1. Hi Guest
    Pls Attention! Kazirhut Accepts Only Bengali (বাংলা) & English Language On this board. If u write something with other language, you will be direct banned!

    আপনার জন্য kazirhut.com এর পক্ষ থেকে বিশেষ উপহার :

    যে কোন সফটওয়্যারের ফুল ভার্সন প্রয়োজন হলে Software Request Center এ রিকোয়েস্ট করুন।

    Discover Your Ebook From Our Online Library E-Books | বাংলা ইবুক (Bengali Ebook)

Collected নিঃসঙ্গতার একশ বছর | গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস

Discussion in 'Collected' started by abdullah, May 1, 2016. Replies: 44 | Views: 4744

  1. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,200
    Likes Received:
    1,586
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ------------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ১৬
    ------------------------------------

    এটাই ছিল তার জীবিকা । নাম পরিচয়হীন নাবিকদের দলে নাম লিখিয়ে পঁয়ষট্টিবার পাক খেয়েছে পৃথিবীটাকে । কাতারিনোর দোকানে সেই রাতে ওর সাথে বিছানায় যাওয়া মেয়ে দুটো ওকে ন্যাংটো অবস্থায় নাচ ঘরে নিয়ে যায় এটা দেখানোর জন্য যে ওর শরীরের এক মিলিমিটার জায়গাও খালি নেই । সর্বত্রই উল্কি আঁকা আছে: বুকে, পিঠে আর গলা থেকে আরম্ভ করে পায়ের আঙ্গুলের ডগা পর্যন্ত । পরিবারের সংগে মিশতে পারে না সে । সারাদিন ঘুমোত আর রাত কাটাতো সহ্য করে নেয়া এলাকাগুলোতে নিজের শক্তির ভাগ্য পরীক্ষা করে । মাঝে মাঝে উরসুলা যখন ওকে টেবিলে বসাতে সমর্থ হতো তখন সে খুব দরদের পরিচয় দিত, বিশেষ করে দূরদেশগুলোতে তার অভিযানের বর্ণনার সময়। জাপান সাগরের জাহাজডুবিতে দু সপ্তাহ সাগরে বেঁচে ছিল প্রচন্ড সুর্যালোকে দগ্ধ হয়ে মৃত এক সঙ্গীর গায়ের মাংশ খেয়ে । মৃতের গায়ের নোনা মাংশ সাগরের পানিতে আরও লবনাক্ত আর সূর্যকিরণে রান্না হওয়া সেই মাংশের স্বাদ ছিল দানা দানা আর মিষ্টি। এক রৌদ্রদগ্ধ দুপুরে ওর জাহাজ পরাজিত করে এক সমুদ্র ড্রাগনকে আর তার পেট চিরে পায় শিরস্ত্রাণ,বক্লেস আর ক্রুসেডে ব্যবহৃত অস্ত্র। ক্যারিবিয় সাগরে দেখতে পায় ভিক্টর হুগোর জাহাজের অপছায়া, মৃত্যুর হাওয়ায় জাহাজটার পালগুলো ছিল ছেঁড়া, মাস্তুল খেয়ে ফেলেছিল সামুদ্রিক আরশোলা, আর চিরদিনের জন্য হারিয়েছিল গুয়াদালুপের পথ। উরসুলা কাঁদত খাবার টেবিলে, “আর এত বড় বাড়ী এখানে, বাছা আমার” ফোঁপাত সে “ আর এত খাবার ফেলে দেয়া হয় শুয়োরদের জন্য”। কিন্তু ভিতর থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারত না যে, তার যে ছেলেকে জিপসিরা নিয়ে গিয়েছিল সে আর এই লোক একই বর্বর যে নাকি অর্ধেকটা দুধছাড়ানো শূকরছানা এক দুপুরের খাবার বেলায় সাবাড় করে আর যার ঢেঁকুরের গন্ধে শুকিয়ে যায় সব ফুল। পরিবারের অন্য সকলেরও একই অনুভূতি ছিল এ ব্যাপারে। অার জন্তুর মত ঢেঁকুর যে বিরক্তির উদ্রেক করত আমারান্তা তা কিছুতেই চেপে রাখতে পারত না। আর্কাদিও ওদের মধ্যেকার সম্পর্ক কখনই জানতে পারেনি আর সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টায় হোসে আর্কাদিওর করা প্রশ্নগুলির উত্তর কোনরকম দায়সাড়াভাবে দিয়ে শেষ করত। আউরেলিয়ানো, যখন তার সঙ্গে একই কামরায় ঘুমুত, সেই ছেলেবেলার সৃতি জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করে কিন্তু সমুদ্রের জীবনের এত সমস্ত ঘটনা তার স্মৃতিকে এমনভাবে পূর্ণ করে রেখেছে যে হোসে আর্কাদিও ওসব কথা ভুলে গিয়েছে। একমাত্র রেবেকাই প্রথম থেকে প্রভাবিত হয় তার দ্বারা। সেই বিকেলে যেদিন তাকে তার শোবার ঘড়ের সামনে দিয়ে যেতে দেখে, সেদিনই তার মনে হয় যে, সাড়া বাড়ি শুনতে পায় যার আগ্নেয়গিরির মত নিঃশ্বাস, সেই আদিম পৌরুষের তুলনায় পিয়েত্র ক্রেসপি নেহায়েতই এক রোগা পটকা ফুলবাবু। তখন থেকেই রেবেকা সবসময় অজুহাত খুঁজে বেড়াত তার কাছে ভিড়বার । এক সময় হোসে আর্কাদিত্ত নির্লজ্জ মনযোগ দিয়ে তার দেহে চোখ বুলায় আর বলে, “ছোট বোন, আসলেই তুমি এক রমনী।” রেবেকা নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। আবার মাটি আর দেয়ালের চুন খাওয়া শুরু করে অন্যসব বারের মতই আগ্রহভরে, আর এতই উৎকণ্ঠা নিয়ে আঙ্গুল চুষতে শুরু করে যে তার বৃদ্ধাঙ্গুলে কড়া পরে যায়। মৃত জোঁকসমেত সবুজ রংয়ের বমি করে সে। জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে বিকারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে হোসে আর্কাদিওর ভোর বেলায় বাড়ি ফেরা পর্যন্ত সে ঘুমহীন রাত কাটায়। এক বিকেলে, সকলেই যখন দিবানিদ্রায় মগ্ন, নিজেকে সামলাতে না পেরে ঢুকে পরে তার শোবার ঘরে। সে হোসে আর্কাদিওকে পায় জাহাজ বাঁধার কেবল দিয়ে করিকাঠ থেকে ঝোলান হ্যামকে জেগে থাকা শুধু মাত্র জাঙ্গিয়া পরে শোয়া অবস্থায়। তার এই বিশাল, চোখ কপালে ওঠানোর মতো নগ্নতা, রেবেকাকে এতই মুগ্ধ করে যে সে ফিরে আসার তাড়া অনুভব করে। “ক্ষমা কর,” দুঃখ প্রকাশ করে সে। “জানতাম না যে তুমি এখানে আছ”। অন্য কেউ যেন জেগে না ওঠে তাই খুব নীচু স্বরে বলে সে, “এদিকে আয়”। রেবেকা তার বাধ্য হয়। বরফ শীতল ঘাম নিয়ে অন্ত্রের মধ্যে গিট অনুভব করতে করতে হ্যামকের পাশে দাড়ায় রেবেকা । ততক্ষণে হোসে আর্কাদিও আঙ্গুলের ডগা দিয়ে আদর করছে তার হাটুতে, পরে পায়ের পেশীতে, তারপর উরু আদর করতে করতে বিড়বিড় করে “ওরে আমার বোনটি, আমার ছোট্ট বোন।“ তার মরে যাওয়া ঠেকাতে এক অপ্রাকৃতিক চেষ্টা চালাতে হয় যখন বিস্ময়করভাবে নিয়ন্ত্রিত এক ঝড়োশক্তি তাকে কোমড় ধরে উঁচু করে ফেলে আর তিন থাবায় হরণ করে তার লজ্জা আর ছিন্নভিন্ন করে ফেলে তাকে ছোট্ট পাখির মত । সে শুধু মাত্র জন্মানোর জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানানোর সময় করে উঠতে পারে। অসহ্য যন্ত্রনার অকল্পনীয় সুখানুভবে জ্ঞান হারানোর আগেই বিশাল ভেজা তরলে খাবি খেতে থাকে আর হ্যামকটা টিস্যু পেপারের মত শুষে নেয় সেই রক্তের বিস্ফোরণ।

    তিন দিন পর পাঁচ তারিখের প্রার্থনায় বিয়ে করে ওরা। তার আগের দিন হোসে আর্কাদিও গিয়েছিল পিয়েত্র ক্রেসপির দোকানে । পিয়েত্র তখন গিটারের একটা পর্ব শেখাচ্ছে ছাত্রদের। কথা বলার জন্য হোসে আর্কাদিও তাকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যায় না। “রেবেকার সঙ্গে বিয়ে করছি আমি” বলে সে। পিয়েত্র ক্রেসপি পান্ডুর মত হয়ে পরে। সেতারটা এক ছাত্রের হাতে ধরিয়ে দিয়ে ক্লাস শেষ করে দেয়। বাদ্যযন্ত্র আর দড়ি ও স্প্রিংয়ের খেলনায় ঠাসা ঘরটায় যখন শুধুমাত্র দুজন তখন পিয়েত্র ক্রেসপি বলে,
    - “সে হচ্ছে তোমার বোন”
    - “আমার কাছে সেটার গুরুত্ব নেই” উত্তর দেয় আর্কাদিও।
    ল্যাভেন্ডার মাখা রুমাল দিয়ে কপাল মোছে পিয়েত্র ক্রিসপি।
    - “এটা প্রকৃতি বিরুদ্ধ” ব্যাখ্যা করে- “তাছাড়া, সর্বোপরি আইনবিরুদ্ধ”
    অধৈর্য হয়ে পরে হোসে আর্কাদিও যতটা না বিতর্কের কারণে, তার চেয়েও বেশী পিয়েত্র ক্রেসপিকে পান্ডুর হয়ে যেতে দেখে।
    - “প্রকৃতির উপর আমি দুবার হাগি” বলে- “আর শুধু মাত্র বলতে এসেছি যে রেবেকাকে কোন কিছুই জিজ্ঞেস করার কষ্টটা যেন তোমাকে না করতে হয়”।
    কিন্তু পিয়েত্র ক্রেসপির চোখ ভিজে ওঠায় তার পাশবিক আচরণে ভাঙ্গন ধরে।
    - “আর শোন” বলে অন্য স্বরে- “যা তোমার ভাল লাগে, তা যদি আমাদের পরিবারই হয় তাহলে আমারান্তা তো আছেই”।

    রেবেকা আর হোসে আর্কাদিও যে সম্পর্কে ভাই বোন নয়, তা রোববারের ধর্মোপদেশের সময় ফাদার নিকানোর সর্বসম্মূখে উন্মোচন করে । উরসুলা এটাকে কখনই ক্ষমা করতে পারে না, কারণ তার বিবেচনায় কাজটা হচ্ছে অসম্মানজনক, আর যখন তারা গীর্জা থেকে ফেরে, তখন নবদম্পতিকে এ বাড়িতে পুনর্বার পা ফেলতে নিষেধ করে। তার কাছে, ওরা যেন আগেই মারা গেছে। যার দরুণ গোরস্থানের সামনে ওরা এক বাড়ি ভাড়া করে, আর শুধু হোসে আর্কাদিওর হ্যামকটাই ছিল ওদের একমাত্র আসবাব । বিয়ের দিন রেবেকাকে চপ্পলের মধ্যে ঢুকে থাকা এক কাকড়া বিছে কামড় দেয়। ফলে তার জিব্বা অবশ হয়ে পড়লেও সেটা ওদের হট্টোগোলপূর্ণ মধুচন্দ্রিমায় বাধার সৃষ্টি করে না। এলাকার প্রতিবেশীরা চমকে যেত যখন এক রাতে আটবার আর দুপুরে ঘুমের সময় তিনবার জেগে উঠত ওদের শীৎকার শুনে আর অনুনয় করত, যেন ওদের বন্ধনহীন যৌনাবেগ মৃতদের শান্তি ভঙ্গ না করে।

    একমাত্র আউরেলিয়ানোই ওদের জন্য উদ্বিগ্ন হয়। ওদের কিছু আসবাব কিনে দেয় আর কিছু টাকা দেয় যতদিন পর্যন্ত না হোসে আর্কাদিও বাস্তববোধ পুনরুদ্ধার করে আর বাড়ির সংলগ্ন মালিকবিহীন জমিতে কাজ শুরু করে। অন্য দিকে আমরান্তা কখনই রেবেকার উপর ঈর্ষাপূর্ণ ঘৃণাকে জয় করতে পারে না, যদিও জীবন তাকে এনে দিয়েছে এমন এক সন্তুষ্টি যা সে স্বপ্নেও দেখেনি । উরসুলার কাছে এই লজ্জা ঢাকার উপায় ছিল সম্পূর্ণ অজানা। তার উদ্যোগেই এক ধীরস্থির আত্মমর্যাদাকে ব্যর্থতার গ্লানির উপরে আসন দিয়ে পিয়েত্র ক্রেসপি প্রতি মঙ্গলবার দুপুরের খাবারটা এ বাড়িতেই খেয়ে চলে একইভাবে। টুপিতে একইভাবে ফিতেটা ব্যবহার করে চলে পরিবারটার প্রতি কৃতজ্ঞতায়। সে উরসুলতার প্রতি দরদ প্রদর্শনের জন্য সবসময় নিয়ে যেত বিচিত্র সব উপহার: পর্তুগিজের সার্ডিন, তুর্কী গোলাপের জ্যাম আর এক বিশেষ উপলক্ষে ম্যানিলায় তৈরী চমৎকার এক শাল। আমারান্তা তাকে আপ্যায়ন করত আদরভরা যত্নশীলতায় । তার পছন্দগুলোকে আগে থেকেই আন্দাজ করত, জামার আস্তিনে সেলাই খুলে যাওয়া সুতো ছিড়ে দিত আর এক জন্মদিন উপলক্ষে তার নামের আদ্যাক্ষর এমব্রয়ডারী করে এক ডজন রুমালে । প্রতি মঙ্গলবার দুপুরের খাবার শেষে যখন সে অলিন্দে এমব্রয়ডারী করত তখন পিয়েত্র ক্রেসপি তাকে এক আনন্দঘন সঙ্গ দিত । যে মেয়েটাকে সবসময় বালিকা হিসেবে গনণ্য করেছে সে হয়ে উঠেছে তার কাছে এক বিস্ময়কর উন্মোচন । আমরান্তার মধ্যে মাধুর্যের অভাব থাকলেও জাগতিক বিষয়বস্তু সমন্ধে এক বিরল সংবেদনশীলতা ছিল আর ছিল এক গোপন কমনীয়তা । ঘটনাটা যে ঘটতে যাচ্ছে এ নিয়ে যখন কারো মনেই কোন সন্দেহ ছিল না, এমনই এক মঙ্গলবার পিয়েত্র ক্রেসপি তাকে বিয়ের প্রস্তাব করে । আমরান্তা তার কাজ বন্ধ করে না । সে অপেক্ষা করে কানের কাছে হয়ে ওঠা লাল ভাবটা ম্লান হবার আর এক ধীরস্থির ও পরিণত স্বর নিয়ে এসে বলে- “অবশ্যই ক্রেসপি” – যোগ করে- “কিন্তু যখন আমরা নিজেদের ভাল করে চিনব । তাড়াহুড়ো করা কোন কিছুতেই ভাল না” । উরসুলা বিভ্রান্ত হয়ে পরে । পিয়েত্র ক্রেসপিকে বিশেষ মর্যাদা দিলেও রেবেকার সঙ্গে তার সুদীর্ঘ সময়ে বাগদানের ঘটনা প্রচারিত হওয়ায় এ বিয়ের ব্যাপারে সে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারে না । কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটাকে সে গ্রহণ করে ভাল খারাপ চিন্তা ছাড়াই । কারণ অন্য কেউই ব্যপারটার নৈতিকতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে না । বাড়ির কর্তা আউরেলিয়ানো তার হেঁয়ালিপূর্ণ চূড়ান্ত মতামত দিয়ে আরও বিভ্রান্ত করে উরসুলাকে ।

    -“বিয়ে নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার সময় নয় এখন”
    এই মন্তব্যটির অর্থ বুঝতে উরসুলার কয়েক মাস লেগে যায় । সত্যিকার অর্থে মন্তব্যটা ছিল যথেষ্ট আন্তরিক । কারণ শুধু বিয়ে নয়, ঐ মুহূর্তে যুদ্ধ ব্যতীত অন্য কিছু চিন্তা করার সময় আউলিয়ানোর ছিল না । ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাড়িয়ে সে নিজেও ভাল করে বুঝে উঠতে পারবে না কিভাবে সুক্ষ্ন কিন্তু অলংঘনীয় ঘটনাক্রমের ধারাবাহিক বন্ধন তাকে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে । রেবেকার মৃত্যু তাকে যে রকম নাড়া দেবে বলে ভয় করছিল, বাস্তবে তা হয় নি । বরঞ্চ তৈরী হয়েছিল এক বোবা ক্রোধের, যা আস্তে আস্তে পরিণত হয়েছিল এক অসাড় নিসঙ্গতার, একই রকম হতাশার, যেমনটা সে অনুভব করেছিল নারীসঙ্গ বর্জন করে । কাজের গভীরে ডুবে গেলেও শ্বশুড়ের সঙ্গে দোমিনো খেলার অভ্যাসটা ঠিক রাখে সে । শোকাচ্ছন্ন এক বাড়িতে দুই পুরুষের রাতের আলাপ ওদের বন্ধুত্বের ভিতটা শক্ত করে তোলে ।
    -“আবার বিয়ে কর আউরেলিতো” ওকে বলত শ্বশুড়–“পছন্দমত নির্বাচন করার জন্য আমার আরও ছয়টি মেয়ে আছে।”

    সে প্রায়ই সফরে যেত আর তেমনি এক সফর থেকে ভোটের আগে ফিরে আসে দেশের রাজনৈতিক অবস্থায় উদ্বিগ্ন হয়ে । উদারপন্থীরা যুদ্ধ আরম্ভের সিদ্ধান্ত নিয়েছে । এই সময়ে উদারপন্থী আর রক্ষণশীলদের নিয়ে আউরেলিয়ানোর ধারণা খুব অস্পষ্ট থাকায় তার শ্বশুড় সুনির্দিষ্ট বিন্যাসে ওগুলোর পাঠ দিত । “উদারপন্থিরা হচ্ছে ফ্রীম্যাসন, খারাপ ধরনের লোক” বলতো সে, যারা পাদ্রীদের ফাঁসি দিতে চায় সিভিল বিবাহের আর বিবাহ বিচ্ছেদের প্রবর্তন করতে চায়, তারা বৈধ আর অবৈধ সন্তানদের সমান অধিকারে বিশ্বাসী । আর এক ফেডেরাল সিস্টেমের অধীনে দেশটাকে টুকরো টুকরো করে ভাগ করতে চায় যাতে সর্বোচ্চ কেন্দ্রীয় শাসনকর্তার হাতে ক্ষমতা থাকবে । আর অন্যদিকে রক্ষণশীলরা সরাসরি ঈশ্বরের কাছ থেকে ক্ষমতা পেয়েছে । তারা জনশৃংখলা পারিবারিক মূল্যবোধের প্রবক্তা । খ্রীষ্টধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিরোধকারী । কেন্দ্রীয় শাসনতন্ত্রে বিশ্বাসী আর তারা দেশটাকে স্বায়ত্তশাসনের অধীনে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে দিতে প্রস্তুত নয় । মানবিক মনোবৃত্তির কারণে আউরোলিয়ানো অবৈধ সন্তানদের অধিকারের ব্যাপারে উদাহরণপন্থিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয় কিন্তু কিছুতেই সে বুঝে উঠতে পারছিল না হাত দিয়ে স্পর্শ করা যায় না এমন কিছু কিভাবে যুদ্ধের মত এক চূড়ান্ত অবস্থার সৃষ্টি করতে পার । রাজনৈতিক উদ্দীপনা নেই এমন এক শহরে এক সার্জেন্টের নেতৃত্বে যে সশস্ত্র সৈন্য নিয়ে আসার মত শ্বশুড়ের নেওয়া সিদ্ধান্তকে, বাড়াবাড়ি বলে মনে হয় তার । ওরা শুধু এসেই ক্ষান্ত হয় না, তারা একুশ বছরের বেশী বয়সের পুরুষদের ভিতর রক্ষণশীল প্রার্থীদের নাম নীল রংয়ের কাগজের টুকরায় আর উদারপন্থি প্রার্থীদের নাম লাল রংয়ের কাগজের টুকরায় বিলি করার আগেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাজেয়াপ্ত করে শিকার করার অস্ত্র, মাসেতে, (বড় ধরনের ছুড়ি বা দা) এমনকি রান্না ঘরের ছুড়ি পর্যন্ত । নিজেই এক ফরমান পড়ে শোনায় যেখানে শনিবার মধ্যরাত থেকে পরবর্তী আটচল্লিশ ঘন্টা অ্যালকোহল আছে এমন পানীয় বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়, আর নিষিদ্ধ করা হয় একই পরিবারভুক্ত নয় এমন তিনজন লোকের সমাবেশ । কোন ঘটনা ছাড়াই সম্পন্ন হয় নির্বাচন । রোববার সকাল আটটা থেকে প্লাজায় সৈন্যদের পাহারায় এক কাঠের ব্যালট বাক্স রাখা হয় । আউরেলিয়ানো নিজেই যাচাই করে যেন সবাই ভোট দেয় স্বাধীনভাবেই, কারণ প্রায় সারাদিন সে শ্বশুড়ের সঙ্গে পাহাড়া দেয় যাতে করে একবারের বেশী কেউ ভোট দিতে না পারে । বিকেল চারটায় প্লাজায় ড্রাম বাজিয়ে নির্বাচিন পর্বের সমাপ্তি ঘোষণা করা হলে দন আপলিনার মসকতে ব্যালট বাক্স শীল করে একটি লেবেল বাক্সের মুখে আড়াআড়িভাবে সেটে দিয়ে তাতে স্বাক্ষর করে । সেই রাতে দন আপলিনার মসকতে যখন আউরেলিয়ানোর সঙ্গে দোমিনো খেলছিল সার্জেন্টকে আদেশ করে ভোট গোনার জন্য ব্যালটের মুখ খোলার । ব্যালট বাক্সে প্রায় যতগুলো লাল কাগজ ছিল একই রকম ছিল নীল কাগজও । কিন্ত সার্জেন্ট মাত্র দশটি লাল কাগজ রেখে বাকী লাল কাগজের বদলে সমানসংখ্যক নীল কাগজ ঢুকিয়ে ব্যালট বাক্সটাকে নতুন করে সীল করে আর পরের দিন প্রথম ঘন্টায় প্রাদেশিক রাজধানীতে নিয়ে যায় সেটা । “উদারপন্থিরা যুদ্ধে যাবে” বলে আউরোলিয়ানো। দন আপলিনার দোমিনোর গুটি থেকে মনোযোগ সরায় না । “যদি কাগজগুলো বদলের জন্য বলে থাক তাহলে বলব যে ওরা যুদ্ধে যাবে না,” বলে “এর জন্যই কিছু লাল কাগজও রেখে দেয়া হয়েছে, যাতে করে কোন প্রতিবাদ না হয়।“

    বিরুদ্ধ পক্ষের প্রতিকুলতা বুঝতে পারে আউরোলিয়ানো, “যদি আমি উদারপন্থি হতাম” বলে- “ এই কাগজগুলোর জন্যই যুদ্ধে যেতাম”। তুমি যদি উদারপন্থি হতে তাহলে আমার মেয়েজামাই হয়েও এই কাগজ বদলের ব্যপারটা দেখতে পেতে না” ।
    আসলে সারা গ্রামে অসন্তুষ্টি ছড়িয়ে পরে নির্বাচনের ফলাফলের কারণে নয়, বরঞ্চ সৈন্যরা বাজেয়াপ্ত করা অস্ত্রগুলো ফিড়িয়ে না দেয়ায় । আউরোলিয়ানোর সঙ্গে একদল মহিলা কথা বলে যাতে সে তার শ্বশুড়ের সঙ্গে কথা বলে রান্না ঘরের ছুড়িগুলো ফেরতের ব্যবস্থা করে । দন আপলিনার মসকতে কঠিন গোপনীয়তার সঙ্গে জানায় যে উদারপন্থিরা যে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল তারই প্রমাণ হিসেবে বাজেয়াপ্ত করা অস্ত্রগুলো নিয়ে যাওয়া হয়েছে । এই ভাষ্যের লজ্জাহীনতার কারণে সতর্ক হয় আউরোলিয়ানো । কোন মন্তব্যই করে না সে । কিন্তু এক রাতে যখন জেরিনালদো মার্কেস আর ম্যাগালাসকে ডিসবাল তাদের অন্য বন্ধুদের সঙ্গে ছুড়িগুলোর ব্যাপারে আলাপ করছিল । তখন তারা জিজ্ঞেস করে যে, সে উদারপন্থী না রক্ষণশীল? আউরোলিয়ানো হেঁয়ালি করে না যদি কিছু করতে হয় তাহলে উদারপন্থিই হব বলে। কারণ রক্ষণশীলরা হচ্ছে একদল ঠগ ।
     
  2. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,200
    Likes Received:
    1,586
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ------------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ১৭
    ------------------------------------

    পরদিন বন্ধুদের অনুরোধে এক মনগড়া যকৃতের ব্যাথার অজুহাতে ডাক্তার আলিরিও নোগুয়েরার সঙ্গে দেখা করতে যায় সে । এমনকি সে জানতও না মিথ্যে অজুহাত দেয়ার কারণটা । ডাক্তার আলিরিও নগুয়েরা মাকন্দোতে আসে কয়েক বছর আগে স্বাদহীন বড়ির এক বাক্স আর এক বাক্য লেখা ডাক্তারী প্রতীক (সিলমোহর) নিয়ে, যে বাক্য কেউই বিশ্বেস করত না । “এক পেরেক বের করে আরেক পেরেক” । আসলে লোকটা ছিল মেকি । এক নিরীহ ডাক্তারের চেহারার আড়ালে লুকানো ছিল এক সন্ত্রাসী যে নাকি তার পাঁচ বছর কারাবাসের ফলে গোড়ালিতে উৎকীর্ণ বেড়ির দাগ ঢেকে রাখত এক জোড়া বুট জুতো দিয়ে। প্রথম ফেডেরালপন্থি অভিযানের সময় গ্রেপ্তার হলেও কুরাসাও-এ পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় সে। এমন এক পোষাক দিয়ে ছদ্মবেশ ধারণ করে যে পোষাককে সে ঘৃণা করত সবচেয়ে বেশী : যাজকদের পোষাক । অনেক বছরের নির্বাসন শেষে সমস্ত ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে নির্বাসিতদের কাছ থেকে গরম গরম খবর শুনে উত্তেজিত হয়ে চোরাকারবারীদের এক ছোট্ট পালতোলা নৌকায় চেপে রিত্তআচায় আবির্ভূত হয় সে বিভিন্ন ছোট ছোট জার ভর্তি বড়ি নিয়ে আর নিজ হাতে জাল-করা লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নকল ডিপ্লোমা নিয়ে । মোহভঙ্গে কাঁদে সে । নির্বাসিতদের বর্ণিত উদ্দীপনা, যেটাকে ওরা তুলনা করেছিল এক বারুদের সঙ্গে, যেটা যে কোনো মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হতে পারে, তা মিইয়ে যায় এক মিথ্যে নির্বাচনের মোহের মধ্য দিয়ে । ব্যর্থতায় তিক্ত হয়ে বৃদ্ধ বয়সে একটা নিশ্চিত আশ্রয়ের খোঁজে উদ্বিগ্ন হয়ে এই ভুয়া হোমিওপ্যাথ এসে আশ্রয় নেয় মাকন্দোতে । প্লাজার পাশে খালি দোতলা বাসার ছোট এক কামরা ভাড়া নেয় সে আর সব ধরনের চিকিৎসায় ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত চিনির বড়ি নিয়ে সান্তনা পাওয়া রোগীদের দেখে কয়েক বছর কাটিয়ে দেয় সেখানে । যতদিন পর্যন্ত দন আপলিনার মসকতে নামেমাত্র কর্তৃত্ব ছিল ততদিন তার আন্দোলন করা প্রবৃত্তিগুলো ছিল ঘুমন্ত। সময়গুলো পার হচ্ছিল তার স্মৃতিচারণ করে আর হাপাঁনীর সঙ্গে যুদ্ধে । আসন্ন নির্বাচন তার জন্য নতুন করে আন্দোলনে ঢোকার সুতো স্বরূপ কাজ করে । রাজনৈতিক জ্ঞানহীন গ্রামের যুবকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে আর গোপনে আরম্ভ করে উস্কানীমূলক কাজের প্রচার-অভিযান । ব্যালট বাক্সে এত লাল কাগজের উপস্থিতি যেটাকে দন আপলিনার মসকতে তরুণদের দিবা স্বপ্ন বলে গন্য করে, সেটা ছিল আলিরিও নেগরিয়রি পরিকল্পনার অংশ: নির্বাচন যে একটা প্রহসন এই ব্যাপারটা বোঝাতে সে তার শিষ্যদের ভোট দিতে বাধ্য করে । “সন্ত্রাসই হচ্ছে একমাত্র কার্যকর পদ্ধতি”–বলত সে। আউরেলিয়ানোর অধিকাংশ বন্ধুই রক্ষনশীলদের কর্তৃত্বকে উৎখাত করার ব্যাপারে উৎসাহী থাকলেও কেউই তাকে পরিকল্পনার অংশীদার করতে সাহস করেনি । কারণ শুধুমাত্র ম্যাজিষ্ট্রেটের সঙ্গে তার নৈকটত্বের কারণেই নয় বরঞ্চ তার একাকিত্বে ভরা সব কিছু এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতার জন্যও বটে । এছাড়াও ওরা জানত যে শশুরের নির্দেশমত আউরেলিয়ানো নীলে ভোট দিয়েছে । ফলে ঘটনাচক্রে তার এই রাজনৈতিক মতামতের জন্যই বন্ধুরা কৌতূহলবশত এক কৃত্রিম ব্যথা নিরাময়ের জন্য তাকে পাঠায় ডাক্তারের কাছে। নিজেকে আবিস্কার করে সে এক মাকড়শায় আচ্ছাদিত ঝুপড়ির মধ্যে, এক ধুলোভরা ইগুয়ানার সামনে যার নিশ্বাসের সঙ্গে শিষ বের হয় । কোন কিছু প্রশ্ন করার আগেই ডাক্তার তাকে জানালার কাছে নিয়ে যায় এক চোখের ভিতরে পাপড়ি পরীক্ষা করে । “ওখানে নয়” বলে আউরেলিয়ানো, যেভাবে তার বন্ধুরা নির্দেশ দিয়েছিল। যকৃতের জায়গাটা ভিতর দিকে দাবিয়ে দিয়ে আঙুগুলের ডগা দিয়ে দেখিয়ে যোগ করে: এখানেই, যেখানে আমার ব্যথা করে আর আমাকে ঘুমুতে দেয় না । সুতরাং ডাক্তার নোবুয়েরা প্রচুর রোদের উসিলায় জানালাটা বন্ধ করে আর সহজভাবে ব্যাখ্যা করে কেন রক্ষনশীলদের খুন করা দেশ প্রেমিকদের জন্য কর্তব্য । এরপর অনেকদিন আউরেলিয়ানো শার্টের পকেটে এক ছোট্ট বোতল বহন করে । ওটাকে সে বের করত প্রতি দুই ঘন্টা পরপর। শিশিটা বের করে হাতের তালুতে তিনটি গুলি নিয়ে এক ধাক্কায় মুখের ভিতর ঢুকিয়ে দিত যাতে আস্তে আস্তে সেগুলো চলে যায় জিহবার ভিতর । হোমিওপ্যাথির উপর বিশ্বাসের কারণে দন আপলিনার মসকতে বিদ্রুপ করে ওকে কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা ঠিকই ওকে চিনতে পারে নিজের দলের একজন হিসেবে । প্রায় সকল পত্তনকারীদের ছেলেরাই দলভুক্ত হয় যদিও তাদের কেউই নিশ্চিতভাবে জানে না তাদের ষড়যন্ত্রের কারণ । যাইহোক যেদিন ডাক্তার গোপন ব্যাপারটা আউরেলিয়ানোর কাছে উন্মোচন করে সে সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্রটাই আলোয় টেনে বের করে । যদিও রক্ষনশীল দলকে ক্ষমতাচ্যুত করার আশু প্রয়োজনীয়তা সমন্ধে সে নিশ্চিত ছিল তবুও পরিকল্পনাটা ছিল রোমহর্ষক । লোকজনকে হত্যা করার ব্যাপারে ডাক্তার নোগুয়েরা ছিল এক বিশেষজ্ঞ । তার কর্মপদ্ধতি ছিল ধারাবাহিকভাবে একের পর অফিসারদের এবং তাদের পরিবারসহ বিশেষ করে শিশুদের নিকেশ করবার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে সাড়া দেশ জুড়ে রক্ষনশীলদের মূলসহ উৎপাটনের এক ওস্তাদী মার দেয়ায় । অবশ্যই তাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল দন আপলিনার মসকতে, তার স্ত্রী আর ছয় মেয়েরা । “আপনি উদারপন্থি নন, এমনকি কিছুই নন” । উত্তেজিত না হয়ে বলে আউরেলিয়ানো– “আপনি শুধুমাত্র এক কসাই ছাড়া আর কিছুই নন” । “সেক্ষেত্রে”– ডাক্তার উত্তর দেন একই রকম ঠান্ডা মাথায়– “আমাকে ছোট্ট শিশিটা ফেরত দাও, তোমার আর ওটার প্রয়োজন নেই” । শুধুমাত্র ছয়মাস পরই আউরেলিয়ানো জানতে পারে যে তাকে বাদ দেয়া হয়েছে কাজে লাগবে এমন লোকদের তালিকা থেকে, কারণ সে ছিল ভবিষ্যৎহীন এক ভাবপ্রবণ লোক, যে ছিল নিঃসঙ্গ আর নিরুদ্যম চরিত্রের । ষড়যন্ত্রটা জানিয়ে দেবে এই ভয়ে চোখে চোখে রাখে তাকে । আউরেলিয়ানো ওদের আশ্বস্ত করে যে সে একটা কথাও বলবে না, কিন্তু যে রাতে মসকতে পরিবারকে খুন করতে যাবে তখন আউরেলিয়ানো দরজায় থাকবে প্রতিরোধ করতে–এই সিদ্ধান্তটা ওদের এতই স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় যে পরিকল্পনাটা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য মুলতবি করা হয় । এই সব দিনেই উরসুলা পিয়েত্র ক্রেসপি আর আমারান্তার বিয়ের ব্যাপারে তার মতামত জানতে চেয়েছিল । আর সে উত্তর দিয়েছিল ওগুলো ভাবার সময় এখন নয় ।

    এক সপ্তাহ যাবৎ সে বহন করত এক প্রাচীন আমলের পিস্তল,আর নজর রাখতো বন্ধুদের উপর । বিকেলের দিকে কফি পান করতে যেত হোসে আর্কাদিও ও রেবেকার ওখানে, যারা তাদের ঘড় সাজানো আরম্ভ করেছে তখন । আর সন্ধ্যে সাতটা থেকে দোমিনো খেলত শশুরের সঙ্গে । দুপুরের খাবার সময় আলোচনা করত দশাসই হয়ে ওঠা কিশোর আর্কাদিওর সঙ্গে । আর তাকে পেত আসন্ন যুদ্ধের আঁচে ক্রমশই আরো উত্তেজিত অবস্থায় । স্কুলে কেবল মাত্র বোল ফুটেছে এমন শিশু থেকে শুরু করে ওর থেকেও বয়সে বড় এমন সব ছাত্র ছিল আর্কাদিওর আর তাদের গায়েও এসেছিল উদারপন্থি জ্বর । ওরা আলাপ করত ফাদার নিকানোরকে গুলি করে খুন করার, গীর্জাটাকে স্কুলে পরিবর্তন করার আর বাধাহীন মিলনে স্বীকৃতি দেয়ার। ওদের এই উত্তেজনাকে শান্ত করার চেষ্টা করে আউরেলিয়ানো । ওদেরকে পরামর্শ দেয় গোপনীয়তার আর সতর্কতার । ওর ঐ ঠান্ডা মাথার বাস্তব বুদ্ধিতে কান না দিয়ে সকলের সামনেই আর্কাদিও তাকে দুর্বল চরিত্রের লোক আখ্যা দিয়ে তিরস্কার করে । আউরেলিয়ানো অপেক্ষা করে । শেষ পর্যন্ত ডিসেম্বরের প্রথম দিকে উরসুলা কর্মশালায় উত্তেজনার ঝড় তোলে।
    -“যুদ্ধ বেঁধে গেছে”
    সত্যিকার অর্থে যুদ্ধ বেধেছে আরও তিন মাস আগে । সামরিক আইন জারি হয়েছে সাড়া দেশ জুড়ে। একমাত্র দন আপলিনার মসকতেই জেনেছিল সময়মত কিন্তু সবাইকে আশ্চর্য করে এক সেনাবাহিনী গ্রামটাকে দখল করার আগ পর্যন্ত এমনকি ব্যাপারটা তার স্ত্রীকেও জানায়নি সে। ওরা ঢুকে নিঃশব্দে ভোর হওয়ার আগে খচ্চরে টানা দুটো হাল্কা কামান নিয়ে আর স্কুলটাকে বানায় সামরিক ঘাটি । সন্ধা ছটায় কার্ফু জারি হল । তল্লাশি হল বাড়ি বাড়ি গিয়ে আর এবারেরটা হল আগেরটার চেয়েও কড়া । এমনকি এবার বাজেয়াপ্ত হল চাষবাসের যন্ত্রপাতিগুলোও। টেনে ছেচড়িয়ে বের করে আনে তারা ডাক্তার নোগুয়েরাকে বাঁধে প্লাজার এক গাছের সঙ্গে আর বিচারহীন গুলি করে মারে তাকে। ফাদার নিকানোর শূন্যে ভাসার অলৌকিকতা দেখিয়ে সামরিক কর্তৃত্বদের মন জয়ের চেষ্টা করলে এক সৈনিক রাইফেলের বাট দিয়ে তার মাথা ফাটিয়ে দেয়। উদারপন্থি উন্মাদনা নিভে যায় এক ভয়াবহ নীরবতায়। পান্ডুর, রহস্যময় আউরেলিয়ানো দোমিনো খেলে চলে তার শশুরের সঙ্গে। সে বুঝতে পারে যে বেসামরিক ও সামরিক পদমর্যাদা থাকা সত্বেও দন আপলিনার মসকতে পরিণত হয়েছে এক অালঙ্কারির কর্তৃত্বে। সামরিক বাহিনীর কাছে নিত সমস্ত সিদ্ধান্ত, যে নাকি নাগরিক শৃঙ্খলা রক্ষার খাতিরে প্রতি সকালে অসাধারণ রকমের অংকের টোল আদায় করত। তার অধীনে চারজন সৈন্য পাগলা কুকুরে কামড় দেয়া এক মহিলা তার পরিবার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বন্দুকের বাট দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলে সকলের সামনে রাস্তার উপর। সামরিক দখলের দু সপ্তাহ পর এক রোববার আউরেলিয়ানো ঢোকে হেরিনেল্দো মারকেজের বাড়ি তার স্বভাবজাত শান্তভাব নিয়ে আর চিনি ছাড়া এক কাপ কফি চায়। যখন রান্নাঘরে শুধু মাত্র দুজন তখন আউরেলিয়ানো তার গলায় আনে এক কর্তিৃত্বের স্বর যেটা কখনই কেউ জানতনা– “ছেলেগুলোকে তৈরি হতে বল,” বলে–“যুদ্ধে যাচ্ছি আমরা”। হেরিনেল্দো বিশ্বাস করে না।
    “কোন অস্ত্র দিয়ে”- জিজ্ঞেস করে।
    “ওদের অস্ত্র দিয়ে”- উত্তর দেয় আউরেলিয়ানো। এক মঙ্গলবার মধ্যরাতে আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার আজ্ঞাধীন তিরিশ বছরের কম বয়স্ক একুশজন যুবক খাবার টেবিলের ছুরি ও ধারালো লোহা দিয়ে এক অভাবনীয় কস্মাৎ হামলা চালিয়ে দখল করে সেনাশিবির, নিয়ে নেয় তাদের অস্ত্রশস্ত্র, উঠানেই গুলি করে মেরে ফেলে ক্যাপ্টেন আর সঙ্গে চারজন সৈনিককে যারা হত্যা করেছিল মহিলাকে।
    ঐ একই রাতে যখন সৈনিকদের মেরে ফেলার গুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল তখনই আউরেলিয়ানোর আত্মপ্রকাশ ঘটে সামরিক কর্তৃত্ব হিসেবে। কোনরকমে সময় পায় বিবাহিত বিদ্রোহীরা নিজেদের স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নেবার আর তারা স্ত্রীদের বলে নিজেদের ব্যবস্থা নিজেরাই যেন করে নেয়। আতঙ্কমুক্ত লোকজনের আনন্দধ্বনির মধ্য দিয়ে ভোরবেলায় ওরা চলে যায় বিদ্রোহী জেনারেল বিক্টর মেদিনার শক্তির সঙ্গে যোগ দেবার জন্য, শেষ খবর অনুযায়ী যে তখন ছিল মানাউরের পথে। যাবার আগে আউরেলিয়ানো দন আপলিনার মসকতেকে বের করে আনে এক জামাকাপড় রাখার দেয়াল আলমারি থেকে। “আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন” বলে তাকে, “নতুন সরকার সম্মানজনক কথা দিচ্ছে পারিবারিক এক নাগরিক নিরাপত্তার”। এই উঁচু বুট পরিহিত, পিঠে বন্দুক ঝোলানো লোকটাকে তার সঙ্গে রাত নটা পর্যন্ত দোমিনো খেলার মানুষটাকে মেলাতে কষ্টকর হয়ে দাড়ায় দন আপালিনো মসকতের জন্য। “এটা এক পাগলামী আউরেলিতো”–কাতর কন্ঠে বলে সে। “কোনো পাগলামীই নয়”- বলে আউরেলিয়ানো- “এটা হচ্ছে যুদ্ধ। আর আমাকে কখনই আউরেলিতো বলবেন না। আমি হচ্ছি কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া।”
     
  3. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,200
    Likes Received:
    1,586
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ------------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ১৮
    ------------------------------------

    কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া বত্রিশটি সশস্ত্র বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয় আর পরাজিত হয় সবকটিতেই। সতেরজন ভিন্ন রমনীর গর্ভে জন্ম দেয় সতেরজন পুত্র সন্তানের আর পুত্রদের মধ্যে সবচেয়ে বড়জনের পয়ত্রিশ বছর পূর্ন হবার আগে এক রাতেই একের পর এক মেরে ফেলা হয় তাদের। পালিয়ে বাঁচে প্রাণের উপর চৌদ্দটি হামলা, তেষট্টিটা অ্যামবুশ আর একটি ফায়ারিং স্কোয়াড থেকে। একটি ঘোড়াকে মেরে ফেলার পরিমান স্ট্রিকনাইন (বিষ) মিশিয়ে দেয়া কফি পান করেও বেঁচে যায় সে। প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের প্রদত্ত অর্ডার অফ মেরিট প্রত্যাখ্যান করে এক সীমান্ত হতে অন্য সীমান্ত পর্যন্ত বৈধ কর্তৃত্ব বজায় রেখে, সরকারের চোখে সবচেয়ে বিপজ্জনক লোক হিসেবে গণ্য হয়ে বিদ্রোহী বাহিনীর সেনাপ্রধানের পদ পেলেও সে কখনও তার ছবি তোলার অনুমতি দেয় না। যুদ্ধের পরে প্রস্তাবিত আমরণ পেনশন নিতে অস্বীকার করে আর বেঁচে থাকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত মাকন্দোতে নিজের কর্মশালায় সোনার ছোট ছোট মাছ বানিয়ে। যদিও সে সবসময় সম্মুখভাগে যুদ্ধ করত তবুও একমাত্র যে আঘাতটা পায়, সেটা বিশ বছরের গৃহযুদ্ধের ইতি টানানো নিরলান্দিয়ার চুক্তি স্বাক্ষরের পরে, যেটা করেছিল সে নিজের হাতেই। এক পিস্তল দিয়ে নিজের বুকে গুলি করে সে আর বুলেট বেরিয়ে যায় বেঁচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যক কোন অঙ্গের ক্ষতি না করেই। এত কিছু অর্জনের পরেও একমাত্র যা বেঁচে থাকে তা হচ্ছে মাকন্দোতে তার নামে নামকরন করা এক রাস্তা। যদিও বার্ধক্য জনিত মৃত্যুর অল্প কয়েক বছর আগে তার কথা অনুযায়ী জানা যায় যে সেই সকালে, যখন সে একুশ জন ছেলে নিয়ে রওয়ানা হয় জেনারেল বিক্তর মেদিনার বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে তখন সে এটুকুও প্রত্যাশা করে নি।
    “তোর হাতে রেখে গেলাম মাকন্দোকে” যাবার আগে এটাই ছিল আর্কাদিওকে বলা তার সব কথা- “ভাল অবস্থায়ই রেখে যাচ্ছি। চেষ্টা করিস যাতে ফিরে এসে আরও ভাল অবস্থায় পাই।”

    আর্কাদিও তার এই নির্দেশকে নিতান্তই নিজের মত করে ব্যাখ্যা করে। মেলকিয়াদেছের এক বইয়ের পাতায় দেখা ছবির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে শোভাবর্ধক বুনুনী ও মার্শালদের স্কন্ধভূষন দিয়ে এক ইউনিফরম বানায় সে। আর নিহত ক্যাপ্টেনের সোনার ঝালরবিশিষ্ট তরবারি কোমড় বন্ধনীর সঙ্গে ঝুলিয়ে কামান দুটো বসায় গাঁয়ের প্রবেশপথে। ইউনিফর্ম পরায় সাবেক ছাত্রদের আর আগুন ঝরানো ঘোষনায় খেপিয়ে তুলে অস্ত্রসহ নামিয়ে দেয় তাদের রাস্তায় যাতে করে বাইরের লোকজন বুঝতে পারে যে শহরটা দুর্ভেদ্য। ধোঁকাটা দুরকম ফল নিয়ে আসে ওদের জন্য। কারণ দশমাস যাবৎ সরকার প্লাজা আক্রমণের সাহস করে না। কিন্তু যখন করে তখন ওদের তুলনায় এতই বড় এক বাহিনী পাঠায় যে আধঘন্টার মধ্যে ধংস করে ফেলে প্রতিরোধটা। কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রথমদিন থেকেই আদেশ করার প্রতি টান দেখা যায় আর্কাদিওর ভিতরে। মাথার মধ্যে কোনো আদেশের চিন্তা খেলে গেলে দিনে চারবার করে পড়ে শোনাতো সেটা। আঠারো বছর বয়সের বেশী বয়স্ক লোকদের জন্য সামরিক বাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামূলক করা হয়, সন্ধ্যা ছটার পর রাস্তায় জীবজন্তু ঘুরে বেড়ালে সেটাকে জনসাধারনের সম্পত্তি বলে গন্য হবে বলে জানায় আর বৃদ্ধদের বাধ্য করে বাহুতে লাল ফিতে বাঁধতে। মৃত্যুদন্ডের ভয় দেখিয়ে ফাদার নিকানোরকে পাত্রীদের ঘড় থেকে বের হতে, আর কোনো রকমের উপদেশ দেওয়া নিষিদ্ধ করে। অবৈধ করা হয় উদারপন্থিদের বিজয় উৎসব ছাড়া অন্য কোনো কারণে গির্জার ঘন্টা বাজানোও। যাতে করে কারও মনে তার আদেশের গুরুত্ব নিয়ে সন্দেহ না জাগে। সে ফায়ারিং স্কোয়াডের সৈন্যদের আদেশ করে প্লাজায় এক কাকতাড়ুয়া বানিয়ে ওতে গুলি করার জন্য। প্রথম দিকে কেউ ওর আদেশের তেমন গুরুত্ব দেয় না। ওরা ভাবছিল, আসলে এরা হচ্ছে স্কুলের বাচ্চা, বড়দের খেলা খেলছে। কিন্তু এক রাতে আর্কাদিও কাতারিনোর দোকানে ঢোকার সময় ঢোলবাদক আনুষ্ঠানিক বাজনা বাজিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানালে খরিদ্দারদের মধ্যে হাসির রোল ওঠে, আর কর্তৃপক্ষের প্রতি অসম্মান দেখানোর অপরাধে আর্কাদিওর আদেশে গুলি করে মেরে ফেলা হয় তাকে। যারা এর প্রতিবাদ করে তাদের গোড়ালিতে বেড়ি পরিয়ে রুটি আর পানি দিয়ে স্কুলের এক কামরায় আটক করা হয়। “তুই এক খুনী” উরসুলা চেঁচাত, যখন নতুন কোনো বিচারের কথা তার কানে যেত- “যখন আউরেলিয়ানো জানতে পারবে তখন তোকে গুলি করে মারবে আর তাতে সকলের আগে আমিই খুশী হব।” কিন্তু এসব কিছুই বৃথা যায়। আর্কাদিও অকারণেই শাষনযন্ত্রের সমস্ত স্ক্রুগুলোকে এমনভাবে টাইট করতে থাকে যে সে হয়ে ওঠে মাকন্দোর শাষকদের মধ্যে নিষ্ঠুরতম। “এখন উপভোগ কর তফাতটা”- দন আপলিনার মসকতে এক সময় বলে। “এই হচ্ছে উদারপন্থিদের স্বর্গ।” আর্কাদিও জানতে পারে কথাটা। পাহারাদারদের সামনেই হামলা চালায় দন আপলিনারের বাড়িতে। ধ্বংস করে সমস্ত আসবাবপত্র। মেয়েদের ধরে পেটায় আর টানা-হেঁচড়ার দাগ রেখে যায় দন আপলিনার মসকতের শরীরে। যখন আর্কাদিও নিজে দাড়িয়ে ফায়ারিং স্কোয়াডকে গুলির হুকুম দিচ্ছে তখন লজ্জায় কাঁদতে কাঁদতে আর ক্রোধে গালাগালি করতে করতে হাতে পিচ্ মাখানো চাবুক নিয়ে সমস্ত গ্রাম পার হয়ে ব্যারাকের উঠানে ফেঁটে পরে উরসুলা। “গুলির হুকুম কর, দেখি তোর কত সাহস, বেজন্মা।” - চিৎকার করে। আর্কাদিওর কোনো প্রতিক্রিয়ার আগেই প্রথম চাবুক গিয়ে পরে ওর উপর। “সাহস করে দেখ, -খুনি”-চিৎকার করে-“ আর আমাকেও মেরে ফেল, নষ্টা মায়ের ছেলে- মেরে ফেল আমাকে যাতে করে এমন এক দানবকে লালন করে বড় করার লজ্জায় কাঁদার চোখ না থাকে” দয়াহীন ভাবে চাবুক মেরে তাকে, অনুসরণ করে উঠানের শেষ মাথা পর্যন্ত, যেখানে আর্কাদিও গুটিয়ে যায় এক শামুখের মত। দন আপলিনার মসকতে জ্ঞানশূন্য হয়ে আটকানো ছিল এক খুঁটির সঙ্গে যেখানে বাধা ছিল ফায়ারিং স্কোয়াডের প্রশিক্ষণের সময়ে গুলি করে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে ফেলা কাকতাড়ুয়াটা। উরসুলা ওদের উপরও রাগ ডেলে দেবে এই ভয়ে ফায়ারিং স্কোয়াডের ছেলেগুলো উধাও হয়ে যায়। কিন্তু উরসুলা ওদের দিকে ফিরেও তাকায় না। ছোঁড়া ইউনিফর্ম, ব্যাথা আর ক্রোধে গোঙানো আর্কাদিওকে রেখে দন আপলিনার মসকতের বাঁধন খুলে দেয় বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য । ব্যারাক পরিত্যাগের আগেই ব্যারাকের বেড়ির বন্দীদেরও মুক্তি দেয় সে।

    সেই সময় থেকে সেই ছিল, যে গ্রামটাকে চালাতো। রোববারের ধর্মোপাসনা আবার প্রতিষ্ঠিত হল, বাজুতে লাল ফিতে বাধার নিয়ম তুলে ফেলা হল, আর পরিহার করা হল খামখেয়ালিপূর্ণ আদেশগুলো। কিন্তু তার এই শক্তিমত্তা সত্ত্বেও খারাপ নিয়তির কারণে কাঁদত সবসময়ই । সে এতই নিঃসঙ্গ বোধ করত যে চেষ্টনাটের সঙ্গে বাঁধা সকলের ভুলে যাওয়া স্বামীর কাছে নিস্ফল সান্নিধ্য খুঁজে বেড়াত। “দেখ আমাদের কি অবস্থা হয়েছে”- স্বামীকে বলে যখন জুন মাসের বৃষ্টিপাত ছাউনিটাকে ধ্বংস করার হুমকি দিচ্ছে। “শূন্য বাড়িটা দেখ, ছেলেমেয়েরা ছড়িয়ে পরেছে সাড়া দুনিয়া জুড়ে আর আমরা দুজন আবার একা হয়ে গেছি সেই প্রথম দিককার মত।” চেতনাহীন গভীরে ডুবে থাকা হোসে আর্কাদিওর কানে এই বিলাপের কিছুই পৌঁছুতো না যে তার পাগলামীর প্রথমদিকে হঠাৎ উচ্চারিত লাতিন শব্দে নিত্য জরুরী প্রয়োজনীয় কিছু জিনিষের কথা জানাতো। সাময়িকভাবে উদ্ভ্রান্তির অবস্থায় যখন আমারান্তা খাবার নিয়ে আসত তথন তাকে জানাতো সবচেয়ে যন্ত্রনাদায়ক মনস্তাপের কথা আর পরে সুবোধ ছেলের মত তাকে সরষের পুলটিপ মাখাতে আর শোষন পাম্পের সাহায্যে পরিচর্যার সুযোগ দিত। কিন্তু উরসুলা যখন তার কাছে বিলাপ করার জন্য গিয়েছে সে তখন বাস্তবের সঙ্গে সমস্ত সংসর্গ হারিয়ে ফেলেছে। উরসুলা তাকে গোছল করাত টুলের উপর বসিয়ে দেহের এক একটা অংশ আলাদা করে ধোয়ার মাধ্যমে। “চারমাসের বেশী হল আউরেলিয়ানো যুদ্ধে গিয়েছে। আর এখনও ওর ব্যাপারে আমরা আর কিছুই জানতে পারিনি। বলত সাবান মাখানো এক ছোবা দিয়ে পিঠ ডলতে ডলতে। “হোসে আর্কাদিও ফিরে এসেছে, তোর চেয়ে লম্বা এক পুরুষ হয়ে, তার সাড়া দেহ উল্কি দিয়ে ঢাকা, কিন্তু শুধুই এসেছে বাড়ির জন্য লজ্জা বয়ে আনতে”। তার মনে হয় খারাপ সংবাদ শুনে তার স্বামী বিষন্ন বোধ করে। সুতরাং সে মিথ্যা বলে “আমার কথা বিশ্বেস করো না।” আর এগুলো বলতে বলতে কোদাল দিয়ে তুলে ফেলার জন্য স্বামীর বিষ্ঠা ছাই চাপা দেয়। “ঈশ্বর চেয়েছেন যে হোসে আর্কাদিওর আর রেবেকার বিয়ে হোক। এখন তারা খুব সুখী” এতই অকৃত্রিমতার সাথে সে এই প্রবঞ্চনাগুলো করতে থাকে যে শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজেকে এই মিথ্যের মাধ্যমে স্বান্তনা দিত। “আর্কাদিও এখন খুব নিষ্ঠাবান, আর সাহসী । তলোয়ার আর ইউনিফর্মসহ তাকে খুব সুপুরষ দেখায়।” এগুলো ছিল এক মৃতকে কথা বলার মত। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া তখন সবধরনের উৎকন্ঠার নাগালের বাইরে ছিল। কিন্তু উরসুলা অনঢ় থাকে আর তার সঙ্গে কথা বলেই চলে। তাকে এতই শাশ্বত, সবকিছু সমন্ধে এতই নিরাশক্ত মনে হত যে উরসুলা বাধন খুলে দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। সে এমনকি টুল থেকে নড়েও না। রোদ আর বৃষ্টি থেকে অরক্ষিত অবস্থায় বসে থাকে যেন দড়িগুলোর কোন প্রয়োজনই ছিল না। কারণ দৃশ্যমান যে কোনো বাধনের থেকেও এক অমোঘ কর্তৃত্ব যেন তাকে বেধে দিয়েছে চেষ্টনাট গাছের সঙ্গে। আগষ্ট মাসের দিকে শীত চিরস্থায়ী হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত উরসুলা ওকে এক খবর দিতে পারে, যেটাকে মনে হয় বিশ্বাস্য । “দেখ, সৌভাগ্য এখনও আমাদের সঙ্গে আছে” – বলে- “আমারান্তা আর পিয়ানোলার ইতালীয় বিয়ে করতে যাচ্ছে।”

    সত্যিই উরসুলার ছত্রছায়ায় পিয়েত্র ক্রেসপি আর আমারান্তার বন্ধুত্বের গভীরত্ব বেড়েছে, আর এখন সে আর সাক্ষাতের সময় পাহারার প্রয়োজন মনে করে না। এটা ছিল এক গোধুলিবেলার মিলন। ইতালীয় চলে আসত বিকেলে, বাটনহোলে এক গার্ডেনিয়া নিয়ে। আর আমারান্তা পেত্রার্কের সনেটের অনুবাদ করত। অরেগানো (এক ধরনের সুগন্ধিযুক্ত রান্নায় ব্যবহৃত পাতা) আর গোলাপের দমবন্ধ করা বারান্দায় বসে পিয়েত্র বই পড়ত, আর আমারান্তা উল বুনে চলত যুদ্ধের উল্লেখযোগ্য এবং খারাপ খবরে বিচলিত না হয়ে যতক্ষণ পর্যন্ত না মশারা বাধ্য করত বসার ঘড়ে গিয়ে আশ্রয় নিতে। আমারান্তার সংবেদনশীলতা, তার গোপন কিন্তু বাধনে জড়ানোর কোমলতা প্রেমিককে ঘিড়ে ফেলত এক অদৃশ্য মাকড়শার জাল দিয়ে আর প্রায় আক্ষরিক অর্থেই সেই জাল পাণ্ডুর আংটিবিহীন হাত দিয়ে সরিয়ে আটটার সময় বাড়ি ত্যাগ করতে হত ইতালিয়কে। ইতালি থেকে যে সব পোষ্টকার্ড পিয়েত্র ক্রেসপি পেত সেগুলি দিয়ে সে তৈরী করেছিল চমৎকার এক এ্যালবাম। ওগুলো ছিল নির্জন পাকে দয়িতাযুগলের ছবি, তীরবিদ্ধ আঁকা হৃদয় আর কবুতরের ঠোঁটে ঝোলা সোনালী ফিতে।

    “আমি ফ্লোরেন্সের এই পার্কে গিয়েছি”- পোস্টকার্ডের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বলত পিয়েত্র ক্রেসপি । “যে কেউ হাত বাড়িয়ে দিলেই পাখিরা নেমে আসে খাবার খেতে” । মাঝে মাঝে ভেনিসের এক জলরঙা ছবির সামনে স্মৃতিকাতরতা বদলে দিত কাদা আর পচা সামুদ্রিক মাছের গন্ধকে এক কোমল ফুলের সুবাসে । আমারান্তা দীর্ঘশ্বাস ফেলত, হাসত আর স্বপ্ন দেখত সুন্দর সব নরনারীর, দ্বিতীয় জন্মভুমির, যেখানে সকলেই শিশুর মত কথা বলে আর স্বপ্ন দেখত প্রাচীন শহরের যে শহরের প্রাচীন বিপুলতার মধ্যে অবশিষ্ট আছে ধংসস্তুপের মাঝে শুধুমাত্র কিছু বিড়াল । মহাসাগর পেরিয়ে রেবেকার তীব্র আবেগমথিত হাতের আদরে বিভ্রান্ত পিয়েত্র ক্রেসপি খুঁজে পায় সত্যিকার ভালবাসা । ভালবাসা নিয়ে আসে সমৃদ্ধিকে তার সঙ্গে করে । তার গুদামঘরের আয়তন ছিল প্রায় এক ব্লক আর সেটা যেন ছিল উদ্ভট উদ্ভাবনার গ্রীন হাউস । সেখানে ছিল ফ্লোরেন্সের ঘন্টা ঘরের প্রতিরূপ, যেটায় প্রতি ঘন্টায় বাজে কী-বোর্ডের ঐকতান, সরেন্টোর মিউজিক্যাল বক্স, চাইনীজ পাউডারের বাক্স যার ঢাকনা খুললেই পাঁচটি স্বরের বাজনা বেজে ওঠে । কল্পনা করা যায় এমন সব বাদ্যযন্ত্র যা প্যাঁচ দিয়ে চালানো যায়। জোগার করা যায় এমন সব যান্ত্রিক জিনিসপত্রে ভরা ছিল সেটা। ছোট ভাই ব্রুনো ক্রেসপি বসতো গুদামঘরে, কারণ গানের স্কুলটাকে দেখাশোনা করার পর সে আর সময় করে উঠতে পারত না । ওর বদৌলতেই তুর্কদের রাস্তাটা আর্কাদিওর স্বেচ্ছাচারিতা আর যুদ্ধের দূরবর্তী দুঃস্বপ্ন ভুলে গিয়ে রূপান্তরিত হয় এক চোখধাঁধানো নানা জিনিসের প্রদর্শনী আর শান্ত সুরেলা জায়গায় ।

    উরসুলা যখন রোববারের উপাসনাকে পুনর্বার আরম্ভ করে, পিয়েত্র ক্রেসপি তখন গীর্জায় দান করে জার্মানীর তৈরী এক হারমোনিয়াম । গড়ে তোলে শিশুদের দিয়ে এক কোরাসের দল, আয়োজন করে এক গ্রেগরিয়ান রেপাটরি যেটার সুর ফাদার নিকানোরের নিরস ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এনে দেয় উজ্জলতা । আমারান্তা যে এক সুখী স্ত্রী হবে এ ব্যাপারে কারোরই কোন সন্দেহ থাকে না । আবেগকে তাড়া না দিয়ে হৃদয়ের স্বাভাবিক স্রোতে যেতে যেতে ওরা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে শুধুমাত্র বিয়ের দিনটা স্থির করা বাকি থাকে । কোন বাঁধারই সম্মুখীন হয় না তারা । উরসুলা গোপনে নিজেকে দোষী ভাবত বার বার রেবেকার বিয়ে বিলম্বিত করে ওর নিয়তিকে বিগরে দেবার জন্য। আর তাই নিজের অনুশোচনাকে সে আর বাড়াতে চায় না । যুদ্ধের নিগ্রহ, আউরেলিয়ানোর অনুপস্থিতি, আর্কাদিওর বর্বরতা, হোসে আর্কাদিও আর রেবেকার বিতারন এ সবই রেমেদিওসের মৃত্যুশোককে এক গৌণ অবস্থানে সরিয়ে দেয় । বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসার সম্ভাবনায় পিয়েত্র ক্রেসপি নিজেই আভাস দেয় যে আউরেলিয়ানো হোসেকে, যার প্রতি তার পিতৃসুলভ ভালবাসা জন্মেছে, তাকে নিজের বড় সন্তানরুপে গন্য করবে । সমস্ত কিছুই আমারান্তার জীবনে এক বাধাহীন সুখের নির্দেশনা দেয় । রেবেকার চেয়ে আমারান্তা হচ্ছে একেবারেই উল্টো। সে বিয়ের ব্যাপারে কোন উৎকণ্ঠাই দেখায় না । যেরকম ধৈর্য সহকারে সে টেবিল ক্লথে রঙ ছাপাতো, করত লেসের কাজ বা এম্ব্রয়ডারী করত ময়ুরের, ঠিক একই ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করে সেই মুহূর্তের জন্য যখন পিয়েত্র ক্রেসপি তার হৃদয়ের তীব্র আবেগ আর সহ্য করতে পারবে না । সেই মুহূর্ত এল অক্টোবরের কুলুক্ষুণে বৃষ্টির সঙ্গে । পিয়েত্র ক্রেসপি কোল থেকে সেলাইয়ের ঝুড়িটা সরিয়ে দিয়ে আমারান্তার হাত নিজের হাতে নিয়ে চাপ দেয় । “এই অপেক্ষা আর সহ্য করতে পারছি না”।– ওকে বলে “আমরা আসছে মাসেই বিয়ে করছি” আমারান্তা ওর বরফশীতল হাতের স্পর্শে কেপে ওঠে না । এক পলায়নপর জন্তুর মত হাতটা সরিয়ে নেয় আর আবার যা করছিল তা আরম্ভ করে । “ছেলেমানুষি করো না ক্রেসপি” হাসে সে- “মরে গেলেও আমি তোমাকে বিয়ে করছি না”
     
  4. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,200
    Likes Received:
    1,586
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ------------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ১৯
    ------------------------------------

    পিয়েত্র ক্রেসপি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে । কাঁদে লজ্জাহীনভাবে, আঙ্গুলগুলোকে প্রায় ভেঙ্গে ফেলে হতাশায়, কিন্তু তার সিদ্ধান্তে ভাঙ্গন ধরাতে পারে না । “সময় নষ্ট করো না” এটাই ছিল আমারান্তার বলা সব কথা- “সত্যিই যদি আমাকে এতই ভালবাস তাহলে এ বাড়িতে আর পা ফেল না” । উরসুলার মনে হচ্ছিল লজ্জায় সে মরে যাবে । পিয়েত্র ক্রেসপি মিনতির ঝুড়ি খালি করে ফেলে । অপমানিতের চরম পর্যায়ে পৌঁছায় সে । পরে যার কোলে মাথা রেখে সারা বিকেল কেঁদে কাটায় সে হচ্ছে উরসুলা। উরসুলা যদি প্রাণটা বিক্রি কর হলেও তাকে সান্ত্বনা দিতে পারত তাহলে তাই করত। বৃষ্টির রাতগুলোতে তাকে দেখা যেত সিল্কের ছাতা মাথায় বাড়ির চারিদিকে ঘুরতে, আমারান্তার শোবার ঘরে জ্বলে ওঠা আলোয় আশ্চর্য হবার অপেক্ষায়। তখনকার মত এত সুন্দর পোশাক সে কখনই পরেনি । ওর রাজসিক সম্রাটের মাথা, যন্ত্রনার ভারে অর্জন করে এক নতুন ধরনের মহিমা । বিরক্ত করে আমারান্তা বান্ধবীদের, যারা আমারান্তার সঙ্গে এমব্রয়ডারি করত তাদের, যাতে করে তারা ওকে রাজি করানোর চেষ্টা করে । ব্যবসায় মনে দেয় না, সারাদিন কাটিয়ে দিত দোকানের পেছনে বসে, প্রলাপেভরা চিরকূট লিখে আমারান্তার কাছে পাঠিয়ে দিত শুকনো ফুলের পাপড়ি আর প্রজাপতির পাখা ভরে, আর আমারান্তা ওগুলো ফেরত দিত না খুলেই । ঘরবন্দি হত ঘণ্টার পর ঘন্টা গিটার বাজাতে । এক রাতে সে গান গায়। মাকন্দো জেগে ওঠে বিস্ময়াহত হয়ে, স্বর্গীয় এই গিটারের বাজনা এই পৃথিবীর হতে পারে না। আর এমন ভালবাসার কণ্ঠ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি থাকতে পারে না। তখন আমারান্তার জানালা ছাড়া গ্রামের সব জানালাতেই আলো দেখতে পায় পিয়েত্র। নভেম্বরের দু তারিখ, মৃতদের দিন। ওর ভাই গুদামঘর খোলে, আর দেখতে পায় সবগুলো বাতি রয়েছে জ্বালানো, সবগুলো মিউজিক বাক্স রয়েছে খোলা, ঘড়িগুলো বেজে চলেছে এক অন্তহীন সময়ের জানান দিয়ে, আর সেই উন্মত্ত ঐকতানের মাঝে দোকানের পিছন দিকের ডেস্কে পিয়েত্র ক্রেস্পিকে পেল ছুরি দিয়ে হাতকাটা অবস্থায়। তার দুটো হাতই বেনজএন ভরা গামলায় ডোবানো।
    উরসুলা প্রস্তাব করে বাড়িতেই শোকরাত্রি পালন করার। ধর্মীয় অনুষ্ঠানপর্ব আর পবিত্রভূমিতে লাশ দাফনের বিরোধিতা করে ফাদার নিকানোর। উরসুলা তার মুখোমুখি হয়ে মোকাবেলা করে। “কোনভাবেই না আমি, না আপনি ওকে বুঝতে পারব। লোকটা ছিল এক সন্ত”- বলে উরসুলা- “কাজেই ওকে কবর দিচ্ছি আমরা মেলকিয়াদেসের কবরের পাশে তোমার মতের বিরুদ্ধেই”। আর সেটা করে সে গ্রামের সকলের সমর্থন নিয়ে এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। আমারান্তা বিছানা ত্যাগ করে না। নিজের শোবার ঘর থেকে শুনতে পায় উরসুলার আরতি, বাড়ি ভেঙ্গে পরা মানুষের ফিশফিসানি, ভাড়াটে শবানুগামীদের আর্তনাদ আর পরে পায়ে দলিত ফুলের মাঝে এক গভীর নীরবতা। দীর্ঘদিন ধরে সন্ধ্যাবেলায় পিয়েত্র ক্রেস্পির ল্যাভেন্ডারের সুগন্ধিযুক্ত নিঃশ্বাস অনুভব করে সে, কিন্তু অপ্রকৃতিস্থতায় ডুবে না যাওয়ার জন্য শক্তি থাকে তার। উরসুলা বর্জন করে তাকে। যে বিকেলে রান্নাঘরে ঢুকে কয়লার আগুনে হাত ঢুকিয়ে অপেক্ষা করে যতক্ষণ পর্যন্ত না ক্রমশই প্রচণ্ড ব্যথা পেতে পেতে আর কোনো ব্যাথা অনুভব করে না বরঞ্চ পায় নিজের হাতের পোড়া গন্ধ, উরসুলা এমনকি সেদিনও মুখ তুলে তাকায় না ওর দিকে। সেটা ছিল ওর অনুতাপ নিরাময়ের এক নির্বোধ প্রচেষ্টা। এর পরে অনেকদিন পর্যন্ত এক হাত গামলায় ভর্তি ডিমের সাদা অংশে ডুবিয়ে বাড়িময় ঘুরে বেড়ায়। আর যখন পোড়া ক্ষত সেরে ওঠে, মনে হয় যেন ডিমের সাদা অংশ তার হৃদয়ের আলসারটাকেও সাড়িয়ে তুলেছে। এই দুঃখজনক ঘটনা একমাত্র যে বাহ্যিক চিহ্ন রেখে যায় তা হচ্ছে, পুড়ে যাওয়া হাতটার উপরের কালো ব্যান্ডেজ যেটাকে সে আমৃত্যু পরে থাকবে।

    আর্কাদিও দেখায় উদারতার এক দুর্লভ দৃষ্টান্ত। পিয়েত্র ক্রেস্পির মৃত্যুতে সরকারি শোকদিবশ ঘোষণা করে। উরসুলার কাছে এটাকে মনে হয় পথহারা মেষশাবকের ঘড়ে ফেরার মত ব্যাপার। কিন্তু সে ভুল করে। আর্কাদিওকে হারিয়ে ফেলেছে যেদিন সে সামরিক পোশাক পড়েছে সেদিন নয়, বরঞ্চ চিরদিনই সে পথ হারানো ছিল। রেবেকাকে যেমন মানুষ করেছে ভেবেছিল তেমনই করেছে আর্কাদিওকেও, অন্যান্য ছেলেমেয়েদের চেয়ে কম সুবিধে দিয়ে বা বৈষম্য সৃষ্টি করে নয়। কিন্তু অনিদ্রা রোগের সময়, উরসুলার পরহিতকারিতার আতিশয্যের সময়, হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার বিকারের সময়, আউরেলিয়ানো যখন সবকিছুই গোপন রাখত, আর যখন রেবেকা আর আমারান্তার মধ্যে ছিল মরণপণ প্রতিদ্বন্দিতা, আর্কাদিও তখন ছিল এক নিঃসঙ্গ ভীত শিশু। আউরেলিয়ানো ওকে লিখতে আর পড়তে শিখিয়েছে নিজের রক্তের কেউ মনে করে নয়, বরঞ্চ সে যেমনটি শেখাত অজ্ঞাত অন্য কাউকেও। ওকে জামাকাপড় উপহার দিত যাতে ভিসিতাছিওন ছোট করে দেয় যখন সেগুলোকে ফেলে দেবার সময় হয়েছে। বড় সাইজের জুতো নিয়ে, তালি দেয়া পান্তালুন নিয়ে আর মেয়েদের মত নিতম্ব নিয়ে আর্কাদিও সবসময়ই ভুগতো। কারও সাথেই ভালভাবে ভাব বিনিময় করতে পারে নি সে, যেমনটি পেরেছিল ভিছিতাসিওন ও কাতাউরের সঙ্গে ওদের নিজস্ব ভাষায়। একমাত্র মেলকিয়াদেসই সত্যিকার অর্থে তার ভার নিয়ে আর্কাদিওকে তার দুর্বোধ্য লেখা শুনতে বাধ্য করত আর দাগেরটাইপ শিল্পের ব্যাপারে জ্ঞানদান করত। কেউ ভাবতেও পারবে না মেলকিয়াদেসের মৃত্যুতে সে গোপনে কত কেঁদেছে, আর মরীয়া হয়ে ওর অকেজো কাগজপত্র পড়ে তাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছে। স্কুলে সকলে তার প্রতি মনোযোগ দিত, তাকে সম্মান করত। আর পরে মহিমাময় উনিফর্ম আর তার কঠোর আদেশগুলো তাকে এনে দেয় ক্ষমতা। আর এগুলোই তাকে তার পুরাতন তিক্ততা থেকে মুক্তি দেয় । এক রাতে কাতাউরের দোকানে একলোক দুঃসাহস করে বলে, “যে পদবী তুমি ব্যবহার করছ তার যোগ্য তুমি নও”। সবাই যার জন্য অপেক্ষা করছিল তা হলো না । লোকটাকে গুলি করার আদেশ দেয় না আর্কাদিও । বরঞ্চ সে বলে “ এটাই হচ্ছে সম্মানকর” – বলে “ যে আমি বুয়েন্দিয়া নই” ।

    যারা ওর জন্মের গুপ্ত রহস্য জানত তারা ভাবে যে এই উত্তরের অর্থ হচ্ছে সে ব্যাপারটা সম্বন্ধে অবগত কিন্তু আসলে সে কখনোই তা জানতে পারেনি । ওর মা পিলার তেরনেরা দাগেরটাইপের ঘরে ওর রক্তে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল, যেটা ছিল এক অপ্রতিরোধ্য আচ্ছন্নতা। যেমনটি হয়েছিল প্রথমে হোসে আর্কাদিওর মধ্যে, আর পড়ে আউরেলিয়ানোতে । যদিও সে তার লাবণ্য আর হাসির জৌলুশ হারিয়ে ফেলেছিল, তবুও আর্কাদিও খুঁজে বেড়াত আর পেয়েও যেত তার ধোঁয়ার গন্ধ । যুদ্ধের কিছুদিন পুর্বে এক দুপুরে পিলার তেরনেরা তার ছোট ছেলেকে খুঁজতে স্কুলে আসে বরাবরের চেয়ে একটু দেরি করে। আর্কাদিও ওর জন্য অপেক্ষা করছিলো সিয়েস্তার (দিবানিদ্রা) ঘরটাতে, যে ঘরটাতে পরে লোকজনের পায়ে বেড়ি পরিয়েছিল সে । যখন বাচ্চাটা উঠানে খেলছিল উৎকণ্ঠার সাথে হ্যামকে অপেক্ষা করছিল আর্কাদিও । জানত যে পিলার তেরনেরাকে ওখান দিয়েই যেতে হবে । আসে পিলার, আর্কাদিও তার হাতের কব্জি ধরে আর টেনে তুলতে চেষ্টা করে হ্যামকে । “পারব না, পারব না” আতংকের সাথে বলে পিলার তেরনেরা । “তুই চিন্তাও করতে পারবি না, তোকে আমি খুশি করতে পারলে কতো ভাল লাগতো, কিন্তু ঈশ্বর সাক্ষী আমি তা পারবো না । আর্কাদিও তাকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া প্রচন্ড শক্তি দিয়ে কোমড় ধরে, আর আর্কাদিওর মনে হয় পৃথিবীটা উধাও হয়ে যাচ্ছে ওর গায়ের ত্বকের স্পর্শে । “সতীপনা দেখাসনে” বলে- “সবাইতো জানে তুই বেশ্যা” । পিলার তেরনেরা ওর জঘন্য নিয়তির ফলে, এসে ফেলা বমি কোনভাবে ঠেকায় । “বাচ্চারা জেনে যাবে” ফিসিফিসিয়ে বলে “তার চেয়ে ভাল হয় যদি আজ রাতে দরজার হুড়কোটা আলগা করে রাখিস” । সেই রাতে জ্বরগ্রস্থ রোগীর মত কাঁপতে কাঁপতে হ্যামকে অপেক্ষা করে আর্কাদিও । অপেক্ষা করে নিদ্রাহীন, অন্তহীন ভোররাতের কামোজ্জিত ঝিঝি পোকার ডাক শুনতে শুনতে, অপেক্ষা করে কাদাখোঁচা পাখিগুলোর অবিশ্রান্ত প্রহর শুনতে শুনতে আর প্রতি মুহুর্তেই আরও নিশ্চিত হয় যে তাকে ঠকানো হয়েছে । এই সময় যখন উৎকন্ঠা পচে গিয়ে ক্রোধে রূপ নিচ্ছে, দরজাটা খুলে যায় । কয়েক মাস পর ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়িয়ে আর্কাদিওর মনে পড়ে যায় ক্লাশরুমে হারিয়ে ফেলা পদক্ষেপ গুলোর কথা, বেঞ্চের সঙ্গে হোঁচট খাওয়ার কথা, আর শেষ পর্যন্ত ঘরের অন্ধকারে এবং শরীরের ঘনত্বের কথা আর এক বাতাসের চাবুকের কথা যে বাতাস পাম্প করা হয়েছে তার নয় এমন হৃদপিন্ড থেকে । হাতটা বাড়িয়ে দেয় সে আর নাগাল পায় একই আঙ্গুলে দুটো আংটি পরা এক হাতের । যে হাতটা আরেকটু হলেই অন্ধকারে ডুবে মরতে যাচ্ছিল । অনুভব করে শিরার গঠন প্রকৃতি, দুর্ভাগ্যভরা নাড়ির গতি, আর অনুভব করে ভেজা এক তালু যে তালুর জীবন রেখাটাকে বুড়ো আঙ্গুলে গোড়া থেকেই কেটে দিয়েছে মৃত্যুর থাবা । তখন বুঝতে পারে এ সে নয়, যার জন্য সে অপেক্ষা করছে । কারন এর গায়ে ধোঁয়ার গন্ধ নেই, আছে ফুলের মত গন্ধ ভরা চুলের ক্রীমের সুবাস । এর বুক দুটো ফোলানো, আর বুকের বোঁটা দুটো পুরুষদের মত, অন্ধের চোখের মত ভিতর দিকে দাবানো, পাথরের মত গোলাকার যোনীর মেয়েটা থেকে বেরুচ্ছিল অনাভঙ্গতার বিশৃঙ্খল উদ্দীপিত পেলবতা । মেয়েটা কুমারী ছিল আর তার নাম ছিল বিশ্বাসের অযোগ্য- সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদ । পিলার তেরনেরা ওকে দিয়েছে সারা জীবনের সঞ্চয়ের অর্ধেকটা- পঞ্চাশ পেসো । যা সে করছে এখন, এই কাজটা করার জন্য । আর্কাদিও ওকে বহুবার দেখেছে তার বাবার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকানে সাহায্য করতে কিন্তু কখনই ভাল করে তাকায়নি কারন সব সময়ে অদৃশ্য থেকে উপযুক্ত সময়ে উপস্থিত হবার এক বিরল গুণ ছিল ওর মধ্যে । কিন্তু সেই দিন থেকে মেয়েটা আর্কাদিওর বগলতলার লোমের মধ্যে বিড়ালের মত গুটি পাকিয়ে রইল । পিলার তেরনেরা ওর বাবা- মাকে তার সঞ্চয়ের বাকি অর্ধেক দিয়ে দেয়ায় তাদের মত নিয়ে মেয়েটা সিয়েস্তার সময়ে স্কুলে যেত, আরও পরে যখন সরকারী বাহিনী স্কুলটাকে তাদের প্রয়োজনে খালি করে ফেলে তখন তারা মিলিত হতো চর্বিভরা ক্যানের বা ভুট্টার বস্তার মাঝের খালি জায়গায়, দোকানটার পিছনে । যখন আর্কাদিওকে সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃত্ব বলে ঘোষণা করা হয় ঐ সময়ের দিকে তাদের এক মেয়ে জন্মায় ।

    আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে ব্যাপারটা জানতো শুধু হোসে আর্কাদিও আর রেবেকা । আর্কাদিও ওদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রাখত আত্মীয়তার কারণে নয় বরঞ্চ দুস্কর্মে পরস্পরের যোগসাজসের কারণে । ততদিনে হোসে আর্কাদিওর ঘাড় বাকিয়ে দিয়েছে সংসারের জোয়াল । রেবেকার দৃঢ় চরিত্র, তার জঠরের সর্বগ্রাসী ক্ষুধা, তার প্রচন্ড উচ্চাশা, শুষে ফেলে তার স্বামীর অসাধারণ শক্তি, ফলে অলস মেয়ে পাগললোকটা পরিণত হয়েছে এক প্রকান্ড কর্মী জন্তুতে । পরিষ্কার এবং সাজানো এক বাড়ি ছিল ওদের । ভোরবেলা রেবেকা হাট করে খুলে দিত দরজা জানালাগুলো আর গোরস্থানের কবর থেকে আসা বাতাস জানালা দিয়ে ঢুকে উঠানের দরজা দিয়ে বের হয়ে যেত। আর চুনকাম করা দেয়াল ও আসবাবগুলোকে তামাটে করে দিত মৃতদের সোরা । তার মাটির খিদে, বাবা মায়ের হাতের ক্লক ক্লক শব্দ; পিয়েত্র ক্রেসপির নিষ্ক্রিয়তার সামনে তার রক্তের উন্মাদনা– এসবই ঠাই নিয়েছে স্মৃতির চিলেকোঠায় । যুদ্ধের আশংকা দূরে রেখে সারাদিন এমব্রয়ডারি করত জানালার পাশে বসে যতক্ষণ না আলমারীর সিরামিক পটগুলো কাঁপতে শুরু করত, আর সে উঠে পরতো খাবার গরম করতে, কৃশ শিকারী কুকুরগুলো হাজির হবার অনেক আগে । তারপর হাজির হতো নোনলা বন্দুক হাতে, মাঝে মাঝে কাঁধে হরিণ ঝুলিয়ে আর প্রায় সবসময়ই দড়িতে ঝোলানো খরগোস আর বুনোহাঁসসহ লম্বা মোজা আর নাল লাগানো বুটপরা মানুষটা । একবার শাসনামলের গোড়ার দিকে আর্কাদিও অসময়ে গিয়ে উপস্থিত হয় ওদের বাড়িতে । বিয়ে করে বাড়ি ত্যাগের পর আর্কাদিওর আর ওদের মধ্যে দেখা হয়নি । কিন্তু ওদের কাছে আর্কাদিওকে এতই আপন আর আদরের বলে মনে হয় যে তাকে ওরা একসাথে খাবারের আমন্ত্রণ জানায় । যখন ওরা কফি নিয়ে বসে একমাত্র তখনই আর্কাদিও তার আগমনের কারণটা জানায়; হোসের বিরুদ্ধে এক অভিযোগ তার কাছে এসেছে । অভিযোগটা হচ্ছে সে নিজের জমি চাষ করতে করতে বলদগুলোর সাহায্যে সোজা প্রতিবেশির বেড়া ভেঙ্গে সবচেয়ে ভাল জমিগুলো জবরদখল করে নিয়েছে । আর যেসব জমির উপর তার কোনো উৎসাহ নেই তাদের মালিকদের সম্পত্তি থেকে বিতাড়ন করেনি । তাদের উপর এক চাঁদা ধরা হয়েছে আর প্রতি শনিবার শিকারী কুকুর আর দোনলা শটগান নিয়ে সে সেই চাঁদা আদায় করে । হোসে আর্কাদিও অস্বীকার করে না। কারণ দেখায় যে- মাকন্দো পত্তনের সময়ে যে সমস্ত জমিগুলো আসলে তার পরিবারের সদস্যদের প্রাপ্য ছিল সেগুলো অন্যদের দিয়ে দেয় বিধায় হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া তখন থেকেই পাগল ছিল আর সেই কারণেই হোসে আর্কাদিওর জমিগুলোর উপর অধিকার আছে । ওটা ছিল এক অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক কারণ আর্কাদিও সুবিচার করতে আসেনি । একটা রেজিস্ট্রি অফিস স্থাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করে সে যাতে করে হোসে আর্কাদিও দখল করা জমিগুলোর দলিল বৈধ করে নেয় আর খাজনা আদায়ের ভার অর্পন করে স্থানীয় সরকারে উপর । ওরা একমত হয় এ ব্যাপারে । কয়েক বছর পর যখন কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া দলিলগুলোর স্বত্ব পরীক্ষা করে দেখতে পায় যে হোসে আর্কাদিওর বাড়ির উঠান থেকে দিগন্ত পর্যন্ত সব জমি তার নামে রেজিস্ট্রি করা আর এগার মাস ধরে আর্কাদিও শুধুমাত্র খাজনার টাকাই নেয়নি বরঞ্চ গ্রামের লোকদের কাছ থেকে আর্কাদিওর মালিকানাধীন গোরস্থানে মৃতদের কবর দেবার জন্য খাজনা আদায় করে আত্মসাৎও করেছে ।

    জনগনের দলিল সম্পর্কিত ব্যাপারগুলো জানতে উরসুলার দেরি হয় কয়েক মাস কারণ ওর ভোগান্তি যাতে না বাড়ে তার জন্য সবাই এসব তার থেকে লুকিয়ে রাখত । উরসুলা সন্দেহ করতে শুরু করে । স্বামীর মুখে তোতুমো (লাউয়ের আকৃতির এক ধরনের ফল)-র সিরাপ ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে করতে কৃত্রিম অহংকারের সাথে বলে “আর্কাদিও একটা বাড়ি বানাচ্ছে” কিন্তু নিজের অজান্তেই দীর্ঘঃশ্বাসের সঙ্গে যোগ করে: “কিন্তু জানি না কেন যেন এসব কিছুর মধ্যেই বদ গন্ধ পাচ্ছি আমি” । পড়ে যখন জানতে পারে যে আর্কাদিও শুধুমাত্র বাড়িই শেষ করেনি সে ভেনিসিও আসবাবপত্রেরও অর্ডার করেছে তখন সে সন্দেহমুক্ত হয় যে আর্কাদিও জনগনের অর্থ খরচ করেছে । “তুই আমাদের পদবীর কলংক”, মিসার (গীর্জার ধর্মোপদেশ) পরে এক রোববারে চীৎকার করে উরসুলা, যখন দেখে আর্কাদিও নতুন বাড়িতে তার অফিসারদের সঙ্গে তাস খেলছে । আর্কাদিও মনোযোগ দেয় না তার দিকে । একমাত্র তখনই উরসুলা জানতে পারে যে তাদের ছয় মাস বয়সী এক মেয়ে আছে আর সে বিয়ে ছাড়াই বাস করছে, সান্ত মারিয়া দে সোলেদাদের সঙ্গে যে নাকি আবার পোয়াতি । যেখানেই থাকুক না কেন আউরেলিয়ানোকে চিঠি লিখে বর্তমান অবস্থার সব লিখে জানানোর সিদ্ধান্ত নেয় উরসুলা । কিন্তু দ্রুত ঘটে যাওয়া তখনকার ঘটনাগুলো শুধুমাত্র তার এই পরিকল্পনায় বাধ সাধে তাই-ই নয়, বরঞ্চ পরে এই কথা ভাবার জন্য অনুতপ্ত হয় । যুদ্ধ নামক যে শব্দটা তখন পর্যন্ত বোঝাতো একটা দূরবর্তী অবস্থার পরিস্থিতিকে আর সেটাই হয়ে উঠল এক নাটকীয় বাস্তবতা । ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ঝাড়ুবোঝাই এক গাধার পিঠে চড়ে হাজির হয় এক পান্ডুর চেহারার বৃদ্ধা । তার চেহারা এতই নিরীহদর্শন ছিল যে গ্রাম পাহারার দায়িত্বশীল সেনারা জলাভূমির গ্রামগুলো থেকে আসা যে কোনো ফেরিওয়ালাদের একজন মনে করে কিছু জিজ্ঞেস না করেই ঢুকতে দেয় তাকে । সোজা সৈন্য শিবিরে হাজির হয় সে । আর্কাদিও তাকে অভ্যর্থনা জানায় ক্লাশরুমে যেটা এখন পরিণত হয়েছে এক সৈন্যশিবিরে। যেখানে অংটা থেকে ঝুলছে গুটানো হ্যামক, কোনায় মেঝেতে স্তুপ করা আছে মাদুর, রাইফেল,কারাবাইন এমনকি শিকারের শটগানও । পরিচয় দেবার আগে বৃদ্ধা এক সামরিক কায়দায় স্যালুট দিয়ে বলে:- “আমি কর্নেল গ্রেগরিও স্টীভেনসন” ।
     
  5. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,200
    Likes Received:
    1,586
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ------------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ২০
    ------------------------------------
    খারাপ খবর নিয়ে এসছে সে। তার কথানুযায়ী উদারপন্থিদের শেষ প্রতিরোধগুলো ধসে পরছে। রিওআচার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যুদ্ধরত পিছু হঠতে থাকা কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার কাছ থেকে আর্কাদিওর সঙ্গে কথা বলার মিশন নিয়ে এসেছে সে। “কোন প্রতিরোধ ছাড়াই উদারপন্থিদের জানমালের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে”, এই শর্তে রক্ষনশীলদের হাতে প্লাজা ছেড়ে দিতে হবে। পলাতকা দাদীর মত চেহারার বার্তাবাহককে আর্কাদিও করুণা মাখানো দৃষ্টি দিয়ে পরখ করে।
    “তুমি নিশ্চয়ই লিখিত কিছু এনেছ”- বলে।
    “অবশ্যই”- উত্তর দেয় “কিছুই লিখিত আনিনি।– এটা খুবই সহজবোধ্য যে এখনকার বিপজ্জনক অবস্থার কারণে কোনো প্রমাণই বহন করা সম্ভব নয়”।
    কথা বলতে বলতে অন্তর্বাসের ভিতর থেকে সোনার এক ছোট্ট মাছ বের করে টেবিলের উপর রাখে। “মনে হয় এটাই প্রমাণের জন্য যথেষ্ট”-বলে। আর্কাদিও বুঝতে পারে এটা হচ্ছে কর্ণেল আউরোলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার বানানো সোনার মাছগুলোর একটা। কিন্তু কেউ একজন যুদ্ধের আগেই মাছটা কিনে থাকতে পারে অথবা চুরি করতে পারে আর সেজন্য প্রমাণ হিসেবে এটা গ্রহণযোগ্য নয়। নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে বার্তাবাহক যুদ্ধের গোপন কথা ফাঁস করার চুড়ান্তে পৌঁছায়। জানায় যে কুরাসাও থেকে সমস্ত নির্বাসিতদের রিক্রুট করে যথেষ্ট পরিমাণে অস্ত্র আর রসদ কিনে বছরের শেষ দিকে এক আক্রমণের মিশন দিয়ে যাচ্ছে সে। এই পরিকল্পনার উপর আস্থা রেখেই কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুযেন্দিয়া এখন লোকবল নষ্ট করতে চাইছে না। কিন্তু আর্কাদিও অটল থাকে। তার পরিচয়ের প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত বার্তাবাহককে বন্দী করে আর প্লাজা প্রতিরোধের আমৃত্যু সিদ্ধান্ত নেয়। বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয় না তাকে। উদারপন্থিদের পরাজয়ের সংবাদ ক্রমশই আরও দৃঢ় হতে থাকে। মার্চের শেষের দিকে এক অকাল বৃষ্টির মধ্যে ভোরের কিছু আগে, সপ্তাহগুলোর উৎকণ্ঠায় ভরা শান্ত অবস্থাটা হঠাৎ করেই ভেঙে পড়ে এক আনাকাঙিক্ষত রননিনাদে আর তার পশ্চাৎধাবন করে এক কামানের গোলা যা ভেঙে দেয় গির্জার চুঁড়াটা । সত্যিকার অর্থে আর্কাদিওর প্রতিরোধের ইচ্ছেটা ছিল এক পাগলামী। অপ্রতুল অস্ত্রসহ তার ছিল সাকুল্যে পঞ্চাশজন লোক,যাদের একেকজনের কাছে বিশটির বেশী কার্তুজ ছিল না। কিন্তু ঐসব প্রাক্তন ছাত্ররা তার উত্তেজনাকর বক্তৃতায় উত্তেজিত হয়ে এক নিশ্চিত হেরে যাওয়া লক্ষের উদ্দেশ্যে প্রাণ বলী দেবার সংকল্প নেয়। বুটের ঘনঘন আওয়াজ, বৈপরীত্যে ভরা আদেশ, মাটি কাপানো কামানের গোলা, লক্ষহীন গোলাগুলি আর উদ্দেশ্যবিহীন রনশিঙ্গার আওয়াজের মধ্যে তথাকথিত কর্ণেল স্টিভেনসান আর্কাদিওর সঙ্গে কথা বলতে সক্ষম হয়। “এভাবে পায়ে বেড়ীবাঁধা আর মেয়ে মানুষের কাপড় পড়া অবস্থায় অপমানকর মৃত্যুর হাত থেকে মুক্তি দাও”- বলে সে - “মরতেই যদি হয় লড়াই করে মরব”। আর আর্কাদিওকে রাজি করাতে সক্ষম হয়। আর্কাদিও আদেশ দেয় ওকে বিশটি কার্তুজসহ একটি অস্ত্র আর পাঁচজন লোক দিতে, যাতে করে সে ঘাঁটিটা প্রতিরোধ করতে পারে আর যাতে করে আর্কাদিও চলে যেতে পারে তার নিজস্ব আদেশপ্রদানকারীর অবস্থানে, সমরভাগের সামনের শ্রেণীতে। জলাভূমির রাস্তাটা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না সে। ততক্ষণে ব্যারিকেডগুলো গুড়িয়ে গেছে, আর প্রতিরোধকারীরা অরক্ষিত অবস্থায় রাস্তার উপর যুদ্ধ করছে। যতক্ষন পর্যন্ত গুলি আছে ততক্ষন গুলি করে, পরে পিস্তল দিয়ে রাইফেলের বিরুদ্ধে,আর সর্বশেষে হাতাহাতি করে। এই অত্যাসন্ন পরাজয়ের মধ্যে কিছু কিছু মহিলা হাতে লাঠি আর রান্নার ছুড়ি নিয়ে রাস্তায় নামে। সেই বিশৃঙ্খলার মাঝে রাতপোশাক গায়ে, হোসে আর্কাদিও বুয়োন্দিযার পুরোনো পিস্তল হাতে উন্মাদিনীর মতো তাকে খুঁজতে থাকা আমারান্তাকে দেখতে পায় আর্কাদিও। হাতাহাতির সময় অস্ত্র খোঁয়া যাওয়ায় এক অফিসারের হাতে নিজের রাইফেলটা ধরিয়ে দিয়ে আমারান্তাসহ ঢুকে পরে পাশ্ববর্তী গলির মধ্যে, আমারান্তাকে বাড়ি পৌঁছে দেবার জন্য। প্রতিবেশীর বাড়ির সামনের দেয়ালে কামান দিয়ে করা গর্তের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করেই দরজায় অপেক্ষা করছিল উরসুলা। বৃষ্টি ধরে আসছিল কিন্তু রাস্তাগুলো ছিল গলা সাবানের মত পিচ্ছিল, ভেজা আর অন্ধকারের মাঝে দুরত্বটা আন্দাজ করে নিতে হত। আমারান্তাকে উরসুলার কাছে রেখে কোনা থেকে গুলি চালিয়ে যাওয়া দুই সৈনিকের মোকাবেলার চেষ্টা করে আর্কাদিও। কিন্তু অনেক বছর পোশাকের আলমারিতে পড়ে থাকা প্রাচীন পিস্তল কাজ করে না। নিজের শরীর দিয়ে আর্কাদি্ওকে আড়াল করে তাকে বাড়িতে টানার চেষ্টা করে উরসুলা,-“ঈশ্বরের দোহাই ভেতরে আয়, চিৎকার পাগলামি অনেক হয়েছে।”
    সৈণ্যরা অস্ত্র তাক করে ওদের দিকে।
    “লোকটাকে ছেড়ে দিন ম্যাডাম” এক সৈন্য চিৎকার করে “নইলে কিন্তু আমরা দায়ী হব না।” আর্কাদিও উরসুলাকে বাড়িতে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজেকে সমর্পন করে। কিছুক্ষণ পর গোলাগুলি থেমে যায় আর ঘন্টা বাজতে শুরু করে। আধঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে সমস্ত প্রতিরোধ ধ্বসে পরে। আর্কাদিওর লোকদের মধ্যে একজনও বেঁচে থাকতে পারল না, কিন্তু মৃত্যুর আগে নিয়ে গেল তিনশত সৈন্যকে ওদের সঙ্গে করে। শেষ প্রতিরোধটা ছিল সেনাছাউনি। আক্রান্ত হবার আগে তথাকথিত কর্ণেল গ্রেগরীয় স্টীভেনসন বন্দীদের মুক্ত করে আদেশ দেয় রাস্তায় বেরিয়ে যুদ্ধ করতে। অসাধারণ গতি আর বিভিন্ন জানালা দিয়ে ছোঁড়া বিশটা কার্তুজের নিখুঁত টিপের জন্য মনে হচ্ছিল সেনা ছাউনিটা খুব ভালভাবে সুরক্ষিত আর ফলে আক্রমনকারীরা পুড়িয়ে দেয় সেটা কামানের গোলা ছুঁড়ে। যে ক্যাপ্টেন দায়িত্বে ছিল সে ধ্বংসস্তুপটার মধ্যে জাঙ্গিঁয়াপরা বাহু থেকে বিছিন্ন হওয়া এক হাতে গুলিহীন রাইফেল ধরা, মৃত মাত্র একজন লোক দেখে অবাক হয়ে যায়। তার মাথায় ছিল খোপা করে বাধা, চিরুনি গোজা মেয়েদের চুল, আর গলায় ছিল সোনার ছোট্ট মাছের একটা হার। মুখ দেখার জন্য বুটের ডগা দিয়ে শরীরটা উল্টাতে ক্যাপ্টেন চলৎশক্তিহীন হয়ে পরে। “খাইছে”-অবাক কণ্ঠে বলে, অন্যান্য অফিসাররা এগিয়ে আসে দেখতে। “দেখ কোথায় নাজেল হতে এসেছে লোকটা”- ক্যাপ্টেন ওদেরকে বলে-” এ হচ্ছে গ্রেগরীয় স্টীভেনসন”

    ভোরবেলা, এক সংক্ষিপ্ত কোর্টমার্শালের পর সমাধিস্থলের দেয়ালে দাড় করিয়ে গুলি করা হয় আর্কাদিওকে। জীবনের শেষ দুই ঘণ্টায় সে বুঝতে পারে না কি করে শৈশব থেকে জ্বালিয়ে মারা ভয়টা যেন উধাও হয়ে গেছে। বোধশূণ্য, এমনকি তার সাম্প্রতিক সাহসিকতার জন্য উদ্বেগহীনভাবে সে শুনলো তার প্রতি আনিত অশেষ অভিযোগগুলো। সে ভাবছিল উরসুলার কথা, এই সময়ে চেষ্টনাটের নিচে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার সঙ্গে তার চা খাবার কথা। ভাবছিল তার আট মাসের ছোট্ট মেয়েটার কথা,যার এখনও নাম নেই, আর সেই সন্তানটার কথা যে আগষ্ট মাসে জন্মাবে। ভাবছিল সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদের কথা যাকে গত রাতে দেখেছিল শনিবার দুপুরে খাবার জন্য হরিণের মাংসে লবন মাখাতে। যার হাটু পর্যন্ত নেমে আসা চুলগুলো আর মেকী মনে হওয়া চোখের পাপড়িগুলোর জন্য শূন্যতা বোধ করবে সে। ভাবছিল আবেগহীনভাবে জীবনের নির্মম হিসেব-নিকেশের সময় তার লোকজনদের কথা,আর বুঝতে শুরু করে: যাদেরকে সে ঘৃনা করে ভেবেছিল, বাস্তবে কি ভালই না বাসে তাদেরকে। দুঘন্টা পার হয়ে গেছে সেটা আর্কাদিওর বুঝে ওঠার আগেই কোর্টমাশার্লের বিচারকর্তা তার চরম বক্তৃতা আরম্ভ করে। “যদিও প্রমাণিত অভিযোগগুলো তার মৃত্যুদন্ডের জন্য যথেষ্ট নয়”- বলে চলে বিচার কর্তা- তারপরও যে দায়ীত্বজ্ঞানহীন ও অপরাধজনকভাবে অভিযুক্ত ব্যাক্তি, তার অধস্তনদের ঠেলে দিয়েছে এক অর্থহীন মৃত্যুর দিকে, তাতে মৃত্যুদন্ডই তার যথার্থ পাওনা”। যেখানে প্রথমবারের মত শ্রম, অকারনে পাওয়া নিরাপত্তার স্বাদ আর যেখানে প্রথমবারের মত ভালবাসার অনিশ্চয়তার আস্বাদ পায় সে, সেই স্কুলের কয়েক মিটার দূরে তার মৃত্যুর এই আনুষ্ঠানিকতা আর্কাদিওর কাছে ছিল হাস্যকর। সত্যিকার অর্থে মৃত্যু তার কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ ছিল জীবন। ফলে যখন তার শাস্তি উচ্চারণ করা হয় তখন তার ভয়ের অনুভূতি ছিল না, ছিল স্মৃতিকাতরতার। শেষ ইচ্ছের কথা জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত কোনো কথা বলে না সে।

    “ আমার স্ত্রীকে বলো”- গম্ভীড় গলায় বলে-
    “মেয়ের নাম যেন উরসুলা রাখে”- একটু বিরতি টেনে নিশ্চিত করে; “উরসুলা, দাদীর মতন এবং বলো যার জন্ম হতে যাচ্ছে সে যদি ছেলে হয় তার নাম যেন রাখে হোসে আর্কাদিও, কিন্তু কাকার জন্য নয় বরঞ্চ দাদার জন্য।” দেয়ালের গায়ে ওকে দাঁড় করানোর আগে ফাদার নিকানোর সাহায্য করার চেষ্টা করে। ” অনুতাপ করার মত কিছুই নেই আমার” – বলে আর্কাদিও আর এক কাপ কালো কফি পানের পরে নিজেকে ফায়ারিং স্কোয়াডের কাছে সমর্পন করে। ফায়ারিং স্কোয়াডের নেতা যে সংক্ষিপ্ত বিচারে মৃত্যুদন্ডের ব্যাপারে ছিল দক্ষ তার নামটা ছিল কাকতালীয়র চেয়েও বেশি: ক্যাপ্টেন রোকে কারনিসেরো (স্প্যানিশে কারনিসেরো শব্দের অর্থ হচ্ছে কসাই)। গোরস্থানের পথে একটানা গুড়ি বৃষ্টির ভিতর দিয়ে আর্কাদিও দেখতে পেল দিগন্তরেখায় এক উজ্জল বুধবারের ভোরের আগমন। কুয়াশার সাথে সাথে বিদায় নেয় ওর স্মৃতিকারতাও, আর রেখে যায় তার বদলে প্রবল কৌতূহল। শুধুমাত্র ওরা যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাড়াতে বলে তখনই দেখতে পায় ভেজা চুলে রেবেকাকে, গোলাপী রংয়ের ফুল ছাপানো জামা পরে বাড়ির দরজা জানালা খুলছে হাট করে। সে চেষ্টা করে যাতে করে রেবেকা তাকে চিনতে পারে। তখন কোনো কারণ ছাড়াই রেবেকা দেয়ালের দিকে তাকায়, আর বিস্ময়ে নিশ্চল হয়ে কোনো রকমে হাত নেড়ে বিদায় জানায় আর্কাদিওকে।একইভাবে আর্কাদিও-ও বিদায় জানায় ওকে। সেই সময়ে ধোঁয়া ওঠা রাইফেলগুলো তাক করা হল ওর দিকে আর সে শুনতে পেল অক্ষরে অক্ষরে মেলকিয়াদেসের সুর করে পড়া ধর্মীয় চিঠি, অনুভব করে ক্লাশ ঘড়ে কুমারী সান্তা সোফিয়া দেলা পিয়েদাদের পথ হারানো পদক্ষেপ, অনুভব করে ওর নিজের নাকে একই কাঠিন্য, যে রকম কাঠিন্য তার মনোযোগ কেড়েছিল মৃত রেমেদিওসের নাকের ফুটো। “আহ, কি বোকা,” ভাবার সময় পেল- “ভুলেই গেছি বলতে যে যদি মেয়ে হয় তাহলে যেন ওর নাম রাখা হয় রেমেদিওস “ সেই সময়ে জড়ো হওয়া আর সারা জীবনব্যাপী জ্বালিয়ে মারা প্রচন্ড আতংকের থাবা ফিরে আসে ওর কাছে। ক্যাপ্টেন গুলির আদেশ দেয়। আর্কাদিও কোন রকমে সময় পায় বুক ফুলিয়ে, মাথা উচুঁ করার। সে বুঝতেই পারে না কোত্থেকে আসে গরম তরল পদার্থ যাতে জ্বলে যাচ্ছে তার উরু। “হারামজাদারা” চিৎকার করে-
    “উদারপন্থি দল, জিন্দাবাদ”!

    মে মাঝে যুদ্ধ শেষ হয়। সরকার পক্ষের বিদ্রোহীদের কঠিন শাস্তি দেবার অঙ্গীকারে সোচ্চারিত ঘোষণার দুই সপ্তাহ আগেই ধরা পরে যায় কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া। আরেকটু হলেই সে আদিবাসীদের ওমার ছদ্মবেশে পশ্চিম সীমান্তে পৌছে যেত। যে একুশজন ওর সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল তাদের মধ্যে চৌদ্দজন মারা যায় যুদ্ধে, ছয়জন হয় আহত আর চুড়ান্ত পরাজয়ের সময় তাকে সঙ্গ দিয়েছিল শুধু মাত্র একজন, কর্ণেল হেরিনালদো মার্কেস। এই খবর মাকন্দোতে আসে এক বিশেষ ফরমানের মাধ্যমে। ”সে বেঁচে আছে” উরসুলা খবরটা জানায় স্বামীকে-“চল ,ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যেন শত্রুপক্ষের দয়া হয়। “ তিনদিন কান্নার পর এক বিকেলে রান্নাঘরে যখন দুধের মিষ্টি নাড়া দিচ্ছিল তখন পরিষ্কার ছেলের গলার স্বর তার কানে আসে। ‘‘আউরেলিয়ানোর গলা ছিল ওটা”- চিৎকার করে চেষ্টনাট গাছের দিকে ছুট লাগায় স্বামীকে খবরটা দেবার জন্য- “জানি না কিভাবে অলৌকিক ব্যাপারটা ঘটল কিন্তু সে বেঁচে আছে এবং খুব শীঘ্রই ওকে আমরা দেখতে পাব” । এটাকে সে নিশ্চিৎ বলে ধরে নেয়। ঘরের মেঝে ধোয়ার ব্যবস্থা করে আর আসবাবপত্রের জায়গা করে। কয়েক সপ্তাহ পর নাটকীয়ভাবে এক অশুভ ইঙ্গিত শোনা যায় যেটার কোনো সরকারী ফরমানের ভিত্তি ছিল না; কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুন্দিয়াকে মৃতুদন্ড দেয়া হয়েছে আর লোকজনকে শিক্ষা দেবার জন্য সেটা সম্পন্ন করা হবে মাকন্দোতেই।

    এক সোমবার, সকাল দশটা বিশে উরসুলার “ওকে নিয়ে আসছে।”–এই চিৎকার করে ঘড় ভাঙার এক মুহূর্ত আগে, যখন আমারান্তা আউরেলিয়ানো হোসেকে কাপ পরাচ্ছিল তখন শোনা যায় দূর থেকে আসা এক বনশিঙ্গার আওয়াজ আর সেনাদলের উপস্থিতির শব্দ। বন্দুকের কুদোর ঘায়ে উপড়ে পরা লোকজনকে সামাল দিতে রীতিমত যুদ্ধ করতে হয় ওদেরকে। উরসুলা আর আমারান্তা ভীড়ের মধ্যে পথ করে নিয়ে রাস্তার বাঁকে পৌঁছায় আর দেখতে পায় আউরেলিয়ানোকে। ভিখাড়ীর মত দেখাচ্ছিল ওকে। পরনে ছেড়া কাপড়, চুল দাড়ি জট পাকানো আর খালি পা ছিল ওর। গরম ধুলার দিকে আমল না দিয়ে হাঁটছিল সে, হাত দুটো ছিল দড়ি দিয়ে পিছমোড়া করে বাধা আর এক অশ্বারোহী অফিসার ঘোড়ার মাথার উপর ধরে রাখছিল দড়িটাকে। একইভাবে ছিন্ন পোশাকে বিধ্বস্ত হেরিনালদো মার্কেসকেও নিয়ে যাচ্ছিল ওরা। কিন্তু ওরা বিমর্ষ ছিল না। বরং ওরা যেন সৈন্যদের উদ্দেশ্যে অকথ্য ভাষায় চিৎকাররত মিছিলের উপরই বিরক্ত। “বাছা আমার ” – সমবেত গর্জনের মধ্যে চিৎকার করে উরসুলা আর এক সৈন্য তাকে থামানোর চেষ্টা করায় এক থাপ্পড় দেয় তাকে। অফিসারের ঘোড়া পিছু হটে। ফলে কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া থেমে দাড়িয়ে কেঁপে উঠে মায়ের বাড়িয়ে দেয়া হাত এড়িয়ে মায়ের চোখের উপর এক কঠিন দৃষ্টিতে চোখ রাখে।

    -বাড়ি ফিরে যাও, মা” বলে-“কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চাও আর পরে আমার সঙ্গে দেখা কর জেলখানায়” । মায়ের দুপা পিছনে ইতস্তত আমারান্তাকে দেখে তখন, আর হেসে জিজ্ঞেস করে তোর হাতের এ অবস্থা হয়েছে কিভাবে? “আমারান্তা কালো ব্যান্ডেজসহ হাতটা উঁচু করে বলে-পুড়ে গিয়েছে আর উরসুলাকে সরিয়ে নেয় যাতে ঘোড়াগুলো তাকে না মাড়ায়। সৈন্যদল এগিয়ে যায় আর বিশেষ এক দল বন্দীদের ঘিড়ে ফেলে দ্রুত নিয়ে যায় কারাগারে।
     
  6. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,200
    Likes Received:
    1,586
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ------------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ২১
    ------------------------------------


    বিকেলে, উরসুলা দেখা করে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার সঙ্গে । চেষ্টা করে সে দন আপলিনার মসকতের মাধ্যমে অনুমতি নেবার । কিন্তু দন আপলিনার এই প্রবল প্রতাপ মিলিটারির সামনে নিজের কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলেছে। ফাদার নিকানোর যকৃত সমস্যায় জ্বরে ভুগছে তখন। মৃত্যদণ্ডে দণ্ডিত না করা কর্নেল হেরিনাল্দো মার্কেসের বাবা-মা দেখা করার চেষ্টা করলে বন্দুকের কুঁজো দিয়ে গুতিয়ে তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়। মধ্যস্ততা করার মতো কাউকে পাওয়া অসম্ভব বুঝতে পেরে আর পরেরদিন সকালে ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে নিশ্চিত হয়ে উরসুলা ছেলের জন্য কিছু জিনিসপত্র বাঁধাছাধা করে, আর একাই চলে যায় কারাগারে।
    “আমি কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মা।” ঘোষণা করলে কারাগারের প্রহরীরা তার পথরোধ করে।
    “যে কোনোভাবেই হোক, আমি ঢুকবই।” সতর্ক করে ওদের উরসুলা, “যদি তোমাদের প্রতি গুলি করার আদেশ থেকে থাকে তাহলে এক্ষুনি আরম্ভ করতে পারে।”
    ওদের একজনকে ঠেলে ধাক্কা দিয়ে সাবেক ক্লাসঘরে গিয়ে ঢোকে সে, যেখানে খালি গায়ে একদল সৈন্য অস্ত্রে গ্রিস লাগাচ্ছিল। কমব্যাট ইউনিফর্ম পরা লালমুখো পুরু লেন্সের চশমা পরা, বিধিসম্মত চালচলনের অধিকারী এক অফিসার সৈন্যদের বাইরে যাবার ইঙ্গিত করে।
    “আমি কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মা।” পুনরাবৃত্তি করে উরসুলা।
    “আপনি বলতে চাচ্ছেন…” এক সদয় হাসি সহকারে শুধরে দেয় অফিসার, “আপনি হচ্ছেন মিস্টার আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার শ্রদ্ধেয় মা ।”
    তার কথা বলার শিথিল ভাব দেখে উরসুলা বুঝতে পারে, সে হচ্ছে বেলিটার অভিবাসী উঁচু অঞ্চলের বাসিন্দা। “তোমার যেভাবে ইচ্ছে বল।” মেনে নেয় উরসুলা, “শুধু আমাকে দেখা করার অনুমতি দাও।”
    উপরওয়ালাদের আদেশ ছিল, মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিতদের সঙ্গে কাউকে দেখা করার অনুমতি না দেওয়ার কিন্তু নিজেই সে দায়িত্ব নিয়ে পনের মিনিটের জন্য দেখা করতে দেয় অফিসারটি। বোঁচকার ভেতর কী আছে খুলে দেখায় অফিসারকে—একপ্রস্থ পরিষ্কার জামা, তার ছেলে বিয়ের সময় যে জুতোটি পরেছিল সেটা, যেদিন থেকে ছেলের ফেরত আসার ব্যাপরটা আঁচ করতে পারে, সেদিন থেকে তার জন্য রেখে দেওয়া দুধের মিষ্টি।
    কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে পেল পায়ে বেড়ি দেওয়া; বগলে এমপেদ্রাদাস দে গলন্দ্রিনোস (Lymphatic Ganglion, এক ধরনের ঘা) হওয়ায় হাত ছড়িয়ে বিছানায় শোয়া অবস্থায়। ওকে দাড়ি কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। দুই প্রান্ত চোখা করে পাকানো গোঁফ তার চোয়ালের হাড়গুলোকে প্রকট করে তুলছিল। উরসুলার মনে হচ্ছিল যখন সে চলে গেছে, তার থেকে আরও বেশি পান্ডুর আর একটু লম্বা হয়েছে সে। আর মনে হচ্ছে, অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি নিঃসঙ্গ। বাড়ির সব খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলোই বিস্তারিতভাবে তার জানা—পিয়েত্র ক্রেসপির আত্মহত্যা, আউরেলিয়ানোর স্বেচ্ছাচার আর মৃত্যুদণ্ড, চেস্টনাটের নিচে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার নির্ভিক মনোভাব। জানত, আমারান্তা আউরোলিয়ানো হোসেকে লালন পালনের উদ্দেশ্য নিয়ে কুমারী অবস্থায়ই বৈধব্য মেনে নিয়ে নিজেকে উৎসর্গ করেছে। এর মধ্যে আউরেলিয়ানো হোসে খুব বুদ্ধির নমুনা দেখাতে শুরু করেছে ; কথা বলতে শেখার সময়েই একসঙ্গে লিখতে আর পড়তে শিখছে। ঘরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই উরসুলার কাছে বেখাপ্পা লাগছিল ছেলের পরিণত মানসিকতা, তার গায়ের চামড়া থেকে বিচ্ছুরিত কৃর্তৃত্ব তার নিয়ন্ত্রণের ছটা। সে এত সব খবর রাখায় মা আশ্চর্য হয়।
    “তুমি জান, আমি সবজান্তা…” কৌতুক করে আউরেলিয়ানো, পরে সিরিয়াস হয়ে বলে, “আজ সকালে আমাকে যখন ওরা আনে, তখন আমার মনে হচ্ছিল, আমার জীবনেই এসব ঘটে গেছে। আসলে ওর চারপাশের মানুষের ভিড় যখন চিৎকার করছিল, সে তখন, গ্রামটা এক বছরে এভাবে বুড়িয়ে যাওয়ায় আশ্চর্য হয়ে নিজের চিন্তাতেই মগ্ন ছিল। আলমন্ড গাছের পাতাগুলোতে চিড় ধরেছে। নীল রং করা বাড়িগুলো লাল রং করে পরে আবার নীল রং করায় এখন এক অবর্ণনীয় রং ধারণ করেছে।”
    “কি আশা করছিলি,” দীর্ঘশ্বাস ফেলে উরসুলা, “সময় বয়ে যায়।”
    “ঠিক তাই।” মেনে নেয় আউরেলিয়ানো, “কিন্তু এত তাড়াতাড়ি নয়।”
    আর এভাবেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত দুজনেরই আগে থেকে ঠিক করে রাখা প্রশ্ন আর উত্তরগুলো গিয়ে ঠেকে দৈনন্দিন নিত্যনৈমিত্তিক কথোপকথনে।
    প্রহরী যখন সময় শেষের কথা ঘোষণা করে, আউরেলিয়ানো তখন বিছানার নিচ থেকে খামে পোড়া রোল করা একটি কাগজ বের করে আনে। ওগুলো ছিল তার পদ্য। রেমেদিওস দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা পদ্যগুলো যাবার সময় সঙ্গে করে নিয়ে যায় সে। আর যুদ্ধের সময় কোনো ঝুঁকিপূর্ণ অবসরে লিখে চলে, “প্রতিজ্ঞা করো, কেউ কোনোদিনও এগুলো পড়বে না।” বলে, “এই রাতেই এগুলো দিয়ে চুলো ধরিও।”
    উরসুলা প্রতিজ্ঞা করে আর বিদায়চুম্বনের জন্য উঠে দাঁড়ায়।
    “তোর জন্য একটি রিভলবার এনেছি,” ফিসফিস করে।
    কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া খেয়াল করে, কোনো প্রহরী দৃষ্টিসীমার মধ্যে নাই।
    “আমার কোনো প্রয়োজনেই আসবে না।” নিচুস্বরে বলে, “তবুও দাও আমাকে। বেরুনোর সময় ওরা তোমার শরীর তল্লাশি করতে পারে।”
    উরসুলা বডিসের ভেতরে থেকে রিভলবারটা বের করে। সে সেটা বিছানার মাদুরের নিচে চালান করে দিয়ে শান্ত ও দৃঢ়তার সঙ্গে সাক্ষাতের ইতি টানে, “কারও কাছে কোনো অনুনয় করো না বা মাথা হেট করো না। মনে কর যে আমার মৃত্যুদণ্ড অনেক আগেই কার্যকর হয়েছে।”
    উরসুলা ঠোট দুটো কামড়ে ধরে কান্না চেপে রাখতে। বলে, “ঘাগুলোতে গরম পাথরের ছেঁকা দে।”
    আধপাক ঘুরে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় সে। চিন্তিত কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া দাঁড়িয়ে থাকে দরজাটা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত। তারপর আবার সে শুয়ে পরে হাতদুটো ছড়িয়ে।
    শৈশবের প্রান্ত থেকেই যখন পূর্বলক্ষণ সম্বন্ধে সচেতন হতে শুরু করেছে, তখন থেকেই সে মনে করত, মৃত্যু আসবে সুনিশ্চিত, নির্ভুল ও অনিবার্য সংকেতের ঘোষণা দিয়ে। এখন আর কয়েক ঘণ্টা বাকি আছে। কিন্তু সংকেতটা এখনও আসছে না।
    একবার খুব সুন্দরী এক মেয়ে তার তুকুরিঙকার সেনাছাউনিতে এসে প্রহরীদের কাছ থেকে দেখা করার অনুমতি চায়। মায়েরা তাদের মেয়েদের পরবর্তী বংশধরদের উন্নতির জন্য প্রসিদ্ধ যোদ্ধাদের কাছে পাঠিয়ে দেবার গোঁড়ামির কথা জানা থাকায় প্রহরীরা মেয়েটাকে প্রবেশের অনুমতি দেয়।
    যখন মেয়েটা ঘরে ঢোকে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া ‘বৃষ্টিতে পথ হারিয়ে ফেলার’ কবিতাটাকে শেষ করছিল। যেখানে তার পদ্যগুলো রাখত, সেই আলমারিতে পদ্যটা তালা দিয়ে রাখার জন্য যখন মেয়েটার দিকে পিছন দিয়ে আছে সে, তখন অনুভব করে কারও আগমনি। আলমারি থেকে পিস্তলটা নেয় মুখ না ঘুরিয়েই বলে, “দয়া করে গুলি করো না।”
    যখন সে গুলিভরা পিস্তল নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে ততক্ষণে মেয়েটা তারটা নামিয়ে ফেলেছে। বুঝতে পারছে না কি করবে। এভাবেই এগারটার মধ্যে চারটে অ্যামবুশ এড়িয়ে গিয়েছে সে। অন্যবার এক রাতে মানউরের বিপ্লবী শিবিরে তার জ্বর আসায় শরীর ঘামানোর জন্য তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কর্নেল মাগনিফিকো ভিসবালকে নিজের বিছানা ধার দেয়। যাকে কখনও ধরা যায়নি এমন এক লোক মাননিফিকোকে ছোঁড়াঘাতে মেরে পালায়। আর নিজে সে কয়েক মিটার দূরে হ্যামকে একই ঘরে শুয়ে থেকেও কিছুই টের পায় না। পূর্ববোধগুলোকে শৃংখলাবদ্ধ করার চেষ্টাগুলো ছিল ব্যর্থ।
    হঠাৎ করে ওগুলো আসত, যেটাকে ঠিকমতো ধরে রাখা যায় না। কোনো কোনো সময় সেগুলো ছিল এতই স্বাভাবিক যে, সেগুলোকে পূর্ববোধ বলে চিহ্নিত করা যেত না। একমাত্র ঘটে যাওয়ার পরেই বোঝা যেত যে সেগুলো ছিল পূর্ববোধ। প্রায়ই সেগুলো ভ্রান্ত অন্ধবিশ্বাসের নগ্ন ধাক্কা ছাড়া আর কিছুই নয়।
    কিন্তু যখন তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল, আর জিগ্যেস করা হল তার শেষ ইচ্ছের কথা, পূর্ববোধের ভেতরকার সেই উত্তরটাকে চিনে নিতে তার কোনো সমস্যাই হয় না। বলে, “আমি চাই যে, দণ্ডটা মাকন্দোতেই কার্যকর হোক।”
    কোট মার্শালের প্রেসিডেন্ট এটাকে পছন্দ করে না, “মতলববাজি করো না।” বুয়েন্দিয়াকে বলে, “এটা হচ্ছে তোমার সময় কেনার এক কৌশল।”
    “যদি পূরণ না করেন, সেটা আপনার ইচ্ছে।” কর্নেল বলে, “কিন্তু এটাই আমার অন্তিম ইচ্ছে।”
    সে সময় থেকেই পূর্ববোধগুলো তাকে ত্যাগ করেছে। যেদিন জেলে উরসুলার সঙ্গে দেখা হয়, সেদিন থেকেই প্রচুর চিন্তা করে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, এবার মৃত্যু ঘোষণা দিয়ে আসবে না। কারণ, সেটা দৈবের উপর নির্ভর করছে না। বরঞ্চ নির্ভর করছে জল্লাদের উপর।
    ঘায়ের ব্যথায় কাৎরাতে কাৎরাতে সাড়া রাত জেগে কাটায় সে। ভোরের কিছুক্ষণ আগে বারান্দায় পদশব্দ শুনতে পায়। “এই যে আসছে…” বলে ওঠে, আর কোনো কারণ ছাড়াই হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার কথা চিন্তা করে, যে নাকি বিষণ্ন ঊষায় চেস্টনাটের নিচে বসে ওর কথাই ভাবছিল। ভয় করে না তার অথবা অনুভব করে না কোনো স্মৃতিকাতরতা; বরঞ্চ মানুষের আয়োজিত এই মৃত্যুটা যে তার আরম্ভ করা কাজগুলো শেষ করতে না দিয়ে কাজগুলোর সমাপ্তিকে জানতে দিচ্ছে না, তার জন্য পেটের ভেতর অনুভব করে প্রচণ্ড ক্রোধ।
    দরজা খুলে যায়। এক মগ কফি হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকে পাহারাদার। পরের দিন একই সময় একই অনুভূতি নিয়ে বগলের যন্ত্রণায় কাতর অবস্থায় ঘটে একদম একই ঘটনা। বৃহস্পতিবার পাহারাদারদের মধ্যে দুধের মিষ্টি ভাগ করে দিয়ে পরিষ্কার জামা পরে, যেগুলো এরমধ্যে তার সঙ্গে আঁটসাঁট হয়ে লাগে। আর পরে নেয় চামড়ার বুটজোড়া। শুক্রবারেও তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় না।

    সত্যি বলতে কি, ওর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সাহস পাচ্ছিল না ওরা। গ্রামের বিদ্রোহীরা মিলিটারিদের ভাবতে বাধ্য করেছিল যে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে শুধু মাকন্দোতে নয়, জলাভূমির সমস্ত এলাকায় ভয়াবহ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে। তারা প্রাদেশিক রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ করে শনিবার রাতে ওরা যখন রাজধানী থেকে উত্তর আসার অপেক্ষা করছে, কাপ্টেন রোকে কার্নিসেরো অন্যান্য অফিসারের সঙ্গে কাতারিনোর দোকানে যায়।
    প্রায় হুমকির মুখে শুধুমাত্র একটা মেয়ে তাকে ঘরে নিতে সাহস করে। “কারও মরন নিশ্চিত অবগত হওয়ার পর, কোনো মেয়েই আর তার সঙ্গে শুতে চাইবে না।” তার কাছে স্বীকারোক্তি করে মেয়েটা, “কেউই জানে না কীভাবে ব্যাপারটা ঘটবে কিন্তু সবাই বলাবলি করছে যে, কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে যে অফিসার গুলি চালাবে সে আর তার প্লাটুনের সকলেই দুনিয়ার শেষ প্রান্তে লুকালেও, আগে হোক বা পরে হোক খুন হয়ে যাবে, একের পর এক।”
    কাপ্টেন রোকে কার্নিসেরো অন্যান্য অফিসারদের জানায় কথাটা, আর তারা জানায় তাদের উপরওয়ালাদের। রোববার, যদিও কেউ খোলাখুলিভাবে বলেনি, যদিও কোনো মিলিটারি কার্যক্রম তখনকার চাপা উত্তেজনাপূর্ণ শান্ত অবস্থাতে ভাঙন ধরায়নি—তবুও সারা গ্রামই জানত, অফিসাররা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দায়িত্ব এড়াতে সব রকমের অজুহাত দেখানোর জন্য একপায়ে খাড়া।
    সোমবারের ডাকে সরকারি আদেশ: চব্বিশঘণ্টার মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে।
    সেই রাতে অফিসাররা এক টুপির মধ্যে নিজেদের নাম লেখা সাতটা কাগজ ফেলে আর পুরস্কার হিসেবে আসা কাগজটা কাপ্টেন রোকে কার্নিসেরোর ঝঞ্ঝাময় নিয়তিকেই প্রকাশ করে।
    “মন্দ ভাগ্যে চিড় ধরল না কখনও।” প্রচণ্ড তিক্ততার সঙ্গে উচ্চারণ করে, “জন্ম নিয়েছি খানকির ছেলে হয়ে, মরবও খানকির ছেলে হয়ে।”
    সকাল পাঁচটার সময় লটারি করে ফায়ারিং স্কোয়াডের সৈন্যদের বাছাই করা হয়। দণ্ডিতকে জাগায় ওরা এক সতর্কবাণী দিয়ে। বলে, “চলো বুয়েন্দিয়া। সময় এসেছে আমাদের।”
    “আচ্ছা, এই ব্যাপার!” উত্তর দেয় কর্নেল, “স্বপ্ন দেখেছিলাম যে আমার ফোঁড়াগুলো ফেটে গেছে।”
    যেদিন থেকে রেবেকা বুয়েন্দিয়া জানতে পারে যে আউরেলিয়ানোকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেদিন থেকেই সে ভোর তিনটার সময় জেগে উঠত। আর শয়নঘরে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার নাসিকা গর্জনে কাঁপতে থাকা আধখোলা জানালা ও গোরস্থানের দেয়ালের মধ্যে দিয়ে পাহারা দিত। অন্যসময়ে যেমন পিয়েত্র ক্রেসপির চিঠির জন্য যেমন অপেক্ষা করত, তেমনি গোপন অধ্যাবসায় নিয়ে অপেক্ষা করে সে সাড়া সপ্তাহ।
    “এখানে ওকে মারা হবে না।”
    ওকে বলত হোসে আর্কাদিও।
    “ওকে মার হবে মধ্যরাতে, শিবিরের ভেতর। ওখানেই তাকে কবর দেওয়া হবে, যাতে কেউ জানতে না পারে, কে তাকে গুলি করেছে।”
    রেবেকা অপেক্ষা করতে থাকে ওকে আমল না দিয়ে।
    “ওরা কি এতই বোকা যে এখানে মৃত্যুদণ্ড দেবে!” বলত আর্কাদিও।
    কিন্তু রেবেকা এতই নিশ্চিত ছিল যে আগে থেকেই ভেবে রেখেছে কীভাবে দরজা খুলে হাত নেড়ে ওকে বিদায় জানাবে।
    “ওকে রাস্তা দিয়ে নিয়ে আসা হবে না।” জোর করত হোসে আর্কাদিও, “ওরা কি এতই বোকা যে লোকজন সবকিছুর জন্য প্রস্তুত—তা জানা সত্ত্বেও শুধুমাত্র ছজন ভয়ে কাঁপতে থাকা সৈন্য নিয়ে যাবে এখান দিয়ে?”
    স্বামীর যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে রেবেকা জানালার পাশে বসেই থাকত। আর বলত, “তুই দেখতে পাবি, ওরা আসলে ও রকমই গাধা…”
    মঙ্গলবার সকাল পাঁচটায় হোসে আর্কাদিও কফি পান করে কুকুরগুলোকে ছেড়ে দিয়েছে, তখন রেবেকা জানালা বন্ধ করে আর খাটের উঁচু রেলিং ধরে নিজের পতন রোধ করে।
    “ঐ যে ওকে নিয়ে আসছে…” দীর্ঘশ্বাস ফেলে, “কী সুন্দর দেখাচ্ছে ওকে।”
    হোসে আর্কাদিও জানালার কাছে যায়। দেখতে পায় ওর যৌবনে পরা প্যান্ট পরিহিত ঊষার স্বচ্ছ আলোয় কাঁপছে সে। এরই মধ্যে দেয়ালে পিঠ ঠেকানো আর দুহাত কোমরে রাখা। কারণ, বগলতলার জ্বলুনি ধরা ঘাঁ তাকে হাত নামাতে বাধা দিচ্ছিল।

    “লোকে এত চোদা চোদে এরই জন্য।” বিড়বিড় করে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া, “এতই চোদে যে ছয় হিজরা তাকে মারে আর সে কিছুই করতে পারে না!”

    সে এতই রাগের সঙ্গে বলছিল, মনে হচ্ছিল সেটা এক রকম আকুলতা; আর ক্যাপ্টেন রোকে কার্নিসেরো সেটাকে প্রার্থনা করছে মনে করে। তার মনটা নরম হয়। যখন ফায়ারিং স্কোয়াড ওকে তাক করছে তখন ওর রাগ পরিণত হয় এক তিক্ত ঘন পদার্থে, যা ঘুম পাড়িয়ে দেয় জিভটাকে, আর ওকে বাধ্য করে চোখ বন্ধ করতে। ফলে উধাও হয়ে যায় ভোরের উজ্জ্বল আলো। আবার নিজেকে দেখতে পায়—নিতান্তই শিশু, খাটো এক প্যান্ট আর গলায় টাইপরা অবস্থায়। এক উজ্জ্বল বিকেলে ওকে নিয়ে যাচ্ছে এক তাঁবুর মধ্যে। দেখতে পেল বরফ। যখন চিৎকার শুনতে পেল, ওর মনে হল, সেটাই হচ্ছে ফায়ারিং স্কোয়াডের শেষ আদেশ।
    চোখ খোলে এক শিহরিত কৌতূহল নিয়ে। জ্বলন্ত বুলেটের গতিপথে অপেক্ষা করতে করতে। কিন্তু শুধু দেখতে পায় শূন্যে দুহাত তোলা অবস্থায় ক্যাপ্টেন রোকে কার্নিসেরোকে, আর হোসে আর্কাদিও-কে উদ্যত রাইফেল হাতে গুলি করতে প্রস্তুত অবস্থায় রাস্তা পার হতে।
    “গুলি করো না।” ক্যাপ্টেন বলে হোসে আর্কাদিওকে, “স্বর্গীয় এক্তিয়ার পাঠিয়েছে তোমাকে।”
    সেখানেই আরম্ভ হয় আরেক যুদ্ধ। ক্যাপ্টেন রোকে কার্নিসেরো, ও তার ছয় সৈন্য কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার সঙ্গে রওনা হয় রিওয়াচার উদ্দেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিপ্লবী জেনারেল ভিক্তর মেদিনাকে মুক্ত করার উদ্দেশে। সময় বাঁচানোর উদ্দেশে মাকন্দো পত্তনের সময় যে পথ ব্যবহার করেছিল হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া সেই পথ ধরে তারা। কিন্তু এক সপ্তাহ পার হবার আগেই বুঝতে পারে, সেটা ছিল এক অসম্ভব অভিযান। ফলে পাহাড়ের পাদদেশের বিপজ্জনক পথ ধরে এগুতে হয় তাদের, শুধুমাত্র ফায়ারিং স্কোয়াডের জন্য বরাদ্দকৃত গুলি নিয়ে। পথে পড়া গ্রামগুলোর কাছাকাছি ঘাঁটি গাড়ত ওরা। সোনার মাছ হাতে ছদ্মবেশ নিয়ে ওদের একজন সম্পূর্ণ দিনের বেলায় বিশ্রামরত বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বেরিয়ে যেত। পরে বিপ্লবীসহ দুজন শিকারের নাম করে বেরিয়ে আর কখনও গ্রামে ফিরত না। পাহাড়ের বাঁক থেকে রিওয়াচা যখন ওদের চোখে পড়ে ততক্ষণে জেনারেল ভিক্তর মেদিনাকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে জেনারেল পদমর্যাদা দিয়ে লোকেরা কারিবীয় উপকূলের বিপ্লবী বাহিনীর প্রধান বলে ঘোষণা করে। সে এই ভার গ্রহণ করলেও পদোন্নতি বর্জন করে। পাশাপাশি নিজের উপর শর্ত আরোপ করে যে যতক্ষণ পর্যন্ত না রক্ষনশীলদের ক্ষমতা থেকে না সরাতে পারবে, ততদিন সে এই পদ গ্রহণ করবে না।
    মাস তিনেকের মধ্যে সে হাজারের বেশি লোকের হাতে অস্ত্র তুলে দিতে পারলেও তারা সকলেই যুদ্ধে নিহত হয়। যারা বেঁচে থাকে তারা পূর্ব সীমান্তে পৌঁছুতে সক্ষম হয়। পরে তাদের সম্পর্কে যা জানা যায়, তা হচ্ছে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জে অন্তর্ভুক্ত ‘কাবো দে ভেলা’-য় গিয়ে ওরা জাহাজ থেকে নেমেছে। সরকারের তরফ থেকে টেলিগ্রাফের মাধ্যমে দেশব্যাপী ঘোষণা করা হয় বিজয় উল্লাস।

    কিন্তু দুদিন পরই, প্রায় আগের টেলিগ্রাফের সঙ্গে সঙ্গেই এল দক্ষিণের সমভূমির আরেক বিদ্রোহের বার্তাবাহী টেলিগ্রাম। আর এভাবেই সূত্রপাত হয় সর্বব্যাপী হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার কিংবদন্তির। একইসঙ্গে পরস্পরবিরোধী সংবাদ আসে, বিইয়্যানুয়েবার বিজয়ের ও গুয়াকামায়ালের পরাজয়ের, নরখাদক মেতিলনদের খাদ্যে পরিণত হয়েছে সে, জলাভূমির এক গ্রামে মারা গিয়েছে আবার আর এক খররে জানা যায় সে উরমিতায় ঘোষণা করেছে বিদ্রোহের। সেই সময়ে উদারপন্থি নেতারা সরকারের সঙ্গে পার্লামেন্টে অংশগ্রহণের জন্য দরকষাকষি করছিল আর ঘোষণা করে আর তারা তাকে নিঃসঙ্গ ভাগ্যান্বেষী অভিযাত্রী বলে ঘোষণা করে, যার তাদের দলে কোনো স্থান নেই। সরকার তাকে ডাকাতের তালিকাভুক্ত করে এবং তার মাথার দাম পাঁচ হাজার পেসো ধার্য করে। ষোলবার পরাজয়ের পর কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া দুই হাজার অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত আদিবাসি নিয়ে গুয়াহিরা ত্যাগ করে আর অপ্রস্তুত আক্রমণে নিদ্রারত সৈন্যরা রিওয়াচা পরিত্যাগ করে। সেখানেই সে নিজের প্রধান সৈন্যশিবির স্থাপনে করে এবং শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে। সরকারের তরফ থেকে প্রথম যে হুমকি আসে তা হচ্ছে সে তার সৈন্যদলকে পূর্ব সীমান্ত পর্যন্ত সরিয়ে না নিলে আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে কর্নেল হেরিনালদো মার্কেসকে গুলি করে মেরে ফেলা হবে। তখনকার পদোত্তীর্ণ সেনাপতি কর্নেল রোকে কার্নিসেরো হতাশা সহকারে টেলিগ্রামটা তার হাতে দেয়। সে সেটা অভূতপূর্ব আনন্দের সঙ্গে পড়ে।
    “কী ভালো!” উল্লাসভরা কন্ঠে বলে, “আমাদের মাকন্দোতে এখন টেলিগ্রাফ আছে।”
    সে সুস্পষ্ট ভাষায় চিঠিটার উত্তর দেয়। তিন মাসের মধ্যে সে তার প্রধান সৈন্যশিবির স্থাপন করার চিন্তা করছে। যদি ঐ সময় কর্নেল হেরিনালদো মার্কেসকে জীবিত না পাওয়া যায় তাহলে কোনো রকম বিচার না করেই ঐ সময়ের সকল বন্দিদের গুলি করে মেরে ফেলা হবে। শুরু করা হবে জেনারেল দিয়ে আর তার অধিনস্তদেরও একইভাবে গুলি করার। নির্দেশ দেওয়া হবে আর যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত একইভাবে চলবে সেটা। বিজয়ী বেশে তিন মাস পর, জলাভূমির পথে সে যার সঙ্গে প্রথম আলিঙ্গনবদ্ধ হয়, সে হচ্ছে কর্নেল হেরিনাল্দো মার্কেস।
     
  7. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,200
    Likes Received:
    1,586
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ------------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ২২
    ------------------------------------

    বাড়িটা তখন শিশুদের দিয়ে ভরে গিয়েছে। আর্কাদিওর মৃত্যুর পাঁচ মাস পর জন্ম দেয়া দুই যমজ ছেলেসহ তার বড় মেয়ে সান্তা সোফিয়া দেলা পিয়েদাদ-কে উরসুলা অনেক আগেই বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিতের শেষ ইচ্ছের বিরুদ্ধেই “রেমেদিওস” নাম দিয়ে মেয়েটাকে ব্যাপটাইজ করা হয়। “আমি নিশ্চিত যে এটাই আর্কাদিও বলতে চেয়েছে। তর্ক করে সে, “ওর নাম উরসুলা রাখা হবে না। কারন উরসুলারা জীবনে অনেক কষ্ট ভোগ করে।” যমজ দুজনের নাম রাখা হয় হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো ও আউরেলিয়ানো সেগুন্দো। আমারান্তা ওদেরকে দেখাশুনার দায়িত্ব নেয়। বসবার ঘরে কাঠের ছোট ছোট টুল বসিয়ে প্রতিবেশীদের অন্যান্য বাচ্চাদের নিয়ে সে কিন্ডারগার্টেন স্থাপন করে। যখন কর্নেল আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ফিরে আসে, আতশবাজি, ঘন্টা ধ্বনি আর বাচ্চাদের কোরাস গানের মাধ্যমে স্বাগতম জানানো হয় তাকে। দাদার মত লম্বা, বিপ্লবী আফিসারদের মত পোশাক পরা আউরেলিয়ানো হোসেকে সামরিক কায়দায় সম্মান জানায় তারা।

    সব খবরই ভাল খবর ছিল না। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার পালানোর একবছর পর হোসে আর্কাদিও আর রেবেকা আর্কাদিওর বানানো এক বাড়িতে উঠে যায় বাস করার জন্য। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময়ে হোসে আর্কাদিওর হস্তক্ষেপের কথা কেউই জানত না। প্লাজার সবচেয়ে ভালো কোনায় তিনটে রবিন পাখী যে আলমন্ড গাছে বাসা বেঁধেছে সে গাছটার ছায়ায় অবস্থিত বাড়িটায় ছিল অতিথিদের জন্য এক বড় দরজা আর আলো আসবার জন্য চারটে জানালা। বাড়িটার দরজা ছিল অতিথিদের জন্য অবারিত। রেবেকার পুরোনো বান্ধবীরা, মসকতেদের চার কুমারী বোনসহ বেগনীয়া ভরা বারান্দায় অনেক বছর আগে ছেদ পড়া এমব্রয়ডারির আসর পুনরায় আরম্ভ করে। রক্ষনশীল সরকার কর্তৃক মালিকানার স্বত্ব অনুমোদিত জোড়পূর্বক দখলকৃত জমিগুলো হোসে আর্কাদিও ভোগ করতে থাকে। ওকে দেখা যেত প্রতি বিকেলেই তার দোনালা শটগানে দড়ি দিয়ে ঝোলানো খরগোশ ঝুলিয়ে, সঙ্গে শিকারী কুকুরগুলো নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বাড়ি ফিরতে। সেপ্টেম্বরের এক বিকেলে, আসন্ন ঝড়ের হুমকির মুখে অন্যসব দিনের চেয়ে আগেই বাড়ি ফেরে সে। খাবার ঘড়ে রেবেকাকে সম্ভাষণ জানিয়ে, উঠোনে কুকুরগুলোকে বেঁধে, খরগোশগুলোকে পরে লবন মাখানোর জন্য রান্নাঘড়ে ঝোলায় আর কাপড় বদলাতে যায় শোবার ঘড়ে। রেবেকা পরে জানায় যে যখন তার স্বামী শোবার ঘড়ে ঢুকে সে বাথরুমে ঢুকে দরজা আটকে দিয়েছিল, ফলে সে কিছুই জানতে পারেনি। তার এই উক্তি বিশ্বাস করা কঠিন হলেও এর চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য আর কিছু ছিল না। আর তাছাড়া রেবেকাকে যে লোকটা সুখী করেছিল তাকে খুন করার কোনো মোটিভ রেবেকার মধ্যে কেউ খুঁজে পায়নি। এটাই ছিল মাকন্দোতে সম্ভবত একমাত্র রহস্য যার সত্য কখনই উদঘাটিত হয়নি। হোসে আর্কাদিও শোবার ঘড়ের দরজাটা বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে পিস্তলের এক বিকট আওয়াজে বাড়িটা কেঁপে ওঠে। সুতোর মতন রক্তের এক ধারা দরজার নীচ দিয়ে বেরিয়ে উঠোন পেরিয়ে , পরে রাস্তায় বেরিয়ে উচুনিচু চত্বরগুলো সোজা পার হয়ে সিড়ি বেয়ে নীচে নেমে উঠে পরে পাঁচিলের উপর। পরে তুর্কদের সড়ক ধরে এগিয়ে গিয়ে এক কোনায় এসে প্রথমে ডানে পরে বায়ে বাঁক নিয়ে বুয়েন্দিয়ার বাড়ির দিকে সরাসরি এগিয়ে বন্ধ দরজার নীচ দিয়ে ঢোকে যাতে করে কার্পেটে রক্তের দাগ না লাগে। একই কারণে অতিথিদের বসার ঘড়ের দেয়াল ঘেঁষে এগিয়ে গিয়ে অন্য বসার ঘর পার হয়ে, বড় একটা বাঁক নিয়ে খাবার টেবিল এড়িয়ে বারান্দা ধরে এগুতে থাকে আমারান্তার চেয়ারের নীচ দিয়ে, যেখানে আউরেলিয়ানো হোসেকে অংকের এক পাঠ দেয়ায় ব্যাস্ত আমারান্তার অলক্ষে গুদামে ঢুকে হাজির হয় রান্না ঘড়ে, যেখানে উরসুলা পাউরুটি বানানোর জন্য ছত্রিশটি ডিম ভাঙ্গার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

    “হায় খোদা”-চিৎকার করে উরসুলা। রক্তের সুতোর উৎপত্তি নির্ণয়ের ইচ্ছেয় ওটা ধরে উল্টোদিকে অনুসরণ করে ভাঁড়ার পেরিয়ে বেগনিয়ার ঘেড়া বারান্দা, যেখানে আউরেলিয়ানো নামতা পড়ছিল তিন আর তিন ছয়, ছয় আর তিন নয় সেটা পেড়িয়ে, খাবার ও বৈঠক ঘড়গুলোর মধ্যে দিয়ে রাস্তায় নেমে সোজা এগিয়ে প্রথমে ডানে পরে বায়ে বাঁক নিয়ে তুর্কদের রাস্তায় গিয়ে নামে, তার গায়ে তখনও বেকিং করার এপ্রন আর হাতে বানানো চপ্পল। এসমস্ত ব্যাপারে গুরুত্ব না দিয়ে সে এগিয়ে প্লাজায় গিয়ে পড়ে আর সেখান থেকে ঢুকে পরে এমন এক বাড়ির দরজা দিয়ে যে বাড়িতে সে কখনই ঢোকেনি; শোবার ঘড়ের দরজায় গিয়ে ধাক্কা দেয়ায় পোড়া বারুদের গন্ধে তার দম বন্ধ হয়ে আসে আর কেবল মাত্র খুলে রাখা লম্বা মোজার উপর মুখ থুবরে পড়ে থাকা অবস্থায় পায় হোসে আর্কাদিওকে, আর আবিস্কার করে হোসে আর্কাদিওর ডান কান থেকে বের হওয়া রক্তের সুতোর উৎপত্তি। তার শরীরে কোনো ক্ষত খুঁজে পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় না অস্ত্রটাও। এমনকি লাশের গা থেকে বারুদের গন্ধটা সরানোও অসম্ভব হয়ে পরে। সাবান আর ছোঁবা দিয়ে তিনবার ধুয়ে প্রথমে লবন আর ভিনিগার ঘষা হয় লাশে, পরে ছাই আর লেবু মেখে তরল ক্ষারের পিপেতে ভরে ছয় ঘন্টা রেখে দেওয়া হয়। লাশটাকে তারা এমনভাবে ঘষে যে তার গায়ের আরবী অক্ষরের উল্কিগুলো বিবর্ন হতে শুরু করে। পড়ে যখন তারা নিরুপায় হয়ে গোল মরিচ, জিরে আর তেজপাতা দিয়ে কম আঁচে সিদ্ধ করার কথা ভাবছে ততক্ষণে লাশে পচন ধরতে শুরু করায় দ্রুত দাফন করতে বাধ্য হয়। এক বায়ুরোধক দুই মিটার দশমিক ত্রিশ সেন্টিমিটার লম্বা এবং এক মিটার দশমিক দশ সেন্টিমিটার চওড়া, ভিতর দিকে লোহার পাত দিয়ে মজবুত করে লোহার বল্টু লাগানো বিশেষভাবে তৈরি কফিনে লাশটাকে বন্ধ করা হলেও যে জায়গায় কবর দেয়া হয়েছে তার রাস্তাগুলোতে গন্ধ পাওয়া যেত বারুদের। যকৃত ফুলে ঢোল হওয়া ফাদার নিকানোর বিছানায় শুয়ে শুয়েই আশির্বাদ করেন। যদিও পরের কয়েক মাসের মধ্যেই শক্ত দেয়াল তুলে কবরটাকে মজবুত করে চাপ ধরা ছাই, কাঠের গুড়া আর চুন ফেলে ওরা , তবুও পরের অনেক বছর গোরস্থানে বারুদের গন্ধ থাকে, যতদিন না কলা কোম্পানীর ইঞ্জিনিয়াররা এসে কংক্রিট দিয়ে সম্পূর্নভাবে সীল করে দেয় কবরটাকে। লাশটা বের করার প্রায় সাথে সাথেই রেবেকা তার ঘড়ের দরজাবন্ধ করে এক ঘৃণার পুরু খোলের মধ্যে ঢোকায় নিজেকে। জ্যান্ত কবর দেয় সে তাকে আর জাগতিক কোন প্রলোভনই সেটাকে কখনোই ভাঙ্গতে পারে নি। শুধুমাত্র একবারই প্রাচীন আমলের রুপোলী জুতো পরে সুক্ষ্ন ফুলের হ্যাট পরে রাস্তায় বেরিয়েছিল সে যেবার গ্রামে এক পর্যটক ইহুদি এসে এমন উত্তপ্ত অবস্থার সৃষ্টি করেছিল যে পাখিরা জানালার তার ভাঙ্গতো ঘড়ে ঢুকে পরার জন্য। শেষবার তাকে কেউ জীবন্ত অবস্থায় দেখতে পায় যখন দরজা ভেঙে চুরি করতে আসা চোরকে সে এক গুলিতে মেরে ফেলে। শুধুমাত্র বিশ্বস্ত চাকরানী আরহেনিদা ছাড়া কেউই তার সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখে নি। এক সময় শোনা যাচ্ছিল যে সে নিজের জ্ঞ্যাতিভাই বিবেচনা করা এক বিশপকে চিঠি লিখতো কিন্তু কেউই বলেনি সে উত্তর পেত কিনা। সাড়া গ্রাম তাকে ভুলে যায়।
    বিজয়ী হয়ে ফিরে এলে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে খুব একটা উৎসাহ পায় না। কোনরকম প্রতিরোধ ছাড়াই সরকারী সৈন্যদল প্লাজা ছেড়ে চলে যাওয়ায় উদারপন্থী লোকজনের মধ্যে বিজয়ের এক মিথ্যে ভ্রমের সৃষ্টি হয় যাকে ভেঙে দেয়া সঙ্গত মনে করে না সে, কিন্তু বিপ্লবীরা সত্যটা ঠিকই জানতো আর সবচেয়ে বেশী জানতো কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া। যদিও এই সময়ে তার অধীনে পাঁচ হাজারের ও বেশী সৈন্য ছিল আর উপকুলীয় দুটো রাষ্ট্র শাসন করত তবুও ভাল করেই জানত তার পিঠ ঠেকে আছে সমুদ্রে। আর সে এমন এক গোলমেলে রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে ঢুকে পরেছে যে সে যখন সৈন্যদলের গোলার আঘাতে বিধ্বস্ত গীর্জার চূড়ার পুনঃনির্মানের নির্দেশ দেয় তখন রোগশয্যা থেকে ফাদার নিকানোর মন্তব্য করেন “কি হাস্যকর! খৃষ্টের বিশ্বাসের রক্ষকরাই ধ্বংশ করে গীর্জা আর ম্যাসনরা তা মেরামত করতে পাঠায়।” এই অবস্থা থেকে নিষ্কৃতির এক পথ খুঁজে পেতে ঘন্টার পর ঘন্টা সে কাটিয়ে দিত টেলিগ্রাফ অফিসে অন্যান্য প্লাজার প্রধানদের সঙ্গে আলাপ করে। কিন্তু প্রতিবারই বেরুত আরও নিশ্চিত হয়ে যে যুদ্ধটা স্থবিরাবস্থায় এসে পৌঁছেছে। যখন উদারপন্থিদের নতুন বিজয়ের সংবাদ আসত সেটা খুব উল্লাসের সঙ্গে ঘোষণা করা হলেও মানচিত্রে সে দেখতে পেত সত্যিকার অবস্থা; আর বুঝে যেত যে তার সৈন্যরা জঙ্গলের গভীরে ঢুকে ম্যালেরিয়া আর মশার বিরুদ্ধে যুঝে এগুচ্ছে বাস্তবতার উল্টো দিকে। “ ‘আমরা সময় নষ্ট করছি’- অভিযোগ করত অফিসারদের কাছে। আমরা সময় নষ্ট করছি আর ওদিকে পার্টির হারামীরা এক আসন-এর জন্য ভিক্ষে করেছে। “ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে যে ঘড়ে ছিল সেই একই ঘড়ে নীদ্রাহীন কাটিয়ে দিত ঝোলানো হ্যামকে চিৎ হয়ে শুয়ে। মনের চোখে দেখত বরফ শীতল প্রভাতে কান অবধি ঢাকা কালো কোট পরিহিত উকিলরা রাষ্ট্রপতি ভবন ত্যাগ করছে হাত মর্দন করতে করতে, আর ফিসফিসিয়ে কথা বলতে বলতে আশ্রয় নিচ্ছে ভোরের বিষন্ন ক্যাফেগুলোতে, অনুমান করতো: যখন প্রেসিডেন্ট হ্যাঁ বলেছিলেন তখন কি বলতে চেয়েছেন যখন না বলেছিলেন তখনই বা কি বোঝাতে চেয়েছেন আর যখন সম্পূর্ন অপ্রাসঙ্গিক কিছু বলেছিলেন তখনই বা কি চিন্তা করছিলেন, আর সেই মুহূর্তে মশা তারাতে তাড়াতে, পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় আসন্ন ভীতিপ্রদ ঊষা অনুভব করতে করতে তাকে আদেশ করতে হবে তার লোকদের সমুদ্রে ঝাপ দিতে।

    অনিশ্চয়তার এক রাতে যখন পিলার তেরনেরা উঠোনে বারান্দায় বসে সৈন্যদের সঙ্গে গান গাইছে, সে তাকে তাস দেখে ভবিষ্যত বলতে বলে। “সাবধানে কথা বল”- তিন বার তাস বিছিয়ে আবার গোটানোর পর একমাত্র এটাই স্পষ্টভাবে বের করতে পারে পিলার তেরনেরা। “ জানি না এর মানে কি কিন্তু সংকেতটা খুবই পরিষ্কার যা বলবে খুব সাবধানে বলবে”। দুদিন পর এক আর্দালির হাতে কেউ একজন এক মগ চিনি ছাড়া কফি দেয়। সেই আর্দালী সেটাকে আরেক আর্দালির হাতে দেয় আর সে দেয় আরেকজনকে, এভাবে সেটা এসে পৌঁছায় কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার অফিসে। কারও কাছে সে কফি চায় নি, কিন্তু সামনেই ছিল বলে কর্নেল পান করে কফিটা। ওটাতে একটা ঘোড়াকে মেরে ফেলার মত পর্যাপ্ত ন্যক্স ভোমিকা (এক ধরনের বিষ) ছিল। যখন তাকে বাড়ি নেয়া হলো তখন তার শরীর শক্ত আর বাঁকা হয়ে গিয়েছিল আর দুই পাটি দাঁতের মধ্যে পরে জিহ্বা গিয়েছিল কেটে। উরসুলা মৃত্যুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। বমি হওয়ার দাওয়াই দিয়ে ওর পাকস্থলী পরিষ্কার করিয়ে শরীরটাকে গরম কম্বল চাপা দেয় সে; আর পান করায় দুদিন ধরে ডিমের সাদা অংশ যতক্ষন পর্যন্ত না শরীর তার স্বাভাবিক তাপমাত্রা ফিরে পায়। চতুর্থদিনে বেরিয়ে আসে সমস্ত বিপদ থেকে। নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে উরসুলা আর অন্য অফিসারদের চাপে পরে আরও এক সপ্তাহ বিছানায় কাটায় কর্নেল। শুধুমাত্র তখনই সে জানতে পারে যে তার লিখা পদ্যগুলো পোড়ানো হয় নি। “আমি তাড়াহুড়ো করে কিছুই করতে চাইনি” -ব্যাখ্যা দেয় উরসুলা। “সেই রাতে যখন এগুলো দিয়ে চুলো ধরাতে যাচ্ছিলাম” তখন মনে হলো লাশটা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করাই ভাল।” রেমেদিওসের ধুলোভরা পুতুলগুলোর মাঝে, আরোগ্য লাভের কুয়াশা মাখা সময়ে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া নিজের পদ্যগুলোর মধ্যে খুঁজে পায় তার অস্তিত্বের তাৎক্ষনিক নিশ্চয়তা। আবার লিখতে বসে সে। ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে এক পরিণতিহীন যুদ্ধের কিনারায় দাড়িয়ে ছন্দোবদ্ধ পদ্যের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রান্তসীমার অভিজ্ঞতাগুলোকে ফুটিয়ে তোলে সে। ফলে তার চিন্তাগুলো এতই পরিস্কার হলো যে সে সেগুলোকে উল্টেপাল্টে খতিয়ে দেখতে পারে। এক রাতে প্রশ্ন করে কর্ণেল হেরিনেল্দো মার্কেজকে:

    -“একটা কথা বল তো কম্পাদ্রে (বন্ধু অর্থে): কেন যুদ্ধ করছিস তুই”?
    - “কেন নয়, কম্পাদ্রে”- উত্তর দেয় কর্নেল হেরিনেল্দো মার্কেজ-:“ মহান উদার পন্থিদের জন্য” -“ভাগ্যবান তুই, কারণটা জানিস” - উত্তর দেয় সে- “ আমার কথা যদি বলি, আমি যুদ্ধ করছি আত্মসম্ভ্রমের কারণে।” “এটা ভাল নয়” -বলে কর্নেল হেরিনেল্দো মার্কেজ। তার এই উদ্বিগ্নতা উপভোগ করে কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া, “অবশ্যই” - বলে। “কিন্তু কেন যে যুদ্ধ করছি তা না জানার চাইতে অন্তত এটা ভাল।” ওর চোখের দিকে তাকিয়ে হেসে যোগ করে: “অথবা তোর মত যুদ্ধ করার চাইতে, যে যুদ্ধটা কারও জন্যই কোনো অর্থ বহন করে না।”
    যতক্ষণ পর্যন্ত না দলের নেতারা জনসম্মুখে “সে ডাকাত বৈ কিছু নয়” ঘোষণাটা প্রত্যাহার না করে ততক্ষণ পর্যন্ত তার আত্মমর্যাদা তাকে দেশের অভ্যন্তরের সশস্ত্র দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা থেকে বিরত করে। অবশ্য সে জানতো, যখনই এইসব দ্বিধা একপাশে সরিয়ে রাখবে, তখনই যুদ্ধের দুষ্টচক্রকে ভেঙে ফেলতে পারবে। আরোগ্য লাভের সময়টা তাকে চিন্তা করার অবকাশ দেয়। সুতরাং সে উরসুলাকে রাজী করায় তার মাটির নীচে পুঁতে রাখা উত্তরাধিকারের অবশিষ্টাংশ আর তার সঞ্চয়ের একটা বড় অংশ তার হাতে তুলে দিতে। মাকন্দোর সামরিক এবং বেসামরিক নেতা হিসেবে কর্নেল হেরিনেল্দো মার্কেজেকে ঘোঘণা করে দেশের অভ্যন্তরস্থ বিদ্রোহীদলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে যায় সে।
    কর্নেল হেরিনেল্দো মার্কেজ যে শুধুমাত্র কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার সবচেয়ে বিশ্বাসভাজন ছিল তাই নয়, উরসুলাও তাকে বরণ করত পরিবারের একজন হিসেবে। নরম স্বভাবের ভীরু ভঙ্গুর আর সহজাত শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষটি সরকার চালনার চাইতে যুদ্ধের জন্যই ছিল বেশী উপযুক্ত। তার রাজনৈতিক উপদেষ্টারা সহজেই তাকে তাত্ত্বিক গোলকধাঁধায় জড়িয়ে ফেলত। যেরকমটি কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া স্বপ্ন দেখত: বৃদ্ধ বয়সে সোনার মাছ তৈরী করতে করতে মারা যেতে; মাকন্দোতে ঠিক একই রকম গ্রামীন শান্তি স্থাপন করতে সক্ষম হয় সে। বাবা মা’র সঙ্গেই বসবাস করলেও উরসুলার কাছেই সপ্তাহে দু তিন বার দুপুরের খাওয়াটা সারত। উরসুলার সম্মতি নিয়ে, আউরেলিয়ানো হোসেকে পুরুষ হিসেবে গঠন করার জন্য আগ্নেয়াস্ত্র চালনায় এবং প্রাথমিক সামরিক শিক্ষা দেয় সে আর তাকে নিয়ে যায় ব্যারাকে, সেখানে কয়েক মাসব্যাপী কাটাতে। অনেক বছর আগে যখন হেরিনেল্দো মার্কেজ - ছিল প্রায় এক শিশু, তখন আমান্তার প্রতি তার প্রেম নিবেদন করেছিল। আমারন্তা তখন পিয়েত্র ক্রেসপির প্রতি এক পাক্ষিক প্রেমে এতই আপ্লুত ছিল যে সে তাকে হেসে উরিয়ে দেয় । হেরিনেল্দো মার্কেজ অপেক্ষা করে। একবার জেল থেকে আমরান্তাকে তার বাবার নামের অাদ্যাক্ষর লেখা এক ডজন বাতিস্তা (মিহি সুতী কাপড়) রুমাল বানানোর অনুরোধ করে এক চিরকুট পাঠায়। টাকাও পাঠায় চিরকুটের সঙ্গে। সপ্তাহ খানেক পর আমারান্তা এমব্রয়ডারি করা এক ডজন রুমাল নিয়ে জেলখানায় যায়। টাকাগুলোও সঙ্গে করে নিয়ে যায় ফেরৎ দিতে, আর কয়েক ঘন্টা কাটিয়ে দেয় অতীত দিনের গল্প করতে করতে। “যখন বের হব তোমাকে বিয়ে করব আমি” বিদায়কালে বলে হেরিনেল্দো মার্কেজ। আমরান্তা হেসে ফেলে ঠিকই, কিন্তু বাচ্চাদের পড়ানোর সময় তার কথা ভাবতে থাকে আর কৈশোরে পিয়েত্র ক্রেস্পির প্রতি যে ভালবাসা ছিল, তার প্রতি সেই একই রকম প্রেম জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করে। শনিবার কারাগারে দর্শনার্থীদের দিনগুলোতে বাড়ির সামনে দিয়ে যেত হেরিনেল্দো মার্কেজের বাবা মা’রা আর আমারান্তা তাদের সঙ্গী হতো। ঐ রকমেরই এক শনিবারে উরসুলার কাছে ধরা পরে যায় রান্না ঘড়ে চুল্লীর সামনে দাড়িয়ে বিস্কুটগুলো বেরিয়ে আসার পর সেখান থেকে সবচেয়ে ভালগুলো বেছে নেয়ার অপেক্ষারত অবস্থায়।
    -‘ওকে বিয়ে করে ফেল।” - বলে ওকে- “ওর মত আর একজন খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন হবে।”
    আমরান্তা কথাটা ভাল না লাগার ভান করে।
    -“পুরুষ শিকারে প্রয়োজন নেই আমার” - উত্তর দেয়- “এগুলো নিয়ে যাচ্ছি, কারণ আজ হোক কাল হোক ওকে গুলি করে মারবে ওরা।”
     
  8. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,200
    Likes Received:
    1,586
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ------------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ২৩
    ------------------------------------

    কোন কিছু না ভেবেই কথাটা বলে আমারান্তা। কিন্তু কথাটা বলেছিল একই সময়ে, যখন সরকার রিওআচা দিয়ে না দিলে হেরিনালদো মার্কেসকে গুলি করার হুমকি দিয়েছিল। জেলখানায় সাক্ষাতের নিয়মটা তখন বন্ধ করে দেয়া হয়। রেমেদিওসের মৃত্যুতে যে আপরাধ বোধ হয় সেই একই বোধে পীড়িত হয়ে ঘর বন্ধ করে কাঁদে আমারান্তা, যেন তার বিবেচনাহীন কথা আরেকজনের মৃত্যুর কারন হতে বসেছে।ওর মা তাকে সান্ত্বনা দেয়। ওকে আশ্বাস দিয়ে বলে যে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া নিশ্চয়ই কিছু করবে এর মৃত্যুদণ্ড রোধ করতে, আর প্রতিজ্ঞা করে যুদ্ধ শেষে হেরিনালদো মারকেসকে আমারান্তার প্রতি আকৃষ্ট করার। নির্দিষ্ট করে রাখা সময় উতরে যাবার আগেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করে সে। সামরিক এবং বেসামরিক নেতার নতুন সম্মান নিয়ে যখন হেরিনালদো মার্কেস বাড়িতে আসে, তাকে নিজের ছেলের মত বরণ করে নেয় উরসুলা; বিভিন্ন তোষামুদে অবস্থার সৃষ্টি করে তাকে বেশিক্ষণ বাড়িতে আটকে রাখার জন্য, আর সমস্ত হৃদয় দিয়ে প্রার্থনা করে যেন আমারান্তাকে বিয়ে করার প্রস্তাবটা তার মনে পড়ে যায়। তার প্রার্থনা মনে হয় সফল হয়েছে। যে দিনগুলিতে দুপুরের খাবার খেতে বাড়িতে যেত, কর্নেল হেরিনালদো মার্কেস বিকেলটা কাটিয়ে দিত বেগনিয়া ভরতি বাগানে, আমারান্তার সাথে চাইনিজ চেকার খেলে। উরসুলা বিস্কুট আর দুধকফি নিয়ে যেত আর লক্ষ্য রাখত বাচ্চারা যেন ওদের বিরক্ত না করে। সত্যি বলতে আমারান্তা তার হৃদয়ে ভুলে যাওয়া যৌবনের প্রেমের ভস্মে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করতে থাকে। অসহ্য উৎকণ্ঠা নিয়ে সে অপেক্ষা করত দুপুরে খাবারের দিনগুলোর জন্য, চাইনিজ চেকারের বিকেলগুলোর জন্য আর সময় উড়ে যেত সেই যোদ্ধার সঙ্গে যার নাম স্মৃতিকাতরতায় ভরা আর যার আঙ্গুলগুলো কেঁপে উঠত সুক্ষ্ণভাবে, গুটি চালার সময়। কিন্তু যেদিন কর্নেল হেরিনালদো মার্কেস তাকে বিয়ের ইচ্ছেটা আবার্ও জানায়, সে তাকে প্রত্যাখান করে। -‘আমি কারো সাথেই বিয়ে করব না’ বলে ওকে, “ তোমাকে তো নয়ই। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে তুমি এতই ভালবাস যে, ওকে বিয়ে করতে পারবে না বলেই তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাইছ”।
    কর্নেল হেরিনালদো মার্কেস ছিল ধৈর্যসম্পন্ন লোক। “আবার জোর করতে আসব আমি” বলে, “আগে বা পরে , তোমাকে রাজি করাবই।” বাড়িতে আসাটা চালিয়ে যায় সে। ঘরে আবদ্ধ হয়ে গোপনে অশ্রু রোধ করত, উরসুলাকে বলা যুদ্ধের শেষ খবরগুলো বলতে থাকা পাণিপ্রার্থীর গলার স্বর না শোনার জন্য কানে আঙ্গুল দিত; আর যদিও তাকে দেখার জন্য প্রাণ বেরিয়ে যেত তবুও বের না হওয়ার মত শক্তি সঞ্চয় করতে পারত সে। সে সময়টাতে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া প্রতি দু সপ্তাহে বিস্তারিত খবর পাঠাত মাকোন্দোতে। কিন্তু একবার , চলে যাবার প্রায় আট মাস পর সে উরসুলাকে লিখে। এক বিশেষ সংবাদবাহক নিয়ে যায় সীল করা এক খাম যার মধ্যে কর্নেলের সুন্দর হাতের লেখাঃ বাবাকে অনেক যত্ন কোরো, কারণ সে শীঘ্রই মারা যাবে। উরসুলা ভয় পায় -আউরেলিয়ানো যেহেতু বলেছে, সে অবশ্যই জানে। আর সে সাহায্য চায় হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে শোবার ঘরে নিয়ে যেতে। শুধু যে সে সবসময়ের মত ভারী ছিল তাই নয়, বরঞ্চ সুদীর্ঘ সময় চেষ্টনাট গাছের নীচে অবস্থানের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ওজন বাড়ানোর এমন ক্ষমতা অর্জন করে সে, যার ফলে সাতজন পুরুষকে বহন করতে না পেরে তাকে টেনে হিঁচড়ে বিছানায় তুলতে হয়। রোদ আর বৃষ্টি আপ্লুত সেই প্রাচীন প্রমাণাকৃতির শরীর যখন শ্বাস নিতে শুরু করে তখন শোবার ঘরের আর আশপাশের বাতাস ভরে যায় কোমল ব্যাঙের ছাতা, আর ফ্লর দে পালোর (এক ধরনের বনফুল)প্রাচীন ও নিবিড় খোলা হাওয়ার সুবাসে। পরের সকালে সে আর বিছানায় জেগে ওঠে না। সমস্ত ঘরগুলোতে খোঁজার পর উরসুলা আবার ওকে পায় চেষ্টনাটের নীচে। তাকে বিছানায় বাঁধা হয়। শরীরে শক্তি অটুট থাকলেও হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার পক্ষে বাধা দেওয়ার মত অবস্থা ছিল না। ওর জন্য সবই ছিল সমান। সে চেষ্টনাট গাছের নিচে ফিরে গিয়েছিল নিজের ইচ্ছায় নয়, শরীরের অভ্যস্থতার কারনে। উরসুলা তাকে যত্ন করত, খাবার খেতে দিত, আর আউরেলিয়ানোর খবর দিত। কিন্তু, সত্যিকার অর্থে বহুদিন যাবত একমাত্র যার সঙ্গে সে যোগাযোগ করতে পারত, সে হচ্ছে প্রুদেনসিও আগিলার। মৃত্যুর গভীর জীর্ণতার কারণে প্রায় ধূলোয় পরিণত হওয়া প্রুদেনসিও আগিলার দিনে দুবার কথা বলতে যেত। লড়াকু মোরগের কথা বলত ওরা। স্থির করত চমৎকার সব মোরগের খামার প্রতিষ্ঠা করার। মৃত্যুর পর জেতার আর প্রয়োজন নাই বলে জেতার জন্য নয়; বরঞ্চ , একঘেয়ে মরণের রোববারগুলোতে বৈচিত্র্য আনতে। সে ছিল প্রুদেনসিও আগিলার, যে নাকি তাকে পরিষ্কার করত, খাবার দিত আর এক অপরিচিত আউরেলিয়ানো যে নাকি যুদ্ধে কর্নেল ছিল, তার কথা বলত। যখন একা থাকত, তখন হোসে আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া নিজেকে সান্ত্বনা দিত অগুনতি কামরার স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখত, সে বিছানা থেকে উঠছে, দরজা খুলে একই রকম রট আয়রনের মাথার কাছে ঘেরওয়ালা বিছানা, একই রকম উইলো কাঠের চেয়ার, পেছনের দেয়ালে একই রকম কুমারী রেমেদিওসের ছবি্ওয়ালা একই রকমের কামরায় ঢুকেছে। সেই কামরা থেকে সে যেত আর এক কামরায় যেটা ছিল একেবারে একই রকমের, যার দরজা খুলে যেত একই রকম আরেকটিতে যাবার জন্য , তারপরে সম্পূর্ণভাবে একই রকম আরেকটিতে যাবার জন্য। ওর ভাল লাগত সমান্তরাল আয়নার গ্যালারির মতো এক কামরা থেকে আরেক কামরায় যেতে যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রুদেনসিও আগিলার ওর কাঁধে টোকা দিত। আর তখন সে ফিরে আসত কামরার পর কামরা ধরে, উল্টো দিকের পথ বেয়ে বেয়ে। আর খুঁজে পেত প্রুদেনসিও আগিলারকে, ওর বাস্তবের কামরাটাকে। কিন্তু, এক রাতে, বিছানায় নিয়ে যাবার দু সপ্তাহ পর, যখন প্রুদেনসিও আগিলার ওর কাঁধে টোকা দিল, সে মাঝপথে এক কামরাকে বাস্তবের কামরা ভেবে সেখানেই চিরদিনের জন্য রয়ে যায়।

    পরদিন সকালে উরসুলা নাস্তা নিয়ে যাবার সময় বারান্দা ধরে এক লোককে আসতে দেখে। ছোটোখাটো , শক্ত সামর্থ্য মানুষটার পরনে ছিল কালো কাপড়ের কোট আর বিষাদমাখা চোখ পর্যন্ত নেমে আসা বিশাল আকারের টুপিটাও ছিল কালো। ‘হায় খোদা , উরসুলা ভাবে, ‘ আমি দিব্যি করে বলতে পারি যে, এ হচ্ছে মেলকিয়াদেস।’ সে ছিল কাতাউর; অনিদ্রা রোগের সময় বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ভিসিতাসিওনের ভাই, কখনই যার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ভিসিতাসিওন ওকে জিজ্ঞেস করে কেন ফিরে এসেছে। আর সে নিজেদের ভাষায় গাম্ভীর্য নিয়ে উত্তর দেয়, ‘ এসেছি রাজার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে।’ তখন সকলে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার ঘরে ঢুকে সমস্ত শক্তি দিয়ে সকলে একসঙ্গে ধাক্কা দেয়, কানের কাছে চিৎকার করে, নাকের ফুটোর কাছে এক আয়না ধরে। কিন্তু ওকে আর জাগাতে পারে না। কিছুক্ষণ পর যখন ছুতোর কফিন বানাতে মাপ নিচ্ছে, সকলে তখন জানালা দিয়ে দেখতে পায় একরাশ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হলুদ ফুলের গুড়ি বৃষ্টি। সারা রাতভর গোটা গ্রামের উপর সেই নীরব ফুলের ঝড় বয়ে যায়, বাড়ির ছাদগুলো ঢেকে দেয়, দরজাগুলো আটকে দেয় আর খোলা বাতাসে ঘুমানো সব জীবজন্তুর দম বন্ধ হয়ে আসে। আকাশ থেকে এত ফুল ঝরে যে, রাস্তাগুলো জেগে ওঠে এক নিবিড় হলুদ ফুলের গালিচা হয়ে, আর শবযাত্রার জন্য সেগুলোকে বেলচা আর আঁচড়া দিয়ে পরিষ্কার করতে হয় ওদের ।

    উইলো কাঠের দোলচেয়ারে বসে, হাতের কাজটা কোলের উপর ফেলে রেখে আমারান্তা দেখছিল আউরেলিয়ানো হোসেকে, চিবুকে ফেনা মেখে, চামাটিতে ক্ষুর ধার দিতে, জীবনে প্রথমবারের মত দাড়ি কামানোর জন্য। তার ব্রন থেকে রক্ত বেরিয়ে পড়ে, আর উপরের ঠোঁটের মিহি গৌরবর্ণ গোঁফ বাগে আনতে গিয়ে কেটে ফেলে । আর, সব শেষ করার পর, থেকে যায় আগে যেমন ছিল তেমনি । কিন্তু, তার এই কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়া আমারান্তার মনের উপর এক তাৎক্ষনিক ছাপ ফেলে । তার বয়স বাড়তে শুরু করেছে। “যখন আউরেলিয়ানো তোর বয়সী ছিল, তুই দেখতে অবিকল তারই মত” বলে, “এখন তুই এক পুরুষ মানুষ”। অনেক আগে থেকেই সে পুরুষ ছিল। সেই পুরোনো দিনটি থেকে যখন আমারান্তা এখনও শিশু ভেবে গোছলখানায় ওর সামনে নগ্ন হত; পিলার তেরনেরা ওকে লালন করার জন্য যখন ওর হাতে তুলে দেয় সেই দিনটি থেকে, যেমনটি সে অভ্যস্ত হয়েছে তখন থেকেই। প্রথম বারের মত আউরেলিয়ানো যখন ওকে দেখে, একমাত্র যেটা তার নজর কাড়ে, সেটা হচ্ছে তার বুকের মাঝের গভীর খাঁজ। তখন সে এতই নিষ্পাপ ছিল যে প্রশ্ন করে ওখানটায় কি হয়েছে, আর আমারান্তা আঙ্গুলের ডগা দিয়ে বুকের মাঝে অনুসন্ধানের ভঙ্গিতে বলে, “এখান থেকে ওরা বিভিন্ন টুকরাগুলো কেটে তুলে নিয়েছে।” আরও পরে, যখন পিয়েত্রি ক্রেসপির আত্মহত্যার ধাক্কা কাটিয়ে উঠে, আবার ওর সঙ্গে গোসল করে তখন তার বুকের গভীরতা আউরেলিয়ানো হোসের আর মনোযোগ টানে না। বরং অনুভব করে এক অচেনা গায়ে কাটা দিয়ে ওঠার অনুভূতি। আমারান্তাকে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে আর আবিষ্কার করে একটু একটু করে তার গূঢ় অলৌকিকতা। অনুভব করে তার গায়ের চামড়ার লোম খাঁড়া হয়ে ওঠা, যেমনটি আমারান্তার বেলায় ঘটে ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে। শিশুকাল থেকেই হ্যামক ত্যাগ করে সকালবেলা আমারান্তার বিছানায় জেগে ওঠার অভ্যেস ছিল তার; যার উদ্দেশ্য ছিল অন্ধকারের ভয়টা দূর করা। কিন্তু যেদিন থেকে নগ্নতার ব্যাপারে সে সচেতন হয়, সেদিন থেকে অন্ধকারের ভীতি তাকে আমারান্তার মশারির ভিতর ঠেলে না দিয়ে বরঞ্চ ভোরে তাকে ধাবিত করতো আমারান্তার কোমল নিঃশ্বাসের তীব্র আকর্ষণ। এক কাক ভোরে, সেই সময় যখন সে ফিরিয়ে দিয়েছিল হেরিনালদো মার্কেসকে, আউরেলিয়ানো হোসে জেগে ওঠে দমবন্ধ করা অনুভুতি নিয়ে। অনুভব করে, আমারান্তার আঙ্গুলগুলোকে কতগুলো গরম কেন্নোর মতো, তার পেটের উপর উৎকণ্ঠিতভাবে কি যেন খুঁজছে। তার কাজ সহজ করে দিতে ঘুমের ভান করে পাশ ফিরে সে; আর অনুভব করে কালো কাপরের ব্যান্ডেজবিহীন হাতটা এক অন্ধ শামুকের মত ডুব দিচ্ছে উৎকণ্ঠার শৈবালের দঙ্গলে। যদিও দুজনেই যা জানে তা অগ্রাহ্য করার ভান করে, তবুও একজনে যা জানত , অন্যজনও তা জানে। আর, সেই রাত থেকে ওরা বাঁধা পড়ে যায় এক অলঙ্ঘনীয় নিষিদ্ধ কাজের বন্ধনে। বৈঠকখানার ঘড়িতে বারোটার ওয়াল্টজ শোনা পর্যন্ত আউরেলিয়ানো হোসের চোখে ঘুম আসত না , আর সেই পরিণতা কুমারী –যার চামড়া দুঃখভারাক্রান্ত হতে শুরু করেছে; সে এক মুহূর্ত শান্তি পেত না যতক্ষণ না অনুভব করতো মশারীর ভিতর নিশিপাওয়া ছেলেটাকে পিছলে ঢুকে পড়তে, যাকে সে লালন করেছে, আর কখনোই ভাবেনি যে সেই হবে তার নিঃসঙ্গতার উপশম। পরে শুধু নগ্ন হয়ে শুয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়া পর্যন্ত পরস্পরকে আদর করত, তাই নয়, একে অপরকে তাড়া করে বেড়াত বাড়ির আঙ্গিনার অন্ধকার কোনগুলিতে। আর ঘুমানোর ঘরগুলোতে ঢুকে দরজা লাগাত দিনের যেকোন সময়ে নিরবচ্ছিন্ন উত্তেজনা নিয়ে। একবার যখন গোলাঘরে চুমু খেতে উদ্যত, তখন উরসুলার কাছে প্রায় ধরা পড়ে যাচ্ছিল ওরা। ‘খুব ভালোবাসিস ফুফুকে?’ নিষ্পাপভাবে প্রশ্ন করে উরসুলা আউরেলিয়ানো হোসেকে। সে ইতিবাচক জবাব দেয়। ‘ভালই করিস’ –ইতি টানে উরসুলা আর রুটি তৈরির জন্য ময়দা মেপে রান্নাঘরে ফিরে যায়। এই ঘটনা চিত্তবিভ্রম থেকে মুক্ত করে আমারান্তাকে। সে অনুধাবন করতে পারে যে, অনেকদূর এগিয়ে গেছে, তারা আর শিশুদের চুম্বনের খেলা খেলছে না, বরং, এক শারদীয় কামনায় মাতামাতি করছে। আর ভবিষ্যৎহীন এই কামনায় ইতি টেনে দেয় সঙ্গে সঙ্গেই। এই সময়ে আউরেলিয়ানো হোসে তার সামরিক প্রশিক্ষণ শেষ করতে চলেছে। সে বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে ঘুমাতে যেত সৈন্য শিবিরে। আর শনিবার দিন সৈন্যদের সঙ্গে যেত কাতারিনোর দোকানে তার এই অপ্রত্যাশিত নিঃসঙ্গতাকে আর অপরিণত বয়ঃসন্ধির অন্ধকারকে মাঝে মাঝে সান্ত্বনা দিতে; আর, মৃত ফুলের গন্ধযুক্ত মেয়েদের দিয়ে আর উৎকণ্ঠিত কল্পনাশক্তি দিয়ে ওদেরকে রূপায়িত করত আমারান্তায়।

    কিছুদিন পরই সকলে পেতে থাকে পরস্পরবিরোধী যুদ্ধবার্তা। যখন খোদ সরকার বিদ্রোহীদের অগ্রগতির কথা স্বীকার করছে তখন মাকন্দোর অফিসারদের কাছে গোপন খবর ছিল দরাদরি করা এক অত্যাসন্ন শান্তি চুক্তির বিষয়। এপ্রিলের প্রথম দিকে বিশেষ এক সংবাদবাহক আত্মপরিচয় দেয় কর্নেল হেরিনালদো মার্কেসের কাছে। সে নিশ্চিত করে যে, সত্যিই দলের নেতারা দেশের অভ্যন্তরে বিদ্রোহী নেতাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেছে; আর উদারপন্থীদের জন্য তিনটে মন্ত্রীত্ব, পার্লামেন্টে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব ও অস্ত্র জমা দেওয়ার সাধারণ ক্ষমার বিনিময়ে এক সন্ধি সন্নিকট। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার কাছ থেকে সংবাদবাহক এক অতি গোপন আদেশ নিয়ে এসেছে যে সে এই শর্তগুলোর সাথে একমত নয়। পাঁচজন সেরা লোককে বেছে নিয়ে কর্নেল হেরিনালদো মার্কেসকে দেশ ত্যাগে প্রস্তুত হতে হবে। সে এই আদেশ পালন করে অতি গোপনীয়তার সঙ্গে। সন্ধিচুক্তি ঘোষণার এক সপ্তাহ পূর্বে, পরস্পরবিরোধী গুজবের ঝড়ের মাঝে, কর্নেল রোকো কারনিসেরোসহ দশজন বিশ্বস্ত অফিসার নিয়ে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া মধ্যরাতের পর নিঃশব্দে মাকন্দো এসে হাজির হয়ে গ্যারিসনটাকে ভেঙ্গে দেয়; সমস্ত অস্ত্র মাটির নিচে পুতে ফেলে ধ্বংস করে রেকর্ডসহ সমস্ত ফাইল। কর্নেল হেরিনালদো মার্কেস তার পাঁচ অফিসারসহ প্রভাতের আগেই উধাও হয়ে যায়। অপারেশনটা এতই গোপনীয়তা ও দ্রুততার সাথে সারা হয় যে, উরসুলা একেবারে শেষ মুহূর্তে ব্যাপারটা জানতে পারে যখন একজন কেউ তার শোবার ঘরের জানালায় আলতো করে টোকা দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে: কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে দেখতে চাইলে এখনই দরজার দিকে আসুন। উরসুলা লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে রাতের পোষাক গায়ে নিয়েই দরজা দিয়ে বেরিয়ে কেবলমাত্র দেখতে পায় নিঃশব্দ ধুলোর ঝড় তুলে গ্রাম ছেড়ে বেড়িয়ে যাওয়া ঘোড়সওয়ারদের। পরদিন সকালেই কেবল জানতে পারে যে আউরেলিয়ানো হোসে চলে গেছে তার বাবার সাথে। সরকার এবং বিরোধীদল যুক্ত বিবৃতিতে ঘোষিত যুদ্ধ বিরতির দশ দিনের মাথায় কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার পশ্চিম সীমান্তে প্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহের খবর পায় ওরা। অস্ত্রসহ তার ছোট্ট দলটা এক সপ্তাহেরও কম সময়ে হেরে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। কিন্তু একই বছরে যখন উদারপন্থী আর রক্ষনশীলেরা সমঝোতার কথা সারা দেশকে বিশ্বাস করাতে ব্যস্ত, কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া আরও সাতটি সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘটানোর চেষ্টা করে। এক রাতে রিওআচার উপর কামান দাগে এক স্কুনার থেকে আর এর ফলে নগররক্ষী সৈন্যরা সবচেয়ে উদারপন্থী হিসাবে পরিচিত এলাকার চৌদ্দজন লোককে বিছানা থেকে নামিয়ে এনে গুলি করে প্রতিশোধ হিসাবে। সে দু সপ্তাহেরও বেশী সময় ধরে দখল করে রাখে সীমান্তের এক শুল্ক আদায়ের অফিস আর সেখান থেকে জাতির উদ্দেশ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধের আহবান জানানো হয়। রাজধানী শহরের উপকন্ঠে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়ার ইচ্ছেয় পনেরশ কিলোমিটারের বেশি দুর্ভেদ্য জঙ্গল পাড়ি দেবার উদ্ভট প্রচেষ্টায় তার এক সামরিক অভিযাত্রীদল তিনমাসের জন্য হারিয়ে যায়। একেকবার মাকন্দোর বিশ কিলোমিটারের মধ্যে চলে আসে আর সরকারের পাহারাদার সৈন্যদের কারণে বাধ্য হয় যেখানে তার বাবা বহু বছর আগে স্প্যানিশ জাহাজের অবশেষ আবিষ্কার করেছিল সেই মায়াবী জায়গার খুব কাছের পাহাড়ে আশ্রয় নিতে।
     
  9. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,200
    Likes Received:
    1,586
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ------------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ২৪
    ------------------------------------

    ঐ সময়টাতে মৃত্যু হয় ভিসিতাসিওনের। অনিদ্রা রোগের ভয়ে সিংহাসন প্রত্যাখ্যান করে স্বাভাবিক মৃত্যুকে বরণ করার সৌভাগ্য হয় তার, আর তার অন্তিম বাসনা ছিল বিশ বছরের বেশী সময় ধরে জমানো বেতন তার বিছানার নীচ থেকে খুঁড়ে বের করে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিায়াকে পাঠিয়ে দেবার যাতে করে সে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই সময় প্রাদেশিক রাজধানীর কাছে জাহাজ থেকে নামার সময় কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া মারা গিয়েছে বলে গুজব ওঠায় উরসুলা আর টাকাগুলো বের করার কষ্ট করে না। সেই সরকারি ঘোষণা - যেটা ছিল দুবছরের মধ্যে চতুর্থবার, ছমাস ধরে এটাকেই সত্য বলে ধরে নিয়েছিল সকলে, কারণ কেউই তার সম্পর্কে কিছু জানত না। পরে যখন আমারান্তা ও উরসুলা আগের শোকপর্বের সঙ্গে নতুন একটি শোকের জন্য নিশ্চিতভাবে প্রস্তুত, তখনই অপ্রত্যাশিত খররটা আসে; কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া বেঁচে আছে, কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে নিজ দেশের সরকারকে বিব্রত করা ক্ষান্ত দিয়ে অন্যান্য বিজয়ী ফেডেরালিষ্ট কারিবিও প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। প্রতিবারই ওর নাম প্রকাশিত হতো তার গ্রাম থেকে ক্রমেই দূের, দূরান্তরে। পরে জানা যাবে যে সেই সময়ে তার চিন্তা ছিল আলাস্কা থেকে পাতাগোনিয়া পর্যন্ত সমস্ত রক্ষণশীলদের উৎপাটন করার, মধ্য আমেরিকার সমস্ত ফেডারেনিস্টদের একত্রিত করা। অনেক বছর পার হবার পর সান্তিয়াগো দে কুবা থেকে হাতে হাতে এক দুমড়ানো মোচড়ানো চিঠির মাধ্যমে প্রথম সরাসরি ওর খবর পায় উরসুলা।
    -“ওকে আমরা চিরকালের জন্য হারিয়েছি”- পড়ার পর হাহাকার করে উরসুলা- “এইভাবে চলতে থাকলে ও বড়দিন পালন করবে পৃথিবীর শেষ প্রান্তে।”

    যাকে কথাটা বলে সে হচ্ছে রক্ষণশীলদের জেনারেল হোসে রাকেল মংকাদা। যুদ্ধ শেষের পর থেকেই সে মাকন্দোর মেয়র আর সেইই চিঠিটা উরসুলার কাছে নিয়ে এসেছিলো। “দুঃখজনক হচ্ছে” মন্তব্য করে জেনারেল মঙ্কাদা-“আউরেলিয়ানো রক্ষণশীলদের একজন নয়”। সত্যিকার অর্থেই সে আউরেলিয়ানোকে শ্রদ্ধা করত। অনেক বেসামরিক রক্ষণশীলদের মতই হোসে রাকেল মংকাদা তার দলকে রক্ষা করতে যুদ্ধে যোগ দেয়, আর সামরিক বাহিনীর লোক না হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধ ক্ষেত্রে জেনারেল খেতাব অর্জন করে। তার দলের আরও অনেকের মতই সে ছিল সামরিক বাহিনীর বিরোধী। তার বিবেচনায় সামরিক লোকেরা হচ্ছে নীতিবোধহীন কুড়ে, উচ্চাকাঙ্খী কুচক্রি আর জনগনের বিশৃংখলার সুযোগে নিজেদের উন্নতি করায় ওস্তাদ। বুদ্ধিমান, দরদী, লাল, ভোজনরসিক মোরগের লড়াইয়ের ভক্ত এই লোকই কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর প্রতিদ্বন্দী ছিল। উপকুলের এক বিস্তীর্ন অঞ্চলের সামরিক অফিসারদের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে সমর্থ হয় সে। একবার কৌশলগত কারণে যখন সে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার দলের কাছে প্লাজা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় তখন কর্নেল আউরেলিয়ানোর জন্য দুটো চিঠি লিখে রেখে আসে। ওর একটি চিঠির মধ্যে বিস্তারিতভাবে কর্নেলকে আহবান করে যুদ্ধটাকে যৌথভাবে মানবিক করে তোলার, আর অন্য চিঠিটা ছিল উদারপন্থিদের এলাকায় বসবাসরত তার স্ত্রীর জন্য , যেটাকে সে স্ত্রীর হাতে পৌঁছে দিতে অনুরোধ করে ওই চিঠিতে। সেই সময় থেকে যুদ্ধের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতেও বন্দি বিনিময়ের জন্য সাময়িক যুদ্ধবিরতির ব্যাবস্থা করত দুই কমান্ডার। যুদ্ধ বিরতিগুলো ছিল অনেকটা উৎসবের পরিবেশ যেখানে কর্নেল মংকাদা সুযোগ নিত কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে দাবা খেলা শেখাবার। ওদের মধ্যে বিশাল বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এমনকি সামরিক বাহিনী আর পেশাদার রাজনীতিকদের প্রভাবমুক্ত করে দুইদলের জনপ্রিয় নেতাদের নিয়ে এক নতুন মানবতাবাদি দল গঠন করার চিন্তাও করে তারা যেখানে তারা দুই মতবাদের শ্রেষ্ঠ অংশগুলো প্রতিষ্ঠা করবে। যুদ্ধ শেষে যখন কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া চিরস্থায়ী অন্তর্ঘাতের সংকীর্নাবস্থায় পিছলে পড়ছিল তখন মংকাদাকে মাকন্দোর ম্যাজিষ্ট্রেটের পদ দেয়া হয়। সৈন্যদের বদলে মোতায়েন করে সে বেসামরিক পোশাক গায়ে নিরস্ত্র পুলিশ, আর সাধারণ ক্ষমার আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে যুদ্ধে মৃত কিছু উদারপন্থিদের পরিবারের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। মাকন্দোকে এক পৌরসভায় প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয় সে আর ফলে সে হয় মাকন্দোর প্রথম মেয়র, আর সে এমন এক পরিবেশের সৃষ্টি করে যাতে করে যুদ্ধকে মনে হয় অতীতের এক অবাস্তব দুঃস্বপ্ন। যকৃতপ্রদাহ জরে শেষ হয়ে যাওয়া ফাদার নিকানোর বদলে আসেন প্রথমে ফেডারেলিষ্ট যুদ্ধে অবসরপ্রাপ্ত ফাদার কর্নেল যাকে ডাকা হতো এল কাচোররো ( ছোট খোকা)। আম্পারো মসকতের সঙ্গে বিবাহিত ব্রুনো ক্রেসপি- যার খেলনা আর বাদ্যযন্ত্রের দোকানটা ক্রমাগতই উন্নতি করতে করতে ক্লান্ত হচ্ছে না, সে এক থিয়েটার স্থাপন করে আর স্পেনের পর্যটন কোম্পানীগুলো তাদের ভ্রমণসুচীতে সেটা যোগ করে। থিয়েটারটা ছিল উন্মুক্ত আকাশের নীচে কাঠের বেঞ্চী পাতা, গ্রীষ্মের বিভিন্ন মুখোশওয়ালা ভেলভেটের পর্দাঅলা বিশাল হল যেটায় সিংহের মাথার আকৃতি দিয়ে বানানো তিনটি টিকিট কাউন্টার ছিল। সিংহের খোলা মুখ দিয়ে দর্শকদের কাছে টিকিট বিক্রি করা হতো। প্রায় একই সময়ে স্কুলটাকেও পূনঃনির্মান করা হয়। জলাভূমি থেকে আসা এক বর্ষীয়ান শিক্ষক, দন মেলতর এস্কালোনা স্কুলটার ভার গ্রহণ করে। সে ক্লাসের নিরুদ্যম ছাত্রদের হাঁটুতে ভরদিয়ে চুন করা উঠানে হাটাতো, আর বাবা মায়ের অনুমতি নিয়ে ক্লাসে বাচাল ছাত্রদের ঝাল মরিচ খেতে বাধ্য করত। সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদের যমজ দুই ছেলে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো (দ্বিতীয়) ও হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো (দ্বিতীয়) তাদের শ্লেট চক আর নিজেদের নামাংকিত এলুমিনিয়ামের ছোটা জগ দিয়ে সবার আগে ক্লাসে যোগ দেয়। নিজের মায়ের কাছ থেকে পাওয়া নিখুঁত সৌন্দর্যের অধিকারী রেমেদিওস পরিচিত হতে শুরু করে সুন্দরী রেমেদিওস হিসেবে। এতটা সময় উপর্যুপরী শোক ও পুঞ্জিভূত যন্ত্রনা পার করার পরও উরসুলা বার্ধক্যকে ঠেকিয়ে রেখেছে। সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদের সাহায্য নিয়ে তার বেকারীটাকে এক ধাক্কায় নতুন শক্তি দান করে, যার ফলে শুধু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সেটা যুদ্ধে খরচ হয়ে যাওয়া বিশাল সম্পদ পুনরুদ্ধার করে তাই নয়, বরঞ্চ শোবার ঘড়ের নীচের লাউয়ের খোলগুলোও ভরে ফেলে সম্পূর্নভাবে। “যতদিন ঈশ্বর আমাকে আয়ু দেয়”- সে বলত “এই পাগলে ভরা বাড়িতে টাকাপয়সার অভাব হবে না।” এভাবেই চলছিল সবকিছু যখন আউরেলিয়ানো হোসে নিকারাগুয়ার ফেডারেল বাহিনী ছেড়ে এক জার্মান জাহাজে যোগ দেয় আর আদিবাসীর মত গাঢ় রঙ ও লম্বাচুলসহ ঘোড়ার মত তাগদ নিয়ে আমারান্তাকে বিয়ে করার গোপন সংকল্প নিয়ে হাজির হয় রান্না ঘড়ে। যখন ওকে ঢুকতে দেখে মুখ খুলে না বললেও সঙ্গে সঙ্গেই আমারান্তা বুঝতে পারে তার ফিরে আসবার কারণ। খাবার টেবিলে একে অপরের মুখের দিকে তাকাবার সাহস করে না। কিন্তু ফিরে আসবার দু সপ্তাহ পরে উরসুলার উপস্থিতিতেই আমরান্তার চোখে চোখ রাখে আর বলে “সারাক্ষণই তোমার কথা অনেক ভেবেছি আমি।” আমারান্তা ওকে এড়িয়ে যেতে থাকে। সবসময়ই চ্ষ্টো করত রেমেদিওস, লা বেইয়ার (সুন্দরী) সাথে সাথে থাকার। তার গাল লজ্জায় অপমানে লাল হয়ে যায় যেদিন তার ভাস্তে জিজ্ঞেস করে কতদিন সে তার হাতের কালো ব্যান্ডেজ পরে থাকার কথা ভাবছে, কারণ সে ভাবে যে কথাটা তার কুমারীত্বকে ইঙ্গিত করেই বলা হয়েছে। প্রথম সে আসার পর থেকে আমারান্তা ভাল করে দরজা লাগিয়ে ঘুমাতো কিন্তু রাতের পর রাত পাশের ঘড়ে তার শান্তিপূর্ন নাক ডাকার আওয়াজে অভ্যস্ত হয়ে সেই প্রতিরোধে শিথিলতা আসে। ফিরে আসার প্রায় দুমাস পর এক ভোরে শোবার ঘড়ে ওর উপস্থিতি অনুভব করে আমারান্তা। ফলে পালাবার বদলে, যেমনটি ভেবে রেখেছিল তেমনিভাবে চিৎকার করার বদলে নিজেকে সে সমর্পণ করে এক প্রশান্ত বিশ্রামের অনুভুতির কাছে। তাকে অনুভব করে মশারির নীচে পিছলে ঢুকে যেতে যেমনটি করত শিশুবেলায়, যেমনটি সে সবসময়ই করে এসেছে, তবুও তার শরীরের ঠান্ডা ঘাম আর দাঁতের বাড়ি রোধ করতে পারে না যখন বুঝতে পারে যে ও এসেছে সম্পূর্ন উলঙ্গ হয়ে। “চলে যা”- ফিসফিসায়, উৎসুক্যের মধ্যে খাবি খেতে খেতে, “চলে যা- নতুবা আমি চিৎকার করব”। কিন্তু আউরেলিয়ানো হোসে জানত কি করতে হবে কারণ সে আর অন্ধকারকে ভয় পাওয়া এক শিশু ছিল না বরঞ্চ সে ছিল এক ব্যারাকের পশু। সেই রাত থেকে পুনরায় আরম্ভ হয় পরিণামবিহীন এক বোবা যুদ্ধের যেটা ভোর পর্যন্ত চলত। “আমি তোর ফুপু” ক্লান্ত আমারান্তা ফিসফিসাত “এটা হচ্ছে প্রায় মায়ের সমান, একমাত্র পার্থক্য হচ্ছে তোকে আমি বুকের দুধ খাওয়াতে পারিনি”। আধো অন্ধকারে পালিয়ে যেত আউরেলিয়ানো আর আমারান্তা খিল লাগাতো না–এই প্রমাণ পেয়ে ফিরে আসতো পরের ঊষায়, প্রতি বারই আরও বেশী উত্তেজিত অবস্থায়। এক মুহূর্তের জন্যও আমারান্তাকে বাসনা করা থেকে বিরত হয়নি সে। ওকে খুঁজে পেতো সে বিজিত গ্রামগুলোর শোবার ঘড়ে, বিশেষ করে সবচেয়ে পরিত্যক্ত গুলোতে, আর রূপদান করত আহতদের ব্যান্ডেজের শুকনো রক্তের গন্ধে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর আতংকে, সবসময় ও সর্বত্র। দুরত্বের সাথে সাথে শুধুমাত্র স্মৃতিগুলোকে উপরে ফেলার জন্যই যে আমারান্তার কাছ থেকে সে পালিয়ে গিয়েছিল তাই নয়, বরঞ্চ পালিয়েছিল এক উন্মত্ত ক্রোধ নিয়ে যেটাকে তার সহযোদ্ধারা তার সাহস বলে ধরে নিত। কিন্তু সে আমারান্তার ছবিকে যতই যুদ্ধের খোঁয়াড়ে সেধিয়ে দিতো ততই যুদ্ধ পরিণত হতো আমারান্তায়। এভাবেই নিজের মুত্যুর মধ্য দিয়ে আমারান্তাকে শেষ করার উপায় খুজতে খুজতে কাটতো তার নির্বাসন, যতদিন না সে এক জনের কাছে পুরোনো এক গল্প শোনে যেখানে এক লোক এমন এক মেয়েকে বিয়ে করে যে তার ফুপুও হয় আবার জ্ঞাতিবোনও হয়। ফলে তার ছেলে নিজেই হয়ে দাড়ায় নিজের দাদা।
    -“ ফুফুকে বিয়ে করা যায়?” আশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করে সে।
    -“শুধু ফুপুর সঙ্গেই নয়”- উত্তর দেয় এক সৈনিক “আমরা পাদ্রিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি যাতে করে নিজের মাকেও বিয়ে করা যায়।”

    পনের দিন পর সে ব্যারাক ছেড়ে পালায়। তার স্মৃতিতে যেমনটি ছিল তার থেকে নির্জীব অবস্থায় পায় আমারান্তাকে, ওকে পায় আরও বেশী বিষন্ন ও লাজুক, সত্যিকার অর্থে পরিপক্কতার শেষ অধ্যায়ের ভারে অবনত কিন্তু শোবার ঘড়ের অন্ধকারে সবচেয়ে বেশী জ্বরতপ্ত ও প্রতিরোধের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী হুসিয়ার ও কঠোর: “তুই হচ্ছিস এক জানোয়ার”- আউরেলিয়ানোর পশুসুলভ আচরণের শিকার হয়ে বলত- “পোপের বিশেষ অনুমতি না নিয়ে, অভাগা ফুপুর সঙ্গে যে একাজ করা জায়েয, একথা সত্যি নয়”। আউরেলিয়ানো হোসে রোমে গিয়ে হাটুতে ভর দিয়ে হেটে সাড়া ইউরোপ পাড়ি দিয়ে পনটিফের চপ্পলে চুমু খাওয়ার প্রতিজ্ঞা করে যাতে করে আমারান্তা তার তুলে ফেলা সেতুটা নামিয়ে দেয়। “শুধু তাই নয়” - তর্ক করে আমারান্তা, “বাচ্চা হলে জন্মায় শুয়োরের লেজ নিয়ে।” এইসব যুক্তি আর্কাদিও হোসের কানে ঢোকে না।
    “পিঁপড়ে হয়ে জন্মালেও আমার আপত্তি নেই”- আকুতি করে সে।

    এক ভোররাতে, অবদমিত কামনার অসহ্য জ্বালায় ভেঙে পড়ে কাতারিনোর দোকানে যায় সে। সেখানে স্তন ঝুলে যাওয়া মমতাময়ী সস্তা এক মেয়েকে পেয়ে পেটের নিচের অংশটাকে শান্ত করে। অবজ্ঞা করার ওষুধটাকে আমারান্তার উপর প্রয়োগ করার চেষ্টা চালায় সে। এতদিনে শিখতে পারা সেলাইকল প্রশংশনীয় দক্ষতায় চালাতে থাকা আমারান্তাকে বারান্দায় দেখতে পেয়েও তার সঙ্গে কোনো কথা বলত না, আমারান্তার মনে হতো বিশাল এক বোঝা থেকে সে মুক্তি পেয়েছে আর তখন সে নিজেও বুঝতে পারে না কেন আবার চিন্তা করে কর্নেল হেরিনাল্দো মার্কেসের কথা, কেনই বা মনে পরে তার সঙ্গে চাইনিজ চেকার খেলার বিকেলগুলোর স্মৃতিকাতরতার কথা, এমনকি বুঝতেও পারে না কেনইবা তাকে কামনা করে শোবার ঘড়ের পুরুষ হিসেবে। আর যে রাতে অবজ্ঞার মিথ্যে প্রহসনটাকে সহ্য না করতে পেরে আবার আমারান্তার ঘড়ে ফিরে যায়, তখন চিন্তাও করতে পারে না কতটুকু অবস্থান সে হারিয়ে ফেলেছে এরই মধ্যে। অনমনীয় নির্ভুল দৃঢ়তার সাথে আমারান্তা প্রত্যাখ্যান করে তাকে আর চির দিনের জন্য আটকে দেয় দরজার খিল।

    আউরেলিয়ানো হোসের ফেরার অল্প ক’মাস পর জেসমিনের সুগন্ধি মাখা পাঁচ বছর বয়সী একছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এক উচ্ছল রমনী বাড়িতে এসে হাজির হয়। সে নিশ্চিত করে যে শিশুটা কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার ছেলে আর নিয়ে এসেছে যাতে করে উরসুলা ওকে ব্যাপটাইজ করে। নামবিহীন ছেলেটার জন্মরহস্য নিয়ে কেউ সন্দেহ প্রকাশ করে না: যে বয়সে কর্নেলকে বরফ চেনাতে নেয়া হয়েছিল ছেলেটা ছিল অবিকল একই রকম দেখতে। মেয়েটা বর্ণনা করে, তার জন্ম হয়েছে খোলা চোখ নিয়ে লোকজনকে বড়দের মত পরখ করতে থাকো অবস্থায় আর ওর পলকহীন চোখে যেভাবে সবকিছুর দিকে তাকাতো তা দেখে ভয় পেয়ে যেত মেয়েটা। “অবিকল একইরকম” বলে উরসুলা- “একমাত্র যা বাকি আছে তা হচ্ছে কেবল দৃষ্টি দিয়ে চেয়ারগুলোকে ঘোরানোর ক্ষমতা।” ওকে ব্যাপ্টাইজ করা হলো আউরোলিয়ানো নামকরণ করে আর মায়ের পদবী দিয়ে কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত না বাবা তাকে ছেলে বলে স্বীকৃতি না দেয় আইনত সে বাবার পদবী ধারণ করতে পারে না। জেনারেল মংকাদা হলো গডফাদার (ধর্মপিতা)। যদিও আমারান্তা চাইছিল তাকে মানুষ করার ভার দিতে কিন্তু ছেলেটার মা তাতে দ্বিমত করে।

    যেমনটি করে ভাল জাতের মোরগের সামনে মুরগীগুলোকে ছেড়ে দেয়া হয়, তেমনি করে কুমারী মেয়েদেরকে যোদ্ধাদের শোবার ঘড়ে পাঠাবার রীতিটা উরসুলার জানা ছিল না, কিন্তু ঐ একই বছরের মধ্যে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার আরও নয়টি ছেলেকে নিয়ে যাওয়া হল ব্যাপটাইজ করানোর জন্য। সবচেয়ে বড় জন ছিল গাঢ় বর্ণ সবুজ চোখের অদ্ভুত এক ছেলে যে বাবার বংশের কিছুই পায়নি, তার দশ বছরের বেশী বয়স হয়েছে। নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সব বয়সের শিশুদের ও সব বর্নের, কিন্তু সকলেই ছিল ছেলে আর সবার চেহারাতেই ছিল এক নিঃসঙ্গতার ছাপ, ফলে তাদের পিতৃপরিচয় সম্মন্ধে কোন সন্দেহের অবকাশ থাকে না। এই দলের মধ্যে শুধু মাত্র দুজনই ছিল সকলের থেকে পৃথক। একজন, বয়সের তুলনায় সে ছিল অনেক বর্ধিষ্ণু, যে নাকি ফুলদানি ও থালাবাটিগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো করে । মনে হয় তার হাত যা ছোঁয় তাই ভেঙে ফেলার এক ক্ষমতা আছে। আর একজন ছিল মায়ের মত বড় বড় চোখের স্বর্নালী চুলের একে ছেলে। যে মেয়েদের মত লম্বা ও কোকড়া চুল রেখে দিয়েছে। সে স্বাভাবিকতার সাথে ঘড়ে ঢোকে যেন এ বাড়িতেই বড় হয়েছে আর সরাসরি উরসুলার শোবার ঘড়ের একসিন্দুকের সামনে দাড়িয়ে দাবি করে “ কলের দম দেয়া নর্তকীটা দাও।” উরসুলা চমকে ওঠে। সিন্দুকটা খুলে প্রাচীন আমলের আর ধুলোমাখা মেলকিয়াদেসের সময়ের জিনিসগুলোর মধ্যে থেকে খুঁজে পায়, একজোড়া লম্বা মোজা দিয়ে মুড়িয়ে রাখা এক কলের নর্তকী যেটা নাকি কোনো এক সময় পিয়েত্রে ক্রেসপি বাড়ি নিয়ে এসেছিল, আর যেটার কথা কারোরই মনে ছিল না। দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে মায়ের উপাধি আর আউরেলিয়ানো নামকরণ করে ব্যাপটাইজ করা হয়, লম্বায় যুদ্ধচলাকালিন সময়ে ও চওড়ায় যুদ্ধক্ষেত্রের সমান বিস্তৃতির এলাকার ভিতর বীজ বপন কোরে করনেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া যে সকল পুত্র সন্তানদের জন্ম দিয়েছে তাদের: সতেরজন। প্রথমদিকে উরসুলা ওদের পকেটভর্তী করে টাকা দিত, আমারান্তা রেখে দিতে চাইত লালন করতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেদেরকে তারা সীমিত করে, একটি করে উপহার দিয়ে আর ব্যাপটাইজ করার সময় ধর্মমাতা হয়ে। “ওদেরকে ব্যপটাইজ করে আমরা আমাদের কর্তব্য পালন করেছি।”- একটা খাতায় তাদের নাম মায়েদের ঠিকানা জন্মস্থান ও জন্ম তারিখ লিখে বলত উরসুলা।

    “আউরেলিয়ানো অবশ্যই ভাল করে ওদের হিসেব রেখেছে, সুতরাং সে এসেই যা করার করবে”। দুপুরে খাবার সময় জেনারেল মংকাদার সঙ্গে এই বর্ধিষ্ণু ও বিচলিত হবার মত ব্যাপারটা নিয়ে মন্তব্য করার সময় জানায় যে তার ইচ্ছে কোনো একদিন কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া যেন ফিরে আসে বাড়িতে; তার সকল পুত্রদের জড়ো করতে।
     
  10. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    6,200
    Likes Received:
    1,586
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ------------------------------------
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ২৫
    ------------------------------------

    “দুশ্চিন্তা করো না কমমাদ্রে (ব্যাপটাইজের সময় ধর্মপিতা এক ধর্মমাতা পরস্পরকে কমপাদ্রে বা কমমাদ্রে বলে থাকে। অর্থঃ সহপিতা বা সহমাতা:)-“ হেঁয়ালিভরে ওকে কর্নেল মংকাদা বলে –“তোমার আন্দাজ করা সময়ের আগেই এসে পরবে সে”।
    যা জেনারেল জানত আর দুপুরের খাবার সময় সেটা উদঘাটিত করতে চায়নি তা হচ্ছে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া এ পর্যন্ত যতগুলো বিদ্রোহ ঘটাবার চেষ্টা চালিয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ভিত নড়ানো ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধটাতে নেতৃত্ব দেবার জন্য পথে আছে।

    পরিস্থিতি আবার প্রথম যুদ্ধের মাসগুলোর মত উদ্বেগপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্বয়ং মেয়র প্রবর্তিত মোরগ-লড়াই স্থগিত করা হয়। নগররক্ষীদের কমান্ডার আকিলেস রিকার্দ পৌরক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নেয়। উদারপন্থি তাকে উস্কানিদাতা হিসেবে চিহ্নিত করে।

    “ভয়ংকর কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে”- আউরেলিয়ানো হোসেকে বললো উরসুলা –“বিকেল ছটার পর রাস্তায় বের হবি না”। সেগুলো ছিল নিছক নিষ্ফল আকুতি। অন্য সময়ের আর্কাদিওর মতই আউরেলিয়ানো হোসে আর তার এক্তিয়ারে ছিল না। যেন দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তায় নিজেকে বিরক্ত না করে তার চাচা হোসে আর্কাদিওর মতই যৌনকামনা আর অলসতা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্যই তার ফিরে আসা। কোনো দাগ না রেখেই আমারান্তার প্রতি তার কামনা নিভে যায়। বিলিয়ার্ড খেলায় নিজের নিঃসঙ্গতাকে ক্ষণিকের মেয়ে মানুষদের দিয়ে স্বান্তনা জুগিয়ে, উরসুলা টাকা রেখে ভুলে যাওয়া জায়গাগুলো হাতরিয়ে উচ্ছন্নে যাওয়া দিন কাটাতে থাকে সে। শেষমেষ বাড়ি ফিরে আসত শুধুই কাপড় বদলাবার প্রয়োজনে। “সবগুলোই এক রকমের” অনুশোচনা করত উরসুলা-“ প্রথমদিকে সবাই ভালমানুষ, সবাই অনুগত, নিয়মনিষ্ঠ, যেন একটা মাছি মারতেও মনে কষ্ট পায়, আর যেই দাড়ি ওঠা শুরু করে এমনি সব নষ্ট হয়ে যায়”। আর্কাদিওর উল্টো, আউরেলিয়ানো জেনে ফেলে যে পিলার তেরনেরা হচ্ছে তার মা আর দুপুরের ঘুমটা তার বাড়িতেই সারার জন্য এক হামক টাঙ্গিয়ে দেয় পিলার। ওদের সম্পর্ক ছিল মা ছেলের সম্পর্কের চেয়েও গভীর, একে অপরের নিঃসঙ্গতার সঙ্গী। পিলার তেরনেরা ততদিনে তার আশা প্রত্যাশার শেষ চিহ্নটুকুও হারিয়ে ফেলেছে।

    তার হাসি তখন অরগানের মতো বাজে, তার বুক নতি স্বীকার করেছে মাঝেমধ্যে বিতৃষ্ণাকর আদরের কাছে, তার পেট আর উরু শিকার হয়েছে বহুজনে ভোগ করা নরীদের অপরিবর্তনীয় ভাগ্যলিপির কাছে, কিন্তু তার মনের বয়স বাড়ছে কোনো রকমের তিক্ততা ছাড়াই। মোটা, বাচাল, অসুখী ভদ্রবাড়ির মেয়েদের ভাগ্য গননার জন্য তার দেখা ছেড়ে দিয়ে সে সান্তনা খুঁজে পায় অচেনা লোকদেরকে সুখ দিয়ে। যে বাড়ীতে আউরেলিয়ানো হোসে দুপুরে ঘুমুতো সেখানেই প্রতিবেশী মেয়েরা আপ্যায়ন করত তাদের সাময়িক প্রেমিকদেরকে। “তোমার ঘড়টা আমাকে ধার দেবে, পিলার?”, শুধ মাত্র এটুকুই বলত তারা আর ভিতরে ঢোকার পর “অবশ্যই” বলত পিলার, আর অন্য কেউ যদি সেখানে উপস্থিত থাকত সে ব্যাখা দেবার সুরে বলত “মানে, লোকজন তাদের বিছানায় সুখী হলেই আমিও সুখী”।
    কখনই এ জন্যে টাকা নিত না সে। কখনই কাউকে ফিরিয়ে দিত না যেমনটি ফিরিয়ে দেয়নি অগুনতি লোকদের যারা খুঁজে বেরিয়েছে ওকে তার পরিণত বয়সের প্রারম্ভ পর্যন্ত, যাদের কাছ থেকে সে কখনও টাকা পয়সা বা ভালবাসা পায়নি, মাঝে মাঝে পেয়েছে একটুকু সুখ। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গরম রক্তের অধিকারী তার পাঁচ মেয়ে বয়সন্ধিকালেই জীবনের বন্ধুর পথে হারিয়ে গেছে। যে দুই ছেলেকে বড় করতে পেরেছে তাদের একজন মারা গেছে কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার বাহিনীতে যুদ্ধ করতে গিয়ে আর অপরজন জলাভূমির এক গ্রামে চৌদ্দ বছর বয়সে মুরগি চুরি করতে গিয়ে ধরা পরে আহত হয়ে। একদিক থেকে দেখতে গেলে অর্ধ শতাব্দী জুড়ে তাসের রাজা তাকে যে দীর্ঘদেহী গাঢ় বর্ণের ব্যক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে আউরেলিয়ানো হোসে ছিল সেই ব্যক্তি। আর যেমনি তাসগুলো সব খবর তাকে পাঠাতো সেই একইভাবে তার হৃদয়ে এসে পৌঁছায় যে আউরোলিয়ানো এরই মধ্যে মৃত্যুছাপ দিয়ে চিহ্নিত। সে তাসগুলোতে স্পষ্টভাবে দেখতে পায় সেটা।
    “আজ রাতে বাইরে যাস নে” ওকে বলে পিলার “এখানেই ঘুমো, তোর বিছানায় তাকে ঢুকিয়ে দেবার জন্য অনুরোধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পরেছে কার্মোলিতা মান্তিয়েল”।

    ঐ নৈবদ্য ও আকুতির পিছনে যে গভীর অর্থ লুকিয়ে আছে আউরোলিয়ানো হোসে তা ধরতে পারে না। “ওকে বলো মধ্যরাতে আমার জন্য অপেক্ষ করতে” উত্তর দেয় আউরোলিয়ানো। সে যায় স্প্যানিস কোম্পানী ঘোষিত “শেয়ালের ছোড়া” নাটকটা দেখার জন্য, সত্যিকারে অর্থে যেটা ছিল সোরিইয়ার (হোসে সোরিইয়া স্পানিশ নাট্যকার এবং কবি) লিখিত। আর সেটার নাম বদলে দেয়া হয়েছে ক্যাপ্টেন আকিলেস রিকার্দর আদেশে। কারন উদাপন্থিরা রক্ষণশীলদের গথ (বর্বর) নামরকন করেছিল। প্রবেশপথে টিকিট দেখানোর সময় হোসে আউরেলিয়ানো টের পায় যে ক্যাপ্টেন আকিলেস রিকার্দ তার দুই অস্ত্রধারী সৈন্যদের দিয়ে দেহ তল্লাসী করছে। “ সাবধান ক্যাপ্টেন” সর্তক করে আউরেলিয়ানো হোসে, “আমার পায়ে হাত তোলে এমন মরদ জন্ম নেয়নি এখনও”। জোড় করে তল্লাশী চালাতে চেষ্টা করে ক্যাপ্টেন আর নিরস্ত্র আউরেলিয়ানো হোসে দৌড় দেয়। সৈন্যরা খুনের আদেশ অমান্য করে “ও একজন বুয়েন্দিয়া” ব্যাখ্যা দেয় এক সৈন্য। রাগে অন্ধ ক্যাপ্টেন রাইফেল কেড়ে নিয়ে রাস্তার মাঝখানে চলে আসে আর তাক করে। “হারামজাদারা” চিৎকার করার সময়টুকু পায় “ভাল হত এটা যদি কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়েন্দিয়া হতো”।

    বিশ বছরের কুমারী কার্মেলিতা মন্তিয়েল কমলার সুগন্ধিযুক্ত পানিতে গোসল সেরে পিলার তেরনেরার বিছানায় যখন রোজমেরির পাতা ছড়াচ্ছে তথনই ভেসে এল গুলির শব্দটা। আউরেলিয়ানো হোসের কপালে লিখা ছিল যে সুখ, তাকে যে সুখ থেকে আমারান্তা বঞ্চিত করেছে সেই সুখ কার্মেলিতার কাছ থেকে পাওয়ার আর সাত সন্তানের পিতা হয়ে বৃদ্ধ অবস্থায় তার হাতে মাথা রেখে মরার, কিন্তু যে বুলেটটা তার পিঠ দিয়ে ঢুকে বুক ঝাঁজরা করে দেয় সেটা চলছিল তাসের এক ভূল ব্যাখ্যার আদেশে। যখন গুলির শব্দ হলো, একই সাথে অন্য দুটো গুলি এসে শুইয়ে দিল ক্যাপ্টেনকে, যে গুলির উৎস কখনই জানা যায়নি। সঙ্গে সঙ্গে ভেসে আসে অনেক গুলির সম্মিলিত রাত কাপানো চিৎকার।
    “উদারপন্থিদের জয় হোক! জয় হোক কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার।”

    বারোটার সময় যখন কার্মেলিতা মন্তিয়েল দেখতে পায় তার ভবিষ্যৎ নির্দেশক তাসে কিছুই লিখা নেই, যখন আউরেলিয়ানো হোসের রক্তক্ষরন শেষ হয়েছে, তখন থিয়েটারের সামনে চার শ’রও বেশী লোক জমায়েত হয় তাদের রিভলবার খালি করে ক্যাপ্টেন আকিলেস রিকার্দর পরিত্যাক্ত শরীরের উপর। সীসায় সীসায় ভারি হয়ে যাওয়া ফুলে ওঠা রুটির মত শরীরটাকে ঠেলাগাড়িতে তুলতে একদল লোকের প্রয়োজন হয়।

    নিয়মিত সৈন্য বাহিনীর দৌরাত্মে উত্যক্ত জেনারেল হোসে রাকেল মংকাদা নিজের রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে আবার গায়ে ইউনিফর্ম চড়ায় আর আবার মাকন্দোর সামরিক এবং বেসামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করে। সে আশা করেনি যে তার আপোষমূলক নীতিমালা অবশ্যম্ভাবীকে ঠেকিয়ে দিতে পারবে। সেপ্টেম্বরের সব খবরই ছিল পরস্পরবিরোধী। যখন সরকার ঘোষনা করছিল যে সাড়া দেশে নিয়ন্ত্রন বজায় রাখছে তখন বিদ্রোহীরা খরব পেত দেশের অভ্যন্তর থেকে অস্ত্র হাতে তুলে নেবার গোপন সংবাদ। সরকার কোনো ঘোষনা না পাওয়ার ফলে যুদ্ধাবস্থাকে স্বীকার করে না আর তার অনুপস্থিতিতেই কোর্ট মার্শালে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মৃত্যুদন্ড ধার্য করা হয়। আদেশ দেয়া হয়, যে দল প্রথমে তাকে বন্দী করতে পারবে তারাই যেন তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে। “তার মানে সে ফিরে এসেছে” - জেনারেল মংকাদার সামনে আনন্দিত উরসুলা বলে, কিন্তু জেনারেলের কাছে উত্তরটা অজানা ছিল।

    আসলে একমাসেরও বেশী সময় ধরে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া দেশে অবস্থান করছে। পরস্পরবিরোধী গুজবের তাড়ায় আর একই সময়ে দুরবর্তী দুই স্থানে তার অবস্থানের কথা শুনে যতদিন পর্যন্ত না সরকারীভাবে তার দ্বারা উপকুলের দুটো রাজ্য দখলের ঘোষনা না আসে ততদিন পর্যন্ত খোদ জেনারেল মংকাদা বিশ্বাস করে না তার ফিরে আসার কথা।

    “অভিনন্দন, কমমাদ্রে”- টেলিগামটা দেখিয়ে উরসুলাকে বলে সে- “ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এখানে পাবেন ওকে ।” সেই প্রথম বারের মত উদ্বিগ্ন হয় উরসুলা, ”আর আপনি কি করবেন কমপাদ্রে?” প্রশ্ন করে সে -“ও যা করত তাই করব, কমমাদ্রে” - উত্তর দেয় –“আমার কর্তব্য পালন করব।”
    অক্টোবরের প্রথম দিকে ভোরে সুসজ্জিত হাজার সৈন্য নিয়ে মাকন্দো আক্রমন করে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া আর নগররক্ষীরা আদেশ পায় শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবার।
    দুপুরবেলা যখন জেনারেল মংকাদা উরসুলার সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজন সারছিল, এক বিদ্রোহী কামানের গোলা সাড়া গ্রামকে কাঁপিয়ে দিয়ে মিউনিসিপাল কোষাগারের সামনেটা ধুলো করে দেয়। “ওরাও আমাদের মতই অস্ত্রেশস্ত্রে সুসজ্জিত” -দীর্ঘশ্বাস ফেলে জেনারেল মংকাদা- “ আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে যুদ্ধ করে সমস্ত অন্তর দিয়ে”। বেলা দুটোর সময় যখন দুপক্ষের কামানের গোলার প্রকটে পৃথিবী কাঁপছে সে উরসুলার কাছ থেকে বিদায় নেয় এক নিশ্চিত বিশ্বাস নিয়ে যে হেরে যাওয়া এক যুদ্ধ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে সে।

    -ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যেন আপনি এই রাতে আউরেলিয়ানোকে বাড়িতে না পান”- বলে - “আর যদি পেয়েই যান, তাহলে আমার পক্ষ থেকে ওকে একবার জড়িয়ে ধরবেন, কারণ কখনই ওকে দেখার আশা আর রাখি না। “

    মাকন্দো থেকে পালিয়ে যাবার সময় ধরা পরে যায় জেনেরাল। সেই রাতে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে যুদ্ধটাকে মানবিক করে তোলার অভিন্ন লক্ষ্য আর সামরিক নেতা ও দুই পক্ষেরই উচ্চাভিলাসী রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে সুনিশ্চিত বিজয কামনা করে এক সুদীর্ঘ পত্র লিখে পালাবার সময় ধরা পরে যায় সে। পরের দিন উরসুলার বাড়িতে তার সঙ্গে দুপুরের খাবার খায় কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া আর সেখানেই বন্দি হয়ে থাকে যতদিন না বিপ্লবী যুদ্ধাপোদেষ্টারা তার ভাগ্য নির্ধারন করে। সেটা ছিল এক পারিবারিক মিলন। কিন্তু যখন দুই প্রতিদ্বন্দী স্মৃতি রোমন্থনের জন্য যুদ্ধের কথা ভুলে যায় তখন উরসুলার এক বিষাদপূর্ণ অনুভূতি হয় যে তার ছেলে হচ্ছে এক অনুপ্রবেশকারী। যে দিন উরসুলা দেখে কোলাহলমুখর একদল মিলিটারি আউরেলিয়ানোকে পাহারা দিয়ে বাড়িতে এনে শোবার ঘড়গুলোকে খুব ভালভাবে পরীক্ষা করে কোনো রকম বিপদ অপেক্ষা করছে না ভেবে নিশ্চিন্ত হয়ে রেখে যায়, সেদিন থেকেই তার এরকমটি মনে হচ্ছিল। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া সেদিন মিলিটারিদের কার্যকলাপ শুধু মেনে নিয়েছিল তাই-ই নয়, সে কড়া আদেশ জারি করে যেন কেউই তার তিন মিটারের কাছে ভিড়তে না পারে, এমনকি উরসুলাও নয়, যতদিন পর্যন্ত না তার দেহরক্ষীরা বাড়ির চারপাশে এক ভাল রক্ষাব্যূহ তৈরী করতে পারে। সে সাধারণ সৈনিকদের ইউনিফর্ম পরত যেটাতে কোন পদভেদ বোঝা যেত না আর পায়ে ছিল সীল লাগানো কাদা আর শুকনো রক্ত মাখা উঁচু বুট। কোমড় বন্ধনীতে সবসময় ঝুলত মুখখোলা পিস্তলের খাপ আর যে হাতটা পিস্তলের বাটে রাখত তাতে থাকত তার চোখের দৃষ্টির মতই এক সার্বক্ষণিক সতর্কতা। কপালে গভীর টাকের আভাসসহ তার মাথাটাকে মনে হচ্ছিল অল্প আঁচে ওটাকে চুল্লিতে ঢোকানো হয়েছিল। ক্যারিবিয়ান লবণের বদৌলতে মুখমন্ডলে চিড় ধরায় সেটা এনে দিয়েছিল এক ধাতব কাঠিন্য। আসন্ন বার্ধক্যকে ঠেকিয়ে রাখা প্রাণশক্তি যেন তার আন্ত্রিক শীতলতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। চলে যাওয়ার সময়ের চেয়ে সে ছিল আরও লম্বা, আরও পান্ডুর ও কৃশকায়, আর স্মৃতিকাতরতা প্রতিরোধের প্রথম চিহ্নগুলো ফুটে উঠেছে ওর ভিতরে।

    “ঈশ্বর”- ভয় পেয়ে উরসুলা বলে “এখন মনে হচ্ছে ও সব পারে।” সে আসলেই সব পারত। আমারান্তার জন্য যে আজটেক শালটা নিয়ে আসে, মধ্যাহ্নের খাবার সময়ে যে স্মৃতি রোমন্থন করে, মজাদার ছোটগল্পগুলো যে শুনায়, সেগুলো ছিল অন্যসময়ের রসবোধের অবশিষ্টাংশ। এক গনকবরে মৃতদেহগুলো গোর দেয়ার আদেশ দিয়ে কর্নেল রোকে কার্নিসেরোকে নিযুক্ত করে সামরিক বিচার দ্রুত শেষ করতে, আর নিজে হাতে নেয় রক্ষনশীল দলের মৌলবাদী আইনগুলো আমূল সংস্কার সাধনের ক্লান্তিকর কাজ, যাতে করে রক্ষনশীল দলের পুনরাগমন হলেই পরবর্তীকালে আইনগুলো সংস্কার করা তাদের পক্ষে সহজ না হয়। “দলের রাজনৈতিক নেতাদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে আমাদের” বলত তার উপদেষ্টাদেরকে, “যখন ওরা চোখ খুলে বাস্তবতাকে দেখতে পাবে ততক্ষণে আমাদের সব কাজ শেষ হয়ে গেছে।” ঐ সময়ই সে জমির বৈধ স্বত্ত্বতা পরীক্ষা করে আর আবিস্কার করে তার ভাই হোসে আর্কাদিওর জবরদস্তি করে দখল করা জমিগুলো। কলমের এক খোঁচায় খারিজ করে দেয় সব রেজিস্ট্রি। শুধুমাত্র সৌজন্য দেখাতে এক ঘন্টার জন্য নিজের কাজ মুলতবী করে রেবেকাকে দেখতে যায় তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিতে।
     

Pls Share This Page:

Users Viewing Thread (Users: 0, Guests: 0)

Users found this page by searching for:

  1. Www বাংলা ফুফু ভাস্তে সম্পক.com