথম আর শেষ বারের মত বলে দিচ্ছি যে এখানে ম্যাজিষ্ট্রেটের কোন প্রয়োজন নেই। কারন এখানে শুধরাবার মত কিছু নেই”। দন অপলিনারের ভয়হীন দৃষ্টির সামনে কখনই গলা উচু না করে পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে বর্ণনা করে কিভাবে গ্রাম পত্তন করেছে, কিভাবে জমি বিলি করেছে, কিভাবে রাস্তা বের করেছে আর গ্রামের অন্যান্য উন্নতি করেছে সরকারকে কোন বিরক্ত না করে আর কারো দ্বারা কোন রকম ত্যাক্ত না হয়ে।


    “ আমরা এতই শান্তিপূর্ণভাবে বাস করছি যে এখন পর্যন্ত আমাদের কেউই স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেনি । বলল- “দেখেছ এখনও আমাদের কোনো কবরস্থান নেই ।“ সরকার যে তাদেরকে সাহায্য করেনি তাতে তাদের কোন কষ্টই হয়নি । বরঞ্চ আনন্দিত হয়েছে কারন তখন পর্যন্ত ওদেরকে শান্তির সাথে বেড়ে উঠতে দিয়েছে। আর আশা করছিল এভাবেই ওদেরকে বেড়ে উঠতে দেয়া হবে, কারন ওরা এমন কোনো গ্রামের পত্তন করেনি যেখানে প্রথম আগন্তুক এসেই বলে দিতে পারবে কোথায় কি করতে হবে। প্যান্টের মতই সাদা ডেনিমের কোট পরিহিত দন আপলিনার মাসকতে সবসময়ই তার অভিব্যাক্তিতে পবিত্রতা বজায় রেখে চলছিল । “সুতরাং, যদি অন্য যে কোন সাধারন নাগরিকের মত এখানে থাকতে চাও তাহলে তোমাকে স্বাগতম”- ইতি টেনে বলে হোসে আর্কেদিও বুয়েন্দিয়া- “ কিন্তু যদি লোকজনের বাড়ি নীল রঙ করতে বাধ্য করিয়ে বিশৃঙ্খলা বাধাতে চাও তাহলে তোমার তল্পিতল্পা গুঁটিয়ে যেখান থেকে এসেছ সেখানে ভাগতে পার, কারন আমার বাড়ি হবে কবুতরের মত সাদা” । পান্ডুর বর্ণ ধারন করে দন আপলিনার মাসকতে । এক পা পেছনে হেটে চোয়াল শক্ত করে কাতরতার সঙ্গে বলে- “ তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি যে আমার কাছে অস্ত্র আছে ।“ হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া টেরও পেলনা কখন তার হাতে যুবক বয়সের ঘোড়া বশ করার শক্তি এসে ভর করে। দন আপলিনার মাসকতের কোটের বুকের সামনের অংশটা ধরে নিজের চোখের উচ্চতায় তুলে ফেলে । “ এটাই করব” বলল, “কারন আমার বাকি সাড়া জীবন, মৃত অবস্থায় তোমাকে বহন করার চাইতে জীবিত বহন করাটাই শ্রেয় বলে মনে করি” । এভাবেই বুকের সামনেটা আকড়ে ধরে বয়ে নিয়ে গেল রাস্তার মাঝখান পর্যন্ত আর ছেড়ে দিল যাতে করে তার পা দুটো জলাভূমিতে যাওয়ার রাস্তাটা স্পর্শ করতে পারে। এক সপ্তাহ পরে খালি পা, জীর্ণ বস্ত্রের ছ জন শটগানধারী সৈন্য নিয়ে ফিরে আসে সে । সঙ্গে ছিল তার স্ত্রী আর সাত মেয়ে বহনকারী গরুর গাড়ি। মাকন্দোর পত্তনকারীরা ওদের বড় ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্তে নিশ্চিত হয়ে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে সাহায্যের ইচ্ছে জানায়। কিন্তু সে তার বিরোধিতা করে, কারন দন আপলিনার মাসকতে ফিরে এসেছে তার বউ ও মেয়েদের নিয়ে, একজন পুরুষ মানুষকে তার পরিবারের সামনে অপ্রস্তুত করা পুরুষোচিত কাজ নয়। আর এই কারনেই সিদ্ধান্ত নেয় ব্যাপারটা ভালোয় ভালোয় মিটিয়ে ফেলতে।

    এবার আউরেলিয়ানো তার সঙ্গী হয়। তখন তার কেবলমাত্র সূচালো গোফ গজিয়েছে, গলার স্বর হয়েছে গমগমে। আর এগুলোই যুদ্ধের সময় তাকে এনে দেবে বৈশিষ্ট। গার্ডদের অগ্রাহ্য করে খালি হাতে অফিসের বারান্দায় উপস্থিত হয় ওরা। দন আপলিনার মাসকতে ধৈর্য হারায় না। ঘটনাক্রমে ওইখানে থাকা তার দুই মেয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। ষোলো বছরের আমপারো, মায়ের মতই শ্যামলা আর রেমেদিওস, বয়স কেবল মাত্র নয় হয়েছে; লিলি ফুলের মত গায়ের রঙ আর সবুজ চোখ নিয়ে খুব সুন্দরী এক কিশোরী। ওরা ছিলো আনন্দোচ্ছল আর শিক্ষিতা। যখন ঘরে ঢোকে, পরিচয় পর্বের আগেই মেয়ে দুটো চেয়ার এগিয়ে দেয় বসার জন্য কিন্তু ওরা উভয়েই দাঁড়িয়ে থাকে। “ঠিক আছে বন্ধু” বলে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া, “তুমি এখানে থাকতে পারবে কিন্তু দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ঐ শটগানধারী দস্যুদের কারনে নয়, তোমাকে থাকতে দিচ্ছি তোমার বউ আর মেয়েদের কথা বিবেচনা করে”

    দন আপলিনার মাসকতে বিচলিত হয়ে পরে কিন্তু তাকে উত্তর দেবার সময় দেয় না হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া “শুধুমাত্র দুটো শর্ত আরোপ করছি” যোগ করে, “ প্রথমটি হচ্ছে সবাই যার যার ইচ্ছেমত নিজেদের বাড়ি রঙ করবে। দ্বিতীয়টি সৈনিকদের চলে যেতে হবে এই মুহূর্তেই। আমরা শৃঙ্খলার নিশ্চয়তা দিচ্ছি”। ম্যাজিস্ট্রেট তার ডান হাত উঁচু করে সবগুলো আঙ্গুল বিস্তৃত করে ।
    “-সম্মানের শপথ”
    “-শত্রুর শপথ” বলে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া আরও তিক্ত স্বরে যোগ করে, “ কারন একটা কথা তোমাকে বলতে চাইঃ তুমি আর আমি পরস্পরের শত্রুই থাকছি ।“

    সেই বিকেলেই বিদেয় নেয় সৈন্যরা। কয়েকদিন পরই ম্যাজিস্ট্রেটের পরিবারের জন্য একটা বাড়ি যোগাড় করে দেয় হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া। আউরোলিয়ানো ছাড়া সকলেই শান্তি পেল। ম্যাজিস্ট্রেটের ছোট মেয়ে, বয়সের তুলনায় যে নাকি আউরেলিয়ানোর মেয়ে হতে পারতো সেই রেমেদিয়সের প্রতিচ্ছবি আউরেলিয়ানোর শরীরের কোনও জায়গা ব্যাথার সৃষ্টি করতে লাগল। সেটা ছিল এক শারীরিক অনুভূতি, যেন জুতোর ভিতরে ছোট্ট এক নুড়ি পাথর।
     
  5. monto
    Offline

    monto বেকার সমিতির সভাপতি Member

    Joined:
    Nov 9, 2013
    Messages:
    2,121
    Likes Received:
    296
    Gender:
    Male
    Location:
    উত্তর বিশিল
    Reputation:
    491
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ড: আনিসুজ্জামান ভাষাবিদ, বাংলার পন্ডিত মানুষ।
    উনার অনুবাদ সর্ব বিচারে অত্যন্ত উঁচু মানের নি:সন্দেহে।
    নোবেল বিজয়ী স্পেনের লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস কালজয়ী উপন্যাস নিঃসঙ্গতার একশ বছর এর বঙ্গানুবাদ থ্রেডটি খুবই ভাল লাগছে। নিয়মিত পড়ার ইচ্ছা আছে।
    এগিয়ে যান।
     
    • Friendly Friendly x 1
  6. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,002
    Likes Received:
    1,583
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ------------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ১১
    ------------------------------------

    কবুতরের মতো সাদা বাড়িটার উদ্বোধন করা হল এক নাচের আয়োজনের মাধ্যমে। উরসুলার মনে ধারণাটা এসেছিল সেই বিকেলে যেদিন ওদের দেখেছিল বয়ঃসন্ধিতে প্রবেশ করতে, আর প্রায় বলতে গেলে বাড়িটা সে বানিয়েছিল, যাতে করে মেয়েরা সম্মানজনক একটা জায়গায় অতিথিদের আপ্যায়ন করতে পারে। উৎসবে যাতে জাকজমকের কমতি না পরে তার জন্য বাড়ি তৈরি শেষ হওয়ার আগেই সে খেটে যায় ক্রীতদাসের মতো। ফলে ফরমাশ দিয়ে দেয় ঘর সাজানোর জিনিসপত্র, বাসনকোসন আর গ্রামে আলোড়ন সৃষ্টিকারী, যৌবনের আনন্দ এবং আজব আবিষ্কারের; পিয়ানোলা (পিয়ানো আর টেপরেকর্ডারের সম্মিলিত এক যন্ত্র, আধুনিক MP3-র ১৯০০ এর সংস্করণ)। ওটাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বিভিন্ন অংশে ভাগ করে আলাদা আলাদা বাক্সে ভরে। আর ওগুলোকে নামানো হয়েছিল ভিয়েনার আসবাবপত্র, বোহেমিয়ার হাতে কাঁটাকাচের সামগ্রী, ইন্ডিজ কোম্পানির বাসনকোসন, হল্যান্ডের টেবিলক্লথ, ভালো ভালো সব ঝাড়বাতি, মোমবাতি, ফুলদানি আর ঘর সাজানোর কারুকার্যের সঙ্গে। পিয়ানোলায় বিশেষজ্ঞ পিয়েত্র ক্রেসপি নামের এক ইতালিয়কে পাঠায় অংশগুলো জোড়া দিয়ে, সুর বেঁধে, আর ছয় রোলে ছাপা আধুনিক বাজনার সঙ্গে কীভাবে নাচতে হয় তা শিখিয়ে দিতে।

    পিয়েত্র ক্রেস্পি ছিল সোনালি চুলওয়ালা মাকন্দোতে দেখা সবচেয়ে সুন্দর আর শিক্ষিত যুবক। পোশাকের ব্যাপারে সে ছিল এতই রীতি-সচেতন যে দম আটকানো গরমের মধ্যেও সে এমব্রয়ডারি করা গেঞ্জি আর গায়ে মোটা কাপড়ের কোট পরে কাজ করত। ঘামে ভিজে, বাড়ির মালিকদের সঙ্গে সম্ভ্রমপূর্ণ দূরত্ব বজায় রেখে কয়েক সপ্তাহ কাটিয়ে দেয় বৈঠকঘরের বদ্ধ অবস্থায়, যা নাকি আউরেলিয়ানোর রৌপ্য কর্মের আত্মনিয়োগের সঙ্গেই একমাত্র তুলনা করা চলে।

    এক সকালে দরজা না খুলে আশ্চর্য ব্যাপারটার সাক্ষী হতে কাউকে না ডেকেই লাগিয়ে দেয় কাগজের প্রথম রোলটাকে পিয়ানোলার সঙ্গে। আর যন্ত্রণাদায়ক হাতুড়ি ও কাঠচেড়াইয়ের নিরবচ্ছিন্ন গোলযোগ বিস্ময়করভাবে বন্ধ হয়ে যায় সুরের শৃঙ্খলা আর পবিত্রতায়। সকলেই ছুটে আসে বৈঠক ঘরে, হোসে আর্কাদিয় বুয়েন্দিয়া যেন বিদ্যুতপৃষ্ঠ হয় সুরের মাধুর্যে নয়, বরঞ্চ পিয়ানোলার রিডগুলোকে নিজে নিজেই বাজতে দেখে। সে অদৃশ্য বাদকের প্রতিচ্ছবির দাগেরটাইপ করার আশায় মেলকিয়াদেসের ক্যামেরাটিকে বসিয়ে দেয় বৈঠকখানায়। সেদিন ওদের সঙ্গে খাবার খায় ইতালীয়। রেবেকা আর আমরান্তা খাবার পরিবেশনের সময় বিস্মিত হয় স্বর্গীয় দূতের মতো মানুষটার আংটিবিহীন পান্ডুর হাতে ছুরি ও কাঁটাচামচের স্বচ্ছন্দ ব্যবহারে। বৈঠকঘর সংলগ্ন থাকার ঘরে ওদের নাচতে শেখায় পিয়েত্র ক্রেস্পি। নাচের পদক্ষেপগুলোর নির্দেশনা দিচ্ছিল ওদের স্পর্শ না করেই। এক মেট্রোনমের (Metronome- নির্দিষ্ট লয়ে সংগীতের তাল মাপার যন্ত্র) মাধ্যমে তালকে বুঝিয়ে দেয় উরসুলার স্নেহপূর্ণ পাহারার মধ্যে, যে নাকি বৈঠক ছেড়ে এক পাও নড়েনি যতক্ষণ ওরা শিখে নিচ্ছিল। এসব দিনে পিয়েত্র ক্রেস্পির পরনে থাকত আঁটসাঁটো নরম কাপড়ের এক বিশেষ ধরনের প্যান্ট আর বিশেষ ধরনের চপ্পল।

    “তোমার এত দুশ্চিন্তা করার কোনো কারণ নেই।” বলে হোসে আর্কাদিয় বুয়েন্দিয়া, “লোকটা হচ্ছে হিজড়ে।” কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত নাচ শেখা শেষ না হল আর লোকটা মাকন্দো থেকে চলে না গেল ততক্ষণ পর্যন্ত সে তার পাহারায় যতি টানল না। তখন আরম্ভ হল উৎসবের প্রস্তুতি। উরসুলা তৈরি করে নিমন্ত্রিতদের এক কড়াকড়ি তালিকা যেখানে শুধুমাত্র বাছাই করা হয় মাকন্দো পত্তনকারীদের আর তাদের বংশধরদের। ব্যতিক্রম ছিল শুধুমাত্র অজ্ঞাত পিতাদের দ্বারা আরও দুই সন্তানের জন্ম দেওয়া পিলার তেরনেরার পরিবার। সত্যিকার অর্থে সমাজের এক বিশেষ স্তরই শুধুমাত্র আমন্ত্রিত হয়েছিল। আর শুধুমাত্র বন্ধুত্বের মনোবৃত্তির উপর নির্ভর করেই তাদের নির্বাচন করা হয়েছিল। কারণ সৌভাগ্যবানরা শুধুমাত্র মাকন্দো পত্তন অভিযানের আগে থেকে হোসে আর্কাদিয় বুয়েন্দিয়ার যে সুহৃদ তাই নয়, বরঞ্চ তাদের ছেলেরা ছিল আউরেলিয়ানো আর আর্কাদিয়র শৈশবের নিত্যসঙ্গী। একমাত্র ওদের মেয়েরাই বাড়িতে আসত রেবেকা আর আমারান্তার সঙ্গে এমব্রয়ডারি করতে।

    দয়াশীল শাসক দন আপলিনার মাসকতের ক্ষমতা সীমিত ছিল ওর অল্প সংস্থানে দুই লাঠিধারী পুলিশের ভরণপোষণে, যা ছিল নিছকই লোক দেখানো। বাড়ির খরচ মেটানোর জন্য তার মেয়েরা এক সেলাইয়ের দোকান খোলে। যেখানে সেলাই করা হত ফেল্টের ফুল। পাশাপাশি করা হত পেয়ারার তৈরি মিষ্টি অথবা চাহিদা অনুযায়ী প্রেম নিবেদনপত্র। কিন্তু বিনয়ী, পরিশ্রমী, গ্রামের সবচেয়ে সুন্দরী আর নতুন ধরনের নাচে সবচেয়ে দক্ষ হলেও উৎসবের আমন্ত্রণ ওরা সংগ্রহ করতে পারে না।

    যখন উরসুলা আর মেয়েরা আসবাবপত্রের মোড়ক খুলছে, ধুলা ঝারছে থালা বাসনের, টাঙাচ্ছে নৌকাভরা গোলাপসহ কুমারী মেয়েদের ছবি, যা কিনা রাজমিস্ত্রিদের বানানো নতুন খালি জায়গায় জীবনের প্রাণস্পন্দন এনে দিচ্ছে, তখন হোসে আর্কাদিয় বুয়েন্দিয়া ঈশ্বরের প্রতিচ্ছবি খোঁজার ব্যাপারে ইস্তফা দেয়। আর ঈশ্বরের অনস্তিত্বে নিশ্চিত হয়ে পিয়ানোলাটা বিভিন্ন অংশে খুলে ফেলে ওটার ভেতরের জাদুকরি গোপন ব্যাপারটা উম্মোচনের জন্য। উৎসবের দুদিন আগে ঠিক জায়গামতো লাগাতে না পারা পিন আর পিয়ানোলার হাতুড়ির মধ্যে ডুবে থাকে সে। একদিক থেকে খুলে ফেলা জট অন্যদিকে পেঁচিয়ে যাওয়ার সমস্যায় হাবুডুবু খেয়ে, কোনো রকমে সে একসঙ্গে লাগায় পিয়ানোলাটা। ঐ সময়ের তুলনাহীন ব্যস্ততা আর দৌড়াদৌড়ির মধ্যেও পিচের বাতিগুলো আগে থেকে নির্দিষ্ট করা দিন এবং ঘণ্টায় জালানো হয়। বাড়িটা খোলা হয় যখন, তখনও সেখান থেকে ভেজা চুন আর রজনের গন্ধ বের হচ্ছিল। পত্তনকারীদের ছেলেরা আর নাতিরা পরিচিত হয় ফার্ন আর বেগনিয়ার বারান্দার সঙ্গে, নিঃশব্দ ঘরগুলোর সঙ্গে আর বাগানভর্তি গোলাপের সুবাসের সঙ্গে। আর ওরা সমবেত হয় বসার ঘরে, সাদা চাদড় দিয়ে ঢাকা এক অজ্ঞাত আবিষ্কারের সামনে। যারা জলাভূমির অন্যান্য লোকবসতিতে জনপ্রিয় পিয়ানো্লা যন্ত্রটার সঙ্গে পরিচিত ছিল, তারা সামান্য হতাশ হয়। তিক্ত মোহভঙ্গ ঘটে উরসুলার যখন আমারান্তা আর রেবেকা নৃত্যপর্বের শুরু করার জন্য প্রথম রোলটা লাগানো হয়, আর দেখা যায় যন্ত্রটা কাজ করছে না। প্রায় অন্ধ, বয়সের ভারে ভগ্ন মেলকিয়াদেস তার প্রাচীন শৈল্পিক বিজ্ঞতা দিয়ে যন্ত্রটাকে সাড়তে চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত হোসে আর্কাদিয় বুয়েন্দিয়া ভুলবশত আটকে থাকা একটা যন্ত্রাংশ নড়িয়ে দেওয়ার পর প্রথমে সুর বেরিয়ে আসে বিস্ফোরণের মতো। পরে সবগুলো জটিল গোলমেলে স্বরের ঝরনারূপে, কোনো কনসার্টের শৃঙ্খলা ছাড়াই তারগুলোতে বেপরোয়া আঘাত হাতুড়িগুলোকে পাগল করে তোলে। কিন্তু সমুদ্রের খোঁজে পাহাড় ডিঙিয়ে পশ্চিম দিক থেকে আসা একশজন একগুঁয়ে লোকের বংশধররা সুরের জগাখিচুড়ির বাধাকে অগ্রাহ্য করে, আর ওদের নাচ প্রলম্বিত হয় ভোর পর্যন্ত।

    পিয়ানোলা সাড়ার জন্য ফিরে আসে পিয়েত্র ক্রেস্পি। রেবেকা আর আমারান্তা সাহায্য করে তাঁরগুলোকে ঠিক জায়গায় বসাতে আর উচ্চহাস্যে ফেটে পড়ে গোলমেলে ওয়ালটজের সুরে। এসব ঘটে এতই স্বাভাবিক আর মাধুর্য্য নিয়ে যে উরসুলা পাহারা দেওয়া বাদ দেয়। যাবার একদিন আগে সেরে ফেলা পিয়ানোলাটা দিয়ে এক বিদায় নাচের আয়োজন করে পিয়েত্র আর নৈপুণ্যসহ রেবেকাকে প্রদর্শন করে আধুনিক নাচ। আর্কাদিয় আর আমারান্তা একই রকম আনন্দ আর নৈপুণ্য সহকারে যোগ দেয়। কিন্তু নাচে বিঘ্ন ঘটে যখন কৌতূহলীদের সঙ্গে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা পিলার তেরনেরা এক মেয়েকে বলতে শুনল ‘ যুবক আর্কাদিয়র নিতম্ব মেয়ে মানুষের মতো’, আর সে তার সঙ্গে কামড়াকামড়ি চুলোচুলি বাধায়। মধ্যরাত্রে পিয়েত্র ক্রেস্পি বিদায় নেয় এক আবেগপূর্ণ আলাপের মাধ্যমে, খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। রেবেকা ওকে সঙ্গ দেয় দরজা পর্যন্ত আর বাড়ির সব দরজা বন্ধ এবং বাতি নেভানোর পর সে ঘরে ঢোকে কান্নার জন্য। সে ছিল এক অসান্ত্বনাদায়ক কান্না, যা গড়িয়েছিল অনেকদিন পর্যন্ত, এর কারণ কেউ জানত না। এমনকি আমারান্তাও নয়। ওর এই গোপনীয়তা কোনো নতুন ব্যাপার ছিল না। যদিও তাকে মনে হত খোলামেলা আর আন্তরিক কিন্তু তার ছিল এক নিঃসঙ্গতায় ভরা চরিত্র আর দুর্ভেদ্য মন। সে ছিল লম্বা আর শক্ত হাড়ের চমৎকার এক কিশোরী, কিন্তু বারবার মেরামত করার পরও, নিজের সঙ্গে নিয়ে আসা হাতলবিহীন কাঠের দোলচেয়ারটাকে ব্যবহারের ব্যাপারে সে ছিল অনড়। কেউই জানত না যে এই বয়সেও সে বজায় রেখেছিল আঙুল চোষার অভ্যাসটা। এ কারণে সে বাথরুমে নিজেকে বন্দি করার সুযোগটা হাতছাড়া করত না। আর একই সময় দেয়ালের দিকে মুখ করে ঘুমানোর অভ্যাসটাও সে আয়ত্ত করে ফেলে।

    বৃষ্টিভেজা বিকেলগুলোতে যখন বেগনিয়া-ঢাকা বারান্দায় একদল বান্ধবীর সঙ্গে সে এমব্রয়ডারি করত, তখন তার আলাপের সুতো ছিঁড়ে গেলে তাকিয়ে দেখত ভেজা মাটির স্তূপগুলো আর স্মৃতিকাতর একফোঁটা জল এসে ভিজিয়ে দিত ওর চোখ ও জিহ্বা। তখন সে কাঁদতে আরম্ভ করত আর অন্যসময়ে কমলা ও রেউচিনির কাছে হেরে যাওয়া নিভৃত ভালো লাগাগুলো অদম্য বাসনা নিয়ে আঘাত করত ওকে। তখন আবার মাটি খেতে আরম্ভ করে সে। প্রথমবার খায় শুধু কৌতূহলবশত, নিশ্চিত হয় যে মাটির খারাপ স্বাদই প্রলোভনের সবচেয়ে ভালো প্রতিষেধক হবে, আর সত্যিই মুখের ভেতর মাটি সে সহ্য করতে পারছিল না। কিন্তু ক্রমবর্ধিষ্ণু উৎকণ্ঠার তাড়নায় নিজেকে জোর করে বারবার। আর আস্তে আস্তে উদ্ধার পায় তার বংশগত ক্ষুধা, মৌল খনিজগুলোর প্রতি ভালো লাগা, আদি খাবারের অভিন্ন পরিতৃপ্তি। মুঠি মুঠি মাটি পকেটে ভরার পর একটু একটু করে খেত সকলের আড়ালে। খেতে ভালোলাগা আর উগ্র রোষের সম্মিলিত এক বিভ্রান্তিকর মনোভাব নিয়ে। কাজটা সে করত বান্ধবীদের সেলাইয়ের সবচেয়ে কঠিন ফোঁড় শিখিয়ে দিতে দিতে আর অন্য পুরুষ মানুষ সম্বন্ধে আলাপ করতে করতে যে, পুরুষরা চুন খাওয়ার মতো ত্যাগস্বীকারের পাত্র নয়। মুঠি মুঠি মাটি ওকে নিয়ে যেত আরও কাছে, ওকে করে তুলত আরও নিশ্চিত যে, এই অধঃপতনের ত্যাগ স্বীকারের যোগ্য পৃথিবীতে একজন লোকই আছে যার পরিশীলিত চামড়ার বুট পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে প্রেরণ করছে রেবেকাকে তার ভার ও রক্তের উত্তাপ এক খনিজ স্বাদের মাধ্যমে, যে স্বাদ মেয়েটার মুখে রেখে যেত এক খসখসে তিক্ততা। আর হৃদয়ে রেখে যেত শান্তির পলি।
     
  7. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,002
    Likes Received:
    1,583
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ------------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ১২
    ------------------------------------

    কোন কারন ছাড়াই এক বিকেলে আম্পারো মসকতে বাড়িটার সঙ্গে পরিচিত হবার অনুমতি চায় । এই আকস্মিক আগমনে অপ্রস্তত আমারান্তা ও রেবেকা কঠোর লৌকিকতার সঙ্গে ওদের আপ্যায়ন করে । তাদের সংস্কার করা ভবনটা ঘুরিয়ে দেখায়, বাজিয়ে শোনায় পিয়ানোলাটা আর পরিবেশন করে বিস্কুটের সঙ্গে কমলার শরবত । যে অল্পক্ষণ উরসুলা ওদের সঙ্গে ছিল সে সময়ের মধ্যেই সম্ভ্রম, চরিত্রের মাধুর্য আর শিষ্টাচার দিয়ে আম্পারো তাকে মুগ্ধ করে । ঘন্টা দুয়েক পরে যখন আলাপচারিতা নিস্তেজ হওয়ার পথে তখন আমারান্তার অসতর্কতার সুযোগে রেবেকাকে দেয় একটি চিঠি । ও শুধু দেখতে পেল ‘সম্মানিতা সেনঞরিতা রেবেকা বুয়েন্দিয়া’ লেখা নামটা, অক্ষরের সেই একই বিন্যাসে লেখা, একই সবুজ কালি আর একই রকম সুক্ষ্ণতার সঙ্গে সাজানো শব্দগুলো, যেভাবে লেখা রয়েছে পিয়ানোলাটাকে চালানোর নিয়মকানুন । আঙুলের ডগা দিয়ে ভাঁজ করে চিঠিটা আর আমপারো মসকোতেকে আমৃত্যু নিঃশর্ত সহযোগিতা ও কৃতজ্ঞতার প্রতিশ্রুতিদায়ক অভিব্যক্তির চাহনি সহকারে লুকিয়ে ফেলে সেটা বডিসের ভিতর ।

    আম্পারো মসকোতে ও রেবেকা বুয়েন্দিয়ার এই আকস্মিক বন্ধুত্ব আউরেলিয়ানোর মনে আশা জাগিয়ে তোলে । ছোট্ট রেমেদিওসের স্মৃতি-যন্ত্রনা থেকে রেহাই দেয়নি ওকে কিন্তু রেমেদিওসকে দেখার মত কোন সুযোগও হয়নি তার। মাগনিফিকো ভিসকল এবং গেরিলেনদো মারকেস, গ্রাম পত্তনকারীদের ছেলে, যাদের নাম ছিল বাপের মত একই নামে নাম, তারা ছিল আউরেলিয়ানোর নিকটতম বন্ধু। যখন ওদের সঙ্গে আউরেলিয়ানো গ্রামের পথে বেড়াত তখন ওকে উৎকন্ঠিত দৃষ্টিতে খুঁজে বেড়াতো সেলাইয়ের দোকানে, কিন্তু শুধুই দেখা যেত বড় দুই বোনকে । আম্পারো মসকোতের এই বাড়িতে উপস্থিতিটা ছিল যেন একটা কিছুর পূর্বাভাস। “ ওর সঙ্গে তাকে আসতেই হবে” এই কথাটা প্রবল বিশ্বাসের সঙ্গে এতবার সে পুনরাবৃত্তি করে, যে এক বিকেলে যখন সে ছোট্ট একটা সোনার মাছ বানাচ্ছিল তখন নিশ্চিত হয় যে সে তার ডাকে সাড়া দিয়েছে । কিছুক্ষণ পর সত্যি সত্যিই শুনতে পেল বালিকাদের গলা, আর ভয়ে জমে যাওয়া হৃদয় নিয়ে দৃষ্টি তুলতেই দেখতে পেল গোলাপী রঙের অর্ধস্বচ্ছ কাপড় দিয়ে বানানো জামা আর সাদা জুতা পরিহিত বালিকাটিকে ।

    “ওখানে ঢুকো না” বলে বারান্দা থেকে আম্পারো মসকোতে- “ওরা ওখানে কাজ করছে” । কিন্তু আউরেলিয়ানো ঐ কথায় সাড়া দেয়ার সময় ওকে দেয় না । মাছের মুখ থেকে বের হওয়া চেন ধরে সোনার মাছটা টেনে ধরে তুলে বলে “ ভেতরে এস” । রেমেদিওস কাছে এসে মাছটি সম্বন্ধে কিছু প্রশ্ন করে তাকে কিন্তু হঠাৎ এসে পরা হাঁপানি আউরেলিয়ানোকে উত্তর দিতে বাঁধা দেয় । অনন্তকালের জন্য থাকতেই ইচ্ছে হয় তার এই লিলি ফুলের মত মুখের সঙ্গে, এই পান্না সবুজ চোখের সঙ্গে। প্রতিবার নিজের বাবাকে সম্মান দিয়ে যেভাবে স্যার বলে, সেই একই সম্মান দিয়ে যে গলার স্বরটা আউরেলিয়ানোকে ডাকছিল “স্যার” বলে, সেই স্বরের খুব কাছাকাছি থাকতে । মেলকিয়াদেস বসা ছিল কোনার টেবিলে আর আঁকিবুকি করছিল অর্থ উদ্ধারে অসম্ভব সংকেত লিপি নিয়ে । আউরেলিয়ানো ওকে ঘৃণা করে ঐ মুহূর্তে। রেমেদিওসকে মাছটা উপহার দিবে এটা বলা ছাড়া সে আর কিছুই করতে পারে না। আর এই নৈবেদ্যের আকস্মিকতায় মেয়েটা এতই ভয় পায় যে দ্রুত কর্মস্থল ত্যাগ করে সে । যে গোপন ধৈর্য নিয়ে আউরেলিয়ানো ওকে দেখতে পাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় ছিল ঐ বিকেলে সে তা হারিয়ে ফেলে । কাজে অন্যমনস্ক হয় সে । মরিয়া হয়ে সমস্ত শক্তি কেন্দ্রীভূত করে অনেকবার তাকে ডেকে যায় আপন মনে কিন্তু রেমেদিওস তাতে সাড়া দেয় না । ওকে খুঁজে বেড়ায় বোনদের কাজের জায়গায়, ওদের বাড়ির জানালার পর্দার পেছনে, ওর বাবার অফিসে, কিন্তু একমাত্র পায় ওর নিজস্ব জমে ওঠা ভয়ঙ্কর একাকীত্বের প্রতিচ্ছবি । ও পার করে দিত ঘন্টার পর ঘন্টা খাবার ঘরে রেবেকার সঙ্গে পিয়ানোলায় ওয়ালটজ শুনে । রেবেকা শুনত কারন ওটা ছিল সেই গান যার সঙ্গে পিয়েত্র ক্রেস্পি নাচতে শিখিয়েছিল ওকে। আউরেলিয়ানো শুনত কারন সবকিছুই, এমনকি বাজনাও তাকে মনে করিয়ে দিত রেমেদিওসের কথা ।

    ভালবাসায় ভরে উঠল বাড়িটা । আউরেলিয়ানো তা প্রকাশ করে পদ্যের মাধ্যমে যার কোন আরম্ভ ছিলনা এমনকি ছিলনা শেষও । ওগুলোকে লিখত সে মেলকিয়াদেস থেকে উপহার পাওয়া খসখসে পার্চমেন্ট কাগজে, গোসলখানার দেয়ালে, নিজের বাহুর চামড়ায়, আর সবগুলো পদ্যেই উপস্থিত হত রূপান্তরিত রেমেদিওসঃ বেলা দুটোর নিদ্রাউদ্রেককারী বাতাসে রেমেদিওস, গোলাপের নীরব নিঃশ্বাসে রেমেদিওস, প্রজাপতির কাঁচ ঘড়ির গোপনীয়তায় রেমেদিওস, রেমেদিওস ভোরের রুটিতে ওঠা ভাপে, রেমেদিওস সব জায়গায় আর রেমেদিওস অনন্তকালের জন্য । বিকেল চারটার সময় এমব্রয়ডারি করতে করতে জানালার পাশে ভালবাসার অপেক্ষা করত রেবেকা । ও জানত যে ডাক বওয়া খচ্চরটা প্রতি পনের দিনে আসে একবার, কিন্তু সে অপেক্ষা করত সব সময়; ভুল করে কোন একদিন চলে আসবে এই স্থির বিশ্বাসে । কিন্তু ঘটে তার ঠিক উল্টোটাঃ একবার খচ্চরটা এল না নির্দিষ্ট দিনে । হতাশায় পাগল হয়ে মধ্যরাত্রিতে বাগানে গিয়ে মুঠি মুঠি মাটি খেল, আত্মহত্যার উদগ্র ইচ্ছেয়, ক্রোধ আর কষ্ট নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে, নরম কেঁচো চিবুতে চিবুতে আর শামুখের খোলসের ঘায়ে মাড়ি ক্ষতবিক্ষত করতে করতে । ভোর পর্যন্ত বমি করে চলে সে । ডুবে যায় এক অবসন্নতার চরমে, বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে ফেলে, আর ওর হৃদয় খুলে যায় অশালীন প্রলাপবিকারে । এতে মর্মঘাতী হয়ে উরসুলা তোরঙ্গের তালা ভেঙ্গে একেবারে তলায় পায় গোলাপী ফিতে দিয়ে বাঁধা সুবাসিত ষোলটি চিঠি, প্রাচীন বইয়ের মধ্যে রাখা গাছের পাতা আর ফুলের পাপড়ির কঙ্কাল আর শুকিয়ে যাওয়া প্রজাপতি যা ছোঁয়ার সাথে সাথেই গুড়ো হয়ে ধুলোয় পরিণত হয় । একমাত্র আউরেলিয়ানোরই ক্ষমতা ছিল ওর এই শোকাহত অবস্থাকে বুঝতে পারার । সেই বিকেলে, উরসুলা যখন রেবেকাকে তার উদ্ভ্রান্ত অবস্থা থেকে উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে, আউরেলিয়ানো তখন ম্যাগনিফিক ভিসবাল ও গেরিনেলদো মারকেসের সঙ্গে কাতারিনোর দোকানে যায় । জায়গাটাকে বাড়ানো হয়েছিল এক কাঠের ঘড় দিয়ে যেখানে নিঃসঙ্গ মেয়েরা থাকে মৃত ফুলের গন্ধ নিয়ে । অ্যাকোরডিয়ান আর বোলসহ একটি দল ফ্রান্সিসকো এল অম্ব্রের গান গেয়ে চলে আর ফ্রান্সিসকো বেশ কয়েক বছর হল মাকন্দো থেকে উধাও হয়ে গেছে । তিন বন্ধু গাজানো গুয়ারাপো (আখের রস দিয়ে বানানো পানীয়) পান করে । মাগনিফিকো আর গেরিনেলদো হচ্ছে আউরেলিয়ানোরই সমসাময়িক কিন্তু দুনিয়ার হাল হকিকতে তারা অনেক বেশি ওয়াকিবহাল । ওরা সেখানে নিয়মমাফিক মেয়েদের কোলে বসিয়ে পান করে যায় । চিমসে যাওয়া সোনার দাঁতওয়ালা ওদেরই একজন কুৎসিতভাবে আদর করে আউরেলিয়ানোকে । সে প্রত্যাখ্যান করে । সে বুঝতে পারে যতই পান করছে ততই মনে পরে যাচ্ছে রেমেদিওসের কথা, কিন্তু তেমনই আরও বেশী অসহ্য হয় তার স্মৃতির যন্ত্রণা । সে বুঝতেও পারল না কখন সে ভাসতে শুরু করেছে। দেখতে পেল তার বন্ধুরা আর মেয়েরা উজ্জ্বল আলোর প্রতিবিম্বে ভেসে বেড়াচ্ছে– ওজনবিহীন, আয়তনবিহীন, বলা কথাগুলো ঠোটের ফাঁক দিয়ে বেরুচ্ছে না । আর ওরা এমন সব ইঙ্গিত করছে যা তাদের মুখভঙ্গির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ । কাতারিনো ওর পিঠে হাত রেখে বলল “এগারোটা বাজতে যাচ্ছে” । আউরেলিয়ানো মাথা ঘুরিয়ে কানে গোঁজা ফেল্টের ফুলসহ বিশাল বিকৃত মুখটা দেখে আর তখনই স্মৃতিবিলোপ ঘটে তার, যেমনটা ঘটত বিস্মরণের সময়। তার স্মৃতির পুনরুদ্ধার হয় এক অদ্ভুত ভোরে; এক কামরায়, যেটা ছিল সম্পূর্ণই অপরিচিত । তার সঙ্গে সংযুক্ত হয় খালি পায়ে, উস্কখুস্ক চুলসহ পিলার তেরনেরা, তাকে দেখছে এক বাতির আলোয় আলোকিত করে অবিশ্বাস্য চোখে ।

    “আউরেলিয়ানো”!

    নিজের পায়ে স্থির হয়ে মাথা তোলে আউরেলিয়ানো । সে জানত না কিভাবে এখানে এসেছে, কিন্তু জানত আসার উদ্দেশ্য। কারন শৈশব থেকে তা গোপনে বহন করছিল হৃদয়ের অলংঘ্য দুর্ভেদ্য অংশে । “ আপনার সঙ্গে শুতে এসেছি” বলল । কাঁদা আর বমিতে মাখামাখি ছিল ওর পরনের জামাকাপড় । পিলার তেরনেরা তখন বাস করত শুধুমাত্র নাবালক দুই ছেলেদের নিয়ে, সে তাকে কোন প্রশ্নই করে না । ঘড়ে নিয়ে ওকে মুখটা মুছিয়ে দেয় এক ভেজা স্পঞ্জ দিয়ে, খুলে ফেলে তার পরিহিত বস্ত্র; পরে নিজে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে মশারী নামিয়ে দেয় যাতে ছেলেরা জেগে উঠলে দেখতে না পায় । যে লোকটার আসার কথা ছিল, যে লোকগুলো চলে গিয়েছে, তাসদের অনিশ্চয়তাময় আচরণে বিভ্রান্ত হয়ে অগনিত যে লোকগুলো তার বাড়ির পথ খুঁজে পায়নি তাদের আগমনের আশায় থেকে থেকে সে ক্লান্ত হয়ে গেছে । এই দীর্ঘ অপেক্ষায় ভাঁজ পরেছে ওর চামড়ায়, স্তনগুলো হয়ে গেছে খালি, আর নিভে গেছে হৃদয়ের অঙ্গার । অন্ধকারে আউরেলিয়ানোকে খুঁজে নিয়ে পেটের উপর হাত রেখে গলায় চুমু খেল মাতৃসুলভ কোমলতা নিয়ে । “ অভাগা ছেলে আমার” বিড়বিড় করে সে । কেঁপে ওঠে আউরেলিয়ানো । এক প্রশান্ত দক্ষতায় বিন্দুমাত্র ভুল না করে পেছনে সরিয়ে দেয় তার পর্বত প্রমান কষ্ট আর রেবেকা হয়ে পরে ছোট্ট জন্তু আর সদ্য ইস্ত্রি করা জামার গন্ধে ভরা সীমানাবিহীন জলাভূমি । যখন স্বাভাবিক হল তখন সে কাঁদছে । গোড়াতে কান্নাটা ছিল নিজের অজান্তেই থেকে থেকে ফুঁপিয়ে ওঠা কান্না । পরে খালি করে দিল এক বাঁধনহীন ঝর্নাধারা, যেন ওর ভেতরে স্ফীত যন্ত্রণাদায়ক কিছু একটা বিস্ফোরিত হয়েছে । পিলার অপেক্ষা করে আঙুলের ডগা মাথায় বুলিয়ে দিতে দিতে, যতক্ষণ পর্যন্ত না আউরেলিয়ানোর শরীর ছেড়ে যায় সেই কালো পদার্থ যা তাকে বাঁচতে দিচ্ছিল না । তখন পিলার তেরনেরা জিজ্ঞেস করে “ কে সে” আর আউরেলিয়ানো বলে তার কথা । পিলার হেসে ফেলে সেই হাসি, যে হাসি শুনে অন্য সময় ঘুঘুরা চমকে যেত। কিন্তু এবার এমনকি বাচ্চারাও ঘুম থেকে জাগে না সেই হাসিতে। “ প্রথমে তাকে লালন করা শেষ করতে হবে তোকে” ব্যাঙ্গ করে সে । কিন্তু এই ব্যঙ্গের আড়ালে আউরেলিয়ানো খুঁজে পায় এক সহানুভূতির স্থির জলাধার। যখন সে ঘড় থেকে বের হয় তখন শুধুমাত্র যে তার পুরুষত্ব সম্বন্ধে অনিশ্চয়তা ত্যাগ করে তাই নয়, এতগুলো মাস ধরে তার হৃদয়ভরা তিক্ততার ভারও ফেলে রেখে আসে পেছনে । হঠাৎ করেই পিলার তেরনেরা অঙ্গীকার করে বসে – “বালিকাটির সঙ্গে আমি কথা বলব”- ওকে বলে “ আর দেখে নিস, ওকে আমি তোর থালায় এনে পরিবেশন করব” । অঙ্গীকার পূরণ করে সে, কিন্তু এক খারাপ সময়ে, কারন বাড়িটা হারিয়ে ফেলেছে সেই অন্য দিনগুলোর শান্তি ।
     
  8. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,002
    Likes Received:
    1,583
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ------------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ১৩
    ------------------------------------

    রেবেকার চিৎকারের কারণ গোপন রাখা সম্ভব না হওয়ায় সকলেই ওর আসক্তির কথা জেনে যায়, আর এদিকে আমারান্তা ভোগে প্রচণ্ড জ্বরে । যেন নিঃসঙ্গ প্রণয়ের কণ্টক ফুটেছে ওর মধ্যেও । গোসলখানার দরজা বন্ধ করে প্রণয়ের ঝড় উজার করত আশাহীন আবেগতপ্ত চিঠি লিখে আর সন্তুষ্ট হত তোরঙ্গের তলায় ওগুলোকে লুকিয়ে রেখে । উরসুলা কোনো রকমে দুজন রোগীর দেখাশোনা করার সময় করে উঠতে পারে । অনেক সময় ধরে গোপন জেরা করার পরও আমারান্তার এই অবস্থার কারণের স্বীকারোক্তি আদায় করা যায় না । পরিশেষে এক ক্ষণিক খেয়ালবশে তোরঙ্গের তালা ভেঙে পাওয়া যায় গোলাপি ফিতে বাঁধা তাজা লিলি ফুলে স্ফীত, আর চোখের জলে ভেজা চিঠিগুলো; যেগুলো পিয়েত্র ক্রেস্পিকে উদ্দেশ্য করে লেখা আর কখনও সেগুলো তাকে পাঠানো হয়নি । রাগে কাঁদতে কাঁদতে শাপান্ত করে সেই সময়টাকে যখন তার ইচ্ছে হয়েছিল পিয়ানোলাটাকে কেনার, আর বন্ধ করে দেয় এমব্রয়ডারির ক্লাস। যদিও কেউ মারা যায়নি; তবুও ঘোষণা করে এক ধরনের শোকাবস্থার যেটা নাকি চলতে থাকবে যতদিন না মেয়েরা পিয়েত্রর আশা ত্যাগ করছে । এ ক্ষেত্রে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার মধ্যস্থতা বৃথাই গেল, কারণ সে পিয়েত্র ক্রেস্পির বাদ্য যন্ত্রের উপর দক্ষতা দেখে তার সম্পর্কের পূর্বধারণা বদলে ফেলেছিল । ফলে যখন পিলার তেরনেরা আউরেলিয়ানোকে বলল যে রেমেদিওস তাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তখন সে বুঝতে পারে যে খবরটা তার বাবা মাকে যন্ত্রণার শেষ অবস্থায় নিয়ে যাবে । কিন্তু অবস্থার প্রেক্ষিতে কাজটা করতে হয় তার । অতিথিদের বসার ঘড়ে এক আনুষ্ঠানিক আলোচনায় আমন্ত্রিত হয়ে ছেলের সাহসী ঘোষণা শোনে তারা, যদিও দয়িতার নাম শুনে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া অপমানে লাল হয়ে যায় । বজ্রাহতের মতো হয়ে বলে, “প্রেম হচ্ছে মহামারী। এত সুন্দরী আর ভদ্র মেয়ে থাকতে একমাত্র তোর বিয়ে করার ইচ্ছে হয় শত্রুর মেয়ের সঙ্গে !”

    কিন্তু উরসুলা একমত হয় ওর এই পছন্দের সঙ্গে। স্বীকার করে যে সত্যিই মসকতের সাত বোনই সৌন্দর্য, কর্তব্যপরায়ণতা, সহবৎ, উত্তম শিক্ষার দিক থেকে উল্লেখযোগ্য আর ছেলের সিদ্ধান্তে খুশি হয় সে । স্ত্রীর এই উৎসাহের কাছে হার মেনে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া এক শর্ত জারি করে, “ পিয়েত্র ক্রেস্পি রেবেকাকেই ভালবেসেছে এবং সে-ই বিয়ে করবে পিয়েত্র ক্রেস্পিকে । যখন হাতে সময় হবে উরসুলা নিয়ে যাবে আমারান্তাকে প্রাদেশিক রাজধানীতে যাতে করে বিভিন্ন লোকজনের সংস্পর্শে এসে সে এই হতাশা থেকে আরোগ্য লাভ করে।”

    এই সিদ্ধান্ত জানার পরপরই রেবেকা সুস্থ হয়ে ওঠে; আর দয়িতের কাছে বাবা মা তাদের বিয়েতে মত দিয়েছে এই জানিয়ে এক উল্লসিত চিঠি লিখে। অন্য কারও সাহায্য না নিয়ে নিজেই ওটাকে ডাকে ফেলে আসে । আমারান্তা সিদ্ধান্তটা মেনে নেওয়ার অভিনয় করে। আস্তে আস্তে তার জ্বর ভালো হয়ে যায় কিন্তু সে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করে যে একমাত্র তার মরা লাশকে ডিঙিয়েই রেবেকা বিয়ে করতে পারবে ।

    পরের শনিবার হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া কালো কাপড়ের সেলুলয়েডের কলারসহ স্যুট, বাড়ি উদ্বোধনের দিন প্রথম পরা পশমি চামড়ার বুট পরে রেমেদিওস মসকতের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায় । ম্যাজিস্ট্রেট আর তার স্ত্রী একই সঙ্গে আনন্দ আর দুশ্চিন্তা নিয়ে তাকে আপ্যায়ন করে কারণ এই অকস্মাৎ সফরের অর্থ তাদের ছিল অজানা । আর পরে ওরা ভাবে, তারা দয়িতার নাম গুলিয়ে ফেলেছে। ওর ভুল ভাঙাতে রেমেদিওসের মা তাকে ঘুম থেকে তুলে বাহু ধরে বসার ঘড়ে নিয়ে যায়। তখনও তার চোখে ঘুম লেগে ছিল ।

    সত্যিই সে বিয়ে করতে রাজি কিনা এই প্রশ্ন তাকে করায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সে বলে যে সে শুধুমাত্র চায় যে তাকে ঘুমুতে দেওয়া হোক। মসকতেদের এই বিভ্রান্তিকর অবস্থা বুঝতে পেরে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ব্যাপারটা খোলসা করার জন্য আউরেলিয়ানোর কাছে যায় । যখন ফিরে আসে ততক্ষণে মসকতে দম্পতি আনুষ্ঠানিক পোশাক পরে, আসবাবপত্রের অবস্থান বদলে, ফুলদানিগুলোতে নতুন ফুল সাজিয়ে, ওদের বড় মেয়েদের নিয়ে অপেক্ষা করছিল । ঘটনাটার অসামঞ্জ আর শক্ত কলারের অস্বস্তিতে পর্যুদস্ত হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ওদের নিশ্চিত করে যে রেমেদিওসই হচ্ছে পছন্দের পাত্রী ।
    “এর কোনো মানেই নেই।” হতাশা নিয়ে বলে দন আপলিনার মসকতে, “আমাদের আরও ছয়টি মেয়ে আছে, সকলেই অবিবাহিতা আর সকলেরই বিয়ের বয়স হয়েছে । যারা কিনা আপনার ছেলের মতো নিষ্ঠাবান আর পরিশ্রমী লোকের বউ হতে পারলে আনন্দিত আর সম্মানিত হত। আর কিনা আউরেলিতোর চোখ পড়ল একমাত্র তার উপর, যে নাকি এখনও বিছানায় প্রশ্রাব করে ।”

    সুসাস্থ্যের অধিকারী তার স্ত্রী বেদনাক্লিষ্ট আঁখিপল্লব ও মুখভঙ্গী নিয়ে মসকতের ভুলের জন্য তিরস্কার করে। ফল বাটা শরবত পান শেষ করে আউরেলিয়ানোর সিদ্ধান্তে আনন্দের সঙ্গেই সম্মত হয় ওরা । শুধুমাত্র মিসেস মসকতে একাকী উরসুলার সঙ্গে একবার আলাপের জন্য অনুনয় করে । পুরুষদের ব্যাপারে জড়ানোর জন্য আপত্তি জানালেও কৌতূহলী উরসুলা বাস্তবিক অর্থেই আবেগের কাছে হেরে পরদিন দেখা করতে যায় । আধ ঘণ্টা আলাপ করার পর এই সংবাদ নিয়ে ফিরে যে রেমেদিওসের তখনও যৌনরোম গজায়নি । আউরেলিয়ানো এটাকে কোনো একটা বড় বাঁধা হিসাবে গণ্য করে না । এতদিন অপেক্ষা করেছে, আরও যতদিন প্রয়োজন সে অপেক্ষা করবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না দয়িতার গর্ভধারণের বয়স হয় ।

    এই নতুন ঐকতান বাধাগ্রস্ত হয় মেলকিয়াদেসের মৃত্যুতে । যদিও ব্যাপারটা আগে থেকে জানা ছিল তবুও পরিস্থিতিটা সুনির্দিষ্ট ছিল না । ফিরে আসার কিছুদিন পর থেকেই খুব দ্রুত সংকটজনকভাবে বুড়িয়ে যাবার এক প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে সে আর কিছুদিনের মধ্যেই হয়ে পড়ে সেই সব অকর্মা প্রপিতামহদের একজন, যারা ছায়ার মতো ঘুরে ঘুরে বেড়ায় পা টেনে টেনে; শোবার ঘড়গুলোতে উচ্চস্বরে জীবনের মধুর সময়গুলোর স্মৃতিচারণ করতে করতে; যাদের কেউ দেখাশোনা করে না; সত্যিকারভাবে তাদের কথা কারও মনেও পরে না, যতক্ষণ না তাদের বিছানায় পাওয়া যায় মৃত অবস্থায় । গোড়ার দিকে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ওর কার্যকলাপে সাহায্য করত দাগেরোটিপোর নতুনত্ব আর নস্ত্রাদামুসের ভবিষ্যৎ বাণীতে উৎসাহী হয়ে । কিন্তু ক্রমশই ওকে একাকীত্বের কাছে পরিত্যাগ করে। কারণ প্রতিবারই তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়ে উঠেছিল দুরূহ, সে হারিয়ে ফেলছিল তার দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি । মনে হত যেন কথা বলছে সে মানবসভ্যতার আদিম অবস্থায় তার সঙ্গে পরিচিত কোনো মানুষের সঙ্গে । বাতাস হাতড়ে হাঁটত সে। জিনিসপত্রের মধ্য দিয়ে এক অবিশ্বাস্য সাবলীলতার সঙ্গে তার এই চলাফেরা যেন ইঙ্গিত করত সহজাত প্রবৃত্তির মাঝে থাকা তাৎক্ষণিক পূর্বধারণা দিয়ে তার দিক-নিদর্শন করার ক্ষমতা ।

    একদিন সে ভুলে যায় নকল দাঁতটা পরতে। সাধারণত রাতের বেলা বিছানার পাশে পানির মধ্যে রেখে দিত সেটা। সেদিন থেকে সেটাকে আর কখনও পরেনি সে । উরসুলা যখন বাড়িটা বানায় তখন আউরেলিয়ানোর কর্মশালার পাশেই একটা বিশেষ কামরা তৈরি করায় যেটা ছিল সব গার্হস্থ্য তৎপরতা আর হট্টগোল থেকে দূরে । ঘরটা জানালা দিয়ে আসা আলোয় ডুবে যেত আর সেখানে উরসুলা নিজেই ধুলো আর পোকার কারণে প্রায় নষ্ট হওয়া, ভেঙে পরা কাগজ আর অবোধ্য চিহ্নে ঠাসা বইগুলোকে সাজিয়ে দিয়েছিল । আরও রেখেছিল বইগুলোর সঙ্গে নকল দাঁতগুলো যেগুলোতে গজিয়েছিল এক ধরনের জলীয় গুল্ম আর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হলুদ বর্ণের ফুল । খুব সম্ভবত নতুন জায়গাটা ভালো লেগেছিল মেলকিয়াদেসের। কারণ তারপর তাকে আর কোথাও দেখা যেত না, এমনকি রান্না ঘরেও না । শুধু মাত্র আউরেলিয়ানোর কর্মশালায় গিয়ে ঘণ্টা পর ঘণ্টা সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া পারচমেন্ট কাগজে রহস্যময় সাহিত্যের হিজিবিজি আঁকত যেগুলোকে দেখে মনে হত এসব বানানো হয়েছে বালুর মতো কোনো এক কাঁচামাল দিয়ে, পেস্ট্রির মতো করে যা ছোঁয়ামাত্রই ভেঙে যাবে । ওখানেই দিনে দুবার খাবার নিয়ে যেত ভিসিতাসিওন, যদিও শেষের দিকে তার ক্ষুধা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল আর শুধু মাত্র খেত শাকসব্জি । এতে খুব দ্রুতই নিরামিষভোজীদের অসহায়ত্ব ধারণ করে সে । তার চামরা ঢেকে গিয়েছিল এক ধরনের নরম শৈবালে। একইভাবে তার মান্ধাতার আমলের পরনের জ্যাকেটটাও ঢাকা ছিল শৈবালে যেটা সে কখনও খুলত না। আর তার নিঃশ্বাসের সঙ্গে বের হত ঘুমন্ত পশুর দুর্গন্ধ । কবিতা লেখায় তন্ময় থাকায় আউরেলিয়ানো ওর কথা ভুলেই যায় যদিও মাঝেমধ্যে এই একঘেয়ে গুনগুন করে বলা কথাগুলো সে বুঝতে পারছে মনে করে কান পাতত ।
    সত্যি বলতে কি তার এই টুকরো টুকরো কথাগুলো থেকে আলাদা করতে পেরেছিল হাতুড়ি পেটানোর মতো একটানা উচ্চারিত বিষুব বিষুব আর আলেকজান্ডার ভন হামবোল্ট এই শব্দ দুটো । আর্কাদিও কিছুটা বেশি ঘনিষ্ঠ হয়েছিল ওর সঙ্গে, যখন সে এসেছিল আউরেলিয়ানোকে রৌপ্যকর্মে সাহায্য করতে । মেলকিয়াদেস এই যোগাযোগের প্রচেষ্টায় সাড়া দিতে আর্কাদিও আর আউরেলিয়ানোর দিকে মাঝেমধ্যে নিক্ষেপ করত কিছু কাসতেইয়ানো শব্দ, যা ছিল সম্পূর্ণই বাস্তবতাবর্জিত । শুধুমাত্র এক বিকেলে হঠাৎ আবেগে তাকে উজ্জ্বল হতে দেখা যায়, যেন যোগাযোগটা সে করতে পেরেছে । অনেক বছর পর ফায়ারিং স্কোয়াডের মুখোমুখি আর্কাদিওর মনে পড়ে যাবে মেলকিয়াদেসের সেই কাঁপা কাঁপা স্বরে তার দুর্বোধ্য রচনা থেকে পড়া কয়েক পৃষ্ঠার কথা।

    বলাই বাহুল্য, সে কিছুই বোঝেনি আর এই উচ্চস্বরে পঠিত বাক্যগুলো ছিল গির্জায় গাওয়া গানের মতো । তারপর বহুদিনের মধ্যে এই প্রথমবার হেসে কাসতেইয়ানোতে বলে, “আমি মারা যাওয়ার পর তিনদিন আমার ঘরে পারদ পোড়াবে।”
    ঘটনাটা হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে জানালে সে আরও বিশদ ব্যাখ্যা জানার চেষ্টা চালায় । এতে করে একমাত্র উত্তর পায়, “আমি অমরত্ব খুঁজে পেয়েছি।”

    মেলকিয়াদেসের শ্বাস-প্রশ্বাসে দুর্গন্ধ বের হতে শুরু হলে আর্কাদিও বৃহস্পতিবার বিকেলে গোসল করানোর জন্য নদীতে নিয়ে যেত । তাতে মনে হত অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে । সে উলঙ্গ হত আর পানিতে নামত অন্যান্য ছেলেদের সঙ্গে। রহস্যময় দিক-নির্দেশক ক্ষমতাটা তাকে সাহায্য করত নদীর গভীর আর বিপজ্জনক জায়গাগুলো এড়িয়ে যেতে ।
    “আমরা পানি দিয়ে তৈরি।” একবার সে বলেছিল।

    এভাবেই কাটল অনেকদিন। সে দিনগুলোতে ঘড়ের কেউ ওকে দেখেনি। শুধুমাত্র যেদিন সে পিয়ানোলা সাড়ার চেষ্টা করে সেই রাতটা আর যখন আর্কাদিওর সঙ্গে নদীতে যেত বগল তলায় তোয়ালে দিয়ে মোড়া লাউয়ের খোলে তালের সাবান নিয়ে, সেই সময়গুলো ছাড়া । এক বৃহস্পতিবার নদীতে নেওয়ার ডাকের আগে আউরেলিয়ানো ওকে বলতে শোনে, “আমার মৃত্যু হয়েছে জ্বরে, সিঙ্গাপুরের বালিয়াড়িতে।”

    ওইদিন পানিতে নামে এক খারাপ জায়গা দিয়ে; আর এর ফলে পরদিন সকাল পর্যন্ত তাকে পাওয়া যায়নি। কয়েক মাইল ভাটিতে এক তীক্ষ্ণ আলোকিত বাঁকে পাওয়া যায় তাকে। আর পেটের উপর বসে ছিল এক নিঃসঙ্গ শকুন । উরসুলা শোকে প্রচুর কাঁদে, যতটুকু সে কাঁদেনি নিজের পিতার মৃত্যুর সময়ও। তীক্ষ্ণ প্রতিবাদ সত্ত্বেও হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া লাশটাকে দাফন করার বিরোধিতা করে, “সে হচ্ছে অমর।” বলে, “সে পুনর্জীবন লাভের সূত্রগুলো জানিয়ে গেছে।”
    কার্যোপযোগী করে তোলা বিস্মৃত সাইফন আর এক কড়াইতে পারদ ফোটাতে শুরু করে তারা আস্তে আস্তে নীলচে বুদবুদে ভরে যাওয়া মৃতদেহের পাশে । দন আপোলিনার মসকতে সাহস করে মনে করিয়ে দেয় যে ডুবে মরা কবর না দেওয়া লাশ, জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক ।
    “ওসব কিছুই হবে না। কারণ, এখনও সে জীবিত।” উত্তর দেয় হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া।
    এর পরের বাহাত্তর ঘণ্টা কাটায় পারদের গন্ধে ভরা ধোয়ার ভেতর থেকে। ততক্ষণে মৃতদেহ থেকে ওঠা নীলাভ লাল রঙের বুদবুদগুলো ফেটে যেতে আরম্ভ করেছে। আর সারা বাড়ি আচ্ছন্ন গেছে ওথেকে উদ্ভুত মৃদু শিস ও দুর্গন্ধযুক্ত বাষ্পে । হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া একমাত্র তখনই অনুমতি দেয় লাশ দাফনের, কিন্তু যেমন তেমনভাবে নয়, সম্মানের সঙ্গে যেমনটি হওয়া উচিত মাকন্দোর সবচেয়ে উপকারী লোকটার বেলায় । ওটাই ছিল মাকন্দোর প্রথম দাফন আর সে দাফনের সময় মাকন্দোতে সবচেয়ে বেশি লোক জমায়েত হয় তখন । একমাত্র একশত বছর পর বড় মায়ের শেষকৃত্য উৎসবেই এর চেয়ে বেশি লোক হয়েছিল । কবরস্থানের জন্য নির্বাচিত হল এক জায়গা; আর তার কেন্দ্রে দাফন করা হল তাকে । পাথরের এক স্মৃতিস্মারকে লিখল শুধুমাত্র যা জানা গিয়েছিল তার সম্বন্ধে– মেলকিয়াদেস। পালন করা হল তার জন্য নয়টি শোকরাত্রি ।
    একবার আমারান্তা তার প্রেম নিবেদনের জন্য পিয়েত্র ক্রেসপিকে পেল কফি পান, কৌতুক করা আর তাস খেলার জন্য উঠোনে জড়ো হওয়া হট্টগোলের মধ্যে । অন্য সময়ে আরবীয়রা গুয়াকামায়ার সঙ্গে তাস বদলের কারণে যে রাস্তাটাকে লোকজনকে তুর্কদের রাস্তা নামে নামকরণ করে। গ্রামের সেই অংশে তখন পিয়েত্র ক্রেসপি একটি বাদ্যযন্ত্রের আর গুদামঘরসহ দোকান দিয়েছে। আর কয়েক সপ্তাহ আগে রেবেকার সঙ্গে তার বিয়ের প্রতিশ্রুতি আনুষ্ঠানিকভাবে পাকাপাকি করে ফেলেছে । যাকে দেখলে মেয়েদের পক্ষে দীর্ঘশ্বাস চেপে রাখা অসম্ভব হয়ে পরে, সেই মাথাভরা উজ্জল কোকড়া চুলওয়ালা ইতালীয় লোকটা আমারান্তার প্রস্তাব এক ছোট্ট মেয়ের জেদ হিসেবে নেয়, যাকে পাত্তা দেওয়ার খুব একটা কারণ নেই বলে মনে করে সে।

    “আমার এক ছোট্ট ভাই আছে।” ওকে বলে, “আমাকে দোকানে সাহায্য করতে আসছে।”
    অপমানিত আমারান্তা বিদ্বেষপূর্ণ ঘৃণা নিয়ে বলে, তার এই বোনের বিয়ে বরবাদের জন্য যদি লাশ হয়ে দরজায় শুয়ে থাকতে হয় তবে তার জন্যও সে প্রস্তত । এই নাটকীয় হুমকি ইটালীয়কে এত বেশি প্রভাবিত করে যে সে রেবেকাকে ব্যাপারটা জানায় । এভাবেই উরসুলার ব্যাস্ততার কারণে রোববার পিছিয়ে দেওয়া আমারান্তার ভ্রমণের প্রস্ততি এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হয় । আমারান্তা অমত করে না এতে, কিন্তু রেবেকাকে বিদায় চুম্বনের সময় কানে কানে বলে, “অলীক স্বপ্ন দেখিস না, যদি আমাকে পৃথিবীর অন্য প্রান্তেও নিয়ে যাওয়া হয়, তবুও তোর এই বিয়ে ভাঙার জন্য একটা উপায় আমি বের করে ফেলবই। যদি এতে করে তোকে খুনও করতে হয় তাহলে তাই করব।”
    উরসুলার অনুপস্থিতি আর মেলাকিয়াদেসের ঘরগুলোয় চুপিসারে পায়চারি করা উপস্থিতির ফলে বাড়িটাকে মনে হত বিশাল ও শূন্যতায় ভরা । আদিবাসী মেয়েটা নিয়েছিল বেকারির দায়িত্ব, আর রেবেকা নেয় সংসারের যাবতীয় ভার । রাত্রি হওয়ার সময় লাভেন্ডারের সুগন্ধ ছড়িয়ে সবসময় হাতে খেলনা নিয়ে যখন পিয়েত্র ক্রেসপি উদয় হত, তখন তার দয়িত তাকে আপ্যায়ন করত মূল বসার ঘরটাতে সমস্ত দরজা জানালা সম্পূর্ণ খোলা রেখে, যাতে কারও মনে কোনো সন্দেহ না জাগে । এটা ছিল এক অপ্রয়োজনীয় সতর্কতা। কারণ, ইতালীয় লোকটা এমনকি সেই মেয়েটার হাতও স্পর্শ করত না যে নাকি এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তার স্ত্রী হতে যাচ্ছে । এই সব আগমনের কারণে বাড়িটা ভরে যাচ্ছিল আশ্চর্যজনক সব খেলনার দিয়ে । দড়ি দিয়ে চালিত নৃত্যরতা মেয়ে, মিউজিক্যাল বক্স, দরাবাজ বাঁদর, টাট্টু ঘোড়া, আর ঢোল বাজিয়ে ভাঁড়ের মতো বিস্ময়কর খেলনার সম্ভার ভুলিয়ে দেয় মেলকিয়াদেসের জন্য হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার শোকভার; আর ফিরিয়ে নিয়ে যায় তাকে সেই প্রাচীন আলকেমীর সময়ে । তখন সে বাস করত এক নাড়িভুড়ি বের করে ফেলা জীবজন্তর স্বর্গরাজ্যে, যেখানে দোলকের বিরতিহীন সূত্রের উপর ভিত্তি করে বানানো যন্ত্রপাতি দিয়ে দোলকের সঞ্চারনকে নিখুঁত করার চেষ্টা করছে সে। আর অন্যদিকে আউরেলিয়ানো কর্মশালাকে অবহেলা করে ছোট্ট রেমেদিওসকে পড়তে আর লিখতে শিখাচ্ছে। গোড়ার দিকে বালিকাটি তার খেলনা পুতুলগুলোকে গোসল করিয়ে কাপড় পরানোর খেলা থেকে বিরত করে প্রতিদিন বিকেলে মানুষটাকে বৈঠকখানায় বসে আপ্যায়ন করার জন্য মানুষটার চেয়ে তার পুতুলগুলোকেই বেশি পছন্দ করত । কিন্তু শেষ পর্যন্ত আউরেলিয়ানোর ধৈর্য আর নিষ্ঠার ফলে আকৃষ্ট হয়ে এমন অবস্থায় পৌঁছুল যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিত বর্ণাক্ষর পড়ে, আর এক খাতায় রঙিন পেন্সিল দিয়ে খামারে গোয়ালঘরসহ গরু আর হলুদ পেন্সিল দিয়ে পাহাড়ের পিছনে অস্তগামী গোলাকার সূর্য এঁকে ।

    শুধুমাত্র রেবেকাই ছিল অসুখী, আমারান্তার হুমকির কারনে । সে ভালোভাবেই পরিচিত ছিল বোনের চরিত্রের সঙ্গে, তার দুর্বিনীত মনের সঙ্গে, আর ভয় পেত তার ঈর্ষাপূর্ণ বিদ্বেষের তীব্রতাকে । ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিত স্নানঘরে আঙুল চুষে, প্রাণান্তকর ইচ্ছাশক্তির বলে মাটি না খেয়ে । একবার এই উৎকণ্ঠা থেকে নিষ্কৃতি পেতে সে ডেকে নিয়ে আসে পিলার তেরনেরাকে ভবিষ্যৎ পড়ার জন্য । প্রচলিত বিভিন্ন অস্পষ্ট ভাষায় আবোলতাবোল বকার পর পিলার তেরনেরা ভবিষ্যদ্বাণী করে, “তুই কখনও সুখী হবি না, যতদিন না তোর বাবা মা কবরস্থ না হবে।”

    শিউরে ওঠে রেবেকা । এক স্বপ্নের স্মৃতির মতো নিজেকে দেখতে পায় খুব বালিকা বয়সে একটা তোরঙ্গ, কাঠের দোলচেয়ার আর এক থলে হাতে এই বাড়িতে ঢুকতে, যে থলের ভেতরের জিনিস সম্বন্ধে তার কোনো ধারণাই ছিল না । তার মনে পরে টাক মাথা, সোনার বোতাম দিয়ে গলাবন্ধ লিলেনের শার্ট পড়া ভদ্রলোকের কথা, যার সঙ্গে (হরতনের) তাসের রাজার কোন সম্পর্কই ছিল না । মনে পরে যায় এক অতি সুন্দরী আর যুবতী মেয়ের কথা যার হাত দুটি ছিল উষ্ণ আর সুগন্ধিযুক্ত যে হাতের সঙ্গে বাতগ্রস্ত তাসের সোনার জোকারের কোনো মিলই ছিল না।

    “বুঝতে পারছি না” – বলল পিলার তেরনেরা বিচলিত হয়ে - “ আমিও না, কিন্তু তাসগুলো এটাই বলেছে”।
    এই প্রহেলিকায় রেবেকা এতই উদ্বিগ্ন হয় যে ব্যাপারটা জানায় হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে আর সে তাসের ভবিষ্যৎবাণীতে বিশ্বাস করায় ভর্ৎসনা করলেও কাউকে কিছু না জানিয়ে, তোরঙ্গে আর আলমারীতে, আসবাবপত্র সরিয়ে, বিছানা পত্র উল্টিয়ে হাড়গোড়ের থলেটা খুঁজতে থাকে । মনে পরে যে বাড়ি সংস্কারের সময় থেকে ওটাকে দেখেনি সে । গোপনে রাজমিস্ত্রিদের ডাকে আর ওদের একজন জানায় যে কাজে অনাস্থা সৃষ্টি করে বলে থলেটা কোন এক শোবার ঘড়ের দেয়ালের মধ্যে রেখে দেয়াল গেঁথে ফেলেছে । অনেকদিন দেয়ালে কান পেতে সতর্কতার সঙ্গে শোনার পর দেয়ালের গভীর থেকে ক্লক ক্লক শব্দটা শুনতে পায় । দেয়ালে গর্ত করে সে আর সেখানেই ছিল হাড়গোড়সহ থলেটা অক্ষত অবস্থায় । ঐ একই দিনে ওগুলোকে গোর দেয়া হয় মেলকিয়াদেসের পাশে একটা কবরে; পাথরের কোনো স্মৃতি স্মারক ছাড়াই। আর এতে করে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া মুক্তি পায় প্রুদেন্সিও আগিলারের স্মৃতির অনুরূপ আরেকটি বিবেক দংশন থেকে। রান্না ঘড়ের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় সে রেবেকার কপালে চুমু খায় – “মাথা থেকে সমস্ত দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেল” বলে-“তুই সুখী হবি”। আর্কাদিওর জন্মের পর থেকে উরসুলার দ্বারা বন্ধ হওয়া এ বাড়ির দরজা নতুন করে খুলে দেয় তেরনেরার সঙ্গে রেবেকার বন্ধুত্ব । ছাগলের পালের মত দিনের যে কোন সময় বাড়ীতে ঢুকে পরত সে, আর এসেই সমস্ত কর্মশক্তি প্রয়োগ করত সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোতে । মাঝেমধ্যে ঢুকে পরতো কর্মশালায় আর আর্কাদিওকে দক্ষতার সঙ্গে সাহায্য করত দাগেরোটাইপ পাতগুলোকে আলক-সংবেদী করতে। আর এটা করত সে এতটাই মমতার সঙ্গে যে ছেলেটা তাতে ওর সম্পর্কে ভুল বুঝত । হতবুদ্ধি করে দিত মেয়েটা ওকে । ওর রোদে পোড়া গা, ওর শরীরের ধোঁয়াটে গন্ধ, হাসির অসামঞ্জস্য অন্ধকার ঘড়টাতে তার মনোযোগে আলোড়ন সৃষ্টি করত, ফলে হোঁচট খেত সে জিনিসপত্রের সঙ্গে ।

    মাঝে মধ্যে আউরেলিয়ানো থাকত ওখানে রুপার কাজ করতে আর একবার পিলার তেরনেরা টেবিলে ভর দেয় ওর ধৈর্যশীল কাজের প্রশংসা করতে । তখনই ঘটে ব্যাপারটা । আউরেলিয়ানো নিশ্চিত হয় আর্কাদিওর অন্ধকার ঘরে থাকার ব্যাপারে, আর চোখ তুলে পিলার তেরনেরার সঙ্গে চোখাচোখি হবার আগেই পড়তে পারে ওর চিন্তাধারা। কারন তা ছিলো মধ্যদিনের আলোর মতই উজ্জ্বল ।
    বলে আউরেলিয়ানো- “বল কি বলতে চাস”
    পিলার তেরনেরা এক করুন হাসির সঙ্গে ঠোট দুটো কামড়ে ধরে । “যুদ্ধ করার জন্য তুমি খুবই ভাল” বলে- “যেখানে দৃষ্টি ফেল সেখানেই বুলেট ঢুকাও” (একবারে সফল হওয়ার অর্থ বহন করে এই প্রবাদ) । ইঙ্গিতটার সত্যতার প্রমান পেয়ে হাঁফ ছাড়ে আউরেলিয়ানো । আবার কাজে মন বসায় যেন কিছুই ঘটেনি আর তার গলার স্বর ফিরে পায় স্বাভাবিক দৃঢ়তা ।
    “স্বীকার করছি” বলে, “আমার নামেই নাম হবে ওর।”
     
  9. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,002
    Likes Received:
    1,583
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ------------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ১৪
    ------------------------------------

    হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া শেষ পর্যন্ত পেয়ে যায় যা খুঁজছিল; ঘড়ির যন্ত্রপাতির সঙ্গে এক দড়ির নর্তকীর সংযোগ ঘটিয়ে ফেলে আর তাতে খেলনাটা নিজস্ব সুর আর ছন্দের সঙ্গে একটানা তিনদিন নেচে যায় । এই আবিস্কারটা তার উদ্ভাবিত অন্য যে কোন ক্ষ্যাপাটে প্রচেষ্টার চেয়ে বেশী সফলকাম হবে মনে করে, খাওয়া ছেড়ে দেয় আবার । ঘুমও দেয় ছেড়ে । উরসুলার সার্বক্ষণিক পাহারা আর সাবধানতা না থাকায় তার অলীক কল্পনা এমন এক মানসিক অপ্রকৃতিস্থতার দিকে নিয়ে যায় তাকে, যে কখনই তার আগেকার অবস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারবে না । উচ্চস্বরে চিন্তা করতে করতে রাত কাটিয়ে দিত ঘরময় পায়চারী করে; আর খুঁজে বেড়াত দোলনের সূত্রটাকে, বলদটানা গাড়ির সঙ্গে মই বা অন্য যে কোন কিছুর গতির সংযোগের সম্ভাবনাকে । অনিদ্রার জ্বর তাকে এতই অবসন্ন করে ফেলে যে এক প্রভাতে সাদা চুলের মাথার বৃদ্ধটাকে চিনতে পারে না, আর সে তার শোবার ঘড়ে ঢুকেছে কিনা সে ব্যাপারেও ছিল অনিশ্চিত । সে ছিল প্রুদেন্সিও আগিলার, শেষ পর্যন্ত যখন চিনতে পারে মৃতরাও বার্ধক্য বরন করে দেখে আশ্চর্যান্বিত হয় আর স্মৃতিকাতরতা নাড়া দিয়ে যায় হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে । “প্রুদেন্সিও”- কাতর কন্ঠে বলে সে “কিভাবে এত দূর থেকে এসেছ!” মৃত্যুর এত বছর পর জীবিতদের প্রতি তীব্র টান, গুরুত্বপূর্ণ একজন সঙ্গীর প্রয়োজন আর নিকটবর্তী মৃত্যুর ভিতরের আর এক মরণ এতই ভয়ংকর ছিল যে প্রুদেন্সিও আগিলার শেষ পর্যন্ত ভালবেসে ফেলে তার সবচেয়ে বড় শত্রুকেও । তাকে অনেক বছর যাবৎ খুঁজে বেড়াচ্ছে সে । রিওআচার মৃতদের কাছে শুধিয়েছে সে, শুধিয়েছে উপরে উপত্যকার থেকে আসা মৃতদের, যারা আসত জলাভূমি থেকে, তাদেরকেও । কেউই দিতে পারেনি ঠিকানা, কারন মৃত মেলকিয়াদেসের আসা পর্যন্ত মৃতদের কাছে মাকন্দো ছিল অজ্ঞাত এক গ্রাম আর মেলকিয়াদেস দেখিয়ে দেয় গ্রামটাকে, মৃতদের বহুরঙা মানচিত্রে কালো একটি ছোট্ট ফোটা এঁকে । হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া গল্প করে সকাল পর্যন্ত প্রুদেন্সিও আগিলারের সঙ্গে । অল্প কয়েক ঘন্টা পর নিদ্রাহীনতায় পরাস্ত হয়ে আউরেলিয়ানোর কর্মশালায় ঢুকে জিজ্ঞেস করে – “আজ কি বার” আউরেলিয়ানো উত্তর দেয়- “মঙ্গলবার” । “আমিও তাই ভেবেছিলাম” বলে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া, “কিন্তু শীঘ্রই বুঝতে পারি যে, আজও গতকালের মতই সোমবার, আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখ, দেখ, দেয়ালগুলোকে আর বেগনিয়াদের, কিছুই বদলায়নি । সুতরাং আজও হচ্ছে সোমবার” । আউরেলিয়ানো তাকে গুরুত্ব দেয় না । পরেরদিন বুধবারে হোসে আরকাদিও বুয়েন্দিয়া আবার হাজির হয় কর্মশালায় । “এটা হচ্ছে এক দুর্বিপাক”- বলে- “আকাশের দিকে দেখ, শোন সূর্যের গঞ্জরন, গতকাল আর গত পরশুর মতই । সুতরাং আজও সোমবার” । সেই রাত্রে পিয়েত্র ক্রেসপি ওকে পেল বারান্দায়; কাঁদছে; ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে, বৃদ্ধদের মত কোন আলোড়ন সৃষ্টি না করে । কাঁদছে প্রুদেন্সিও আগিলারের জন্য, মেলকিয়াদেসের জন্য, রেবেকার বাবা মার জন্য,ওর নিজের বাবা মার জন্য, যাদের কথা মনে করতে পারছে তাদের জন্য, আর যারা ছিল মৃত্যুর পর নিঃসঙ্গ তাদের জন্য । পিয়েত্র ক্রেসপি তাকে উপহার দেয় এক দড়ির ভালুক যেটা এক তারের মাধ্যমে দুই পায়ের উপর হাটতে পারে কিন্তু আচ্ছন্নতা থেকে তার মনোযোগ সরাতে সক্ষম হয় না । ওকে জিজ্ঞেস করে একটা পেন্ডুলামের মেশিন বানানোর সম্ভাবনার কথা যেটা মানুষকে উড়তে সাহায্য করবে আর ওর কাছ থেকে জবাব আসে: এটা অসম্ভব, কারন পেন্ডুলাম যে কোন কিছুই শূন্যে উত্তোলন করতে পারে কিন্তু নিজেই নিজেকে উত্তেলিত করতে পারে না । বৃহস্পতিবার আবার গিয়ে হাজির হয় কর্মশালায়, ছাড়খাড় হয়ে যাওয়া জমির মত যন্ত্রণাক্লিষ্ট চেহারা নিয়ে । “সময়-মেশিনটা নস্ট হয়ে গেছে”, প্রায় ফুঁপিয়ে উঠল- “আর উরসুলা ও আমারান্তা কতও দূরে” । আউরেলিয়ানো ওকে ভর্ৎসনা করে বাচ্চাদের মত আর সে বিনীতভাবে তা মেনে নেয় । আগেরদিনের সঙ্গে একটি পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য জিনিসপত্রগুলো পরীক্ষা করে ছয় ঘন্টা ধরে সময়ের সাথে যদি কোন পরিবর্তন ঘটে তা বের করার অপেক্ষায়, সারা রাত বিছানায় কাটায় চোখ খোলা অবস্থায় । প্রুদেন্সিও আগিলারকে, মেলকিয়াদেসকে, আর সব মৃতদেরকে ডাকাডাকি করে যাতে তারা তার এই অস্বস্তিকর অবস্থা ভাগ নিতে পারে । কিন্তু কেউ আসে না । শুক্রবার সকলে ঘুম থেকে জাগার পূর্বেই সে আবার প্রকৃতির অবস্থা পরীক্ষা করে আর তাতে তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে না যে তখনও সোমবারই চলছে । সুতরাং দরজার এক হুড়কো নিয়ে, শয়তানে ভর করা মানুষের মত অনর্গল আর সম্পূর্ণরূপে দুর্বোধ্য অশ্লীল ভাষায় চিৎকার করতে করতে তার প্রচন্ড শক্তির বুনো হিংস্রতায় ভেঙ্গে ধংস করে চলে আলকেমির যন্ত্রপাতি, দাগেরোটাইপের আলমারি, রুপার কর্মশালা যতক্ষন পর্যন্ত না ওগুলো ধুলায় পরিনত হয় । এরপর যখন বাড়িটার অবশিষ্টাংশও ভাঙার উপক্রম করে আউরেলিয়ানো তখন প্রতিবেশিদের সাহায্য নেয় । দশজন লোকের প্রয়োজন হয় তাকে ধরাশায়ী করতে আর বিশ জন লাগে উঠানের চেস্টনাট গাছটা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে, যেখানে তাকে বেঁধে রাখে ওরা মুখ দিয়ে সবুজ গেজলা বেরুনো অদ্ভুত ভাষায় ঘেউ ঘেউরত অবস্থায় । যখন উরসুলা আর আমারান্তা ফিরে আসে তখনও সে চেস্টনাটের গুঁড়ির সঙ্গে হাত পা বাঁধা অবস্থায় বৃষ্টিতে ভিজে চেহারায় সম্পূর্ণ এক সারল্য নিয়ে বসে আছে । কিছু বলা হলে ওদের দিকে দৃষ্টি ফেলে চিনতে না পেরে দুর্বোধ্য কিছু কথা বলে । দড়ির ক্ষতের কারণে উরসুলা কব্জি আর গোড়ালি মুক্ত করে দেয় । একমাত্র বাঁধা থাকে কোমড়ের সঙ্গে । পরে রোদ আর বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য তালপাতার এক ছাউনি তুলে দেয় ওখানে ।

    আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া আর রেমেদিওস মসকতের বিয়ে হয় মার্চের এক রোববারে, অতিথিদের বসার ঘরে ফাদার নিকোলাস রেইনার দ্বারা বানানো এক বেদীর সামনে । মসকতের বাড়িতে ঘটনার আকস্মিকতার ধাক্কা চার সপ্তাহ ধরে ছিল চরম সীমায়, কারন বাল্যাভ্যাস ত্যাগের আগেই তার যৌনলোম গজিয়ে যায় । যদিও ওর মা ওকে বয়োসন্ধিকালের পরিবর্তনের ব্যাপারে শিক্ষা দিয়েছিল তবুও প্যান্টিতে মাখানো গাড় বাদামী চকলেট বর্ণের এক পড়তা তরল পদার্থ দেখিয়ে চিৎকার করে আউরেলিয়ানো ও তার বোনদের আলাপচারিতায় বাঁধার সৃষ্টি করে । ঠিক করা হয় বিয়েটা হবে এক মাসের মাথায় । এই সময়টুকুতে শুধুমাত্র ওকে শিখাতে পারা গিয়েছিল গোসল করা, নিজেই নিজের কাপড় পরা আর বোঝাতে পারা গিয়েছিল গৃহস্থালির মৌলিক কিছু কাজ । বিছানা ভিজানোর অভ্যাস বর্জন করানোর জন্য তাকে প্রশ্রাব করানো হল গরম ইটের উপর । বৈবাহিক জীবনের গোপনীয়তার অলঙ্ঘনীয়তার কথা তাকে বোঝাতে প্রচুর কষ্ট করতে হয় কারণ রেমেদিওস ব্যাপারটা খোলাশা করে বলায় এতই অভিভুত হয় আর একই সাথে এতই আশ্চর্যান্বিত হয় যে সমস্ত পৃথিবীকে জানিয়ে দিতে চায় বিয়ের রাতের বিস্তারিত বিষয়গুলো । ভীষণ ক্লান্তিকর চেষ্টার ফলে দেখা গেল উৎসবের নির্দিষ্ট দিনে জাগতিক বিষয়াবলী সম্বন্ধে সে তার অন্যান্য বোনদের মতই ছিল পটু । ফুল আর পুস্পমালা দিয়ে সাজানো রাস্তায় বাজির শব্দ আর বিভিন্ন বাদ্যদলের বাজানো গানের মধ্য দিয়ে দন আপলিনার মসকতে যখন ওর বাহু ধরে নিয়ে যাচ্ছিল তখন হাসি উপহার দিয়ে আর হাত নেড়ে ধন্যবাদ জানাচ্ছিল যারা ওকে জানালা থেকে শুভ কামনা জানাচ্ছিল তাদেরকে । অল্প কয়েক বছর পর ফায়ারিং স্কোয়াডের সম্মুখে সেই একই ধাতব বন্ধনীসহ একই জুতো আর কালো কোট প্যান্ট পরিহিত আউরেলিয়ানো যখন বাড়ির দোরে বরণ করে বেদীর সম্মুখে নিয়ে যায় তখন তার মুখ ছিল পান্ডুর আর গলায় অনুভব করছিল গিলতে না পারা একটা দলা । তখন রেমেদিওসের ব্যবহার এতই স্বাভাবিক ছিল, ছিল এত বিচক্ষন যে কখনই সে তার শান্ত ভাব হারায় না। এমনকি যখন আঙটি পরানোর চেষ্টা করা হয় আউরেলিয়ানোকে তখনও না । আপ্যায়িতদের গুঞ্জরন আর বিশৃঙ্খলার মাঝে সে তার লেসের দস্তানা পরা হাত উচু করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে যতক্ষন পর্যন্ত না তার প্রেমিক বুট দিয়ে আংটিটাকে থামাতে পারে দরজা পর্যন্ত গড়িয়ে যাওয়ার আগেই আর বেদীতে ফিরে আসে লজ্জায় লাল হয়ে। উৎসবের সময় সে কোন অশোভন কাজ করে এই ভয়ে ওর মা আর বোনেরা এতই তটস্থ ছিল যে শেষ পর্যন্ত তারাই ওকে একটা চুমু খাওয়ার জন্য কোলে নেয়ার মত অশিষ্টতা দেখায় । প্রতিকূল অবস্থায় সে যে রকম দায়িত্বের, স্বাভাবিক মাধুর্য আর স্বচ্ছন্দ নিয়ন্ত্রণের পরিচয় দেবে সেটা সেদিন থেকেই প্রকাশিত হয় । সে-ই নিজের উদ্যোগে বিয়ের কেকটার সবচেয়ে ভাল অংশ আলাদা করে রাখে আর একটা থালা ও একটা কাটা চামচ সাথে নিয়ে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে দেয় ।

    চেস্টনাট গুড়ির সাথে বাঁধা তালপাতার ছাউনির নিচে এক কাঠের টুলের উপর উবু হয়ে বসে থাকা, রোদ আর বৃষ্টির ফলে বিবর্ণ এই অতিকায় বৃদ্ধ এক কৃতজ্ঞতার হাসি দেয় আর অবোধগম্য এক স্তব উচ্চারন করতে করতে আঙুল দিয়ে ধরে খেয়ে নেয় । সোমবার সকাল পর্যন্ত চলতে থাকা সেই হট্টগোলে ভরা উৎসবে একমাত্র অসুখী ছিল রেবেকা বুয়েন্দিয়া । এটা ছিল ওর জন্য বিরক্তিকর উৎসব । উরসুলার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একই দিনে ওর বিয়েও উদযাপন করার কথা ছিল। কিন্তু শুক্রবার মার মরণাপন্নতার সংবাদসহ এক চিঠি পায় পিয়েত্র ক্রেসপি । সুতরাং তার বিয়ের দিন বদলানো হয় । চিঠি পাওয়ার এক ঘন্টার মধ্যে পিয়েত্র ক্রেসপি প্রাদেশিক রাজধানীতে চলে যায় আর শনিবার ঠিক সময়ে আউরেলিয়ানোর বিয়ের উৎসবে চলে আসে । অন্যদিকে শনিবার দিন ঠিক সময় মত তার মা একই সময় রাস্তায় বেরিয়ে পথে পিয়েত্রকে অতিক্রম করে ।

    তার মা আউরেলিয়ানোর বিয়েতে এলে আরিযা ত্রিস্তে গানটা গায়, যেটাকে সে ছেলের বিয়েতে গাওয়ার জন্য তৈরী করেছিল । এদিকে পিয়েত্র ক্রেসপি সঠিক সময়ে বিয়েতে পৌঁছুনোর চেষ্টায় রাস্তায় পাঁচ পাঁচটি ক্লান্ত ঘোড়া বদলিয়েও রোববার মধ্যরাতে উৎসবের ছাই ঝাড়ু দিতে ফিরে আসে । চিঠিটার প্রেরকের ব্যাপারে সে কখনোই কোন অনুসন্ধান করেনি । উরসুলার জেরায় ক্লিষ্ট আমারান্তা তখনও ছুতোরদের দ্বারা সম্পূর্ণরূপে অবিচ্ছিন্ন বেদীটার সামনে তার নির্দেষিত শপথ করে । বিয়ে পড়ানোর জন্য জলাভূমি থেকে দন আপলিনার মসকতে নিয়ে এসেছিল ফাদার নিকানোর রেইনাকে, যে ছিল তার নিজের যাজক গোষ্ঠীর প্রতি অকৃতজ্ঞতায় মন কঠিন হওয়া এক বৃদ্ধ । গায়ের চামড়া ছিল কোচকানো আর দেহটা ছিল শুধুই হাড়বিশিস্ট, পেটটা ছিল লক্ষনীয় আর গোলাকার, আর চেহারায় ছিল এক বৃদ্ধ দেবদুতের অভিব্যক্তি যেটা যতটা না ছিল ভালোমানুষির জন্য তার চেয়েও বেশী ছিল সরলতার জন্য । বিবাহোৎসবের পর নিজের গির্জায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল তার। কিন্তু মাকন্দোবাসীদের বিধর্মীতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে পরেন তিনি, কারণ ছেলেমেয়েদের ব্যাপটাইজ না করিয়ে, উৎসবগুলোকে ধর্মীয়ভাবে না উদযাপন করে সাধারণ আদি-প্রাকৃতিক নীতিতে চলে। বিভিন্ন কুকাজের মধ্য দিয়েও উন্নতি করে চলছে এরা । এখানকার চেয়ে পৃথিবীর আর কোনো জায়গাতেই ঈশ্বরের বীজমন্ত্রের এত প্রয়োজন নেই বুঝতে পেরে খৎনাধারী আর পৌত্তলিকদের খ্রীস্ট ধর্মে দীক্ষা দিতে, বিয়ে না করে সহাবস্থানকারীদের বিয়ের মন্ত্র পরিয়ে বৈধ করার আর মুমূর্ষুদের সাক্রামেন্ট (খ্রীস্ট ধর্মীয় বাধনে বাঁধা) করার জন্য আরও এক সপ্তাহ থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি । কিন্তু কারুরই মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হন না তিনি । মাকন্দোবাসী তাকে বলে যে তারা পাদ্রিবিহীন বাস করে চলছে অনেকদিন যাবত । আত্মার ব্যাপারগুলো তারা সরাসরি ঈশ্বরের সঙ্গে ঠিকঠাক করে । যার ফলে নশ্বর পাপের খারাপ ব্যাপারটা কেটে গেছে তাদের । মরুভুমিতে ধর্মোপদেশ দিয়ে দিয়ে ক্লান্ত হয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হন এক গির্জা তৈরী করার যেটা হবে পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় । থাকবে প্রমাণ আকারের সেইন্টদের মূর্তি, দেয়াল হবে রং বেরঙের কাঁচ দিয়ে তৈরী, যাতে করে রোম থেকেও লোক আসবে এই নাস্তিকতার মাঝখানে ঈশ্বরকে সম্মান জানাতে । তামার এক বাসন নিয়ে সব জায়গায় দাক্ষিণ্য চেয়ে বেড়ান উনি। ওকে অনেক দেয়া হত কিন্তু সে চাইত আরও বেশী কারণ গির্জাটার ঘণ্টাটা এমন হতে হবে যে ঘন্টার গর্জন ডুবন্তদেরও ভাসিয়ে তুলবে । এতই অনুনয় করতেন যে এতে করে তার গলা ভেঙে যায়, আর হাড়গোর ভরে ওঠে শব্দে । এক শনিবার, তখনও এমনকি দরজাগুলোর খরচের টাকাও একত্রিত করতে পারেননি, প্রচন্ডভাবে হতাশ হয়ে পরেন । প্লাজায় এক বেদী তৈরী করে হাতে অনিদ্রার সময়ের মত এক ঘন্টি নিয়ে সারা গ্রাম ঘুরে বেড়ান এক উন্মুক্ত উপাসনা উৎসবের ঘোষণা করে । কৌতূহলবশত অনেকেই যোগ দেয় । অন্যেরা যোগ দেয় স্মৃতিকাতরতায় । আর অন্যেরা যোগ দেয় ঈশ্বর যেন তার এই মধ্যস্থতার অবজ্ঞা নিজস্ব অপমান হিসেবে না নেন । এভাবেই সকাল আটটার সময় অর্ধেক গ্রাম গিয়ে জমায়েত হয় প্লাজায়, যেখানে ফাদার নিকোলাস রেইনা ধর্মীয় সংগীত গায় তার অনুনয়ের কারণে ভাঙা গলায়। উপাসনা শেষে যোগদানকারীদের দলটা যখন বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছে, তখন তিনি হাত তোলেন সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করতে । -“এক মিনিট”- বলেন, “ এবার আমরা দেখব ঈশ্বরের বিতর্কাতীত অসীম ক্ষমতার প্রমাণ ।”

    যে ছেলেটা তাকে এই উপাসনা উৎসবে সাহায্য করে সে এক কাপ ঘন ধুমায়িত কফি এগিয়ে দেয় আর উনি এক নিঃশ্বাসে তা পান করেন । পরে আস্তিন থেকে একটি রুমাল বের করে ঠোঁটগুলো মুছে হাত ছাড়িয়ে চোখ দুটো বন্ধ করেন । এসময়ই মাটি থেকে বারো সেন্টিমিটার উপরে উঠে যান তিনি । এটা ছিল বিশ্বাস জন্মানোর এক ভালো পন্থা । এভাবেই পরে দিকে অনেকদিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে চকলেট দিয়ে বানানো উত্তেজকের মাধ্যমে শূন্যে উঠে ঈশ্বরের ক্ষমতার প্রমাণ দেখাতেন উনি আর তার বেদীতে সাহায্যকারী বালক তখন এক থলিতে টাকা তুলত । এভাবেই এক মাসের কম সময়ের মধ্যে আরম্ভ করে দেয়া হল গির্জা বানানোর কাজ । এক সকালে যখন আর একবার সেই শূন্যে উত্তোলনের প্রদর্শনী দেখতে একদল লোক চেস্টনাটের নীচে জমায়েত হয় তখন একমাত্র হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ব্যতীত কেউই তার এই স্বর্গীয় প্রদর্শনীর উৎসের ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করে না ।

    একটু সোজা হয়ে বসে কাঁধটাকে নীচু করে যখন ফাদার নিকানোর রেইনা যে চেয়ারটায় বসেছিলেন সেটা শুদ্ধ মাটির উপরে উঠে যেতে শুরু করে, তখন হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া বলে –“হক এস্ত সিমপ্রিসিসিমাস । হোমো ইস্তে স্ট্যাটাম কোয়ারটাম ম্যাটারিয়ে ইনভেনিট । (এটা তো খুবই সহজ ব্যাপার । মানুষই আবিস্কার করেছে এই জিনিসটা) ফাদার নিকানোর হাত দুটো উঁচু করেন আর চেয়ারটার চারটে পা একই সঙ্গে মাটিতে স্থান নেয় । -নেগ- বলেন – ফ্যাক্টুম হক একজিস্টেনসিয়াম দেই প্রোব্যাত সিনে দুবিও । ( না- বলেন- এটাই হচ্ছে ঈশ্বরের অস্তিত্বের সন্দেহাতীত প্রমাণ) এভাবেই উনি বুঝতে পারেন যে, হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার শয়তানে ভর করা দুর্বোধ্য বুলিটা হচ্ছে লাতিন । আর তিনিই একমাত্র লোক যিনি লাতিনে তার সাথে যোগাযোগে সক্ষম । এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে ফাদার নিকোনার তার শৃঙ্খলাহীন মস্তিষ্কে ঈশ্বরের বিশ্বাস রোপনের চেষ্টা করেন । প্রতি বিকেলে চেস্টনাটে গুড়ির পাশে বসে লাতিনে তাকে ধর্মোপদেশ দিতেন কিন্তু হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া এক গুঁয়েমির সঙ্গে এই বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথার মারপ্যাচ, এমনকি চকলেটের রূপান্তরকেও গ্রহণযোগ্য মনে করে না আর দাবি করে যে একমাত্র দাগেরটাইপই হচ্ছে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের একমাত্র উপায় । সুতরাং ফাদার নিকানোর তার কাছে নিয়ে যায় মেডেল, বিভিন্ন ধর্মীয় ছবি, এমনকি ভেরনিকার ছবি আঁকা কাপড়ের এক প্রতিরূপ কিন্তু হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া এগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে কারণ এগুলো হচ্ছে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন হস্তশিল্প । সে ছিল এতই একগুঁয়ে যে শেষ পর্যন্ত ফাদার নিকোনার তার খ্রীস্টধর্মী প্রচেষ্টায় ক্ষান্ত দিয়ে তার সঙ্গে দেখা করা চালাতে থাকেন মানবতার খাতিরে ।

    অতএব হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া উদ্যোগ নেয় যুক্তি দিয়ে ফাদারের ঈশ্বর বিশ্বাস ভেঙে দিতে । মাঝে মাঝে ফাদার নিকোনার চেস্টনাটের কাছে নিয়ে যেত পাশা খেলার বোর্ড আর এক গুটি তাকে খেলায় আমন্ত্রণ জানাত কিন্তু হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া খেলতে অস্বীকার করে । কারণ হিসাবে জানায় যে খেলাগুলোর নিয়ম কানুনে প্রতিদ্বন্দ্বীরা আগে থেকেই একমত, সেই খেলাগুলোর উদ্দেশ্য সে কখনই বুঝতে পারেনি । ফাদার নিকোনার কখনই পাশা খেলাকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেননি আর এতে করে তিনি কখনই আর খেলাটা খেলেননি । প্রতিবারই হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার প্রাঞ্জলতায় আরও বেশী বিস্মিত হয়ে একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেন যে এটা কি করে সম্ভব যে সে একটা গাছের সঙ্গে বাঁধা । -“হক এস্ত সিমপ্লিসিজিমম” সে উত্তর দেয়- “কারন আমি পাগল। “
     
  10. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,002
    Likes Received:
    1,583
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ------------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ১৫
    ------------------------------------

    সেই সময় থেকে নিজের ঈশ্বর বিশ্বাসের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে আর কখনই তার সঙ্গে দেখা করতে না গিয়ে সম্পূর্ণরূপে গির্জা তৈরীতে আত্মনিয়োগ করেন ফাদার যাতে করে সেটা দ্রুত শেষ হয় । রেবেকা নতুন করে আশার আলো দেখতে পায় । এক রোববার যেদিন ফাদার নিকানোর বাড়িতে একই টেবিলে বসা বাড়ির অন্যান্য সকলের সঙ্গে সকালের নাস্তা সারছিল, আর গির্জা তৈরী শেষ হবার পর ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো কি রকম ধর্মীয় আড়ম্বর ও জৌলুশপূর্ণ হবে এই নিয়ে আলাপ করছিল, সেদিন থেকেই রেবেকার ভবিষ্যৎ ছিল গির্জা তৈরী শেষের সঙ্গে শর্তাধীন । “সবচেয়ে ভাগ্যবতী হবে রেবেকা”– বলে আমারান্তা । আর যেহেতু রেবেকা বুঝতে পারেনি তার কথার গুঢ় অর্থ সেহেতু এক সরল হাসি দিয়ে ব্যাখ্যা করে – “বিয়ের মধ্য দিয়ে গির্জাটাকে উদ্বোধন করতে হবে তোকে” রেবেকা মন্তব্য শোনার আগেই বলতে চেষ্টা করে । “যে গতিতে গির্জা নির্মাণ কাজ এগোচ্ছে তাতে দশ বছরের আগে ওটা শেষ হবে না” । ফাদার নিকানোর একমত হন না; ক্রমবর্ধমান বিশ্বাসীদের বদান্যতার ফলে সময়ের হিসাবটা আরও আশাব্যঞ্জক বলে মনে হয় তার । অপমানিত রেবেকা কিছু না বললেও নাস্তা শেষ করতে পারে না । ফলে উরসুলা আমারান্তার প্রস্তাবটার সঙ্গে একমত হয়ে গির্জাটা তাড়াতাড়ি শেষ করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করে । ফাদার নিকানোর হিসেব অনুযায়ী এরকম আরও একটা সাহায্য অন্য জায়গা থেকে পেলে গির্জার কাজ তিন বছরের মধ্যেই শেষ হবে । আমারান্তা যে সরলতার ভাব দেখিয়ে প্রস্তাবটা করেছে আসলে তা ছিল না-বুঝতে পারার কারণে। ঐ সময় থেকে রেবেকা আর আমারান্তার সঙ্গে কথা বলে না । “এটাই হচ্ছে সবচেয়ে কম খারাপ তোর জন্য” সেই বিদ্বেষপূর্ণ তর্কের রাতে আমারান্তা বলে- “ এতে করে পরবর্তী তিন বছর তোকে খুন করতে হবে না” । রেবেকা গ্রহণ করে তার এই চ্যালেঞ্জ । পিয়েত্র ক্রেসপি বিয়ের সময় পেছানোর নতুন এই খবরে হতাশায় ভোগে, কিন্তু রেবেকা তাকে বিশ্বস্ততার স্পষ্ট প্রমাণ হিসাবে বলে “যখনই তুমি বলবে আমরা পালিয়ে যাব”। পিয়েত্র ক্রেসপি দুঃসাহসিক কাজে পা দেবার লোক ছিল না । দয়িতার আবেগপ্রবণ স্বভাবের বিরোধিতা করে সে তার কথা রক্ষার ব্যাপারটাকে এমন এক সম্পদ বলে বিবেচনা করে যেটাকে অপচয় করা যায় না । সুতরাং রেবেকা আরও দুঃসাহসী উপায়ের আশ্রয় নেয় । যখন রহস্যময় এক বাতাস বৈঠকখানার বাতি নিভিয়ে দিত, উরসুলা চমকে যেত প্রেমিক প্রেমিকাদের অন্ধকারে চুমু খেতে দেখে । পিয়েত্র ক্রেসপি আধুনিক বাতিগুলোর নিম্নমান সম্বন্ধে এক অপরিণামদর্শী ব্যাখ্যা দিত, এমনকি বৈঠকখানায় উচ্চমানের আলোর ব্যবস্থার সাহায্যের প্রস্তাব করে সে । কিন্তু আবার জ্বালানীর সংকট ঘটত বা সলতে আটকে যেত আর উরসুলা রেবেকাকে পেত প্রেমিকের কোলে বসা অবস্থায়, ফলে উরসুলা আর কোন কৈফিয়তই গ্রহণ করত না । রুটি বানানোর কারখানার ভার আদিবাসীর হাতে ন্যস্ত করে দোলচেয়ারে বসে প্রেমিক জুটির উপর নজর রাখতো, আর তার কম বয়সেই সেকেলে হয়ে যাওয়া সমস্ত কায়দার কাছে যেন এই জুটির অভিনব পন্থা যাতে হার না মানে তা নিশ্চিত করতো । “বেচারী মা”, একঘেয়ে সাক্ষাতে হাই তুলতে দেখে ব্যাঙ্গ করে বলে রেবেকা - “মৃত্যুর পরও রেহাই পাবে না এই দোলচেয়ারে বসার শাস্তি থেকে”। তিনমাস নজর রাখা প্রেমে আর গির্জার নির্মাণ কাজের ধীরগতিতে বিরক্ত হয়ে পিয়েত্র ক্রেসপি গির্জার কাজ শেষ করার জন্য প্রয়োজনীয় বাকি টাকাটা ফাদার নিকানোরকে দিয়ে দেয় । এতে করে অধৈর্য হয় না আমারান্তা । প্রতিদিন এমব্রয়ডারি করার সময় বান্ধবীদের সঙ্গে গল্প করতে করতে অথবা বারান্দায় সেলাই করতে করতে নতুন নতুন ফন্দী বের করতে চেষ্টা চালিয়ে যায় । সেটা ছিল গির্জা শেষ হবার দুমাসেরও কম সময় বাকি থাকতে । শোবার ঘরের আলমারীতে বিয়ের পোশাকের সঙ্গে রেবেকার ন্যাপথালিনগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু রেবেকা বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসায় এতই অসহিঞ্চু হয়ে পরে যে, আমারান্তার ভেবে রাখা সময়ের আগেই বিয়ের পোশাকটার সমস্ত আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি শেষ করার । আলামারী খুলে প্রথমে কাগজগুলো সরিয়ে লিলেনের আবরন খোলার পর পেল পোশাকের হেম, নেকাবের সেলাই এমনকি আসার (AZAHAR); ফুলের মুকুটটা পর্যন্ত মথে কেটে ধুলোয় পরিবর্তিত হয়েছে । যদিও রেবেকা নিশ্চিত ছিল যে, পোশাকটা মুড়ে রাখার সময় সে দুই মুঠো ন্যাপথালিন ঢুকিয়েছিল তবুও ঘটনাটা স্বাভাবিক দুর্ঘটনা বলে চিহ্নিত হবে মনে করে সে আমারান্তাকে দোষী করার সাহস পায় না । বিয়ের মাত্র এক মাস বাকী ছিল তখন । আম্পারো মসকতে এক সপ্তাহের মধ্যে এক নতুন বিয়ের পোশাক সেলাইয়ের অঙ্গীকার করে । এক বৃষ্টিঝরা দুপুরে যখন শেষবারের মত রেবেকার গায়ে লাগে কিনা তা দেখার জন্য, একঝলক গুড়ি বৃষ্টিতে আবৃত আমপারো ঘরে ঢোকে তখন আমারান্তার মূর্ছা যাবার উপক্রম হয় । বাকরোধ হয়ে আসে তার আর ঠান্ডা এক ঘামের সুতো নামে মেরুদন্ড বেয়ে।

    সেই বিকেলে আমপারো হাজার আলপিন দিয়ে অসীম ধৈর্য সহকারে শরীরের চারপাশে সার্টিনের বর্ম তৈরী করায় রেবেকা যখন গরমে হাসফাস করছে, আমারান্তা তখন উলের বুনুনিতে কয়েকবার ভুল করে ফেলে । আঙ্গুলে সুচ ফোটায় কয়েকবার কিন্তু ভীতিকর শীতলতার সাথে সিদ্ধান্ত নেয় যে দিনটা হবে বিয়ের পূর্বের শেষ শুক্রবার আর, প্রয়োগ করা হবে কফির সাথে কয়েক ফোটা আফিমের আরক ।

    যেমন অনতিক্রমণীয় তেমনি এক বিরাট বাঁধা বিয়ের দিনটাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দিতে বাধ্য করে । নির্দিষ্ট করা বিয়ের দিনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে ছোট্ট রেমেদিওস মাঝরাতে জেগে ওঠে তার অন্ত্রের মধ্যে মর্মান্তিক উদগীরণের মধ্য দিয়ে, বিস্ফোরিত এক গরম স্যুপের মধ্যে ভিজে জবজবে অবস্থায়, আর মারা যায় তিনদিন পর নিজের পরিবার প্রয়োগকৃত বিষপান করে, আর সঙ্গে মারা যায় তার পেটের মধ্যে আড়াআড়ি অবস্থায় থাকা এক জোড়া জমজ শিশু । আমারান্তা বিবেক দংশনে ভোগে । ঈশ্বরের কাছে সে প্রার্থনা করেছিল যেন এমন ভয়ংকর কিছু ঘটে যাতে করে রেবেকাকে বিষ খাওয়াতে না হয় আর ফলে সে রেমেদিওসের মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী করে । রেমেদিওস বাড়িতে নিয়ে এসেছিল এক পরশ আনন্দের দমকা হাওয়া । সে ঠাঁই নিয়েছিল কর্মশালার কাছেই এক শোবার ঘরে, যেটাকে সাজিয়েছিল তার সদ্য পার হওয়া শৈশবের খেলনা আর পুতুল দিয়ে, আর তার প্রাণবন্ত আনন্দময় শোবার ঘরের চার দেয়াল পেরিয়ে উপচে পড়ত বেগনিয়া-ঘেরা বারান্দায় এক স্বাস্থ্যময় দমকা হাওয়ার মত । ভোরবেলা থেকে আরম্ভ করত গান গাইতে। একমাত্র সে-ই সাহস করেছিল রেবেকা আর আমারান্তার বিরোধে মধ্যস্ততা করতে । হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার দেখাশোনা করবার মত ধকলপূর্ণ কাজও নিজের কাঁধে নেয় সে । তাকে খাবার দিত, নিত্যনৈমিত্তিক কাজগুলোতে সাহায্য করত, তার পা ধুয়ে দিত সাবান আর ছোবা দিয়ে । তার চুল,দাড়ি,উকুন ও উকুনের ডিমমুক্ত রাখত। তালপাতার ছাউনিটাকে সবসময় ঠিক করে রাখত আর ঝড়ের সময় সেটাকে আরও মজবুত করতে ছাউনির উপর চাপিয়ে দিত পানিনিরোধক ক্যানভাস । জীবনের শেষের কয় মাস ল্যাটিন ভাষার প্রাথমিক বুলি দিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারত রেমিদিওস । যখন আউরেলিয়ানো আর পিলার তেরোনেরার ছেলে জন্ম নেয়, আর বাড়িতে নিয়ে এসে তার নাম আউরেলিয়ানো হোসে রেখে এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে ব্যাপটাইজ করা হয়, তখন রেমেদিওস সিদ্ধান্ত নেয় বাচ্চাটাকে তার প্রথম ছেলে হিসাবে পরিচয় দেবার । তার মাতৃপ্রবৃত্তি অবাক করে দেয় উরসুলাকে । অন্যদিকে আউরেলিয়ানো বেঁচে থাকার সঙ্গত কারণ খুঁজে পায় ওর ভিতর । প্রতিদিনই কর্মশালায় কাজ করত সে, আর মধ্য সকালে চিনি ছাড়া এক কাপ কফি নিয়ে দিত রেমেদিওস তাকে । দুজনে প্রতি রাতে বেড়াতে যেত মসকতেদের বাড়ি । যখন আউরেলিয়ানো অন্তহীন ডোমিনো খেলত তার শ্বশুরের সংগে, তখন রেমেদিওস বোনদের সংগে গল্প করত অথবা মায়ের সঙ্গে বয়স্কদের ব্যাপারগুলো নিয়ে আলোচনা করত । গ্রামটাতে বুয়েন্দিয়ার কর্তৃত্ব আরও পোক্ত হয় দন আপলিনার মসকতের কর্তৃত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়ে । দন আপলিনার মসকতে প্রাদেশিক রাজধানীতে বার বার যাতায়াত করে সরকারকে রাজী করাতে সক্ষম একটা স্কুল বানাতে যেখানে ভর্তি হয় আর্কাদিও, যে তার উত্তরাধিকার সূত্রে দাদার কাছ থেকে পেয়েছে শিক্ষার উদ্দীপনা । অটল প্রত্যয় দিয়ে জাতীয় স্বাধীনতা দিবস আসার আগেই বেশীর ভাগ বাড়ি নীল রঙ করাতে সক্ষম হয় দন আপলিনার মসকতে । ফাদার নিকানোরের ক্রমাগত অনুরোধে কাতরিনার দোকানটাকে সরানো হল দূরের এক রাস্তায়, বন্ধ করা হল গ্রামের কেন্দ্রের বিভিন্ন লজ্জাজনক জায়গাগুলো, যেগুলো প্রতিদিনই প্রচুর উন্নতি করে যাচ্ছিল । একবার সে ফিরে আসে অস্ত্রধারী পুলিশ সঙ্গে করে আর তাদের দেয়া হয় শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব । কারুরই মনে থাকে না গ্রামে অস্ত্রধারী লোকা না রাখার আদি চুক্তিটার কথা । শ্বশুরের দক্ষতা আনন্দিত করত আউরেলিয়ানোকে । “তুইও ওর মতই মোটা হয়ে যাবি” বলত তার বন্ধুরা । কিন্তু প্রচুর সময় বসে কাটানোর ফলে উচু হওয়া তার চোখের দীপ্তিকে কেন্দ্রীভূত করলেও, ওজন বাড়ে না তার, বা চরিত্রের শান্তভাব হারায় না সে, বরং তার ঠোঁটের উপর নির্জন মগ্নতার ও দৃঢ় সংকল্পের রেখাটাকে স্থায়ী করে তোলে । সে আর তার স্ত্রী দুই পরিবার থেকেই এত গভীর মমতা অর্জন করেছিল যে যখন রেমেদিওস তার আশু সন্তান আগমনের সংবাদ দেয় তখন, এমনকি রেবেকা আর আমারান্তাও ঝগড়া বাদ দিয়ে চুক্তি করে, ছেলে হলে নীল উলের আর মেয়ে হলে গোলাপী উলের পোশাক বোনার । অল্প কয়েক বছর পর আর্কাদিও ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাড়িয়ে সবার শেষে চিন্তা করে রেমেদিওসের কথা ।

    অতি আবশ্যিক কারণগুলো ছাড়া দরজা জানালা বন্ধ রেখে সকলের আগমন বা নির্গমন বন্ধ করে এক শোক পর্বের আয়োজন করে উরসুলা; এক বছর উচ্চস্বরে কথাবার্তা নিষিদ্ধ করা হয়, আর যেখানে মৃতদেহের নিশি শোকের ব্যবস্থা করা হয়েছিল সেখানে এক কালো লেস বাঁধা রেমেদিওসের দাগেরটিপো স্থাপন করা হয় এক অনির্বান তেলের বাতির সঙ্গে । ভবিষ্যৎ বংশধররা, যারা কখনই সেই বাতিটাকে নিভতে দেয়নি, তাদের হতবুদ্ধি করে দেবে কুঁচি দেয়া স্কার্ট, সাদা জুতো আর অর্গান্ডির লেস বাঁধা মেয়েটার প্রতিচ্ছবি, যেটাকে গৎবাঁধা পরদাদীর অবয়বের সংগে কিছুতেই মেলাতে পারবে না তারা । আমারান্তা আউরেলিয়ানো হোসের যত্নের ভার নেয় । ছেলে হিসেবে গ্রহণ করে তাকে, যে নাকি তার একাকীত্বের অংশীদার হয়ে উপশম করবে তার ঠিক জায়গামত না লাগা প্রার্থনা, আর অনিচ্ছাকৃত আফিমের আরক কফিতে মিশে যাবার ভার । সন্ধ্যাবেলা পা টিপে, টুপিতে কাল লেস লাগিয়ে ঘরে ঢুকত পিয়েত্র ক্রেসপি রেবেকাকে দেখে যেতে, আর মনে হত হাতের মুঠি পর্যন্ত কালো পোশাকের মধ্যে রেবেকার রক্তক্ষরণ হচ্ছে । ওই সময়ে, বিয়ের নতুন একটা দিনের চিন্তা এতই শ্রদ্ধাহীন হত যে ওদের প্রেম পরিণত হল এক চিরন্তন সম্পর্কে, এক ক্লান্তিকর তত্ত্বাবধানহীন প্রণয়ে । অন্যদিনে যে প্রেমিকরা চুমু খাবার জন্য বাতি নষ্ট করে ফেলত তাদের প্রেমকে যেন মৃত্যুর ইচ্ছের হাতে ছেড়ে দেয়া হয় । লক্ষহীন সম্পূর্ণরূপে হতোদ্যম রেবেকা আবার মাটি খেতে আরম্ভ করে ।

    যখন শোকপর্বটা দীর্ঘায়িত হতে হতে এমন পর্যায়ে আসে যে উলের কাটার বুনুনির পর্বটা আবার আরম্ভ হয়। তখন নিঃশব্দ দুপুর দুটোর প্রাণান্তকর গরমের মধ্যে কেউ একজন এমনভাবে রাস্তার দিকের দরজাটা ধাক্কা দেয় যে দরজার সংগে লাগানো সিমেন্টের পিলারগুলো কেঁপে ওঠে প্রচন্ড শক্তির প্রবলতায়, আর গোলচেয়ারে আঙ্গুল চোষণরত রেবেকা, রান্নাঘরে উরসুলা, কর্মশালায় আউরেলিয়ানো, এমনকি নিঃসঙ্গ চেস্টনাটের নীচে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ারও মনে হয় যেন এক ভূমিকম্প বাড়িটাকে ছিন্নভিন্ন করছে । বিশাল শরীরের এক লোক ভেতরে ঢোকে । তার চতুর্ভুজ পিঠটা কোনরকমে দরজার মধ্যে এঁটে যায় । তার বাইসনের মত গলা থেকে ঝুলছিল ভার্জিন রেমেদিওসের মেডাল, বাহুগুলো আর বুক ছিল সম্পূর্ণভাবে রহস্যময় সব উল্কি দিয়ে ঢাকা । আর ডান কব্জিতে শক্ত করে লাগানো তামার বালাতে খোঁদাই করে করা নিনঞস-এন-ক্রস (ক্রসের ভিতর শিশু)ওর গায়ের চামড়া ছিল উন্মুক্ত, লবনাক্ত বাতাসের কারণে তামাটে, চুল খাটো করে খচ্চরের কেশরের মত করে ছাটা, চোয়াল দুটো লোহার মত শক্ত আর এক করুন চাহনী । ঘোড়ার জীনের দিগুণ চওড়া কোমড়বন্ধনী, হাটু পর্যন্ত লম্বা মোজাসহ ঘোড়া দাবরানোর কাটাওয়ালা ও লোহা দিয়ে আবৃত বুটসহ লোকটার উপস্থিতি চারপাশে এক ভুকম্পনের মত অবস্থার সৃষ্টি করে । বৈঠকখানা পার হয়ে ভিতরে বসার ঘর পার হয়ে, প্রায় ছিন্ন কিছু চামড়ার থলে (SADLLE BAG) হাতে নিয়ে বজ্রের মত আবির্ভূত হয় সে বেগনিয়ার বাগানে, যেখানে আমারান্তা আর তার বান্ধবীরা বাতাসে সুচ তুলে ধরে চলৎশক্তিহীন হয়ে পরে । “শুভ দুপুর” বলে ক্লান্ত স্বরে, আর থলেগুলো কাজের টেবিলের উপর ফেলে বাড়ির পিছন দিকে পা বাড়ায় । “শুভ দুপুর” চমকে ওঠা রেবেকাকে বলে, যখন রেবেকা তার শোবার ঘরের দরজার সামনেটা পার হতে দেখছিল তাকে। “শুভ দুপুর” বলে পঞ্চম ইন্দ্রিয় কেন্দ্রীভূত করে সতর্ক অবস্থায় রৌপ্যকর্মের টেবিলে বসা আউরেলিয়ানোকে । কারও সঙ্গেই সময় কাটানোর জন্য দাড়ায় না সে । সরাসরি গিয়ে উপস্থিত হয় রান্নাঘরে আর সেখানেই প্রথমবারের জন্য থামে এক সফর শেষে, যে সফর শুরু করেছিল পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে । “শুভ দুপুর” বলে । উরসুলা এক সেকেন্ডের জন্য মুখ হা করে থ হয়ে থাকে । চোখগুলোকে দেখে, চীৎকার করে লাফিয়ে উঠে তার গলা জড়িয়ে ধরে আর চীৎকার করতে থাকে আনন্দমন্ডিত কান্নায় । সে ছিল হোসে আর্কাদিও, যে নিঃস্ব অবস্থায় চলে গিয়েছিল, ঐভাবেই খালি হাতে ফিরে এসেছে । এতটাই নিঃস্ব সে যে তার ঘোড়া ভাড়া বাবদ দু পেসো দিতে হল উরসুলাকে । এসপানঞলের সঙ্গে নাবিকদের খিস্তি মিশিয়ে কথা বলছিল সে । কোথায় ছিল জিজ্ঞেস করা হলে উত্তর দিল “এখানে-ওখানে” । যে ঘরটা ওকে বরাদ্দ করা হল সেখানে হ্যামক ঝুলিয়ে ঘুমিয়ে নিল তিনদিন । যখন জেগে উঠল ষোলটা কাঁচা ডিম পান করে সোজা কাতরিনার দোকানের দিকে রওয়ানা দিল যেখানে ওর প্রমাণ সাইজের শরীর, মেয়েদের মাঝে আতংকভরা কৌতূহলের সৃষ্টি করে । ওর খরচে সকলের জন্য পান আর আখের রসের মদ দিতে বলে । একই সঙ্গে পাঁচজনের সংগে পাঞ্জার বাজীর প্রস্তাব করে সে । “এটা অসম্ভব” ওর বাহু নাড়াতে পারবে না এটা নিশ্চিত হয়ে ওরা বলে । “ওর কাছে নিন্ঞস-এন-ক্রস আছে “। কাতারিনা দৈবশক্তিতে বিশ্বাস না করে প্রতিপক্ষকে নাড়াতে পারবে না বলে, বারো পেসো বাজী ধরে । হোসে আর্কাদিও সেটাকে জায়গা থেকে সরিয়ে মাথার উপর তুলে পরে নামিয়ে রাখে রাস্তার উপর । এগারোজন লোকের প্রয়োজন হয় সেটাকে ভিতরে ঢোকাতে । নীল আর লাল অক্ষরে জট লাগানো বিভিন্ন ভাষার উল্কিতে সারা শরীর ঢাকা হোসে আর্কাদিও প্রতিপক্ষের উপর অবিশ্বাস্য পুরুষত্ব দেখানোয় এক উৎসবেরও আমেজ তৈরি হয় । লোলুপতা নিয়ে ঘিরে থাকা মেয়েদেরকে জিজ্ঞেস করে কে ওকে বেশী দাম দেবে । যার সবচেয়ে বেশী ছিল সে বিশ পেসো করে । সুতরাং সে লটারীর প্রস্তাব জনপ্রতি দশ পেসো করে । দামটা ছিল অচিন্তনীয় কারণ সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মেয়েটির আয় ছিল এক রাত্রের জন্য আট পেসো । তবুও ওরা প্রস্তাবে একমত হয়ে ওদের নাম লেখে চৌদ্দ টুকরো কাগজে আর ঢুকায় এক টুপিতে প্রতিজনে একটা কাগজ তোলার জন্য । যখন মাত্র দুটো কাগজ বাকি থাকে তখন সকলেই বুঝতে পারে ওদুটোর মালিক কারা । “প্রতিজনে আরও পাঁচ পেসো করে দাও” প্রস্তাব করে হোসে আর্কাদিও আর আমাকে ভাগ করে দেব তোমাদের দুজনের মধ্যে ।
     

Pls Share This Page:

Users Viewing Thread (Users: 0, Guests: 0)

Users found this page by searching for:

  1. আপনার চারপাশে অস্ত্র mp3