1. Hi Guest
    Pls Attention! Kazirhut Accepts Only Bengali (বাংলা) & English Language On this board. If u write something with other language, you will be direct banned!

    আপনার জন্য kazirhut.com এর পক্ষ থেকে বিশেষ উপহার :

    যে কোন সফটওয়্যারের ফুল ভার্সন প্রয়োজন হলে Software Request Center এ রিকোয়েস্ট করুন।

    Discover Your Ebook From Our Online Library E-Books | বাংলা ইবুক (Bengali Ebook)

Collected নিঃসঙ্গতার একশ বছর | গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস

Discussion in 'Collected' started by abdullah, May 1, 2016. Replies: 44 | Views: 4166

  1. kazi mainu
    Offline

    kazi mainu Senior Member Member

    Joined:
    Nov 10, 2014
    Messages:
    1,763
    Likes Received:
    251
    Gender:
    Male
    Location:
    dhaka,Bangladesh.
    Reputation:
    389
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    অনেক ভাল একটা উপন্যাস। ধন্যবাদ।
     
    • Friendly Friendly x 1
  2. Tazul Islam
    Offline

    Tazul Islam Kazirhut Lover Member

    Joined:
    Apr 20, 2016
    Messages:
    19,473
    Likes Received:
    538
    Gender:
    Male
    Location:
    Dhaka
    Reputation:
    142
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    কষ্ট করে শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ মামা ।
     
    • Friendly Friendly x 1
  3. passionboy
    Offline

    passionboy Kazirhut Suprime Member Staff Member Global Moderator

    Joined:
    Aug 20, 2012
    Messages:
    56,918
    Likes Received:
    10,363
    Gender:
    Male
    Location:
    সিটি গেইট, চট্টগ্রাম
    Reputation:
    704
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    এ তো দেখতাছি মহাযজ্ঞ!!

    এর বিচার করা আমার মতন নগন্য মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
    শুধু বলব @abdullah মামা ইউ আর সিম্পলি রক্
     
    • Friendly Friendly x 1
  4. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    5,998
    Likes Received:
    1,583
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ৩৪
    ----------------------------------
    আমারান্তার আকস্মিক মৃত্যু এক নতুন আলোড়ন না তুললে বলা যেত যে বুয়েন্দিয়াদের ক্লান্ত ম্যানশনে দীর্ঘদিনব্যাপী সুখ-শান্তি বজায় ছিল । সবার থেকে আলাদা ও বৃদ্ধা হলেও ওকে দেখাতো ঋজু ও শক্ত, পাথরের মত স্বাস্থ্যসম্পন্ন, সবসময়ই যেমনটি ছিল । চিরকালের জন্য কর্নেল হেরিনেন্দো মার্কেজকে প্রত্যাখ্যান করে কান্নার জন্য ঘরের দরজা বন্ধের পর কেউই আর তার চিন্তাধারাকে ধরতে পারেনি । কান্নার পর যখন সে ঘর থেকে বের হয় তখন তার চোখের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল । সুন্দরী রেমেদিওসের স্বর্গারোহনের সময়, আউরেলিয়ানোদের নিধনের সময়, এমনকি কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া, যাকে এই পৃথিবীতে সবচেয়ে ভালবেসেছিল, তার মৃত্যুতেও ওকে কাঁদতে দেখা যায়নি; যদিও তার মরদেহ চেষ্টনাটের নীচে পাওয়ার পর সেই ভালবাসার নিদর্শন সে দিয়েছিল । দেহটা তুলতে সাহায্য করে সে । যোদ্ধার পোশাক পড়ায় সে দেহটাকে আর দাড়ি কামিয়ে, চুল আচড়িয়ে, গোঁফে এমনভাবে মোম লাগায় যে স্বয়ং কর্নেলও তার গৌরবের শিখরের দিনগুলোতে এমনভাবে করত না । কারও মনে হয়নি ভালবাসার কারণেই সে এগুলো করছে, কারণ মৃত্যুর আচার অনুষ্ঠানের সঙ্গে আমারান্তার ঘনিষ্ঠতা দেখে ওরা অভ্যস্থ ছিল । ফের্নান্দা মর্মাহত হত যখন সে জীবনের সঙ্গে ক্যাথলিক ধর্মের সম্বন্ধ বুঝতে না পেরে শুধু বুঝতো মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কটা, এটা যেন কোনো ধর্ম নয়, শুধুমাত্র অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আচার অনুষ্ঠানের সংক্ষিপ্তসার। আমারান্তা স্মৃতির এক জগাখিচুড়ি অবস্থার মধ্যে এমনভাবে জড়িয়েছিল যে, খ্রিষ্টীয় ধর্ম তত্ত্বের ঐসব সুক্ষ্ণ বিষয়গুলো বোঝার সময় তার ছিল না । সে তার সব স্মৃতিকাতরতাকে অক্ষুন্ন রেখেই বৃদ্ধ অবস্থায় পৌঁছেছিল । যখন সে পিয়েত্র ক্রেসপির ওয়ালটজ শুনতো তখন সে বোধ করত একইরকম কান্নার ইচ্ছে যেমনটি হত বয়ঃসন্ধিকালে, যেন সময়ের নির্মম শিক্ষা ওর উপর কোন ছাপই ফেলেনি । স্যাতস্যাতে হয়ে পচে যাচ্ছে এই অজুহাতে সঙ্গীতের কাগজের যে রোলগুলো সে নিজেই আবর্জনায় ফেলে দিয়েছিল তা সর্বক্ষণই তার স্মৃতির মধ্যে ঘুরছিল আর ছোট ছোট হাতুরীর আঘাত হানছিল । ভাইপো আউরেলিয়ানোকে যে ভালবাসার অধিকার দিয়েছিল সেগুলোকে ডুবিয়ে দিতে চেয়েছিল পচা জলাভূমিতে, আর আশ্রয় নিতে চেয়েছিল কর্নেল হেরিনেলদো মার্কেজের ছত্রছায়ায়, কিন্তু তা সে পারেনি, এমনকি তার বৃদ্ধ বয়সের সবচেয়ে মরিয়া কার্যকলাপের মধ্য দিয়েও নয়, সেমিনারিওতে পাঠানোর তিন বছর আগে যখন সে ছোট্ট হোসে আর্কাদিওকে গোসল করাত তখন সে ওকে আদর করত, দাদীরা যেভাবে নাতীকে আদর করে সেভাবে নয়, আদর করত যেভাবে কোন নারী এক পুরুষকে করে, যেভাবে বলা হয় ফরাসি রমনীরা করে, যেভাবে সে বারো বছর, চোদ্দ বছর বয়েসে করতে চেয়েছে পিয়েত্র ক্রেস্পিকে, যখন ওকে দেখত নাচের প্যান্টপরা অবস্থায় জাদুকরী দন্ড হাতে যেটা দিয়ে ও মেট্রোনমীর তাল রাখতো । মাঝে মাঝে জীবনের পদক্ষেপে এতসব দৈন্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখার জন্য দুঃখ হতো তার, মাঝে মাঝে প্রচন্ড ক্ষোভে আঙ্গুলে সূচ ফোটাতো সে কিন্তু তাতে আরও ব্যথা পেত,আরও বাড়ত তার ক্ষোভ আর আরও তিক্ততায় ও কীট দিয়ে ভরে দিত মৃত্যুর পানে নিয়ে যাওয়া সুবাসপূর্ণ ভালবাসার পেয়ারা বাগানটিকে। কোনভাবেই এড়াতে না পেরে যেভাবে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া যুদ্ধের কথা ভাবত আমারান্তা তেমনিভাবে ভাবত রেবেকাকে । কিন্তু তার ভাই যখন স্মৃতিগুলোকে অক্ষম করে ফেলেছিল তখন সেগুলোকে করেছিল আরও জ্বলন্ত । বহু বছর ধরে সে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছে যাতে করে ঈশ্বর তাকে, রেবেকার আগেই মৃত্যুর মত শাস্তি, না পাঠান । প্রতিবার যখন রেবেকার বাড়ির পাশ দিয়ে যেত, দেখতে পেত ধবংসের আগ্রাসন, আর সে আনন্দ পেত এই ভেবে যে ঈশ্বর তার প্রার্থনায় কান দিচ্ছে । এক বিকেলে যখন বারান্দায় সেলাই করছিল তখন হঠাৎ তার স্থির বিশ্বাস আসে যে যখন তার কাছে রেবেকার মৃত্যু সংবাদ নিয়ে আসবে সে তখন এই জায়গাতেই একই ভাবে, এই একই আলোর নীচে বসে থাকবে । সে অপেক্ষায় বসে রইলো, যেমনটি লোকে বসে থাকে এক চিঠির অপেক্ষায়, আর এটা সত্য যে এক সময় সে বোতাম ছিঁড়ে ফেলতো আবার নতুন করে লাগাবার জন্য যাতে করে অলসতা তার অপেক্ষার সময়টাকে আরও দীর্ঘ ও উৎকণ্ঠাময় করে না তোলে। বাড়ির কেউই টের পায় না যে তখন আমারান্তা রেবেকার জন্য সুন্দর এক সমাধিবস্ত্র সেলাই করেছে। পরে যখন আউরেলিয়ানো ত্রিস্তে বলে ফেটে যাওয়া চামড়া ও মাথার খুলির উপর অল্প কয়েকটি গোছা হলদেটে সুতোর প্রতিমূর্তিকে দেখতে পেয়েছে, আমারান্তা অবাক হয় না কারণ বর্ণিত অপচ্ছায়াটা ছিল একইরকম যা সে অনেকদিন যাবতই কল্পনা করে আসছে । সে সিদ্ধান্ত নেয় রেবেকার মৃতদেহে আগের চেহারা পুনরুদ্ধার করার, মুখের বিকৃতি প্যারাফিন দিয়ে ঢেকে দেবার, আর এক সেন্টদের পরচুলা বানাবার, তার জন্য । সুন্দর এক মৃতদেহ সাজাবে সে মখমলের সমাধিবস্তু দিয়ে, বেগুনী রঙয়ের ঝালর ঢাকা কফিন দিয়ে আর জাকজমকপূর্ণ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পর অর্পন করবে কীটদের হাতে । সে এই পরিকল্পনা এতই ঘৃণা দিয়ে করে যে ভালবেসে করলেও ফলাফলটা একই হত। কিন্তু কোন বিভ্রান্তি থেকে সে বিহবল হয় না, বরঞ্চ সে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র খুঁটিনাটিগুলোকে নিখুঁত করে তোলে, এক বিশেষজ্ঞের চেয়েও ভাল করে যেন সে এক মৃত্যুর আচার অনুষ্ঠানের ওস্তাদ । একমাত্র যেটা সে চিন্তা করেনি তা হচ্ছে ঈশ্বরের কাছে এত অনুনয়ের পরও রেবেকার আগেই সে মারা যেতে পারে, আর সত্যি সত্যি তাই ঘটে। কিন্তু শেষ মুহূর্তগুলোতে আমারান্তা কোনরকমের ক্ষোভ অনুভব করে না, বরং ঘটে উল্টো, সকল প্রকারের তিক্ততা থেকে সে ছিল মুক্ত, কারণ কয়েক বছর আগে থেকে মৃত্যু তাকে মৃত্যুর কথা ঘোষণা করে সৌভাগ্যবতী করে । এক জ্বলন্ত মধ্য দিনে, মেমের স্কুলে যাবার কিছুক্ষণ পর তার বারান্দায় সেলাইরত অবস্থায় দেখতে পায় তাকে । সঙ্গে সঙ্গেই চিনতে পারে তাকে আর মৃত্যুর মধ্যে ভীতিপ্রদ কিছু ছিল না, কারণ সে ছিল নীল পোশাক পরিহিত লম্বা চুলের এক মেয়ে, চেহারাটা একটু সেকেলে, কিছু কিছু দিক থেকে পিলার তেরনেরা যখন রান্নাঘরে সাহায্য করত অনেকটা সেই সময়ের তার মতো । যদিও সে ছিল ভীষণ বাস্তব,ভীষণ মানবিক । এতই বাস্তব যে আমারান্তার কাছে সুইয়ে সুতো পরানোর জন্য সাহায্য চায়, তা সত্ত্বেও ফের্নান্দা অনেকবারই সেখানে উপস্থিত হলেও দেখতে পায় না তাকে । মৃত্যু ওকে বলে না কবে সে মারা যাবে, বা বলে না ওর জন্য নির্দেশিত ঘন্টা রেবেকার আগে কি না, বরং ওকে আদেশ করে পরের এপ্রিলের ছয় তারিখের মধ্যে নিজের সমাধিবস্ত্র সেলাই আরম্ভ করতে । ওকে অনুমতি দেয় নিজের ইচ্ছেমতো জটিল ও সুন্দর করে তৈরি করতে । কিন্তু করতে হবে রেবেকারটির মত একইরকম আন্তরিকতা দিয়ে, আর তাকে সতর্ক করে দেয় যে, যেদিন সে বস্ত্র সেলাই শেষ করবে সেই রাতেই সে মারা যাবে ব্যাথা, ভয় বা তিক্ততা ছাড়া । যতবেশী সময় নষ্ট করা সম্ভব তা করার জন্য, আমারান্তা কিছু বায়াল (বিশেষ ধরনের লিনেন ) লিনেনের মোটা সুতোর অর্ডার দেয় আর নিজেই বোনে কাপড় তা থেকে । সে এতই সতর্কতার সঙ্গে কাজটা করে যে এতেই কেটে যায় চার বছর । এরপর আরম্ভ করে এমব্রয়ডারি । এভাবে যখন অবশ্যম্ভাবী সেলাইয়ের সমাপ্তি নিকটবর্তী হতে থাকে তখন বুঝতে পারে একমাত্র কোনো অলৌকিক ঘটনাই তার এই কাজকে রেবেকার মৃত্যুর পর পর্যন্ত লম্বা করতে সক্ষম হবে; কিন্তু সেই একই মনযোগ তাকে প্রদান করে হতাশাটাকে মেনে নেবার জন্য শেষতক যতটুকু প্রশান্তির প্রয়োজন । এই সময়েই সে বুঝতে পারে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার সেনার মাঝের দুষ্টচক্রের ব্যাপারটাকে । পৃথিবী ছোট হয়ে অবস্থান নেয় তার ত্বকের উপর আর তার ভিতরটা মুক্ত হয় সব রকমের তিক্ততা থেকে । এই উন্মোচন বহুবছর আগে ঘটেনি বলে দুঃখ হয় তার , তখন, যখন সমস্ত স্মৃতিকে পরিশোধন করে, বিশ্বমন্ডলের নতুন আলোয় পুনর্গঠন করে, সন্ধ্যেবেলায় পিয়েত্র ক্রেসপি থেকে ছড়ানো গন্ধে একটুও না কেঁপে, রেবেকাকে তার দুঃখের ক্লিষ্টতা থেকে মুক্ত করা সম্ভব ছিল; ঘৃণা বা ভালবাসার জন্য নয় বরং অপরিমেয় নিঃসঙ্গতা মোচনের জন্য । এক রাতে মেমের কথা থেকে যে ঘৃণা সে লক্ষ করে তাতে সে বিচলিত হয় না কারণ তাকে উদ্দেশ্য করে বলা হলেও সে বোধ করে আর এক নিষ্কলুষ বয়োঃসন্ধিকালের পুনরাবৃত্তি যেটা নাকি তারটার মতই হতে পারতো কিন্তু এরই মধ্যে সেটা বিদ্বেষের কলুষে পূর্ণ । কিন্তু তখন তার নিয়তিকে সে এমন গভীরভাবে মেনে নিয়েছে যে সবরকমের সংশোধনের পথ যে তার জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছে তা নিশ্চিতভাবে জানার পরও একটুও বিচলিত হয় না । তখন তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল সমাধিবস্ত্রটাকে শেষ করা । প্রথমদিকে যেমন অপ্রয়োজনীয় খুঁটিনাটি দিয়ে কাজটাকে শ্লথ করছিল তা না করে তরান্বিত করে শেষ করতে । এক সপ্তাহ আগে সে হিসেব করে দেখে শেষ ফোরটা দেবে সে চারই ফেব্রুয়ারী রাতে, আর মেমের কাছে উদ্দেশ্য না ভেঙে বলে, সে যেন পরেরদিন হওয়ার কথা, ক্লাভিকরডের কনসার্টটা যেন এগিয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু মেমে তাতে কান দেয় না । আমারান্তা মৃত্যুকে আটচল্লিশ ঘন্টা পিছিয়ে দেবার জন্য উপায় খোঁজে, এমনকি তার মনে হয় মৃত্যু তার কথায় কান দিয়েছে কারণ চৌঠা ফেব্রুয়ারির রাতে এক ঝড়ে বৈদ্যুতিক প্লান্ট বিকল হয়ে পরে, কিন্তু পরেরদিন সকাল আটটায়, সে দেয় তখন পর্যন্ত কোনো নারীর দ্বারা শেষ করা সবচেয়ে সুন্দর কাজের উপর শেষ ফোড়টা, আর কোনো নাটকীয়তা ছাড়াই ঘোষণা করে যে সন্ধ্যে নামার পর সে মারা যাবে । পরিবারের সকলকেই সে শুধু সতর্ক করে না, সতর্ক করে সাড়া শহরকে, কারণ সে ভেবেছিল পৃথিবীর লোকদের শেষবারের মত এক উপকার করে এক জঘন্য জীবনের শোধন করা যেতে পারে, ভাবে মৃতদের কাছে চিঠিপত্র নিয়ে যাবার জন্য তারচেয়ে উপযুক্ত আর কেউ হতে পারে না ।

    আমারান্তা বুয়েন্দিয়ার গোধুলি আলোয় মৃত্যুর উদ্দেশ্যে চিঠি নিয়ে যাবার জন্য নোঙ্গর তোলার খবর দুপুরের আগেই সারা মাকন্দোতে ছড়িয়ে পরে; আর বেলা তিনটের সময় বসার ঘরে ছিল এক বাক্সভর্তি চিঠি । যারা চিঠি লিখতে চায়নি তারা আমারান্তাকে মৌখিক বার্তা দেয় যে বার্তার প্রাপকদের নাম, মৃত্যুর তারিখ সে খাতায় লিখে নেয় । “দুশ্চিন্তা করো না”- প্রেরকদের আশ্বস্ত করে সে –“পৌঁছুনোর পর প্রথমেই ওদের কথা জিজ্ঞেস করে তোমাদের বার্তা পৌঁছে দিব” । মনে হচ্ছিল সে একজন প্রবঞ্চনাকারী । শারিরীক বা মানসিক বৈকল্যের কোনো লক্ষণ বা কোনো ব্যথার চিহ্ন আমারান্তার মাঝে দেখা যায় না, এমনকি সবকিছু শেষ করার ফলে মনে হচ্ছিল তার যেন একটুখানি বয়স কমে গিয়েছে । সবসময়ের মতই সে ছিল ঋজু ও কৃশকায় । যদি না উচু হয়ে থাকত ও কিছু দাত পরে গিয়ে না থাকত তাহলে ওকে সত্যিকার বয়সের তুলনায় অনেক কম বয়সীই মনে হতো । পিচ দেয়া এক বাক্সে চিঠিগুলো রাখার ব্যবস্থা সে-ই করে আর নির্দেশ দেয় এমনভাবে বাক্সটা তার কফিনে রাখতে যাতে আর্দ্রতা থেকে যতটা সম্ভব রক্ষা পায় । সকালে ডেকে আনা এক ছুতোর বৈঠকখানায় দাঁড়িয়ে এমনিভাবে কফিনের মাপ নেয়, যেন পোশাক বানানোর মাপ নিচ্ছে । শেষের ঘন্টাগুলোতে সে এমন প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে যাতে কোরে ফের্নান্দার মনে হয় সে সবার সঙ্গে প্রহসন করছে ।

    উরসুলা, যার অভিজ্ঞতা ছিল যে বুয়েন্দিয়ারা অসুস্থতা ছাড়াই মারা যায়, তার কোন সন্দেহ থাকে না যে আমারান্তা মৃত্যুর পূর্ববোধ পেয়েছে, কিন্তু তারপরও তাকে উদ্ভিগ্ন করে তোলে বাক্সভর্তি চিঠিগুলো, আশংকা করে দ্রুত পৌঁছানোর জন্য প্রেরকরা তাকে না জ্যান্তই কবর দেয়। কাজেই সে অনাহুতদের সঙ্গে চিৎকার করে বাড়ী খালি করার কাজে নেমে পড়ে। আর বেলা চারটার সময় সে সফল হয়। সে সময়ে আমারান্তা নিজের সবকিছু গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া শেষ করেছে। শুধু মাত্র পালিশ না করা কাঠের করুন কফিনের উপর রাখা ছিলো মৃত্যুর মধ্যে নিয়ে যাবার জন্য এক প্রস্থ পোষাক ও একজোড়া কর্ড কাপড়ের চপ্পল। সে এই সতর্কতা অবলম্বন করে কারণ তার মনে পড়ে যায় যখন কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া মারা যায় তখন নতুন একজোড়া জুতো কিনতে হয়েছিলো, কারণ তার অবশিষ্ট বলতে ছিল একজোড়া ঘরে পরার চপ্পল, যেটাকে সে কর্মশালায় ব্যবহার করতো। পাঁচটা বাজার কিছু আগে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো আসে মেমেকে কনসার্টে নেবার জন্য। সে আশ্চর্য হয়ে দেখে যে বাড়ী প্রস্তুত করা হয়েছে এক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য। কাউকে যদি তখন সত্যিকার অর্থে জীবন্ত বলে মনে হতো সে ছিল প্রশান্ত আমারান্তা । যেন তখনও তার ফসল কেটে ঘরে তোলার মত যথেষ্ট সময় হাতে ছিলো। আমারান্তা ও মেমে ওর কাছ থেকে ব্যঙ্গাত্মক বিদায় নেয় আর প্রতিশ্রুতি দেয় পরের শনিবার তার পুনরুজ্জীবন উৎসবের। আমারান্তা মৃতদের কাছে চিঠি নিয়ে যাবার সংবাদ জনসাধারণের কাছে শুনে আকর্ষিত ফাদার আন্তনিয় ইসাবেল পাঁচটার সময় আসে ভিয়াটিকো (মরণাপন্নদের মুখে দেবার জন্য ছোট ছোট রুটি) সাথে নিয়ে, আর পনের মিনিট তাকে অপেক্ষা করতে হয় মরণাপন্নের বাথরুম থেকে বের হবার জন্য। যখন পিঠের উপর চুল ছাড়া ম্যাডাপোলাম কাপড়ের রাত পোষাক পরিহিতা আমারান্তাকে দেখে থুত্থূরে যাজকের মনে হয় ব্যাপারটা এক কৌতুক ছাড়া কিছুই নয়, আর উপাসনায় সাহায্যকারী বালককে বিদায় দেয়। ভাবে, এসে যখন পড়েছেই, সে বিশ বছর জীবনের পাপ স্বীকার করতে না চাওয়া আমারান্তার কাছ থেকে পাপ স্বীকারোক্তি আদায় করে নেবে। সহজভাবে আমারান্তা অস্বীকার করে আর জানায়, আত্মিক কোন সাহায্যে তার দরকার নাই কারণ তার বিবেক সম্পূর্ণরূপে অমলিন। ফের্নান্দা শিউরে ওঠে। তার কথা অন্যে শুনতে পাবে তার তোয়াক্কা না করে উচু স্বরে জিজ্ঞেস করে কি ভয়ংকর পাপ সে করেছে যে স্বীকারোক্তির লজ্জার চেয়ে পাপপূর্ণ এক মৃত্যুকে সে বেছে নিচ্ছে, ফলে আমারান্তা শুয়ে পরে এবং উরসুলাকে বাধ্য করে তার কুমারীত্ব সম্পর্কে জনসম্মুখে সাক্ষ্য দিতে।

    “কেউ যেন মনে না করে”- চিৎকার করে উরসুলা যাতে করে ফের্নান্দা শুনতে পায়-“আমারান্তা বুয়েন্দিয়া যে অবস্থায় এসেছিল সেই একই অবস্থায় এই দুনিয়া থেকে চলে যাচ্ছে”। আর সে উঠে দাঁড়ায় না। বালিশে হেলান দেয়, যেন সত্যি সত্যি সে অসুস্থ। সে তার লম্বা বেনী বাঁধে আর সেগুলোকে কানের উপর গোল করে চূঁড়া করে, যেন মৃত্যু তাকে বলেছিলো এভাবেই কফিনে থাকতে হবে। পরে উরসুলার কাছে এক আয়না চেয়ে নিয়ে চল্লিশ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মত বয়সের কারণে জীর্ন মুখটা দেখে আর মনের মধ্যে নিজের যে প্রতিচ্ছবি তার ছিল তার সঙ্গে মিলে যাওয়ায় আশ্চর্য হয়ে পরে। শোবার ঘরে নীরবতা নেমে আসায় অন্ধকার নেমে আসছে, বুঝতে পারে উরসুলা। “ফের্নান্দার কাছ থেকে বিদায় নে”-ওকে অনুনয় করে-“এক মিনিটের মীমাংসা সারা জীবনের বন্ধুত্বের চেয়েও দামী”।
    “ আর কোন লাভ নেই, এতে”- অস্বীকার করে আমারান্তা ।

    পূর্বপরিকল্পনানুযায়ী মঞ্চে আলো জ্বলে অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হলে ওর কথা না ভেবে পারে না মেমে। বাজনাটার অর্ধেক শেষ হবার পর কেউ একজন খবরটা ওর কানে দেয় আর অনুষ্ঠানটা স্থগিত হয়ে যায়। প্রচন্ড ভীড়ে ঠেলাঠেলি করে পথ করে নিতে হয় আউরেলিয়ানো সেগুন্দোকে, কুশ্রী বিবর্ণ হয়ে যাওয়া, হাতে কালো ব্যান্ডেজ বাধা, জাঁকজমকপূর্ণ সামাধিবস্ত্র পরিহিত জরাজীর্ণ কুমারীর মরদেহ দেখতে। বসার ঘরে তাকে দেখানোর জন্য রাখা হয়েছিলো চিঠির বাক্সটার পাশে।
    আমারান্তা যাওয়ার নয় রাত পর্যন্ত বিছানা ছেড়ে ওঠে না উরসুলা। সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদ ওর দেখাশোনার ভার নেয়। ওর জন্য শোবার ঘরে খাবার নিয়ে যেত, নিয়ে যেত বিহা(bija-এক ধরনের কাকড়লের মত লাল ফল) ভেজানো পানি গোছলের জন্য, আর মাকন্দোতে যা ঘটতো সে সম্মন্ধে ওয়াকিবহাল রাখত তাকে। আউরেলিয়ানো সেগুন্দো ঘন ঘন দেখতে যেত তাকে, আর পড়ার কাপড়-চোপড় ও দৈনন্দিন জীবনের জন্য অপরিহার্য জিনিষগুলো তার বিছানার কাছে রাখার অল্প সময়ের মধ্যেই তার হাতের নাগালের মধ্যে এক বিশ্ব গড়ে ওঠে। অবিকল তারই মতো দেখতে, যে আমারান্তা উরসুলাকে সে লিখতে শিখিয়েছে তার প্রতি প্রচন্ড ভালোবাসা তৈরী হয় তার। তার চিন্তারস্ বচ্ছতা, নিজের কাজ নিজে করার ক্ষমতা দেখে প্রাকৃতিক একশ বছরের ভারের কাছে স্বাভাবিক ভাবেই হার মানার ব্যাপারে সাধারণের মনে সন্দেহ তৈরি হতো আর যদিও তা স্পষ্ট ছিল যে তার দৃষ্টিতে সমস্যা আছে কিন্তু কেউ সন্দেহও করতে পারেনি যে সে ছিল সম্পূর্ণ রূপে অন্ধ। সে সময়ে বাড়ীর জীবনটাকে লক্ষ করার জন্য তখন সে এতই সময় ব্যয় ও নীরবতা ব্যয় করত যে সে-ই প্রথম বুঝতে পারে মেমের ভিতরের নিঃশব্দ অস্থিরতা। “এদিকে আয়”- ওকে বলে “ এখন যখন আমরা দুজনেই এখানে একা, এবার তাহলে এই থুত্থুড়ে বুড়ির কাছে স্বীকার কর তোর কী হয়েছে” ।

    মেমে এক থামা থামা হাসি দিয়ে এড়িয়ে যায় ব্যাপারটা। উরসুলা জোর করে না, কিন্তু তার সন্দেহ সম্বন্ধে নিশ্চিত হয় যখন থেকে মেমে আর ওকে দেখতে আসে না। জানত যে সে স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও আসে সাজগোজ করে, এক মুহূর্তও স্থির থাকে না, রাস্তায় বের হবার ঘন্টা আসার জন্য অপেক্ষার সময়টা তার পাশের শোবার ঘরের বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে রাত কাটায় আর এমনকি প্রজাপতির ডানা ঝাপটানিতেও উত্যক্ত হয় সে। একবার সে বলতে শোনে যে মেমে যাচ্ছে আউরেলিয়ানো সেগুন্দোকে দেখতে কিন্তু অবাক হয়ে যায় যখন ফের্নান্দার স্বামী বাড়ীতে আসে মেমেকে খুঁজতে, আর ফের্নান্দা কিছুই সন্দেহ না করাতে অবাক হয়ে যায় ফের্নান্দার কল্পনার সীমাবদ্ধতা দেখে। । এক রাতে সিনেমাহলে মেমের সঙ্গে একলোককে চুমু খেতে দেখে ফের্নান্দা বাড়ি তোলপাড় করে তোলার অনেক আগেই এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিলো যে মেমে গোপন জরুরী কোনো ব্যাপারে জড়িয়ে চাপা উৎকন্ঠায় আছে।

    মেমে এই সময় এতই বুদ্ধিহীন হয়ে পড়ে যে উরসুলা তার বিরুদ্ধে নালিশ করেছে বলে সে অনুযোগ করে। আসলে সে নিজের কাছেই নিজের বিরুদ্ধে নালিশ করে। অনেক আগে থেকেই সে চলার পথে এমন কিছু চিহ্ন রেখে যাচ্ছিল যা জাগিয়ে দিত ঘোর তন্দ্রাচ্ছন্ন কাউকেও আর ফের্নান্দার ব্যাপারটাকে আবিষ্কার করতে এত সময় লাগে কারণ সেও অদৃশ্য চিকিৎসকদের সঙ্গে তার সম্পর্কের কারণে আচ্ছন্ন ছিল এক প্রচন্ড ঘোরে। এমনকি তারপরও শেষ পর্যন্ত তার নজরে পরে মেয়ের গভীর নিরবতা, হঠাৎ ক্রোধোন্মত অবস্থা, মনমেজাজের আকস্মিক পরিবর্তন, আর মেয়ের কথায় স্ববিরোধিতা। সে আরম্ভ করে এক অনমনীয় কিন্তু গোপন পাহারার। আগের মতই বান্ধবীদের সঙ্গে বাইরের যেতে দেয় তাকে। শনিবারের পার্টির জন্য পোষাক পরায় সাহায্য করে, আর এমন কোনো প্রশ্ন করে না যাতে করে মেমে সতর্ক হয়। ফের্নান্দার কাছে এমন অনেক প্রমাণ ছিল যে মেমে যা বলে তার বদলে অন্য কিছু করে। কিন্তু তারপর তার সন্দেহ সম্পর্কে কোন ইঙ্গিত দেয় না। অপেক্ষা করে মোক্ষম সময়ের। এক রাতে মেমে ঘোষণা করে যে সে বাবার সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাচ্ছে। খানিক পর ফের্নান্দা শুনতে পায় পার্টিতে বাজির শব্দ ও নির্ভুলভাবে শোনে আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর বাজানো অ্যাকরডিয়ানের সুরে পেত্রা কতেসের বাড়ির দিকে থেকে ভেসে আসতে। গায়ে কাপড়ও চড়ায় সে, ঢুকে গিয়ে সিনেমা হলে, লেন্সের আলো আঁধারের মধ্যে চিনতে পারে মেয়েকে। অনুমান নিশ্চিত হবার কারণে তার স্তম্ভিত অনুভুতি বাধা দেয় যার সঙ্গে মেমে চুমু খাচ্ছিল তাকে দেখতে, কিন্তু দর্শকদের কান ফাটানো হাসির মধ্যেও শুনতে পায় লোকটার কাঁপা কাঁপা গলার স্বর । “দুঃখিত প্রিয়তমা” ওকে বলতে শোনে, আর কোনো কথা না বলে হল থেকে বের করে কোলাহলপূর্ণ তুর্কদের সড়ক দিয়ে লজ্জাজনকভাবে মেমেকে নিয়ে এসে শোবার ঘরে ঢুকিয়ে তালাবদ্ধ করে।

    পরের দিন সন্ধে ছয়টায় লোকটার গলা চিনতে পারে যখন সে মেমের সঙ্গে দেখা করতে যায়। সে ছিল অল্প বয়সী, গায়ের রং ফ্যাকাশে, তার ছোখদুটি ছিল কালো বিষাদমাখা। যেটা দেখে ফের্নান্দা হয়ত এতটা আশ্চর্য হত না যদি না জিপসিদের সঙ্গে তার পরিচয় থাকত, আর যুবকটার মধ্যে এমন এক স্বপ্নালু ভাব ছিল যে ফের্নান্দার চেয়ে কম কঠোর যে কোনো মা-ই বুঝতে পারত মেমের প্রেমে পড়ার কারণ। সুতা বেরিয়ে পরা লিনেনের পুরোনো জামা গায়ে, অন্য উপায় না পেয়ে সাদা দস্তার পাতের তালি দেয়া জুতাপরা যুবকের হাতে ছিল গত শনিবারে কেনা এক খড়ের হ্যাট। সেই সময়ের মত ভীত সে সারা জীবনে কখনই ছিল না বা কখনই সে আর এত ভয় পাবে না। কিন্তু তার আত্মসম্মানবোধ ও রাশভারী চালচলন তাকে অপমান থেকে বাঁচায় আর সেই সঙ্গে ছিল তার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য যার জন্য মলিন হয়ে পরে তার রুক্ষ কাজ করা হাত ও নখ। তার পরও ফের্নান্দার এক নজরই বোঝার জন্য যথেষ্ট ছিল যে সে ছিল এক দক্ষ কারিগর। তার চোখে পরে পরনের একমাত্র রোববারের স্ট্যুটের নীচে কলা কোম্পানিতে কাজ করার ফলে চর্মরোগের ক্ষয়ে যাওয়া ত্বক। ছেলেটাকে কোন কথাই বলতে দেয় না সে। এমনকি দরজা পার হতেও দেয় না তাকে আর এক মুহূর্ত পরই দরজা বন্ধ করে দিতে হয় তাকে, কারণ বাড়ী ভরে যায় হলুদ প্রজাপতিতে।
    “দূর হয়ে যা”- ওকে বলে “ ভদ্র লোকদের সঙ্গে দেখা করতে চাওয়ার মত কোনো কারণই থাকতে পারে না তোর” ।
    ছেলেটার নাম ছিল মাউরিসিও বাবিলোনিয়া। মাকন্দোতেই তার জন্ম ও বড় হয়েছে সেখানেই, আর কলা কোম্পানিতে সে ছিল শিক্ষানবিশ মেকানিক।

    মেমের সঙ্গে ওর পরিচয় ঘটনাক্রমে। এক বিকেলে প্যাট্রিসিয়া ব্রাউনের সঙ্গে কলা প্লান্টেশনে ভ্রমনের জন্য গাড়ি খুঁজতে যায় মেমে। ড্রাইভার অসুস্থ খাকায় ওকে চালক হিসেবে পাঠানো হলে শেষ পর্যন্ত মেমের সুযোগ হয় চালকের পাশে বসে গাড়ী চালানো দেখার ইচ্ছেটাকে পূরণ করার। আসল ড্রাইভারের উল্টো, মাউরিসিও ব্যাবিলনিয়া ওকে হাতে কলমেও একবার প্রদর্শন করে। সেটা ছিল যখন মেমে ব্রাউন সাহেবের বাড়ী বেড়াতে যেত এবং মেয়েদের জন্য গাড়ী চালানোটা অসম্মানজনক বলে মনে করা হোত তখনকার কথা। কাজেই শুধুমাত্র তথ্যগত জ্ঞান নিয়েই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। আর কয়েক মাসের মধ্যে মাউরিসিও ব্যাবিলনিয়র সঙ্গে তার দেখা হয় না। পরে তার মনে পরে যাবে যে, ভ্রমনের সময় হাতের রুক্ষতা বাদ দিলে ওর পৌরুষোচিত সৌন্দর্য তাকে আকর্ষণ করেছিল। প্যাট্রিসিয়া ব্রাউনকে খুলে বলাতে সে বলে তার নিরাপত্তাবোধে হুমকী মনে হওয়াতে হাতের রুক্ষতা তার ভাল লাগেনি । বাবার সঙ্গে প্রথম শনিবার সিনেমায় যাওয়ার পর অদূরে লিনেনের জামাপরা মাউরিসিয়ো ব্যাবিলনিওকে বসা দেখে, আর লক্ষ করে ওকে বার বার দেখতে গিয়ে ছবিতে মনযোগ দিচ্ছে না সে। আর শুধু মাত্র দেখার জন্যই দেখা নয় সে যে দেখেছে এটা মেমেকে বোঝানোর জন্যই দেখা। ব্যাপারটার নগ্নতায় ক্রুদ্ধ হয় মেমে । ছবি শেষে আউরেলিয়ানো সেগুন্দোকে সম্ভাষণ জানাতে নিকটে আসে আর কেবলমাত্র তখনই মেমে জানতে পারে যে ওরা একে অপরকে চেনে, কারণ সে আগে আউরেলিয়ানো ত্রিস্তের সেকেলে ইলেক্ট্রিক প্লান্টে কাজ করত, আর ওর বাবার সঙ্গে তার ব্যবহার ছিল অধস্তন ব্যক্তির মত, ফলে তার যে অহংকারবোধ, মেমেকে পীড়া দিচ্ছিল তা কেটে যায়। যে রাতে ওকে স্বপ্ন দেখে যে একটা জাহাজডুবি থেকে সে তাকে বাচাচ্ছে তার আগে একাকী কখনই ওরা দুজনে দেখা করেনি অথবা সম্ভাষন ছাড়া ওর সঙ্গে কোন কথাও বলে নি মেমে, তবুও তখন তার কৃতজ্ঞতার বদলে প্রচন্ড রাগ হয়। যেন ও যে সুযোগটা চাইছে মেমে সেই সুযোগ দিয়ে দিয়েছে যেখানে মেমে ছিল তার সম্পূর্ণ উল্টো আর সে তা শুধু তার বেলায়ই নয়, মেমের ব্যাপারে আগ্রহী যে কোনো পুরুষের বেলায়ই। কাজেই স্বপ্ন দেখার পর তার এতই বেশী রাগ হয় যে ঘৃণার বদলে দেখা করার এক অদম্য ইচ্ছে দেখা দেয় তার মধ্যে। এক সপ্তাহের মধ্যে উৎকন্ঠাটা আরও তীব্র হয় আর শনিবারটায় ওর সঙ্গে দেখা করা এতই জরুরী হয়ে পরেছিলো যে তাকে প্রচন্ড কসরত করতে হয় যখন মাউরিসিও ব্যাবিলনিয় ছবি দেখার সময় ওকে সম্ভাষণ জানালে তার হৃদপিন্ডটা যে লাফ দিয়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইছে তা ওকে বুঝতে না দেবার জন্য। ক্রোধ বা ভাললাগার এই কিংকর্তব্যবিমুঢ় অবস্থায় প্রথমবারের মত ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় আর শুধু তখনই মাউরিসিও ব্যাবলিনিয় নিজেকে তার হাত ঝাকাতে দেয়। মুহূর্তের এক ভগ্নাংশের জন্য এই আবেগের কারণে অনুশোচনা বোধ করলেও অনুশোচনাটা নিষ্ঠুর এক সন্তুষ্টিতে রূপান্তরিত হয় ওর হাতভেজা আর ঠান্ডা দেখে। এই রাতেই বুঝতে পারে যে মাউরিসিও ব্যবিলিনিয়াকে তার উচ্চাশার অসারতা না দেখানো পর্যন্ত সে মুহুর্তের জন্যও স্বস্তি পাবে না, আর সপ্তাহটা কাটায় সে এই উৎকন্ঠায় খাবি খেতে খেতে। গাড়ি খুঁজতে যাবার সমস্ত নিষ্ফল অজুহাত শেষ করে ফেলে সে পাত্রিসিয়া ব্রাউনের সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত সে সেই উত্তর আমেরিকার লালচুলোর শরণাপন্ন হয় কারণ তখন সে মাকন্দোতে ছুটি কাটাচ্ছিল, আর নতুন মডেলের গাড়ী চেনানোর অজুহাতে ওকে গ্যারেজে নিয়ে যেতে বাধ্য করে। যে মুহূর্তে থেকে তাকে দেখে তখন থেকে নিজেই নিজের সঙ্গে প্রতারণা করে। বুঝতে পারে সত্যিকার অর্থে মাউরিসিও ব্যবলিনিয়র সাথে একাকী কাটানোর ইচ্ছেটাকে আর সহ্য করতে পারছিল না, আর তার প্রচন্ড রাগ হয় যখন বুঝতে পারে যে তাকে আসতে দেখে মাউরিসিও সেটা ধরে ফেলেছে।

    “নতুন মডেলগুলো দেখতে এসেছি”– বলে মেমে “হ্যাঁ, এটা ভাল এক অজুহাত”- সে বলে। মেমে বুঝতে পারে যে সে অহংকারের আগুনে টগবগ করে ফুটছে, আর মরিয়া হয়ে অপমান করার উপায় খোঁজে। কিন্তু সে তাকে সময় দেয় না। “ভয় পেয় না” নীচু স্বরে বলে “এটাই প্রথমবার কোন মেয়ে কোন পুরুষের জন্য পাগল হয়নি”।মেমে এতই অসহায় বোধ করে যে নতুন মডেলগুলো না দেখেই গ্যারেজ ত্যাগ করে প্রচন্ড রাগে কাঁদতে কাঁদতে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে রাতটা কাটায়। লালচুলোদক্ষিন আমেরিকান সত্যিকার অর্থে যাকে তার ভাল লাগতে শুরু করে ছিলতাকে মনে হয় ডায়াপার পরা এক বাচ্চা ছেলে। আর তখনই বুঝতে পারে হলুদ প্রজাপতিগুলো মাউরিসিও ব্যাবিলনিয়ার উদয় হবার আগে আগে আসে। এর আগেও সে দেখেছে ওগুলোকে, বিশেষ করে গ্যারেজের ভেতরে আর দেখে ভেবেছিল, রংয়ের গন্ধে ওগুলো হয়ত এসে থাকবে। মাঝে মাঝে ওগুলিকে অনুভব করছে সিনেমা হলে ওর মাথার উপর ডানা ঝাপ্তাতে। কিন্তু মাউরিসিও ব্যাবিলনিয়া যখন তাকে এমন এক অপচ্ছায়ার মত অনুসরন করতে থাকে যার উপস্থিতি শুধুমাত্র সেই বুঝতে পারত, তখনই সে বুঝতে পারে যে হলুদ প্রজাপতিগুলোর সঙ্গে ওর কোন সম্পর্ক আছে। মাউরিসিও ব্যাবিলনিয়া সর্বসময় উপস্থিতথাকত সর্বসাধারনের কনসার্টে, সিনেমায়, হাই মাস-এ আর ওকে বের করতে মেমের চোখ দিয়ে দেখতে হত না, কারণ প্রজাপতিগুলোই সেটা নির্দেশ করত। একবার দমবন্ধ করা এত ডানা ঝাঁপটানো আউরেলিয়ানো সেগুন্দের কাছে অসহ্য হয়ে পরলে মেমের প্রচন্ড ইচ্ছে জাগে বাবার কাছে সব কিছু স্বীকারকরতে যেমনটি সে প্রতিজ্ঞা করেছিল, কিন্তু তার সহজাত প্রবৃত্তি তাকে বলে এই বার সে সবসময়ের মত হাসবে নাঃ “তোর মা কি বলবে যদি জানতে পারে”। এক সকালে গোলাপ গাছগুলোকে ছাটার সময় ফের্নান্দা পিলে চমকে দেয় এক চিৎকার করে মেমেকে সরিয়ে দেয় বাগানের যে জায়গা থেকে রেমেদিওস লা বেয়্যা স্বর্গারোহন করেছিল সেখান থেকে। হঠাৎ করে এই অনবরত ডানা ঝাঁপটানোর ফলে ফের্নান্দার মনে হয় অলৌকিক সেই ব্যাপারটার পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে আর তার মেয়ের বেলাতে ওগুলো ছিল প্রজাপতি। মেমে দেখে ওগুলোকে, যেন অকস্মাৎ জন্ম হয়েছে ওদের আলো থেকে, আর তার বুকটা ধক করে ওঠে। ঐ মুহূর্তে তার কথা মতো পাত্রিসিয়া ব্রাউনের দেয়া উপহার স্বরূপ এক প্যাকেট নিয়ে ঢোকে মাউরিসিও বাবিলনিয়া। মুখের আরক্তিম ভাব লুকিয়ে, মানসিক তোলপার আড়ালে করে,কোমরকমে মুখে স্বাভাবিক হাসি এনে বলে প্যাকেটটা রোলিং এর উপাকেত্ত, কারন তার আঙ্গুল গুলো মাটির লেগে নোংরা হয়ে আছে। আগে কোথায় দেখেছে তা মনে না করতে পেরে কয়েকমাস পর যাকে বাড়ি থেকে বের করে দেবে তার মধ্যে ফের্নান্দা একমাত্র যা লক্ষ্য করে তা হচ্ছে তার চামড়ার জন্ডিসে আক্রান্ত রোগীর মত হলদেটে রং।

    “লোকটা খুবই অদ্ভুত”- বলে ফের্নান্দা- “ মুখ দেখে মনে হয় শিঘ্রই মারা যাবে”।

    মেমে ভাবে তার মা প্রজাপতিগুলোর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আছে। গোলাপের ঝাড় ছাঁটা হলে হাত ধোয় সে আর প্যাকেটটা শোবার ঘরে নিয়ে যায় খোলার জন্য। ভেতরে ছিল এক ধরনের চীনা খেলনা যেটা পাঁচটা সমকেন্দ্রিক বাক্সের সমন্বয়ে বানানো আর শেষ বাক্রটায় ছিল কোন রকমে লিখতে পারে এমন কারও দ্বারা বহুকষ্টে আঁকাঃশনিবার সিনেমায় দেখা হবে। মেমে দেরী করে আসা হতবুদ্ধি অবস্থায় অনুভব করে এই ভেবে যে রোলিং এর উপর বাক্সটা অনেক সময় ধরে ফের্নান্দার কৌতূহলের সীমার মধ্যে ছিল, যদিও মাউরেসিয়ো ব্যাবিলনিয়ার সাহস দেখে আনন্দিত হয় আর মেমে তার কথা মত সিনেমায় দেখা করবে, তার এই সরল বিশ্বাস মেমেকে দোলা দিয়ে যায়। তখন থেকেই মেমে জানত শনিবার রাতে আউরেলিয়ানো সেসুন্দোর এক কাজ আছে , কিন্তু সারা সপ্তাহ জুড়ে উৎকন্ঠার আগুনে তাকে এমনভাবে জড়িয়ে রাখে যে সে বাবাকে রাজী করায় একাকী ওকে সিনেমায় রেখে যেতে আর শো শেষ হলে ফিরে আসতে। বাতিগুলো জ্বলা অবস্থায় এক রাতের প্রজাপতি তার মাথার উপর ডানা ঝাপটায়। আর তখনই ঘটে ব্যাপারটা।যখন বাতিগুলো নেভে মাউরেসিয়ো ব্যাবিলনিয়া বসে তার পাশে।মেমে অনুভব করে খাবি খাচ্ছে সে এক উৎকন্ঠা জড়িত ভয়ে, যেখান থেকে স্বপ্নে যেমনটি ঘটেছিল, একমাত্র যে তাকে উদ্ধার করতে পারে সে হচ্ছে মোটরের তেলের দুর্গন্ধে ভরা আলো আধাঁরে কোন রকমে দেখতে পারা পাশের লোকটা।
    “যদি না আসতেন”-বলেসে- “আমাকে কখনই আর দেখতে পেতেন না” ।মেমে ওর হাতের ভার অনুভব করে হাঁটুতে আর জানে যে সেই মুহূর্তে উভয়েই চলে এসেছে এক অসহায়ত্বের অন্য পাশে।

    “তোমার যা আমাকে ধাক্কা দেয়”- হাসে “তা হচ্ছে নিখুঁতভাবে তুমি তাই বল যা তোমার বলা উচিৎ নয়”।

    মেমে ওর প্রেমে পাগল হয়ে যায়। ঘুম ও ক্ষিদে নষ্ট হয় তার, আর সে ডুবে যায় নিঃসঙ্গতার এতই গভীরে যে এমনকি বাবাও হয়ে ওঠে এক উৎপাত বিশেষ। ফের্নান্দাকে ধোঁকা দেবার জন্য মিথ্যে কাজের জটিল এক জাল তৈরি করে সে, বান্ধবীদের আর দেখতে যায় না, আর সমস্ত গতানুগতিকতার বেড়া ডিঙ্গিয়ে মাউরিসিও বাবিলনিয়ার সঙ্গে দেখা করে যে কোন সময়, যে কোন জায়গায়। প্রথম প্রথম ওর রুক্ষতা তাকে বিরক্ত করত। প্রথমবার যখন গ্যারেজের পিছন দিককার দূর্বা ঘাসেভরা মরুভূমিতে নির্জনে মিলিত হয় তখনও তাকে দয়ামায়াহীনভাবে টানতে টানতে এমন এক জান্তব অবস্থায় নিয়ে আসে যে তাকে করে ফেলে বিধ্বস্ত। মেমে কয়েকদিন দেরী করে বুঝতে পারে যে এটাও এক ধরনের কোমলতা আর তখন অস্থির হয়ে ওঠে সে, ক্ষার দিয়ে তেল পরিষ্কার করার গন্ধের নিঃশ্বাসে ধাক্কা খাওয়ার উৎকন্ঠায় পাগল হয়ে বাঁচে শুধুমাত্র ওরই জন্য। আমারান্তা মৃত্যুর কিছুদিন আগে পাগলামির ভিতরেও এক প্রকৃতিস্থতার জায়গায় প্রবেশ করলে ভয়ে কাঁপে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার সামনে। তখনই তার কানে আসে তাস দেখে ভবিষ্যত বলে দিতে পারে এমন এক রমনীর কথা আর গোপনে দেখা করতে যায়তার সঙ্গে। সে ছিলো পিলারতেরোনেরা। ভিতরে ঢুকতে দেখেই মেমের গোপনীয়তার কারন বুঝতে পারে সে । “বসো “ – ওকে বলে “এক বুয়েন্দিয়ার ভবিষ্যত বুঝতে আমাকে তাস দেখতে হবে না” । মেমে জানতোও না আর তার কাছে সবসময় অজানা থেকে যাবে যে এই শতবর্ষী ভবিষ্যত বক্তা হচ্ছে তার পরদাদী। সে যখন কঠোর বাস্তবতারসঙ্গে উম্মোচন করে যে প্রেমের উৎকন্ঠা মোচন একমাত্র বিছানাতেই ঘটে, বিশ্রামে নয় মেমের তখন তা বিশ্বাস করতে বাঁধে। মাউরিসিও ব্যাবিলনিয়া যদিও একইমত পোষন করতো তবুও মেমে তাতে বিশ্বাস করে না, কারন ভিতরে ভিতরে তখনো তার কাছে ওটা ছিলো এক মেকানিকের ভুল বিচারবুদ্ধির ফল। তখন সে ভাবতো এক ধরনের ভালোবাসা অন্য ধরনের ভালোবাসাকে পরাজিত করতো কারন পুরুষদের ভালোবাসার প্রকৃতিই হচ্ছে একবার খিদে মিটে গেলে সেই ক্ষুধারঅস্তিত্বঅস্বীকার করা। পিলার তেরোনেরা শুধু যে সেই ভুল ভেঙ্গে দেয় তাই নয় ওদেরকে সাধে সেই ক্যানভাসের বিছানাটা যেখানে তার পেটে এসেছিলো মেমের দাদা আরকাদিও আর পরে সে ধারন করেছিলো আউরেলিয়ানো হোসেকে। পরে ওকে শেখায় শর্ষের পুলটিস থেকে বাষ্প বানিয়ে কিভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারন এড়ানো যায়, আর দেয় এক পানীয় বানানোর প্রনালী যা দিয়ে সমস্যার সময় “এমনকী বিবেকের অনুশোচনা পর্যন্ত দূর করে দেয়” । এই সাক্ষাতের সময়ে মেমের ভিতর অনুপ্রবেশ করে সেই সাহস যেটা নাকি সে অনুভব করেছিলো মাতাল হবার বিকালটাতে। অবশ্য আমারান্তার মৃত্যু তাকে বাধ্য করে সিদ্ধান্তটাকে স্থগিত রাখতে । মৃত্যুর পরের নয়রাত বাড়ী উপচে পড়া ভীড়ের মধ্যে এক মূহুর্তের জন্যও সে মাউরিসিও ব্যাবলিনিয়ার কাছ ছাড়া হয়নি, এরপর আসে লম্বা শোকপর্ব আর বাধ্যতামূলক ঘরে আবদ্ধ থাকার কাল, আর কিছু সময়ের জন্য বিছিন্ন হয়ে পড়ে ওরা। দিনগুলো ছিলো এতই অন্তরজ্বালাপূর্ণ, এতই অদম্য উৎকন্ঠাপূর্ণ, এতই অবদমিত কামনাপূর্ণ যে প্রথম সন্ধায়ই মেমে বের হতে পারে, সরাসরি গিয়ে উঠে পিলার তেরনেরার বাড়ী। মাউরিসিও ব্যবলিনিয়ার কাছে নিজেকে অর্পন করে প্রতিরোধবিহীন, লজ্জাহীন, কোন আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া, এমন এক সহজাত বহমানতা ও সজ্ঞা দিয়ে যে তার চেয়ে বেশি সন্দেহ প্রবন লোক হলে মেমের পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে বলে মনে করে সহজেই তাকে ভুল বুঝতে পারতো। তিন মাসের বেশি সময় ধরে ওদের মিলন ঘটে সপ্তাহে দুইদিন করে, আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর অকপট যোগসাজসের দ্বারা নিরাপত্তা পেয়ে, যে নাকি মায়ের কড়াকড়ি থেকে রেহাই দেবার জন্য মেয়ের যে কোন অজুহাতগুলোকে কোন খারাপ ধারণা না নিয়েই বিশ্বাস করতো।
    যে রাতে ফের্নান্দা ওদেরকে সিনেমা হলে ধরে ফেলে অবাক করে দেয় আউরিলিয়ানো সেগুন্দো নুয়ে পড়ে বিবেকের ভারে, আর মেমের সঙ্গে কথা বলতে যায় তার শোবার ঘরে যেখানে ফের্নান্দা ওকে বন্দি করে রাখে, এই বিশ্বাসে যে মেমে তার কাছে প্রতিশ্রুতির মত সবকিছু উগড়ে দিবে। কিন্তু মেমে সবই অস্বীকার করে । সে এতই আত্ববিশ্বাসী যে ও নিজের নিঃসঙ্গতায় এতই দৃড়চিত্ত থাকে যে আউরোলিয়ানো সেগুন্দোর মনে হয় ওদের মধ্যে এখন আর কোন বন্ধন নেই আর সেই বন্ধুত্ব ও যোগসাজস অতীতের মরিচিকা ছাড়া আর কিছুই নয়। সে মাউরিসিও বাবিলানিয়ার সঙ্গে কথা বলতে স্থির করে এই ভেবে যে প্রাক্তন উপরওয়ালা হিসেবে সে কথা বললে মাউরিসিও তার উদ্দেশ্য ত্যাগ করবে, কিন্তু পেত্রা কতেস এগুলো মেয়েলী ব্যাপার এই বলে তাকে নিবৃত করে, ফলে সে সিদ্ধান্তহীনতায় ভাসতে ভাসতে থাকে আর প্রায় বিশ্বাসই করতে পারে না যে এই বন্দিদশা তার মেয়ের দুর্দশার অবসান ঘটাবে।

    বেদনার কোন চিহ্নই প্রকাশ করে না মেমে। বরং তার উল্টো, পাশের শোবার ঘর থেকে উরসুলা পায় তার ঘুমের প্রশান্ত ছন্দ, তারঘরের কাজকর্মের ধীরস্থিরতা, তার সময়মত খাবার আর তার হজমের সুস্থতা। দুই মাস শাস্তিশেষে উরসুলার মনে একমাত্র যা সন্দেহ জাগিয়ে তোলে তা হচ্ছে সে অন্য সকলের মত সকালে গোসল সারে না, সারে রাত সাতটার সময়। মাঝে মাঝে তার মনে হত বিছে সম্মন্ধে সাবধান করে দেবে তাকে। কিন্তু প্রপিতামহী ওর সম্মন্ধে কানকথা লাগিয়েছে এই ভেবে মেমে ওকে এমনভাবে এড়িয়ে চলে যে সে স্থির করে অনধিকারচর্চা করে তাকে বিরক্ত না করার। বিকেল হলেই হলুদ প্রজাপতিগুলো বাড়ী দখল করে নিত। গোসল সেরে প্রতি রাতেই ফের্নান্দাকে দেখতে পেত, মরিয়া হয়ে কীটনাশক গোলা দিয়ে প্রজাপতি গুলোকে মারতো। “এটা খুবই দুর্ভাগ্যের ব্যাপার” বলত “ সারা জীবন বলতে শুনেছি যে রাতের প্রজাপতি অমঙ্গল ডেকে আনে” । এক রাতে মেমে যখন গোসল সারছিল, ঘটনাচক্রে ফের্নান্দা তার শোবার ঘরে ঢোকে আর সেখানে এত প্রজাপতি ছিল যে সে কোনরকম শ্বাস নিতে পারে না। ওগুলোকে তাড়াবার জন্য হাতের কাছে পাওয়া কাপড় তুলতে গিয়ে মেঝেতে গড়িয়ে-পরা শর্ষের পুটুলির সঙ্গে মেয়ের সন্ধেস্নানের সম্পর্ক ধরতে পেরে ভয়ে তার বুক হিম হয়ে যায়। প্রথমবারেরর মত মোক্ষম সময়ের জন্য সে আর অপেক্ষা করে না । পরের দিন সকালে নতুন মেয়রকে দুপুরের খাবারের নিমন্ত্রণ জানায়, যে নাকি ওর মতই পাহাড়ী এলাকা থেকে নেমে এসেছে, আর তাকে অনুরোধ করে পিছনের আঙ্গিনায় এক রাতের পাহারাদার বসাতে কারণ তার ধারণা মুরগীর বাচ্চাগুলো চুরি হচ্ছে। সেই রাতে পাহারাদার নামিয়ে আনে মাউরিসিও ব্যবিলনিয়াকে যখন সে গোসলখানায় ঢোকার জন্য টাইল সরাচ্ছিল, যেখানে মেমে অপেক্ষা করছিল ওর জন্য নগ্ন অবস্থায় কামনায় জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে, বিছে ও প্রজাপতির দঙ্গলের মাঝে, যেমনটি সে অপেক্ষা করেছে শেষের মাসগুলোর প্রায় প্রতিরাতে । মেরুদন্ডের মধ্যে এক বুলেট নিয়ে মাউরিসিওকে বিছানায় বন্দি হতে হয় সারা জীবনের জন্য । একবারের জন্যও বিশ্বস্ততা ভঙ্গের চেষ্টা না করে, স্মৃতির দংশনে জর্জরিত হয়ে, হলুদ প্রজাপতিগুলোর জ্বালায় এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি না পেয়ে, আর মুরগীচোর হিসেবে সমাজ থেকে বিতাড়িত হয়ে, আপোষহীন, প্রতিবাদহীন মৃত্যু হয় তার বৃদ্ধাবস্থায়।
     
  5. abdullah
    Offline

    abdullah Welknown Member Member

    Joined:
    Jul 30, 2012
    Messages:
    5,998
    Likes Received:
    1,583
    Reputation:
    967
    Country:
    Bangladesh Bangladesh
    ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ৩৫
    ----------------------------------
    যে সমস্ত ঘটনা মাকন্দোর জন্য প্রাণঘাতী হয়ে দেখা দেবে সেগুলো শুরু হবার সময়েই বাড়ীতে নিয়ে যাওয়া হয় মেমে বুয়েন্দিয়ার ছেলেকে। সামাজিক পরিস্থিতি তখন ছিল এতই অনিশ্চিত যে কারুরই মানসিক অবস্থা ছিল না ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে কেলেংকারী সৃষ্টির, আর ফলে ফের্নান্দা বাচ্চাটাকে অস্তিত্বহীনভাবে লুকিয়ে রাখার অনুকূল পরিস্থিতি পেয়ে যায়। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে ফের্নান্দার পক্ষে শিশুটিকে প্রত্যাখ্যান করার কোনই উপায় থাকে না, আর ওকে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। বাকি জীবনের জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওকে সহ্য করতেও বাধ্য হয় সে, কারণ তার গোপন সংকল্প, বাচ্চাটাকে গোছলখানায় ডুবিয়ে মারার ইচ্ছে পূরণের শেষ মুহূর্তে তার সাহসের অভাব হয়ে পরে। বাচ্চাটাকে তালাবদ্ধ করে সে কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার পুরোনো কামারশালায়, সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয় যে বাচ্চাটাকে এক ঝুড়িতে ভাসমান অবস্থায় পেয়েছে সে। উরসুলা ছেলেটার জন্মবৃত্তান্ত না জেনেই মারা যাবে। একবার ফের্নান্দা ছেলেটাকে খাবার দেবার সময় ছোট্ট আমারান্তা উরসুলা কামারশালায় ঢুকে পরে আর সেও ভাসমান ঝুড়ির গল্প বিশ্বাস করে। মেমের ব্যাপারটাকে এরকম অযৌক্তিক করুণ পরিণতি ঘটানোর কারণে চিরদিনের জন্য দূরত্ব রচনা করা আউরেলিয়ানো সেগুন্দো ওর কথা জানতেই পারে না বাড়িতে নেবার তিন বছর পর্যন্ত, যেদিন একবার ফের্নান্দার অসর্তকতায় বন্দীদশা থেকে পালিয়ে মুহূর্তের ভগ্নাংশের জন্য ও উঁকি দেয় বারান্দায়, নগ্ন অবস্থায়, মাথায় জটধরা চুল ও বিশালাকারের তিতিরের ঝুটির মত পুরুষাঙ্গ নিয়ে, যেন সে কোন মানবশিশু নয়, বরং বিশ্বকোষের বর্ণিত নরখাদক। এই ধরনের হঠাৎ ঘটে যাওয়া বিশ্রী ব্যাপারটা আর তার অমোচনীয় পরিণতির কথা ফের্নান্দার হিসেবের মধ্যে ছিল না। যে লজ্জাটাকে চিরকালের জন্য নির্বাসন দিয়েছে বলে ভেবেছিল সে, শিশুটি ছিল সেই লজ্জারই প্রত্যাবর্তন স্বরূপ। ভগ্ন মেরুদন্ডসহ, মাউরিসিও ব্যাবিলনিয়াকে বাড়ী থেকে সরিয়ে নেয়া মাত্রই ফের্নান্দা এই লজ্জাজনক ঘটনার সমস্থ চিহ্ন মুছে ফেলার এক সুনিপুন পরিকল্পনা আঁটে। স্বামীর সঙ্গে কোন পরামর্শ না করেই পরের দিন বাক্স পেটরা গোছায়, ওগুলোর ভেতর মেয়ের জন্য দরকার হবে বলে তিন প্রস্থ জামাকাপড় ভরে আর ট্রেন আসার আধঘন্টা আগে মেয়ের শোবার ঘরে যায় ওকে নিয়ে আসতে। “চল রেনাতা”-বলে ওকে। মেমেকে বিস্তারিত কিছুই জানায় না। ওদিকে মেমেও ওরকম কিছুর অপেক্ষা করেনি বা চায়নি। কোথায় যে যাচ্ছে তা যে শুধুমাত্র সে অবজ্ঞা করে তাই নয়, এমনকি ওকে বধ্যভুমিতে নিয়ে গেলেও সেটা ওর জন্য ছিল একই কথা। পিছনে উঠানে গুলির শব্দ ও একই সাথে মাউরিসিও ব্যাবিলনিয়ার যন্ত্রনায় আর্তনাদ শোনার সময় থেকেই ফের্নান্দার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে সে, আর জীবনে কোন দিন বলবেও না। মা যখন তাকে শোবার ঘর থেকে বেরুতে বলে সে চুলও বাধে না, মুখও ধোয় না, আর ট্রেনে চড়ে নিদ্রাচ্ছন্নের মত, এমনকি ওর সহচরী হলুদ প্রজাপতি গুলোকেও লক্ষ না করে। ওর এই পাথরসম নীরবতার কারণ ইচ্ছাকৃত, নাকি করুণ সেই ঘটনার আঘাতের ফলেই সে নির্বাক হয়েছে, তা ফের্নান্দা কখনই জানেনি বা জানার কোন চেষ্টাও করেনি। প্রাচীন মনমুগ্ধকর জায়গাটা পাড় হবার সময়ই প্রথমবারের মত মেমে লক্ষ করে তাদের এই ভ্রমনের ব্যাপারটা। লাইনের দুপাশ ধরে ছায়াঘন অন্তহীন কলা বাগানগুলো সে লক্ষও করে না, দেখে না গ্রিঙ্গদের সাদা বাড়ী বা ধুলো ও রৌদ্র তাপে দগ্ধ বাগানগুলো, চোখে পরে না খাটো প্যান্ট পরিহিত রমনীদের, যারা ডোরাকাটা শার্টপরে চাতালগুলোয় তাস খেলছিল। সে দেখে না ধুলোময় পথ ধরে চলা কলার ছড়া বোঝাই বলদটানা গাড়ীগুলো। তার চোখে পরে না নদীর স্বচ্ছ জলে “সাবালো” মাছের মত লাফিয়ে পরা কুমারী মেয়েদের, যাদের সুডৌল স্তন ট্রেনের যাত্রীদের মন তিক্ততায় ভরিয়ে দিচ্ছিল, চোখে পরে না মজুরদের রংবেরংয়ের জীর্ণ কুটির, যেখানে মাউরিসিও ব্যাবিলনিয়ার হলুদ প্রজাপতিগুলো ডানা ঝাপটাচ্ছিল, পরে না চোখে কুটিরগুলোর দরজায় যার যার মলত্যাগ পাত্রে বসা শীর্ণ সবুজ রংয়ের শিশুরা যেখানে গর্ভবতীরা গাল দিচ্ছিল চলন্ত্ ট্রেন দেখে। যখন সে পাঠস্থান থেকে ফিরত তখন ঐ চলমান দৃশ্য ছিল মেমের কাছে উৎসবের মত, যা কিনা আজ তার হৃদয়ে কোন অনুরনণ জাগায় না। সে জানালা দিয়ে তাকায় না, এমনকি দেখেও না কখন শেষ হয়েছে প্লান্টেশনের গায়ে জ্বালা ধরানো স্যাাতস্যাতে ভাব আর ট্রেন পার হয় আফিম চাষের বিস্তীর্ণ প্রান্ত যেখানে তখনও পড়ে ছিল অঙ্গারে পরিণত হওয়াা স্পেনের জাহাজটি, যেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেই একই স্ফটিক শুদ্ধ বাতাস, একই ফেনাময় নোংরা সমুদ্র আর যেখানে প্রায় এক শত বর্ষ আগে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার সমস্ত সপ্নগুলো পর্যবষিত হয় ধুলোয়। বিকেল পাঁচটায় জলাভুমির শেষ ষ্টেশনে এসে মেমে নেমে পরে, কারণ নামে ফের্নান্দা । হাঁপানীতে ভোগা এক ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে, যেটা দেখতে ছিল বিশাল এক বাদুড়ের মত, পাড়ি দেয় জনশূণ্য শহর, যেটার রাস্তা ছিল অন্তহীন শোরার কারণে ফাটল ধরা, যেখানে পিয়ানো অনুশীলনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল যেমনটি ফের্নান্দা শুনতে পেত বয়ঃসন্ধিকালে সিয়েস্তার সময়। পরে ওরা চড়ে বসে নদীতে চলা এক জাহাজে যেটার কাঠের চাকা যুদ্ধের শব্দ তুলত, যেটার মরিচা ধরা লোহার পাতগুলো আওয়াজ করছিল এক চুল্লী মুখের মত। কেবিনের মধ্যে ঢুকে দরজা বন্ধ করে মেমে দিনে দুইবার ফের্নান্দা ওর বিছানার পাশে খাবার রাখত আর দিনে দুইবার অস্পর্শ অবস্থায় নিয়ে যেত ওগুলো। মেমে যে না খেয়ে মরতে চায় সে জন্য নয় বরঞ্চ খাবারের গন্ধ তার কাছে অসহ্য লাগছিল, তার পাকস্থলী এমনকি পানিও সহ্য না করতে পেরে উগরে দিচ্ছিল। এমনকি সে নিজেও জানতো না যে তার উর্বরা শক্তি নির্বোধ বানিয়েছে সরষের তাপগুলোকে, যেমনটি ফের্নান্দাও জানতো না প্রায় এক বছর যাবৎ যতক্ষন পর্যন্ত না বাচ্চাটাকে তার কাছে নিয়ে আসা হয়েছিল। দমবন্ধ করা কেবিনের ভিতর লোহার পাতের কাপুনিতেও জাহাজের চাকার ঘূর্ণনে তোলপাড় করা কাদায় অসহ্য গন্ধে পাগল হয়ে যাওয়া মেমে ভুলে যায় দিনক্ষণের হিসেব। যখন সে দেখতে পায় শেষ হলুদ প্রজাপতিকে ফ্যানের পাখায় লেগে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হতে, তখন অনেক সময় পার হয়েছে আর তখন সে অমোচনীয় সত্য হিসেবে ধরে নেয় মাউরিসিও ব্যাবিলনিয়াার মৃত্যুকে । কিন্তু সে হতাশার কাছে নিজেকে হার মানতে দেয় না। পৃথিবীতে এ যাবৎ জন্ম নেয়া সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরীর খোঁজে যেখানে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো হারিয়ে গিয়েছিল সেই অলীক মালভুমিতে, খচ্চরের পিঠে পার হওয়ার সময়, ইন্ডিয়ানদের চলার পথ ধরে পর্বতশ্রেণী পাড় হবার সময়, বত্রিশটি গীর্জায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্রোঞ্জের ঘন্টা বাজানো পাথুরে গলির সেই বিষন্ন নগরীতে ঢোকার সময়ও সে চিন্তা করে চলে মাউরিসিও ব্যবিলিয়নিওর কথা। সেই রাতে ওরা ঘুমায় এক পরিত্যাক্ত ঔপনিবেশিক ম্যানশনে ফের্নান্দার পেতে দেয়া তক্তায়, আগাছা দ্বারা আগ্রাসিত মেঝেতে। জানালার থেকে টেনে ছিড়ে নামানো ছেড়া পর্দা গায়ে জড়িয়ে, যেটা শরীরের প্রতিটি গড়াগড়ির সঙ্গেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। মেমে জানতে পারে সে কোথায় এসেছে কারন অনিদ্রার আতংঙ্কের মধ্যে দেখতে পায় কালোপোষাক পরিহিত সেই ভদ্রলোককে, যাকে অনেক আগে বড়দিনের কিছু আগে এক সীসের কফিনে ভরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাড়িতে। পরের দিন, ফের্নান্দা তাকে নিয়ে যায় এক ছায়াঘন দালানে, যেটাকে মেমে একনজরেই চিনতে পারে কারণ যে কনভেন্টে তাকে রানী হবার শিক্ষা দেয়া হয়েছে তার কথা অনেক গল্প করেছে তার মা, আর সে বুঝতে পারে তাদের ভ্রমনের সমাপ্তিতে এসে পরেছে ওরা। ওর মা যখন পাশের অফিসে কোন একজনের সঙ্গে কথা বলছিল মেমে তখন অপেক্ষা করছিল দাবার কোর্টের মত সাদাকালো মেঝের ঔপনিবেশিক আর্চবিশপদের বড় বড় তৈলচিত্র ভরা বৈঠকখানায়, শীতে কাঁপতে কাঁপতে, কারণ তখনও তার পরনে ছিল কালো ফুল তোলা সুতীর পোষাক আর পায়ে ছিল মালভুমির বরফে শক্ত হয়ে ফুলে ওঠা উচুঁ জুতো। বৈঠকখানার কেন্দ্রে দাড়িয়ে অপেক্ষা করছিল সে ঘষা-কাচের মধ্যে দিয়ে আসা হলুদ আলোর নীচে মাউরিসিও ব্যাবিলনিওর কথা চিন্তা করতে করতে, যখন বেরিয়ে আসে এক নবদীক্ষিতা নান যে বহন করছিল তার তিন প্রস্থ কাপড়সহ তোরঙ্গটি। মেমের পাশ দিয়ে যাবার সময় না থেমেই হাত বাড়িয়ে দেয় সে। ”চল রেনাতা”- ওকে বলে, মেমে হাতটি ধরে, আর ওকে নিয়ে যেতে দেয় । শেষবার ফের্নান্দা যখন তাকে দেখে তখনও নবদীক্ষিতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটার চেষ্টা চালাচ্ছিল সে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার পিছনে লোহার গরাদ বন্ধ হয়ে যায়। তখনও সে ভাবছিল মাউরিসিও ব্যাবিলনিওর কথা, ওর তেলের গন্ধের কথা, আর প্রজাপতি বেষ্টনীর কথা, আর সে ভাবতে থাকবে সাড়া জীবন, ওকে যতদিন না এক সুদূর শারদ সকালে মারা যাবে সে বৃদ্ধাবস্থায় ক্রাকোভিয়ার এক অন্ধকার হাসপাতালে কখনও একটিও কথা না বলে আর যখন তার নাম বদলে দেয়া হয়েছে।

    ফের্নান্দা মাকন্দো- ফিরে আসে অস্ত্রধারী পুলিশ প্রহরাবাধীন এক ট্রেনে করে। ভ্রমনের সময় তার চোখে পরে যাত্রীদের মাঝে উত্তেজনা, রেললাইনের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে সামরিক কড়াকড়ি, আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো বিরল, ভয়ংকর কিছু ঘটার নিশ্চয়তা। কিন্তু মাকন্দোয় পৌঁছুনোর আগ পর্যন্ত ঠিকমত কিছু জানতে পারে না। আর পৌঁছুনো মাত্র তাকে বলা হয় যে হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো কলা কোম্পানির শ্রমিকদেরকে ধর্মঘটের জন্য উস্কানী দিচ্ছে। “একমাত্র এটাই বাকী ছিল ”-আপনমনে বলে ফের্নান্দা। পরিবারের মধ্যে এক নৈরাজ্যবাদী ধর্মঘট পালিত হয় দুসপ্তাহ পর আর নাটকীয় এমন কিছুই ঘটে না যেমনটি সে আশঙ্কা করেছিল। শ্রমিকদের দাবী ছিল তাদের যেন রোববারে কলা কাটা এবং তা পরিবহনে বাধ্য না করা হয়, আর এই দাবীকে এতই ন্যায্য বলে মনে হয় যে এমনকি ফাদার আন্তনিও ইসাবেল পর্যন্ত ওদের পক্ষ নিয়ে ওকালতি করে, কারণ দাবীটা ইশ্বরের আইন অনুযায়ী করা হয়েছে। এই ব্যাপারটার সফলতা ও পরের মাসগুলোতে হাতে নেয়া অন্যান্য বিভিন্ন কার্যক্রমে সফলতা হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোকে বের করে আনে তার দুর্নাম-জড়িত পূর্বপরিচিতি থেকে, তার সমন্ধে বলা হতো যে শুধু ফরাসি বেশ্যা এনে গ্রাম ভর্তি করা ছাড়া আর কিছুই সে জানে না। যে ঝোঁকের বশবর্তী হয়ে সে তার লড়িয়ে মোরগগুলো নিলামে তুলে পাগলাটে জাহাজ ব্যবসায় নামে, সেই একইভাবে সে পদত্যাাগ করে কলা কোম্পানির ফোরম্যানের চাকুরী, আর যোগ দেয় শ্রমিকদের পার্টিতে। শিঘ্রই তাকে চিহ্নিত করা হয় সামাজিক স্থিতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী আন্তর্জাাতিক চর হিসেবে। বিভিন্ন গুজবে অন্ধকার হয়ে আসা একটি সপ্তাহের একরাতে গোপন এক সমাবেশ থেকে বের হবার সময় তার উদ্দেশ্যে ছোড়া রিভলবারের চারটি গুলির হাত থেকে অলৌকিকভাবে পালাতে সক্ষম হয় সে। পরের মাসগুলোতে পরিস্থিতি এতই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে পরে যে এমন কি উরসুলা পর্যন্ত তার অন্ধকার কোণ থেকে তা বুঝতে পারে আর তার মনে হয় আবার সে বাস করছে নতুন করে সেই ঘটনাবহুল সময়ে যখন তার ছেলে আউরেলিয়ানো পকেটে ধ্বংসের হোমিওপ্যাথিক গুলি নিয়ে বেড়াচ্ছে। এই ঘটনা জানানোর জন্য হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোর সাথে কথা বলার চেষ্টা করে কিন্তু আউরেলিয়ানো সেগুন্দো জানায় যে হামলার রাতের পর থেকে তার অবস্থানের কথা কেউ জানে না, ঠিক আউরেলিয়ানোর মত বিস্ময়পূর্ণ কণ্ঠে বলে ”উরসুলা, পৃথিবীটা যেন ঘুরছে”। এই সমস্ত দিনের অনিশ্চয়তা ফের্নান্দাকে স্পর্শ করে না। স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ না করেই মেমের নির্বাসনের কারণে তুমুল ঝগড়া হয় তাদের মধ্যে। তার পর থেকে বাইরের জগতের সঙ্গে কোন সম্পর্ক থাকে না তার। মেয়েকে উদ্ধারের জন্য প্রস্তুত ছিল আউরেলিয়ানো সেগুন্দো, এমনকি পুলিশ ব্যবহার করে হলেও, কিন্তু ফের্নান্দা তাকে কাগজপত্রে দেখায় যে মেমে নিজের ইচ্ছেতেই মঠে যোগ দিয়েছে। সত্যিই মেমে লোহার গরাদের অন্যপাশ থেকে কাগজে সই করে আর করে সেই একই রকমের তাচ্ছিল্য নিয়ে, যে রকম তাচ্ছিল্যের কারণে সে তাকে নির্বাসনে পাঠাতে দিয়েছে। অন্তরের অন্তস্থলে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো ঐ প্রমাণের বৈধতায় বিশ্বাস করেনি যেমনটি কখনই বিশ্বাস করেনি, যে মাউরিসিও ব্যবিলনিও মুরগী চুরী করতে উঠানে ঢুকেছিল, কিন্তু দুটো ব্যাপার একীভূত হয়ে তার বিবেককে শান্ত রাখতে সাহায্যে করে আর ফলে কোন বিবেকদংশন ছাড়াই পেত্রা কত্রেসের ছায়াতলে ফিরতে পারে সে যেখানে আবার আরম্ভ করে কোলাহলপূর্ণ পার্টি ও লাগামহীন ভোজনের। শহরের উত্তেজনা থেকে দূরে থেকে উরসুলার ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণীতে কান না দিয়ে ফের্নান্দা তার পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনার শেষ প্যাচ কষে। কেবলমাত্র ছোটখাটো কাজ পেতে আরম্ভ করা ছেলে হোসে আর্কাদিওকে এক বিস্তারিত চিঠি লিখে জানায় যে তার বোন রেনাতা কালো বমি করে মারা গেছে। পরে আমারান্তা উরসুলার দেখাশোনার ভার সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদের হাতে দিয়ে অদৃশ্য ডাক্তারদের সঙ্গে পত্র বিনিময়ের কাজে নিজেকে নিয়োগ করে যা নাকি মেমের ব্যাপারটার কারণে ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল। প্রথমেই যা করে তা হচ্ছে মূলতবী রাখা টেলিপ্যাথিক অপারেশনের জন্য নির্দিষ্ট দিন ঠিক করা। কিন্তু অদৃষ্ট চিকিৎসকেরা উত্তর দেয় যে মাকন্দো-এর সামাজিক অবস্থার এরকম টালমাটাল অবস্থায় এটা করা উচিৎ হবে না। অপারেশনটা তার জন্য এতই জরুরী ছিল আর সে এতই কম খবর রাখতো যে আরেক চিঠিতে সে জানায় যে সে রকম কোন আলোড়ন মাকন্দো- এ বিরাজ করছে না আর এসবই হচ্ছে তার দেবরের পাগলামীর ফল, যে এখন শ্রমিক সংঘের ঘূর্নী বাতাস নিয়ে মত্ত, যেমনটি অন্য সময়ে মত্ত ছিল মোরগ লড়াই ও জাহাজ ব্যবসা নিয়ে। দুপক্ষ এ ব্যাপার নিয়ে একমত হবার আগেই এক উত্তপ্ত বুধবারে এক বর্ষিয়ানী নান দরজা থেকে ডাকে যার বাহুতে ঝুলানো ছিল এক ঝুড়ি। দরজা খুলে সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদ উপহার মনে করে সুন্দর লেসের কাজ করা মোটা কাপড় দিয়ে ঢাকা ঝুড়িটি নেবার চেষ্টা করে। কিন্তু নান বাধা দেয়। কারণ তার প্রতি নির্দেশ ছিল ব্যাক্তিগতভাবে, কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে সেটাকে দোনঞা (মিসেস) ফের্নান্দা দেল কার্পিও দে বুয়েন্দিয়ার হাতে দিতে। ঝুড়ির ভেতর ছিল মেমের ছেলে। ফের্নান্দার আগেকার আধ্যাত্মিক শিক্ষক একটি চিঠিতে খোলাশা করে লিখে দিয়েছে যে ছেলেটার জন্ম হয়েছে দুমাস আগে আর ব্যাপটাইজের সময় নানার নামে নাম রাখা হয়েছে আউরেলিয়ানো কারন ছেলের মা তার ইচ্ছে জানাতে দুঠোঁট আলাদা করেনি, নিয়তির প্রতি প্রচন্ড রাগ অনুভব করলেও নানের সামনে তা গোপন করতে সমর্থ হয় ফের্নান্দা । ”সবাইকে আমরা বলবো ঝুড়িসহ ভাসমান অবস্থায় ওকে পেয়েছি আমরা”- হেসে বলে। ”আপনাকে কেউই বিশ্বাস করবে না” বলে নান। ”বাইবেলে বর্ণিত একই গল্পে লোকে বিশ্বাস করতে পারলে”- উত্তর দেয় ফের্নান্দা- ”আমার কথা বিশ্বাস না করার কোন কারণ দেখছি না”। বাড়িতেই দুপুরের খাবার সাড়ে নান, ফেরার ট্রেন ধরার অপেক্ষায় আর গোপনীয়তার কঠোর নির্দেশ মান্য করে বাচ্চাটি সমন্ধে আর কোন কথা না উচ্চারণ করলেও ফের্নান্দা তাকে লজ্জার এক সাক্ষী হিসেবে গণ্য করে, আর তার আপসোস হয় লোকে মধ্যযুগীয় ফাঁসির রীতি বর্জন করেছে বলে, আর খারাপ খবর নিয়ে আসা এই দূতকে না ঝুলাতে পারায়। আর তখনই সিন্ধান্ত নেয় নান ফিরে যাওয়া মাত্রই শিশুটিকে গোসলের টাবে ডুবিয়ে মারার। কিন্তু মন অতটুকু শক্ত হতে না পারায় অসীম কৃপাময় ইশ্বর তাকে এই অন্তরায় থেকে মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করাই সমীচীন মনে করে। যখন নতুন আউরেলিয়ানোর বয়স এক বছর পূর্ণ হয় তখন কোন আগাম ঘোষণা ছাড়াই জনসাধারনের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পরে। হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো ও অন্যান্য সিন্ডিকেটের নেতারা এতদিন আত্মগোপন করে থাকা জায়গা থেকে, এক সপ্তাহান্তে হঠাৎ করেই উদয় হয় আর কলা অঞ্চলের শহরগুলোতে মিছিল করে। পুলিশ শুধু মাত্র নাগরিক নিরাপত্তা রক্ষা করেই সন্তুষ্ট থাকে। কিন্তু সোমবার রাতে নেতাদের বাড়ী থেকে বের করে পাঁচ কিলোর বেড়ি পায়ে পরিয়ে, পায়ে হাটিয়ে প্রাদেশিক রাজধানীর জেলে পাঠানো হয়। ওদের মধ্যে ছিল হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো ও লরেন্স গাবিলান। মাকন্দো-এ নির্বাসিত মেহিকানো বিপ্লবের এক কর্ণেল যার কথানুযায়ী সে তার কম্পাদ্রে আরতেমিও ক্রুজের বীরত্বের চাক্ষুস সাক্ষী। যদিও তিন মাসের মধ্যেই ওরা ছাড়া পেয়ে যায় কারণ সরকার ও কলা কোম্পানি একমত হতে পারছিল না কাকে জেলে ঢুকাবে এ ব্যাপারে। এসব কর্মচারীদের ক্ষোভের ভিত্তি ছিল অসাস্থ্যকর পরিবেশে বাসস্থান, চিকিৎসার সুবিধা প্রদানের ব্যাপারে প্রতারণা, আর কর্মস্থলের শোচনীয় পরিবেশ। এছাড়াও তারা জোর করে বলে যে তারা নগদ টাকায় বেতন না দিয়ে জিনিসপত্র কেনা যায় এমন টিকেট দেয় যার বিনিময়ে কমিসারি থেকে ভার্জিনিয়া হ্যাম ছাড়া আর কিছুই কেনা যায় না। হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোকে জেলে পোরা হয় কারণ সে-ই ফাঁস করে দিয়েছিল যে টিকেট দিয়ে বেতন দেয়ার ব্যবস্থা আসলে ফলের জাহাজগুলোর জন্য টাকা জোগানোর ব্যবস্থা কারণ, তা না হলে জাহাজগুলোকে খালি ফিরতে হতো কলা ওঠানোর ডক থেকে নিউ আরলিন্স পর্যন্ত। অন্যান্য অভিযোগগুলো ছিল সর্বজনবিদিত। কোম্পানির ডাক্তাররা রোগীদের পরীক্ষা করত না, তার বদলে রোগীদের কে ডিসপেন্সারির সামনে লম্বা লাইনে দাঁড় করিয়ে এক নার্সকে দিয়ে তাদের জিভের উপর কপার সালফেটের রংয়ের বড়ি দেওয়াতো। তা ম্যালেরিয়া, গনোরিয়া বা কোষ্ঠকাঠিণ্য যে রোগই হোক না কেন সব রোগের বেলাতেই ছিল একই চিকিৎসা। চিকিৎসাটা এমন সাধারণভাবে করা হতো যে বাচ্চারা বার বার লাইনে দাড়িয়ে বড়ি না গিলে বাড়ি নিয়ে যেত লটারি খেলার গুটি হিসেবে ব্যবহারের জন্য। কোম্পানির কর্মচারীরা ছোট্ট ঘরে গাদাগাদি করে থাকত। কোম্পানির ইঞ্জিনিয়াররা শৌচাগার না বসিয়ে বড়দিনের সময় ভ্রাম্যমান টয়লেট ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে প্রতি পঞ্চাশজন লোকের জন্য একটি করে দিয়ে, কিভাবে সেটি ব্যবহার করলে দীর্ঘদিন সেটা টিকে থাকবে তার প্রদর্শনী করতো। কালো পোশাক পরিহিত জড়ায় আক্রান্ত অন্য সময়ে কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে ঘিরে থাকা উকিলরা ছিল কলা কোম্পানির আইনগত প্রতিনিধি, আর তারা এই সব দাবী এমন সব যুক্তির সঙ্গে বাতিল করে দিত যে সেটাকে মনে হতো জাদুর খেলা। যখন শ্রমিকরা এক সর্বসম্মত দাবীর তালিকা দাড় করায়, সেটাকে কলা কোম্পানির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে প্রচুর সময় লেগে যায়। এই সর্বসম্মত দাবীর কথা জানার সঙ্গে সঙ্গেই সেনঞর ব্রাউন তার কাঁচের ওয়াগনটা ট্রেনের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে আরও কিছু কোম্পানির বহুল পরিচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একসঙ্গে মাকন্দো থেকে উধাও হয়। অবশ্য পরের শনিবার কয়েকজন শ্রমিক বেশ্যালয়ে গিয়ে এক মেয়েকে দিয়ে ফাঁদে ফেলে উলঙ্গ অবস্থায় তাকে দিয়ে দাবীর কাগজটায় সই করিয়ে নেয়। বিষন্ন উকিলের দল বিচারকের কাছে প্রমাণ করে যে সই করেছে তার সঙ্গে কোম্পানির কোন সম্পর্কই নেই আর যাতে কোন সন্দেহ সৃষ্টি না হয় তার জন্য তাকে প্রতারক হিসেবে জেলে ভরা হয়। পরে ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণীতে বেনামে ভ্রমণকৃত সেনঞর ব্রাউন ধরা পরে যায় শ্রমিকদের কাছে আর তাকে দিয়ে আবার দাবীর অন্য এক অনুলিপিতে সাক্ষর করানো হয়। সে পরের দিন বিচারকদের সম্মুখে হাজির হয় চুলে কালো কলপ লাগিয়ে ও নিখুঁত কাস্তেইঞানো (স্প্যানিশ) বলে। উকিলরা প্রমাণ করে যে সেই লোক আলাবামার গ্যাটাভিলে জন্মগ্রহণকারী কলা কোম্পানির সুপারিন্টেডেন্ড নয়, বরঞ্চ মাকন্দো-এ জন্মগ্রহনকারী এক নিরীহ ভেষজ গাছগাছড়ার বিক্রেতা যাকে ব্যাপটাইজ করা হয়েছিল দাগোবের্ত ফনসেকা নামে। কিছুদিন পর শ্রমিকদের নতুন এক প্রচেষ্টার ফলে উকিলরা জন সম্মুখে প্রদর্শন করে কনসাল ও বিদেশ মন্ত্রীকৃত সত্যায়িত সেনঞর ব্রাউনের মৃত্যু সনদ যেটা অনুযায়ী সে মারা গেছে গত জুনের নয় তারিখে শিকাগোতে দমকল বাহিনীর গাড়ি চাপা পরে। এই সব বাজে প্রলাপে ক্লান্ত হয়ে শ্রমিকরা মাকন্দোর কর্তৃপক্ষকে বাতিল করে দিয়ে উচ্চতর আদালতে তাদের দাবী তুলে ধরে। সেখানেই আইনের যাদুকররা প্রমাণ করে এই সমস্ত দাবীর কোন সত্যকার ভিত্তি নেই কারণ কলা কোম্পানির কখনও কোন শ্রমিক নেই, কোন দিন ছিলওনা এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না। বরঞ্চ যারা সেখানে কাজ করে তারা সকলেই অস্থায়ী কর্মী, ফলে ভার্জিনিয়া হ্যামের কথা, জাদুকরী বড়ীর কথা বড়দিনের পবিত্র শৌচাগারের কথা সবই ভিত্তিহীন হয়ে পরে আর আদালতের হুকুমে সেটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় আর প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রমিকদের অস্থিত্বহীনতার কথা।

    আরম্ভ হয় মহা ধর্মঘট। চাষবাস পরে থাকে অসমাপ্ত, ফল পঁচতে থাকে গাছে আর একশ বিশ ওয়াগনের ট্রেন পরে থাকে রেল লাইনের বিভিন্ন শাখা প্রশাখায়। বেকার শ্রমিকে উপচে পরে শহরটা । তুর্কদের রাস্তায় সম্মিলিত চিৎকার প্রতিধ্বনিত হয়। অনেক দিনের মধ্যে এক শনিবারে আর হোটেল জ্যাকব-এর বিলিয়ার্ড রুমগুলোতে চব্বিশ ঘন্টার শিফট চালু করা হয়। যেদিন ঘোষণা করা হয় জন-সাধারণের মধ্যে শৃংখলা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সামরিক বাহিনীর হাতে দেওয়া হয়েছে, সেদিন হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো ওখানেই ছিল যদিও সে পূর্ববোধ অনুভবের মানুষ নয় তবু ওর জন্য সেটা যেন ছিল মৃত্যুর ঘোষণা যার জন্য সে অপেক্ষায় ছিল সুদূর অতীতের সেই সকাল থেকে যে সকালে কর্ণেল হেরিনেল্দ মার্কেজ ওকে মৃত্যুদন্ড দেখবার সুযোগ দিয়েছিল। অবশ্য এই অশুভ সংকেতটা তার গাম্ভীর্যে কোন পরিবর্তন আনে না। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ীই সে নির্ভুলভাবে বিলিয়াার্ডের কিউ বলটাকে খেলে। খানিক পর ড্রামের শব্দ, বিউগলের তীব্র আওয়াজ লোকজনের চিৎকার ও অনেক লোকের দৌড়াদৌড়ির শব্দ ওকে জানায় যে শুধুমাত্র বিলিয়ার্ড খেলাই যে শেষ হয়েছে তা নয়, নিঃশব্দে একাকী যে খেলাটা সে খেলে আসছিল মৃত্যুদন্ডের ঊষা থেকে সেটারও শেষ পর্যন্ত সমাপ্তি ঘটেছে। সর্বমোট তিন রেজিমেন্ট ছিল ওরা আর গ্যালি ড্রামের শব্দের সঙ্গে করা মার্চ মাটি কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। ওদের অসংখ্য ড্রাগনের নাক থেকে বের হওয়া বিশ্রী গন্ধের বাষ্প দুপুরের নির্মলতাকে ভড়িয়ে দিয়েছিল। ওরা ছিল ছোটখাটো, গাট্টাগোট্টা, রূঢ়। ঘোড়ার মত ঘামতো ওরা, রোদে পোড়া বলে এক ধরনের শুকনো চামড়ার গন্ধ বের হত গা থেকে আর ওদের ছিল পাহাড়ি লোকের মৌনতা ও অভেদ্য অধ্যবসায়। যদিও জায়গাটা পার হতে ওদের এক ঘন্টার বেশী সময় লাগে তবুও মনে হতে পারত যে সামান্য কিছু স্কোয়ার্ড বৃত্তাকারে মার্চ করছে কারণ ওরা ছিল সকলেই একই রকম। একই মায়ের গর্ভে জন্ম আর সকলেই একই রকমের বুদ্ধুতা নিয়ে বয়ে চলেছে হ্যাভারস্যাক, ক্যান্টিন বেয়নেট সমেত বন্দুকের লজ্জা, অন্ধ বশ্যতার অস্বস্তি ও সম্মানবোধ। উরসুলা ওদের শুনতে পায় ওর ছায়াান্ধকার বিছানা থেকে আর হাত তোলে ক্রস আঁকতে । সদ্য ইস্ত্রি করা নকশা করা খাবার টেবিলের চাদরে ভর দিয়ে ক্ষণিকের জন্য থমকে দাড়ায় সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদ আর ভাবে ছেলে হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোর কথা যে তখন হোটেল জ্যাকবের সামনে দিয়ে শেষ সৈন্যটিকে চলে যেতে দেখছে।

    সামরিক আইন, এই বিরোধে মধ্যস্থতা করার সুযোগ করে দেয় সেনাবাহিনীকে । কিন্তু ওরা সমঝোতা ঘটানোর কোন চেষ্টাই করে না দুপক্ষের মাঝে। মাকন্দো-এ মুখ দেখানো মাত্রই বন্দুক একপাশে সরিয়ে রেখে কলা কেটে বোঝাই করে ট্রেন চালিয়ে দেয়। শ্রমিকরা, যারা এযাবৎ অপেক্ষা করেই সন্তুষ্ট ছিল। তারা নিজেদের একমাত্র কাজের হাতিয়ার মাচেতে (বড় কাস্তে) নিয়ে টিলায় ঢুকে অন্তর্ঘাতের বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতে নেমে পরে। আগুন জ্বালিয়ে দেয় কলা বাগানে ও রসদের দোকানে, ধ্বংস করে রেলপথ, বাধা সৃষ্টি করে সেই সব রেল চলায় যে রেলগুলো মেশিনগানের গুলি ছুড়ে পথ করে নেয়া শুরু করেছিল, আর কেটে দেয় টেলিফোন ও টেলিগ্রাফের তার। সেঁচের খালগুলো রক্তে লাল হয়ে উঠে। বিদ্যুতায়িত মুরগীর খোয়াড়ের ভিতরে তখনও জীবিত সেনঞর ব্রাউনকে তার অন্যসব সঙ্গী ও পবিরারসহ মাকন্দো থেকে সরিয়ে ফেলা হয় নিরাপদ জায়গায় সামরিক বাহিনীর প্রহরাধীনে। পরিস্থিতি যখন এক অসম রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের দিকে এগুচ্ছে তখন কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের কে মাকন্দো-তে জড়ো হতে আহবান করে। সেখানে ঘোষণা করা হয় সামরিক ও বেসামরিক প্রাদেশিক নেতারা বিরোধে মধ্যস্থতা করতে পরের শুক্রবারে এসে পৌঁছুবে।
    শুক্রবার ভোর হতে রেলষ্টেশনে জড়ো হওয়া ভীড়ের মধ্যে ছিল হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো। আগেই সে অংশগ্রহণ করেছিল ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে এক বিশেষ আলোচনায়, আর কর্ণেল গাভিলান ও তার দায়িত্ব ছিল ভিড়ের মধ্যে মিশে যেয়ে অবস্থানুযায়ী ব্যবস্থা নেবার। খুব একটা ভাল বোধ করছিল না সে আর আঠালো কিছু দলা অনুভব করতে শুরু করেছিল তার টাকরার উপর, যখন থেকে সে দেখতে পায় ছোট্ট প্লাজার চারদিকে মেশিনগান বসানো হয়েছে ও কলা কোম্পানির তার ঘেরা শহর সুরক্ষিত করা হয়েছে গোলন্দাজ বাহিনীর অস্ত্র দিয়ে তখন থেকেই। বারোটা বাজতে চলেছে, না আসা রেলের জন্য অপেক্ষা করছে তিন হাজারের বেশী লোক, যাদের মধ্যে ছিল শ্রমিক, মহিলা ও শিশু যাদের দ্বারা রেল ষ্টেশনের সামনের খালি জায়গাটা ভরে উপচে পরেছে পার্শবর্তী রাস্তায় সারি বেধে রাখা সামরিক বাহিনীর মেশিনগানধারীদের উপর চাপ সৃষ্টি করে। অভ্যর্থনা জানানোর অপেক্ষারত ভীড়ের চেয়ে, তাদেরকে মনে হচ্ছিল আনন্দমুখর এক মেলা। তুর্কদের রাস্তা থেকে ভাজাভুজি ও পানীয়ের ভ্রাম্যমান দোকানগুলো স্থানান্তরিত হয়েছে ওদের মাঝে আর লোকেরা প্রচন্ড উৎসাহ নিয়ে সহ্য করছিল অপেক্ষা ও গা জ্বলানো রোদের যন্ত্রনা। তিনটে বাজার কিছু আগে গুজব ওঠে সরকারী রেলটা পরের দিনের আগে আসছে না। ক্লান্ত ভিড় ফেলে এক হতাশার দীর্ঘশ্বাস। এই সময় ভিড়ের দিকে তাক করা চারটে মেশিনগান বসানো স্টেশনের ছাদের উপর ওঠে সেবাবাহিনীর এক লেফটেন্যান্ট আর মুহূর্তের জন্য নেমে আসে নীরবতা। হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোর পাশে ছিল চার ও সাত বছরের শিশুসহ খালি পায়ে দাড়ানো এক ভীষন মোটা মহিলা, ওকে না চিনলেও ছোট ছেলেটাকে কোলে তুলে নিয়ে অন্যটাকে উঁচু করে তুলে ধরতে বলে মহিলা হোসে আর্কাদিওকে যাতে ভাল করে শুনতে পারে যা বলা হবে, ছেলেটাকে কাঁধে তুলে নেয় হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো । অনেক বছর পর সেই শিশু যদিও কেউ বিশ্বাস করবে না তবুও গল্প করবে যে লেফট্যানেন্টকে সে গ্রামোফোনের মধ্যে দিয়ে প্রাদেশিক সামরিক ও বেসামরিক ৪ নম্বর ডিক্রি পড়তে শুনেছে। ওটা সই করা ছিল জেনারেল কার্লোস কর্তেস ভার্গাস ও তার সেক্রেটারি মেজর এনরিকে গার্সিয়া ইসায়ার দ্বারা আর আশি শব্দের তিন ধারায় ধর্মঘটীদের দুষ্কৃতিকারীদল বলে ঘোষণা করা হয় এবং সেনাবাহীনিকে গুলি করে মারার ক্ষমতা দেয়া হয়।

    কানে তালা লাগানো শীষ-এর মধ্যে দিয়ে ডিক্রিটা পড়া শেষ হলে ষ্টেশনের ছাদে লেফট্যান্টের জায়গা দখল করে ক্যাপ্টেন ও গ্রামোফোনের চোঙ্গা দিয়ে ইশারা করে যে সে কিছু বলতে চায়। নিঃশব্দ হয়ে যায় জনতা। ”ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গন”- বলে ক্যাপ্টেন খানিকটা ক্লান্ত নিচু স্বরে, ধীরে ধীরে “জায়গা ত্যাগ করার জন্য পাঁচ মিনিট সময় দেয়া হচ্ছে”।

    শীষ ও দ্বিগুণ চিৎকারে চাপা পরে যায় নির্ধারিত সময় আরম্ভের বিউগলের আওয়াজ। কেউ নড়ে না। ”পাঁচ মিনিট পার হয়ে গেছে”-একই স্বরে বলে ক্যাপ্টেন ”আর এক মিনিট, তারপরই গুলি শুরু হবে”। বরফশীতল ঘাম নিয়ে হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো শিশুটিকে কাঁধ থেকে নামিয়ে মহিলাকে দেয়। ”বেজন্মারা গুলি চালাতেও পারে”-বিড়বিড় করে মহিলা। কথা বলার সময় পায় না হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো কারণ একই সময় মহিলার বলা কথার প্রতিধ্বনি তুলে চিৎকার করে বলা কর্ণেল গ্যাভিলানের কর্কশ কন্ঠস্বর মূহুর্তেই চিনতে পারে সে। টানটান উত্তেজনার আশ্চর্য নৈঃশব্দের গভীরতায় মদির হওয়া আর মৃত্যুর আকষর্ণে সম্মোহিত এই জনতাকে কিছুই নড়াতে পারবে না এই বিশ্বাসে নিশ্চিত হয়ে, হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো তার সামনের মাথাগুলোর উপর উচুঁ হয়ে জীবনের প্রথম বারের মত গলা চড়ায়, “বেজন্মার দল”- চিৎকার করে “তোদের উপহার দিচ্ছি বাকি মিনিটটা”।

    to be continued...
     

Pls Share This Page:

Users Viewing Thread (Users: 0, Guests: 0)